ক্যাটেগরিঃ স্যাটায়ার

 
আমাদের অহিফেনসেবক আব্দুল্লাহ আবার এসে হাজির। পথেঘাটে লাঠিখেলা আর ঘরেদপ্তরে রক্তবর্ণের ছড়াছড়ি দেখে মাথা যখন এলোমেলো তখন তার মুখদর্শন মনে একরাশ প্রশান্তিই এনে দেয়। আজ আর সে ভণিতা করল না। বসেই হৃদয় নিংড়ানো আন্তরিক দুঃখে আক্ষেপ করে বলল, দাদা, এই এক আমার দোষে দেশটার কোন উন্নতি হল না। তাকে পাত্তা না দেয়া তার সাধের প্রেমিকা পাথরের মুর্তি হয়েও পাশে দাঁড়িয়ে থাকলে এই হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাসের গভীরতার ছোঁয়ায় সে গলে গলে পড়তো। আমি জানি তার কথায় ঢং অনেক, ভড়ং অনেক। সোজা কথা ঘুরিয়ে না বললে তার চলে না। তোমাদের মনা পাগলের মতো। ঘুরানো কথাটা একটু টেনে সোজা করে বলার তাগাদা দিয়ে কানটা খাড়া করে রাখলাম।

দাদা, এই এক আমারই তো দোষ। অফিসের টেবিল ঘিরে বসে সাহেবরা বা পথের ধারে রেস্তোরায় বসে পাড়ার ছোকরারা সবাই তো চুটিয়ে কথার তুবড়ি ছুটিয়ে চলেছে। বখতিয়ারপুত্রের ঘোড়ারও তাজ্জব হওয়ার কথা! পাবলিক ফুঁসছে, অফিসের কেরানি থেকে সাহেব তক ফাইল ঠ্যাক দিয়ে কামাচ্ছে। কত লোকের আক্ষেপ, ঘুষের টাকা সব ঘুষ দিতে দিতেই শেষ, জমাবো কী? জনতার রাগ, নেতারা সব লুটেপুটে খেল। নেতাদের দুঃখ, এই মূর্খের দল নিয়ে উন্নতি হয় ক্যামনে! দেশ চালানো আর ছাগলভেড়া চড়ানো তো এক কথা নয়। কতোয়ালের মুখ ফসফসিয়ে উঠে। খবরদারের কলম সড়সড়িয়ে চলে।

সবাই যখন কথা বলে দাদা, শুনে মনে হয় আফিংয়ের নেশা ধরে রাখা দায়। কথা যেন একটাই, আমি ছাড়া আর সবার দোষেই দেশের এই দশা। দাদা, জানেনই তো, আমি আফিংখোর। আফিংয়ের নেশায় সব উল্টে গেলে আমার কথা তো তা-ই দাঁড়ায়, দেশসুদ্ধ সব ভাল মানুষ, এক আমার দোষেই সব রসাতলে যায়।

তবে দাদা নেশা ছুটে গেলে সব যখন ভাও হয় তখন মনে হয় কেবল সম্রাট বাবর না আমিও বটগাছ। আমি আবার অবাক! কচুগাছ নয়, লাউগাছ নয়, আমাদের আব্দুল্লাহ হঠাৎ মহীরুহ সেজে বসল! আব্দুল্লাহর সাফ দাবী, বুড়োই হোক আর শিশুই হোক মানুষ তো মানুষই। মোটা মানুষও মানুষ, হ্যাংলা মানুষও মানুষ। আসল কথাটা হলো বীজটা। বীজে বীজে প্রজাতির ফারাক। ছোট-বড়তে ফারাক নয়। বীজ যদি একই হয় – তবে বড় হোক আর ছোটই থাক – এ গাছ তো সে গাছই। এই সেদিনের সম্রাট যে এতো কোতোয়াল দাবড়িয়ে গেল! সে জলপানি পেয়ে সুযোগের হাওয়াবাতাস পেয়ে বড়সড় বটগাছ হলো। সে ইতিহাস আপনার অজানা নেই। তা সম্রাটের মনে যে লোভ বীজ হয়ে ছিল সে কি আমার মনে লুকিয়ে নেই? একই বীজ থেকে গজিয়ে আমি আব্দুল্লাহ আফিমের পয়সাও পাইনে বলে কি আমাকে অপমান করবেন? কচুর পাতা ঠাওরাবেন?

