ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

আমার নাকি মুখে কথা ফুটতেই হাতে কাঁটা ফুটে গিয়েছিল। উল্লেখ্য যে বুলি ফোটার কথা হচ্ছে না। বুলি হল অভ্যাসের দ্বারা আয়ত্ত-করা কথা- যথা পাখির বুলি, শিশুর বুলি, বাঁধা বুলি। ওটি অনুকৃত, সৃজিত নয় বলে বৈচিত্র্যহীন। কথা হলেও ওটা শেখানো, বানানো নয় বলে মজানোও নয়। বলা হচ্ছে প্রাথমিক কথার কথা, যেটা শিশুর মুখে ফোটে বুলি ফোটার পরে- সৃষ্টিরূপে, শিল্পরূপে।
নিজের মুখে কথা ফোটার লগ্নটি নিজের মনে না-থাকতে পারে যে-কারোরই। কিন্তু হাতে কাঁটা ফোটার ক্ষণটি কজনই বা ভুলতে পারে। তাই বুঝি এত আদি শৈশবের ঘটনা হলেও তা আমার মনে আছে বিলক্ষণ। অতি ভোরে আমাকে উঠানে পেয়ে গিয়ে আমার জীবনের প্রথম বন্ধু মেজো ভাইসাব ওরফে মাইজ্যা বাইসা বললেন :
বাগানে চল, হুল্ তুলুম।
আমি না বলাতে তিনি বললেন :
কা ? হুল তোয়াঁর ভালা লাগে না ?
আবারো আমি না বলাতে ঈষৎ বিস্মিত প্রাণবান মানুষটি স্বভাবতই জানতে চাইলেন :
তা অইলে কী ভালা লাগে তঁর ?
ফুল।
শব্দটা আমার শেখা হয়ে গিয়েছিল কোনোভাবে। শুনেই অপ্রত্যাশিত চমকে উল্ল¬সিত কুদ্দুস মিয়া ওরফে মাইজ্যা মিয়া সহাস্যে আমাকে মাথায় তুলে নিয়ে যুগপৎ আদর এবং কদর সহকারে তাঁর ক্রোড়ে স্থাপন করে নিয়ে ফুলবাগানের দিকে চললেন। কাছারিঘরের পেছনের গোলাপগুল্মটির কাছে যেতেই দেখা গেল সুন্দর একটি ফুল ফুটে আছে ঝাড়টির প্রায় মাঝখানে, কুদ্দুস ভায়ের বুকের কাছে। পাশে পেয়ে গিয়ে সে বয়েসেই গোলাপসুন্দরীর গালে হাত দেবার অদম্য কৌতূহলে হাতটি বাড়াতেই আমি কাঁটার আঘাতটি খেয়েছিলাম এবং কাঁদতে কাঁদতে আমার অতি আকর্ষণীয় কোলটি থেকেও নেমে গিয়েছিলাম। ভাই দেখলেন রক্তপাত হয়নি, তবে বুঝলেন যে পলকে কান্না থামাতে হলে ফুলটি আমাকে পেড়ে দিতেই হবে। আব্বা-আম্মা শুনে ফেলার আগে মধুর ভোরে কর্কশ কান্নাটা থামাবার জন্যে তাড়াহুড়া করতে গিয়ে গোলাপের কাঁটায় বয়স্য আমার খানিকটা রক্তাক্তই হয়ে গেলেন। সেদিকে তাঁর ভ্রƒক্ষেপ নেই দেখে আমি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলাম :
কাঁটা ! কাঁটা !
ততক্ষণে কবিভাই ফুলটিকে আঙুলের টিপে ধরে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ভরে গোলাপী সুবাস শুঁকতে শুঁকতে পরম স্বস্তির সঙ্গে উচ্চারণ করে ফেললেন তাঁর অবিস্মরণীয় বাণীখানি :
কাঁটাতে গোলাপও থাকে !
