ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

আগ্নেয়গিরি থেকে উৎপন্ন জেজুডো দ্বীপ দক্ষিণ কোরিয়ার মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণে অবস্থিত। উপবৃত্তাকার এ দ্বীপটি পূর্ব-পশ্চিমে ৭৩ কিলোমিটার এবং উত্তর-দক্ষিণে ৩১ কিলোমিটার বিস্তৃত। এর ক্ষেত্র ১,৮৪৮ বর্গকিলোমিটার, যা সিঙ্গাপুরের চেয়ে তিনগুণেরও বেশী। এখানে বাস করে প্রায় চারশ হাজার মানুষ। এটি দক্ষিণ কোরিয়ার ‘স্পেশাল অটোনোমাস প্রভিন্স’ যার রাজধানীর নাম জেজু বা জেজু সিটি। জেজু নামেই এখন দ্বীপটি বেশী পরিচিত হয়ে উঠেছে। কোরিয় উপদ্বীপের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই জেজু’তে যাতায়াত অতীতে খুব সহজ ছিল না। আর এ কারণে জেজুর অধিবাসীরা গড়ে তুলেছিল একান্তই নিজস্ব এক সাগর পারের সংস্কৃতি।

জেজুর নানা প্রাকৃতিক বিস্ময়ের মধ্যে তিনটি ইউনেস্কো কর্তৃক ‘ওয়ার্ড হেরিটেজ সাইট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এরা হলো হাল্লাসান, সেওংসান ইলচুলবং শিখর এবং দ্বীপটির লাভা টিউব সিস্টেম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক মনোহারী নয়নোহারী লীলাভূমি এই দ্বীপ অধুনা ‘নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স’ এর একটি হিসেবে নির্ধারিত হয়ে আছে।

স্যামডা এবং স্যাম্‌মু

স্যামডা শব্দের অর্থ ‘তিন প্রাচুর্য’। দ্বীপটিতে পাথর, বায়ুপ্রবাহ ও নারীর আধিক্যের জন্য এই স্যামডা নামের উৎপত্তি। সাগর থেকে সাড়া বছর ধরে এখানে জোর বায়ু প্রবাহিত হয়। অগ্ন্যুৎপাত থেকে উৎপত্তির কালে সৃষ্ট নানা আকারের বাহারি সব কালো পাথরের প্রাচুর্য এই দ্বীপের একটি নান্দনিক উপাদান। দ্বীপবাসীরা মনে করে থাকে, এসব পাথর একত্রিত করা গেলে কয়েকটি চীনের প্রাচীর তৈরি করা যেত। এছাড়া এখানে নারীদের আধিক্য ও এখানকার নারীদের মানসিক শক্তিমত্তাও একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ঐতিহ্য হয়ে আছে দূর অতীত থেকেই। এজন্য দ্বীপটি স্যামডাডো দ্বীপ নামেও পরিচিত। অন্যদিকে স্যাম্‌মু অর্থ ‘তিন অভাব’। দ্বীপটিতে যে তিনটি জিনিসের অভাব রয়েছে সেগুলো হলো চোর, ভিক্ষুক ও গেইট।

হাল্লাসান

ভূপ্রকৃতির দিক থেকে হাল্লাসান হচ্ছে জেজুডো’র কেন্দ্র। হাল্লাসান অর্থ হাল্লা পাহাড়। পাহাড়টি পূর্ব-পশ্চিমে প্রলম্বিত এবং চূড়াটি আকাশের দিকে মুখ করে শায়িতা এক নারীর মুখ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে এখানকার অধিবাসীদের কাছে। আমরা মাত্র পাঁচদিন ছিলাম এই দ্বীপে। প্রথম কদিন হাল্লার মুখ দেখার উপায়ই ছিল না কুয়াশার কারণে। বলা হয়ে থাকে লাজুক দেবীর মুখ দর্শন ভাগ্যের বিষয়। তবে পরের কদিন আকাশ পরিষ্কার থাকায় তার মুখ দেখার ভাগ্য আমাদের হয়েছিল। গাড়ীতে করে পাহাড়ের অনেকখানি আমরা উঠেছিলাম। আর সমস্ত রাস্তার দুপাশ জুড়ে দৃষ্টিনন্দন বিচিত্র সব নানা রকমের নানা রঙের গাছপালার সমারোহে মনের বিস্ময়ভাব আয়ত্তে রাখা আমাদের তিনজনের কারও পক্ষেই সম্ভব হচ্ছিল না।