সেদিন এক মোটরসাইকেলওয়ালা ফুটপাতে উঠে বেমক্কা এক ধাক্কা দিলে রেগেমেগে বলে বসেছিলাম, আরে ভাই, এটা কি আপনার জায়গা? আজ সুযোগ পেয়ে গাড়ি নিয়ে ফুটপাতে উঠে গেলেন। কাল সুযোগ পেলে পাইকপেয়াদা নিয়ে বুড়িগঙ্গার পাড় আর জল সবই যে সাবাড় করে দেবেন না তার গ্যারান্টি দিতে পারেন? শুনে ব্যাটা গালে এক চড় মেরে চলে গেল। বলেন দাদা, সেও যে সম্রাটের মত না হোক, বনসাই গোছের একটা বটগাছ তা মানবেন না কেন?

আপনাদের ব্লগে সেদিন কে যেন লিখল, গান্ধীজীর নাকি তিন রকমের বানর ছিল। একটার চোখ নেই। একটার কান নেই। একটার মুখ নেই। আমি জানতাম গান্ধীজী একটা ছাগল নিয়ে নোয়াখালী তক এসেছিলেন। বানরেরা কবে তাঁর পাশে জায়গা পেয়েছিল সেটি তো ভদ্রলোক লিখলেন না। তবে দাদা দেখেন, আপনার ছেলে পড়শির ছেলের সাথে কাইজ্জা করলে আপনি নিজের ছেলেকেই শাসাবেন। উল্টোটা করলে আমাদের সেই কানা-কালা-বোবা’রাও আপনাকে নসিহত করবেন, ওরে পরের ছেলেকে মন্দ বলতে হয় না, নিজেরটাকে শিক্ষা দিতে হয়। তা এই যে সংসারের আজ এই অবস্থা, কই কালারা তো কিছুই শুনে না, কানারা তো কিছুই দেখে না, বোবারা তো কিছুই বলে না। চোখের যত ঝিলিক, কানের যত কারিশমা, মুখের যত ফুলঝুরি তা ব্যাবাক পরের পোলাদের নিয়ে। আরে, নিজের ঘরকে যদি সিধা রাখতে না পারিস তবে সংসার করা ছাড়। বানর না হয়ে বাপুজির ছাগল হয়ে থাক। দিনে একবাটি দুধ তো জোটে।

আব্দুল্লাহর কণ্ঠের তেজ যে হারে বাড়ছিল আমার মুখ তার সমান তালে বিবর্ণ হয়ে উঠছিল। আমি বাপুজির বানর বা ছাগল কোনটাই হবার মুরদ রাখি না। গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল হওয়ার যেমন উপায় নেই, তেমনই ওসব মহৎ প্রাণীও লোকে না মানলে হওয়া যায় না। আমার সংসারে আমাকে মানে কে? তবুও আগাছার বীজ তো আগাছারই বীজ – তা ফুটে আগাছা বের হোক বা না-ই হোক। নিজের গায়ে আঁচড় লাগলে কে না বিচলিত হয়! তার কথার শেল তাই আমাকে জর্জরিত করে তুললো।

আব্দুল্লাহ ঝানু ছেলে, মুখ দেখে মনের দশা আঁচ করতে পারে। বলে, দাদা, দুঃখ দিলাম না তো! তবে আব্দুল্লাহ জানে, কায়দা করে দাদাকে দুঃখ দিলেও দুঃখ নিয়ে তাকে ফিরতে হয় না। আমার সংসার নিয়ে আমাকে খোটা দেয়ার তার সাহসের উৎস এখানেই। খালি পকেট নেশার যোগানে ভরে উঠলে সে খুশিই হয়। খুশি মনেই ফেরে।
n

বিষয়ভিত্তিক বিভাজনসহ ব্লগসূচী