আযৌবন গোলাপচর্চার পরে আমার মনে হয়েছিল শৈশবের সে-গোলাপটি ছিল একাধিক অর্থেই ঐতিহাসিক, স্যর ওয়াল্টার স্কট- বিদেশ থেকে এদেশে আসা আধুনিক গোলাপের প্রথম দলের অন্যতম সদস্য বরং বলা যায় বৈরি পরিবেশ সহিষ্ণুতমটিই।

বয়োধিকগণ বলেন, কথা নিয়ে আমার কথকতা নাকি অতি অল্প বয়েসেই শ্রোতার ভ্রƒকুটি সৃষ্টি করেছিল। কথামাত্রের সাথেই আমি জড়িয়ে পড়তাম : বলাতে চাইতাম বেশি, বলতে চাইতাম বেশি- এমনকি শিক্ষকের সঙ্গেও, যেমন সর্বজনশ্রদ্ধেয় চিরকুমার পণ্ডিত নবীনচন্দ্র পালের সঙ্গেও। বাড়ির পাশের প্রাইমারি স্কুলের নিবেদিতপ্রাণ এই শিক্ষাব্রতীকে আব্বা একদিন কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন যে তাঁর শিশুপুত্রটির সঙ্গে লেখাপড়া নিয়ে খেলা করা যায় বলে তার আম্মা-মামা-নানা কেবল আরবি-ফারসি-উর্দু নিয়েই খেলছেন- অথচ আগে দরকার তার সঙ্গে বাংলা নিয়ে খেলার।
অমনি স্কুলে যাওয়ার বয়স না-হওয়া শিশুটির সঙ্গে বর্ণশিক্ষা নিয়ে খেলতে বাড়িতে চলে এসেছিলেন শিক্ষাপাগল পালবাবু- যিনি ক্ষেতের ধারে বসেও পড়াতেন, ক্ষেতকর্মী গরিব ছাত্রদের। পুস্তিকাটির এ-পাতা ও-পাতা উল্টিয়ে আমাকে এটা-সেটা শুধিয়ে পণ্ডিতজি বলেছিলেন :
তোমার পড়া শুরু হবে এখান থেকে- পড় জল দাও।
ব্যস, জল-শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে অথৈ জলেই পড়ে গিয়েছিলাম আমি- অবশ্য উপস্থিত সকলকে সঙ্গে নিয়েই। জানতে চাইলাম :
জল কী ?
প্রশ্নটি অস্বাভাবিকও ছিল না। কেননা আমাদের মৌলভীবাড়ি থেকে উত্তরে পাটোয়ারিবাড়ি, দক্ষিণে সারেং বাড়ি, পশ্চিমে চৌকিদারবাড়ি আর পূর্বে দফাদারবাড়ি পর্যন্ত এর-ওর কোলে চড়ে আমার-দেখা তখনকার দুনিয়ার কোথাও জলের ছিটাফোঁটাও ছিল না। বস্তুত মিলিয়ান-মোল্লার নোয়াখালী জেলার সুধারাম থানার অন্তর্গত আমাদের রামেশ্বরপুর গ্রামটিতে যেখানে যেটুকু ছিল, সবই ছিল পানি- জল নয় কুত্রাপি। কয়েক বছর পরে পাকিস্তান জন্মানোর সূত্রে সেই পানিই পুস্তকে ঢুকে পড়ে দখল করে নিয়েছিল অবান্তর জলের অনুপ্রবিষ্ট সমস্ত স্থল। নবীন পণ্ডিত উত্তর দিলেন :
জল হল পানি।
পানি কী ?