জেজুর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

আমি বরাবরই অলস এবং নিছক দেখার জন্য এত কষ্টের কী দরকার তা না বুঝেই কাটিয়ে দিয়েছি জীবনের মেলা সময়। ইদানীং বেড়াতে যাই বটে, কিন্তু কন্যার মুখে ফুটে ওঠা দেখার আনন্দটুকু দেখার জন্য মাত্র। জেজুডো দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এমন যে এবারই প্রথম আগ্রহ নিয়ে কিছু দেখেছি, দেখার জন্য মাইল-মাইল হেঁটেছি, পাহাড় বেয়ে উপরে উঠেছি। প্রকৃতির সাথে মিলিয়ে এখানকার মানুষেরা ঘর সাজিয়েছে, পথের দুধারে বিচিত্র রঙের বড় বড় গাছ ও ছোট ছোট ফুলের গাছ লাগিয়েছে। ঈশ্বর ও মানুষ মিলে জেজুডো দ্বীপের সৌন্দর্যকে গড়ে তুলেছে তিলে তিলে; যেখানেই গিয়েছি যেদিকেই তাকিয়েছি সুন্দর ছাড়া কিছুই দেখিনি। এটি তাই এ অঞ্চলে হয়ে উঠেছে বিবাহ পরবর্তী হানিমুন উদযাপনের শ্রেষ্ঠ ক্ষেত্র। শুনেছি গড়ে প্রতিদিন দুশোরও বেশী বিমান উঠা-নামা করে জেজু বিমানবন্দরে।

জেজুর নারীরা

দেবী হিসেবে পরিগণিত হাল্লাসান যেমন জেজুডো দ্বীপের কেন্দ্র, জেজুর নারীশক্তিও তেমনই হয়ে আছে এখানকার কিংবদন্তি, লোকায়ত কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ধর্মের প্রাণ। দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তিমত্তার বিচারে এবং পরিবারের আয়-রোজগার ও নিরাপত্তাবিধানের ক্ষেত্রে এখানকার নারীরা বিখ্যাত হয়ে আছে প্রাকৃতিক নারীবাদী হিসেবে। আমরা বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ব্যক্তি-নারীকে দেখেছি নিজেকে নারীবাদী হিসেবে উপস্থাপন করতে। কিন্তু জেজুর নারীরা যেন ছিল একটি প্রাকৃতিক নারীবাদী সমাজ – যেখানে উপস্থাপনার ঘটা নেই, কিন্তু আছে বাস্তব অবস্থান। এখানে সংসারে নারীর কণ্ঠ ও উচ্চারণ পুরুষের কণ্ঠ ও উচ্চারণের সমান শক্তি নিয়ে বিদ্যমান ছিল। জেজুর লোকায়ত ধর্মে রয়েছে প্রচুর দেবীর অস্তিত্ব, যারা আসলে জেজুর নারীর এই শক্তির রূপকল্প।

