ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

বিচিত্র বোধ হলেও ব্যাপারটা হুবহু এমনটিই ঘটেছিল। আরামবাগের প্যাপিরাস প্রেসের কর্ণধার তরুণ সাহিত্যপ্রেমী হেলালের অকাল প্রয়াণের বছর, ১৯৮৫ সালে, তাঁর টেবিলে আমি প্রথম দেখি মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার একেবারে প্রথম দিককার কোনো একটি কপি। বিশেষভাবে বীতশ্রদ্ধ বোধ করি নামটি দেখে। ধরেই নিয়েছিলাম যে পত্রিকাবান মীজানুর রহমান ছোকরাটা একটু বেশি ফাজিলই হবে। এমনিতেও প্রথম দর্শনে লিটলম্যাগ সাধারণত আমাকে আকর্ষণের চেয়ে বিকর্ষণই করে বেশি। দোষটা সম্ভবত আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার দৈন্যের। বেশিরভাগ ছোটকাগজকে ছোটপ্রতিভার ফসলরূপেই পেয়েছি আমি। কেউ হয়তো বড়র সাধ্যের অভাবেই ছোটতে সাধ মেটান। তবু শিল্পসাহিত্যের ভুবনে নব অবদান যোজনের দেমাকও দেখান। পল্লবগ্রাহী পাণ্ডিত্যের আকর এসব কাগজের লেখকগণ সারাবান পণ্ডিতদের প্রতি কৃপা বর্ষণের পুলকে দলেবলে মজে থাকেন। সে যাক। ইতোমধ্যে পত্রিকাটি আদ্যোপান্ত একবার উল্টিয়েই আমার মনের ভুলটা শুধরে গেল- না, এ-সম্পাদক আর যা-ই হন, অপরিপক্ক নন।

কিন্তু তাই বলে তাঁর প্রতিটি চুলই যে সুপরিপক্ক, তেমন ধারণাও আমার মনের কোনো সীমানাতেই ছিল না- আমার বাসার গেটের ওপর দিয়ে তাঁর তুষারশুভ্র মস্তকের জমজমাট পলিত কেশগুচ্ছ স্বচক্ষে দেখা পর্যন্ত। ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার দুনম্বর রোডের সরকারি বাংলোর বারান্দায় বসে এক বিকেলে আমার নয়নাভিরাম গোলাপ বাগানটির উপর চোখ মেলে দিয়ে ক্লান্তি মোচন করছিলাম। ক্লান্তি ছিল দুটি খাত থেকে প্রবাহিত। প্রথমটি ছিল বছরের প্রথম সংসদ অধিবেশন অনুষ্ঠানের প্রশাসনিক ঝামেলাজনিত, আমি ছিলাম জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের যুগ্মসচিব। দ্বিতীয়টি ছিল ফুলের ভরা মৌসুমে সামগ্রিক ট্রিটমেন্টের জন্যে গোটা উদ্যানটির নিবিড় জরিপঘটিত ক্লিষ্টতাজনিত।
অনভিপ্রেত হলেও আমার প্রথম আচারণটিই ছিল জনৈক বুজর্গের প্রতি একান্ত অশোভন। উঠে গিয়ে গেট খুলে দেবার বদলে বসে থেকে গলাবাজি করলাম :
খোলা আছে, চলে আসুন।

চলে এসেই আগন্তুক বললেন :

আমি মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার সম্পাদক মীজানুর রহমান।