কীভাবে বোঝাবেন ভেবে নিচ্ছিলেন পণ্ডিত। পাশে আরাম-কেদারায় হেলান দিয়ে পত্রিকা পড়ছিলেন আব্বা, মৃদু হেসে তিনি বললেন :
হানি।
এতক্ষণে আমি হানি দাও বুঝে ফেলাতে বস্তুটি আনতে উঠতে চাইলে পণ্ডিত আমাকে বুঝিয়ে বললেন :
আনতে হবে না। শুধু পড়ার জন্যে লেখা হয়েছে জল দাও।
বইয়ের দিকে তাকিয়ে আমি পড়লাম :
হানি দাও।
এ-পর্যায়টিকে আমার নিপুণ অভিনয় ধরে নিয়ে উপস্থিত সকলেই হেসে উঠলেন। প-িত বললেন :
স্থানীয় কথাবার্তায় হানি হলেও, লেখাপড়ায় হবে পানি।
এবার আমি গভীর মনোযোগ সহকারে বর্ণশিক্ষার পৃষ্ঠাটিতে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে আমার চূড়ান্ত পাঠ পেশ করলাম :
পানি দাও।
পানিবন্দি পণ্ডিতকে উদ্ধার করতে অবশেষে আব্বাকেই মাঠে নামতে হল, তিনি বললেন :
পুস্তকে পানি লেখা নেই, লেখা আছে জল। তাই তোমাকে পড়তে হবে- জল দাও।
আমিও নাকি মাঠে নেমেছিলাম এবং বিনীত কণ্ঠে বলেছিলাম :
ঘরে জল নেই, পুকুরেও আছে শুধু পানি। তাই আমি জল দাও পড়ব না।
এতক্ষণে শিক্ষকও বুঝলেন, এ ধরনের ছাত্রদের বুঝিয়ে না দিয়ে কিছুই গছিয়ে দেওয়া যাবে না। তাই তিনি এবার ব্যাখ্যাতেই ব্রতী হলেন, শিক্ষার্থীর বয়সোপযোগী না হলেও :
জল আর পানি একই জিনিস- মুসলমানে পানি বলে, হিন্দুরা বলে জল।
শিক্ষকের অতিসরলীকৃত উক্তিটির অন্তর্গত ভ্রান্তি আমার কোমল মনে যেন শিকড় না গাড়ে, তার জন্যে ওটাকে শোধরানো জরুরি ভাবলেন আব্বা :
না মাস্টার, কথাটা ঠিক হল না। আমি রাজনীতির লোক, ভারতবর্ষ ঘুরে বেড়াই। উর্দু-হিন্দি ভাষাভাষী হিন্দুমুসলিম সকলেই ভাই-বোন-নানি-পানি বলে। দাদা-দিদি-দাদি-জল কেবল বাংলাভাষী হিন্দুরাই বলে। জল-পানির এই ধর্মগত ভেদাভেদ শুধু বাংলায় কেন বল তো পণ্ডিত ?
আলোচ্য বিষয়ে ধর্ম-শব্দটি এসে পড়াতে নবীন পণ্ডিত মুখে হাসি ঝুলিয়ে দিয়ে চুপ করে রইলেন, মন্তব্য এড়াতে অথবা আব্বার প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে। মৌলভীসাব হুজুর-বিশেষণে উল্লে¬খিত-সম্বোধিত আব্বার পাণ্ডিত্যের-ব্যক্তিত্বের দাপট ছিল প্রবচনীয়। প্রবচনটি ছিল : নোয়াখালের পূবকূল, মৌলভী মকবুল। অর্থাৎ নোয়াখালী জেলাসদরসংলগ্ন নয়াখালের পূর্ববর্তী চট্টগ্রাম জেলার সীমানা পর্যন্ত নোয়াখালীর সম্পূর্ণ অংশেরই একচ্ছত্র অধিপতি হলেন মৌলভী মকবুল। আব্বা বস্তুত বিষয়টির ওপর আলোকপাতই চাচ্ছিলেন। তাই তিনি তাকিদ দিলেন :
চুপ করে কেন, কিছু বল নবীন। যদ্দূর পারি বিষয়টি আমি বুঝতে চাই। তুমি তো বিদ্যার জোরেই স্কুলের পণ্ডিত-পদটি পেয়েছ, ডিগ্রির জোরে নয়।
বিব্রত শিক্ষক উত্তরে বিনয় প্রকাশ করে বললেন :
হুজুরের সামনে কে আবার কিসের প-িত ! তবে আমি শুধু এটুকু বলতে পারি যে প্রাচীন বাংলায় পানি-শব্দটির ব্যবহার বাংলা ভাষার প্রবাদে-প্রবচনে তো বটেই, ব্যবহারিক জীবনেও প্রায়শই পাওয়া যায়। বাংলার পানিপাখি পানকৌড়িকে জলকৌড়ি বলা হয় না। বাংলার নৌকার খোলের ওপরের কাঠকে জলতরাস বলা হয় না- বলা হয়, এমনভাবে বোঝাই কর যেন পানিতরাস না ডোবে।
আব্বা যোগ করলেন :
পশ্চিমে ট্রেনে ভ্রমণকালে রেলস্টেশনের যাত্রীদের পানীয় দেওয়ার কর্মচারির অদ্ভুত একটা নাম শুনলাম পানিপাঁড়ে। লক্ষণীয় যে জলপাঁড়ে নয়। আচ্ছা পণ্ডিত, পাঁড়ে মানে কী ?
পাঁড়ে হল আপার-ইন্ডিয়ার পান্ডে- পাঁচবেদে পারদর্শী ব্রাহ্মণের উপাধিবিশেষ।
বেদ তো চারটা জানতাম।
মহাভারতকে পঞ্চম বেদ বলা হয়।
বাড়ির সাংবৎসরিক কৃষিমজুরদের এত বেলায়ও কাছারিঘরের অলিন্দে আনাগোনা করতে দেখে আব্বা তাদের জিজ্ঞাসা করলেন :
সূর্য কি এখনো গাছের নিচে ?
মানে কাজে যেতে এত দেরি হচ্ছে কেন। আব্বার প্রিয় কর্মীটি মাথা চুলকিয়ে উত্তর দিল :
হানিভাত ন-খাই ক্যামনে যাই হুজুর !
হঠাৎ-আলোকিত আব্বা পণ্ডিতকে জিজ্ঞেস করলেন :
সকালে তোমরা কী-ভাত খাও নবীন ? জলভাত ?
জি না হুজুর, পান্তাভাত। এ এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ জলের বদলে পানি-ব্যবহারের। বঙ্গদেশ জুড়েই পান্তাভাতের চল- যেজন্যে ডি. এল. রায় লেখেন : পান্তা আনতে লবণ ফুরায়, লবণ আনতে পান্তা।
আব্বা যোগ করেন :
কথায়ও তো লোকে বলে- পান্তাভাতে নুন জোটে না, বেগুন পোড়ায় ঘি।
জি। আরেকটি প্রবাদ তো খুবই শক্তিশালী- পান্তাভাতে ঘি।
আব্বা যোগ করেন :
এভাবে দেখলে তো আরেক দৃষ্টান্ত পানিফল, জলফল নয়; আরেক দৃষ্টান্ত পানতুয়া, জলতুয়া নয়।
পণ্ডিত এবার ব্যুৎপত্তি উল্লে¬খ সহকারে বললেন :
(চিনির) পানি যোগ রসের তয়া বা তলা, পান্তুয়া। মজার ব্যাপার হল, বারণা আর অসী নামী দুইটি নদীসঙ্গমে আমাদের যে-তীর্থক্ষেত্র বারাণসী কিংবা কাশী সেখানেও তো জল নেই- আছে কেবল পানি। তাই শূন্যপুরাণেও আছে “তীর্থ বারাণসীর পানি”, বারাণসীর জল নয়। মধ্যযুগের বৈষ্ণব কবি চ-ীদাসও জোয়ারের জল বলেন না, বলেন : “জোয়ারের পানি নারীর যৌবন গেলে না ফিরিবে আর”।
চুলচেরা বিশ্লে¬ষণের ছলে কিছু একটা নিয়ে কচকচি করা ছিল আব্বার যুগপৎ কালক্ষেপণ এবং অবসর বিনোদন। তাই তাঁর আর স্মরণও ছিল না যে স্কুলশিক্ষক মহাশয় শিশুর সঙ্গে লঘু শিক্ষার খেলা খেলতেই এসেছিলেন- গুরুর সঙ্গে গুরু বিষয়ে যুঝতে নয়। অতএব অতৃপ্ত ছাত্রটির মতো তিনি পানি নিয়ে এগিয়েই চললেন :
আচ্ছা, তোমাদের রামায়ণ-মহাভারতে আছে নাকি পানি ?