দ্বাদশ শতকে মোঙ্গোলরা জেজুডো অবধি গিয়ে পৌঁছেছিল। জেজুর নারী-মানস গঠনে নারীদের প্রতি উদার মোঙ্গোলদের এই উপস্থিতির ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। মোঙ্গোলদের সাথে এখানে এসেছিল তাদের ঘোড়াগুলোও এবং ক্রসব্রিডিং থেকে উৎপন্ন ঘোড়ার জাতগুলো কেবল জেজুতেই দেখা যায়। একালেই জেজুর নারীরা ঘোড়ায় চড়তে শেখে। পরে কনফুসিয়াসের ধর্মের প্রাধান্যের কালে দ্বীপের মধ্যবর্তী উঁচু অংশের নারীদের অবস্থার কিছু পরিবর্তন হয়েছিল। কিন্তু সাগর পারের মেয়েরা তাদের নারীত্ব-প্রধান শামানীয় ধর্ম ছাড়েনি যদিও তারা অন্যদের দ্বারা গণ্য হয়েছিল নিচু ও অসভ্য হিসেবে।

জাপানীদের উপনিবেশকালে ও তারপরের কমিউনিস্ট দমনকালে জেজুর নারীরা দেখেছে তাদের চোখের সামনে কিভাবে তাদের স্বামীরা পুত্ররা নিহত হচ্ছে। এ যাতনা জেজুর নারীদেরকে সাহসী করে তুলেছিল। পরিবারকে রক্ষা করার জন্য তারা নৌবাহিনীতেও যোগ দিত, যেন তাদের স্বামীরা বা পুত্ররা কমিউনিস্ট আখ্যায়িত হওয়া থেকে রক্ষা পায়। পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আরও নানাভাবে তারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতো। জেজু দ্বীপে এখনও নারীদের সংখ্যা পুরুষদের সংখ্যার চেয়ে বেশী।

জেজুর নারীরা ডুবুরি হিসেবে এক অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিল। সাগরের পার ঘেঁষে ডুব দিয়ে সাগর থেকে খাবার সংগ্রহ করতো তারা। অন্যদিকে, পুরুষরা মাছ ধরতে যেত সাগরের অভ্যন্তরে। পুরুষদের এই বিপদজনক পেশাও দ্বীপে নারীদের সংখ্যাধিক্যের কারণ ছিল। আজও জেজুর অনেক স্থানীয় পরিবারে ডুবুরি মেয়েদের দেখা যায়। আমাদের গাইড কো বলছিলেন, ভাগ্য ভাল থাকলে তাদের কারও ডুব দেয়ার দৃশ্য দেখার সুযোগ আমাদের হতেও পারে। অবশ্য তা দেখার সুযোগ আমরা পাইনি।

গাইড কো

আমারা তিন সহকর্মী জেজু গিয়েছিলাম দফতরের কাজে। আয়োজকেরা এক বিকেল রেখেছিলেন (দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত) দ্বীপটির কয়েকটি আকর্ষণীয় স্থান পরিদর্শনের জন্য। সেজন্য দুটো বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আমরা যে বাসে করে গিয়েছিলাম সে বাসের জন্য গাইড নির্ধারিত ছিলেন এক অনর্গলভাষী রসময়ী নারী। জেজুর স্থানীয় অধিবাসী যুবা বয়সী এই নারীর নাম কো, পেশায় ‘ইংলিশ ইন্টারপ্রেটার’; অর্থাৎ তিনি একজন পেশাদার গাইড। তিনি জেজুর বৈশিষ্ট্য, জেজুর নারীদের ঐতিহ্য, তানজেরিনের চাষ, জেজুর লোকায়ত সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ধর্ম ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলেই চলেছিলেন। এই বাকপটু রসিকা নারীর কথা, উপস্থাপনা আর হাসির মধ্যেও ছিল জেজুর নারীশক্তির সেই ঐতিহ্য। তার বর্ণন ও রসিকতার দক্ষতা হয়ে উঠেছিল এক শিল্পকর্ম যা জেজুকে অনুভব করার ক্ষেত্রে আমাদের পুরো ভ্রমণটিকে দিয়েছিল আরেক মাত্রা।