শুনেই ভিরমি খেলাম। মুখোমুখি চেয়ারে বসা আমার কল্পনার ফাজিল ছোকরাটার আবক্ষ মস্তক দেহখানি- কমিয়ে বললে, বিজ্ঞতার বিজ্ঞাপন; বাড়িয়ে বললে চিত্তাকর্ষক ভাস্কর্য। ভদ্রলোককে একনজর দেখেই মনে হল তাঁর চুলগুলো, প্রত্যয়ী বৃদ্ধের ভাষায়, হাওয়ার বলে পাকেনি- বিনয়ী শিষ্যের ভাষায়, চর্চার বলে পেকেছে। সে যাক। বসেই তিনি বিনা ভূমিকায় বললেন :
আমি এসেছি আমার পত্রিকাটির জন্য আপনার কাছে গোলাপ বিষয়ে একটি লেখা চাইতে।
বললাম :
এ পর্যন্ত গোলাপ বিষয়টি আমি কেবল পড়ছি। অবশ্য কিছু গোলাপ হাতেও ফোটাচ্ছি। তবে লেখার স্তরে পৌঁছাতে এখনও অনেক দেরি।
হতাশ হয়ে সম্পাদক যেন নিজেকেই বললেন :
এই একটি লেখার জন্যেই আটকে আছে আমার চার শতাধিক পৃষ্ঠার বৃক্ষ-সংখ্যাটি।
বলতে বাধ্য হলাম :
তবে তো লেখাটি আপনাকে অন্য কারো কাছ থেকে নিতে হবে।
বললেন :
দুজনের কাছে চাইবো ভেবেছিলাম। কিন্তু নাম শুনে বিজ্ঞগণ বারণ করলেন এবং পাঠিয়ে দিলেন আপনার কাছে।
বললাম :
তাঁরা কেবল চোখ কলমের গোলাপ ফোটানোটাই দেখেছেন আমার। বিশ্বের একনম্বর হবিপ্লান্টের উপর কলম ঘোরানোর অক্ষমতাটা আঁচ করেননি।
তবু এ-বিষয়ে আপনার একটা লেখার কোনো বিকল্পই যে জানা নেই এ মুহূর্তে আমার।
বললাম :
যদি লিখতে পারি কখনো, প্রকাশনার জন্য প্রথমে আপনার পত্রিকারই দ্বারস্থ হব। এর বেশি আমারও এ-মুহূর্তে আর কিছুই বলার নেই।
দৈহিক ক্লান্তি নিয়েই তিনি আমার গৃহে আগমন করেছিলেন, নির্গমন করলেন তার সঙ্গে মানসিক ক্লান্তিও বাড়িয়ে। বিশ্রাম নিতেই হয়তো দুটি বাড়ির পরের বাড়ি ভারতীয় হাইকমিশনের ভারত বিচিত্রার সম্পাদক কবি বেলাল চৌধুরীর রুমে ঢুকে পড়েছিলেন মীজান ভাই সেদিন। ঘটনাটা অনেক পরে আমি তাঁরই জবানি জানতে পারি। আমার সঙ্গে তাঁর নেতিধর্মী অভিজ্ঞতাটার বিবরণ শুনে বেলাল চৌধুরীও পূর্বোক্ত বিজ্ঞজনদের মতোই বলেছিলেন :
একেবারে সঠিক ঠিকানায় হানা দিয়েছেন। লেগে থেকে বসিয়ে দিতে পারলে আপনার মতো হার্ড টাস্কমাস্টারকেও পুরোপুরিই পুষিয়ে দেবেন তিনি। আমার অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে কখনো তাঁর বাগানে থেমে কখনো বারান্দায় বসে আলাপচারিতায় গোলাপ সম্বন্ধে তাঁর নিজস্ব উপলব্ধি সঞ্জাত যেসব ব্যাপক গভীর চিন্তাভাবনার প্রসাদ পাই, তা থেকেই এ ব্যাপারে আমি একেবারেই নিশ্চিত হতে পারি।
কিন্তু তিনি নিজে তো নিশ্চিত নন।
তার কারণ তিনিও আপনার মতোই টাফ কাস্টমার, বরং আরেক কাঠি বেশি।
অতএব লেগেই থাকলেন মীজান ভাই। থাকতে অসুবিধেও ছিল না কোনো। কারণ আমার ধানমন্ডি ২ নম্বর রোডের বাসাটা ছিল তাঁর সাতমসজিদ রোডের পেছনের ধানমন্ডি ৯/এ-র বাসা থেকে হাটখোলার প্রেসে আসা-যাওয়ার পথের ধারে। এ-পর্যায়ে আমার ঘরের ভেতরেও সম্পাদকের পক্ষ নিলেন একজন, আমার স্ত্রী :
এত প্রবীণ একজন সম্পাদককে এতবার না-বলা ঠিক হচ্ছে না। বসে পড়লেই লেখা এসে পড়ে- এ আমার অনেকবারই দেখা আছে।
তবু অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গেই প্রবীণ সম্পাদককে শেষবারের মতো বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম যে, আমি সাহিত্যশিল্পী নই, সাহিত্যশ্রমিক। আরো জানিয়েছিলাম যে, আমার এ মাসের পুরো শ্রমটাই বুক হয়ে আছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সার্বক্ষণিক কাজে, যেখানে এ মুহূর্তে সংসদের শীতকালীন অধিবেশন চলমান এবং আমি তার সাচিবিক দায়িত্বের পিভটাল অফিসার।
সম্পাদক বললেন :
সার্বক্ষণিক কাজে ফুরিয়ে যাওয়া অফিসারটির নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করার সাময়িক বিরতিগুলিতে অফিসে বসেই না-হয় একটু একটু করে লিখবেন।
তাঁর প্রস্তাবটা শুনে পত্নীর পরামর্শটাও মনে পড়ল।
বললাম :
একটু একটু করে নেবেন লেখাটা?
সানন্দে।
তাহলে পরশু আসুন।
এলেন। তিনটি স্লিপ দিয়ে বললাম :
পরশু আসুন।
এলেন এবং আরো তিনটি স্লিপ পেলেন। এমনি আরো দু কিস্তি নেবার পরের তারিখে এসে মীজান ভাই বললেন :
এভাবে আর নেব না। একবার এসে সবটুকু একসঙ্গে নিয়ে যাব।
আঁৎকে উঠে জানতে চাইলাম :
কবে?
যবে লেখাটা শেষ হবে।
কতটুকু হলে চলবে?
যেভাবে লিখছেন, এভাবে লেখাটা যতটুকু গিয়ে শেষ হয়।
বিভ্রান্ত হয়ে বললাম :
মানে?
মানে আপনার কলম যেখানে গিয়ে থামে। জানালেই এসে বাকি লেখাটা আমি একসঙ্গে নিয়ে যাব।
বিব্রত হয়ে বললাম :
মীজান সাহেব! আন্তরিকতা সত্ত্বেও এর চেয়ে তাড়াতাড়ি কিছু লিখে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
না, না, শাকুর সাহেব, আমাকে ভুল বুঝবেন না। এ-রচনা যত দীর্ঘ হতে চায়, হোক। যত সময় নিতে চায়, নিক। আমি স্টপ প্রেস করে ওদের মেশিনে অন্য ম্যাটার তোলার অনুমতি দিয়ে দিয়েছি।
অভিভূত হয়ে আমি শুধু বলে উঠলাম :
কিন্তু বিশাল বৃক্ষ-সংখ্যাটির বিজ্ঞাপন?
মীজান ভাই বললেন :
বড় বিজ্ঞাপন কিছু হারাব। ত্রৈমাসিকটির দুটি সংখ্যাও যুক্ত হয়ে একটি হয়ে যাবে। তবু সবই পুষিয়ে যাবে এ-লেখাটা পরিপূর্ণরূপে ছাপতে পারলে।
শুনে আমি বাক্যহারা হয়ে কেবলি ভাবছিলাম- তাহলে এ যুগেও এমন রসপণ্ডিত একজন সম্পাদক আছেন যিনি এমন সমঝদার একটি পত্রিকার কাছে আপসহীনভাবে দায়বদ্ধ থাকেন। শ্রদ্ধাভরে বিনীতভাবে আমি কেবল জানতে চাইলাম :
লেখাটা কি এতই ভালো লাগছে আপনার?

শুধু আমার নয়, রচনাটা অসাধারণ বোধ হচ্ছে আমার পত্রিকার মুদ্রক, লেটারপ্রেসটির মালিক, সুপাঠক তরুণকুমার মহলানবিশেরও (যিনি পরবর্তীকালে প্রুফরিডার হিসেবে খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করেছেন)।
সে যাক। মীজান ভাই পরিপূর্ণরূপেই ছেপেছিলেন তাঁর পত্রিকার ক্ষুদ্র হরফে আমার ৫৫ পৃষ্ঠা দীর্ঘ লেখাটা- রঙিন একটি আলাদা অনুপ্রচ্ছদ দিয়ে। যাতে কেউ চাইলে, রচনাটা প্রচ্ছদটিসহ বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করতে পারে। সম্পাদক প্রচ্ছদটির বিপরীত পৃষ্ঠায়, অর্থাৎ আখ্যানপত্রে, সোয়েডিশ বটানিস্ট কার্ল ভন লিনিয়াসের চমৎকার একটি ছবিও জুড়ে দিয়েছিলেন, যিনি জিনাস এবং স্পিশিস-এর ল্যাটিন নাম দিয়ে উদ্ভিদের শ্রেণী নির্দিষ্টকরণ প্রথাটির জনক। এই হল মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার অক্টোবর ১৯৮৬/ডিসেম্বর ৮৬ বৃক্ষ সংখ্যাটির জানুয়ারি ১৯৮৭/মার্চ ১৯৮৭ সংখ্যাটির সঙ্গে জুড়ে গিয়ে যুগ্মসংখ্যা হয়ে বেরুবার নেপথ্যকাহিনী।

গোলাপ বিসংবাদ-নামক আমার সে-রচনাটির অর্জিত অনেক খ্যাতির কথাই মীজানভাই তাঁর ব্যক্তিগত আনন্দের ভাগ দেবার খেয়ালে সময় সময় আমাকেও বলতেন। যেমন মস্কোবাসী নিসর্গকৃষ্ণ দ্বিজেন শর্মার লিখিতপত্রজনিত আনন্দ এবং কলকাতার প্রতিক্ষণ পত্রিকার প্রতিবেদন প্রদত্ত আনন্দ। লেখাটিকে ভিত্তি করে প্রকাশিত আমার গোলাপসংগ্রহ ১৪১০ সনের বর্ষসেরা মননশীল গ্রন্থ হিসেবে প্রথম আলো কর্তৃক পুরস্কৃত হলে সবচেয়ে বেশি খুশি হন মীজানভাই এবং সঙ্গত কারণেই। বইটির উৎসর্গও আমি তাঁকেই করেছি এবং উৎসর্গপত্রে তাঁর সম্পর্কে কেবল সত্য কথাটাই লিখেছি : যিনি এই গোলপলালককে গোলাপলেখক বানিয়েছেন। উৎসর্গপত্রটি পড়ে মীজানভাই বলেছিলেন :
আমার ভাগ্যে উৎসর্গিত বই অনেকই জুটেছে। তবে এটি অমূল্য।
আর দ্বিজেনদা বলেছিলেন :
তোমার গোলাপ সংগ্রহ মীজানকে উৎসর্গ করে তার চেয়ে বেশি খুশি করেছ তুমি আমাকে।