চিরকুমার পণ্ডিতের উত্তর রেডিমেড, মানে কৃতপ্রস্তুত :
কৌতূহলবশত পানি-শব্দটির ভুক্তি দেখেছিলাম বঙ্গীয় শব্দকোষে। প্রখ্যাত অভিধানপ্রণেতা হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তো তাতে কৃত্তিবাসী রামায়ণ, কাশীদাসী মহাভারত দুটিরই উদ্ধৃতি দিয়েছেন।
এ-পর্যায়ে দুজন বহুক্ষণের সধৈর্য শ্রোতাও কথায় যোগ দিলেন। প্রথমে বড় ভাই আবদুল হাই যিনি তখন ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের বিজ্ঞানের ছাত্র, বহুমুখী প্রতিভা :
এবার তো আমি আরো বিভ্রান্ত : কী করে জল আর পানি হিন্দু আর মুসলিম গোষ্ঠী দুটিকে দুটি ওয়াটার-টাইট কম্পার্টমেন্টে ভাগ করে দিতে পারল।
উত্তর দিলেন আমাদের কাছারির ম্যানেজার আব্বার মাইজ্যা ভাগিনা, আমার মাইজ্যা বাইসা, জেলাশহরের ঐতিহ্যবাহী বঙ্গবিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র কুদ্দুস মিয়া কবিয়াল :
আসলে এটা আগে থেকেই জলের দেশ, হিন্দুর দেশ। মুসলমানরাই বিদেশ থেকে পানি নিয়ে এসে বঙ্গদেশের অর্ধেক লোকের মুখ থেকে জল কেড়ে নিয়েছে।
বাগড়া দিলেন আব্বা :
কিন্তু পানি তারা আনল কোত্থেকে ? শব্দটা আরবদেশে নেই, পারস্যদেশেও নেই।
বড় ভাই যোগ করলেন :
বরং ভাষাবৃক্ষে দেখা যায় হিন্দি-বাংলা দুটো ভাষাই ইন্দো-ইউরোপীয়ান গোত্রের ইন্ডিক শাখার সহোদর ভ্রাতা।
নবীন পণ্ডিত যোগ করলেন :
এবং দুটি ভাষাই সংস্কৃত অধ্যুষিত। অতএব উচ্চসমতলের হিন্দির পানিই তো নিম্নসমতলের বঙ্গে নেমে আসার কথা ছিল জলের স্থলে। আর যদি হিন্দু-কানেকশনের কথা বলেন তবে তো বলতে হয় যে হিন্দুধর্মের শিকড়-বাকড়, মূল-কা-, শাখা-প্রশাখা, উপকথা-পুরাণকথা- সবকিছুর উৎসস্থলই হল ওই হিন্দিবেল্ট। অতএব বারাণসীর পানি না হয় সেখানেই রয়ে গেল। কিন্তু গঙ্গার পানি কেন জল হয়ে বয়ে এল বঙ্গদেশে। কারণটি আমার আজো জানা হল না।

আলোচনা অসমাপ্ত অবস্থায় আসর ভাঙতে দেখে আমি নাকি বলে উঠেছিলাম :
আমনে গো কতা হুইন্তে হুইন্তে আঁর তো গলা হুয়াই গেছে। অঁন আঁই কী খামু ? হানি না জল ?
ভাষাবিষয়ক অমন একখানি আলোড়ন সৃষ্টিকারী আলোচনার শেষে এমন একটা মৃত্তিকালগ্ন প্রশ্ন শুনে সকলে একযোগে হেসে উঠল। ধোঁয়াটে যত কেতাবি কচকচির গুমোটও কিছুটা কাটল। আব্বা তাঁর শিশুপুত্রের বক্তব্য উপস্থাপনার মুন্সিয়ানায় মুগ্ধ হয়ে শিশুটির জন্য পুরস্কার ঘোষণা করার উদ্দেশ্যে বললেন :
তুমি এখন পানিই খাবে। পরে কোথাও জল পেলে জলই খাবে- পানি চাইবে না। আর এ-বয়েসেই এমন একটা আকর্ষণীয় আলোচনার উপলক্ষ হতে পারার জন্য মাস্টার শাকুরকে আমি একটা পুরস্কার দান করছি- একটা কোম্পানির টাকা।
নবীন পণ্ডিতের বক্তব্য ছিল :
ভালোই হল। জলপানি নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেই শাকুর জীবনের প্রথম জলপানি পেয়ে গেল।
আব্বার প্রশ্ন :
তাই তো ! ছাত্রবৃত্তিকেই বা জলপানি বলে কেন ?
হিন্দুমুসলিম যে-কেউ পেতে পারে বলেই হয়তো।
আব্বা পকেট থেকে ধাতব একটা রূপালী মুদ্রা বের করে আমার হাতে গুঁজে দিলেন। রূপার রুপিটি নিয়ে আমি অনেকদিন খেলেছি। বৃটিশ আমলের কাগুজে কারেন্সির কালে কোম্পানির আমলের একমাত্র স্মারক হিসাবেই বোধ হয় ওই মুদ্রাটিকে কোম্পানির টাকা বলা হত।

আমার আদি শৈশবের বর্ণিত বিবরণটি সংশ্লি¬ষ্টজনদের কাছে আমি যথাবয়েসেই পেয়েছি। তবে পাঠকের ওপর অপ্রয়োজনীয় নির্যাতন নিবারণকল্পে ভাষ্যগুলি আমি মান-ভাষায় অনুবাদ করে দিয়েছি। স্মৃতিচারণের এ-এক মস্ত সুবিধে যে এই কর্মটি সম্পাদন করার কালে যাপিত জীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার দরকার পড়ে না। বরং তা না করলেই ঘটিত ঘটনাগুলি আর কথিত কথাগুলির বাইরের রঙ উজ্জ্বলতর হয়ে ফোটে এবং ভেতরের তাৎপর্য স্বচ্ছতর হয়ে ওঠে। এখানে রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি-র সূচনার প্রথম প্যারা আর চতুর্থ প্যারার উদ্ধৃতি খুবই প্রাসঙ্গিক বোধ করছি :
স্মৃতির পটে জীবনের ছবি কে আঁকিয়া যায় জানি না। কিন্তু যেই আঁকুক সে ছবিই আঁকে। অর্থাৎ, যাহা কিছু ঘটিতেছে তাহার অবিকল নকল রাখিবার জন্য সে তুলি হাতে বসিয়া নাই। সে আপনার অভিরুচি-অনুসারে কত কী বাদ দেয়, কত কী রাখে। কত বড়োকে ছোটো করে, ছোটোকে বড়ো করিয়া তোলে। সে আগের জিনিসকে পাছে ও পাছের জিনিসকে আগে সাজাইতে কিছুমাত্র দ্বিধা করে না। বস্তুত, তাহার কাজই ছবি আঁকা, ইতিহাস লেখা নয়।
কয়েক বৎসর পূর্বে একদিন কেহ আমাকে আমার জীবনের ঘটনা জিজ্ঞাসা করাতে, একবার এই ছবির ঘরে খবর লইতে গিয়াছিলাম। মনে করিয়াছিলাম, জীবনবৃত্তান্তের দুই-চারিটা মোটামুটি উপকরণ সংগ্রহ করিয়া ক্ষান্ত হইব। কিন্তু, দ্বার খুলিয়া দেখিতে পাইলাম, জীবনের স্মৃতি জীবনের ইতিহাস নহে- তাহা কোন্-এক অদৃশ্য চিত্রকরের স্বহস্তের রচনা। তাহাতে নানা জায়গায় যে নানা রঙ পড়িয়াছে তাহা বাহিরের প্রতিবিম্ব নহে- সে-রঙ তাহার নিজের ভারের, সে-রঙ তাহাকে নিজের রসে গুলিয়া লইতে হইয়াছে ; সুতরাং পটের উপর যে-ছাপ পড়িয়াছে তাহা আদালতে সাক্ষ্য দিবার কাজে লাগিবে না।

আমার এ-রচনাও ইতিহাসের ধারায় নয়, সমাজবিজ্ঞানের শৃঙ্খলায়ও নয়। এ কেবল সাহিত্যের লক্ষণাক্রান্ত। তাই লেখাটি বিনশ্বর হলেও, সাহিত্যাঙ্গনেরই শরণার্থী।