ফোকলোর ভিলেজে জেজুর ঢোল

ফোকলোর ভিলেজ এখানে দেখার মত একটি সাইট। পুরাতন আমলের বসত ভিটে বাড়ীর পূর্ণ নমুনা এখানে তৈরি করে রাখা হয়েছে। কোন কোন বাড়ীর চারদিকে ছনের পুরু ছাউনি দেয়া ঘর, মাঝে একটু উঠান ও চারপাশে কালো পাথরের বেড়া। ভিটেগুলো দেখে আমাদের গ্রামের কথাই মনে পড়ছিল। এই ফোকলোর ভিলেজে একটি বড় ঘরে স্থানীয় ছেলে মেয়েরা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোষাকে নেচে নেচে ঢোল-বাঁশী ইত্যাদি বাজিয়ে থাকে। আমরা যখন সেখানে উপস্থিত ছিলাম তখন যে কম্পোজিশনটি শুনেছিলাম তা ধীর লয়ের। তিনটি বালিকা তিনটি ঢোল বাজিয়ে নেচে বেড়াচ্ছিল, পাশে বসে অন্য তিনজন অন্যসব যন্ত্র বাজাচ্ছিল। আমি পশ্চিমাদের ড্রামের বিট শুনেছি, শুনেছি আমাদের বাঙালীদের ঢোলের বাড়ি। এতে উন্মাদনাই যেন বেশী। কিন্তু ঢোলের বাড়ি এতো প্রশান্ত হতে পারে তা এখানে আসার আগে ধারণায় ছিল না। বেশ একটি জটিল তাল-লয়ে বাড়িগুলো কানে আসছিল, বিটগুলো খুবই অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে যেন ভেঙে ভেঙে পড়ছিল। এই প্রত্যাশিত মুহূর্তের নীরবতা ও অপ্রত্যাশিত সময়ের আকস্মিক মধুর শব্দের সৃষ্টি আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল।

কালো পাথরের বেড়া

এখনও জেজুর বাড়িঘরের ঘের হিসেবে দেখতে পাওয়া যায় অনতি-উচ্চ কালো পাথরের বেড়া। এটি তাদের সেই পুরাতন ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছে। আগের কালে জেজুবাসীরা এরূপ বেড়া দিত বাড়িঘরকে গরু-ছাগলের প্রবেশ থেকে রক্ষা করার জন্য। চুরি কি কাজ তা অতীতের মত আজও জানে না জেজুবাসীরা। তবে মানুষের জন্য তারা একটি দ্বার রাখতো যেখানে প্রতি পাশে তিনটি (বা চারটি) ছিদ্রের মধ্যে বাঁশ দিয়ে বেড়ার মত তৈরি করা হতো। যে কেউ এই বেড়া লাফ না দিয়েও ডিঙাতে পারে। ঘরে কেউ নেই তা প্রকাশের জন্য সবগুলো বাঁশ ছিদ্রে ঢুকিয়ে বেড়া সম্পূর্ণ রাখা হতো। ঘরে কেউ নেই কিন্তু আশপাশেই আছে – এটি জানানোর জন্য উপরের একাধিক বাঁশের একমাথা মাটিতে ফেলে রাখা হতো। আর ঘরে লোকজন থাকলে সবগুলো বাঁশেরই এক মাথা মাটিতে ফেলে রাখা হতো। অর্থাৎ তাদের এই বাঁশের গেইট ছিল মূলত আগন্তুকের সাথে যোগাযোগের একটি মাধ্যম।

তানজেরিনের বাগানগুলো

ল্যান্ডিংয়ের সময় জানালা দিয়ে দেখেছিলাম প্রচুর ঢেউ খেলানো ছাদ। ধারণা করেছিলাম এগুলো বুঝি যন্ত্র-সভ্যতার বিগ্রহ উৎপাদনের কারখানাগুলোর ছাদ। কিন্তু পরে জানা গেল এগুলো সব গ্রীন হাউস, যার ভেতর তানজেরিন চাষ করা হয়। তানজেরিন এক রকমের মেন্ডারিন কমলা। জেজু বেশ কয়েক রকমের তানজেরিনের জন্য বিখ্যাত। এদের মধ্যে হাল্লাবং প্রধান।

n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী