ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

rabindranath

রবীন্দ্রনাথ এখনো প্রাসঙ্গিক এজন্যে যে আমাদের দেশের, সমাজের এবং মানুষের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণকল্পে তিনি যেসব দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন তার সবই বাস্তবায়নের অপেক্ষায় পড়ে আছে আজ অবধি। ফলে আমরাও সে তিমিরেই পড়ে আছি, যে তিমিরে ছিলাম সোয়া শ বছর আগে। সে অন্ধকার থেকে আলোকে উঠে আসতে হলে নানান প্রকরণে ও মাধ্যমে কেবল তিমির হননের গান গাইলে আর নাচ নাচলেই চলবে না, বাস্তবে হুবহু রূপ দিতে হবে শতবর্ষ পূর্বে প্রদত্ত রবীন্দ্র মডেলটিকে। একবাক্যে মডেলটি হল আত্মনির্ভরশীলতার মাধ্যমে আত্মশক্তির সৃষ্টি করা এবং আত্মশক্তির দ্বারা আত্ম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। তা করতে পারলে কাঙ্খিত বাকি সমস্ত বস্তুগত ও অবস্তু গত সামাজিক ও দৈশিক উন্নয়ন বাস্তবায়িত হবে স্বভাবতই।

শতবর্ষ ধরে নাছোড় সমস্যাদিতে ভারাক্রান্ত দেশবাসীর কাছে দেশ গঠনের নিত্যনতুন মডেল উপস্থাপনের বদলে- স্বদেশী সমাজ, স্বদেশী সমাজ প্রবন্ধের পরিশিষ্ট, ভারতবর্ষীয় সমাজ, ছাত্রদের প্রতি সম্ভাষণ, সত্যের আহ্বান, কালান্তর প্রভৃতি রচনায় ব্যাখ্যাত- রবীন্দ্র-মডেলটি চূড়ান্ত মডেল রূপে রূপায়িত না হওয়া পর্যন্তই রবীন্দ্রনাথ প্রাসঙ্গিক থাকবেন। বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝতে হলে তাঁকে বিশেষভাবে জানতে হবে।
রবীন্দ্র রহস্যের যেদিকেই তাকাই কেবল এই সত্যই দেখতে পাই যে অনৈসর্গিক এই শিল্পীর সৃজনধর্মী চিত্তবৃত্তি সর্বদাই অন্যথাচারী, তবে সর্ব ক্ষেত্রেই চিরস্থায়ী। তাই অদ্ভুতকর্মা এই সার্বক্ষণিক শিল্পীকে এক জন্মে নয়, বহু জন্মেও নয়, এক প্রজন্মে নয়, বহু প্রজন্মেও নয়, এক শতকে নয়, বহু শতকেও নয়- হয়তো কোনোদিনই সম্ভব নয় রবীন্দ্রনাথকে সম্পূর্ণরূপে জানা। তাই আমাদের কেবল পড়েই যেতে হবে তাঁর সাহিত্য, শুনেই যেতে হবে তাঁর সংগীত, দেখেই যেতে হবে তাঁর চিত্র, নিয়েই যেতে হবে তাঁর শিক্ষা, ভেবেই যেতে হবে তাঁর কথা। তাই বলতে হয় যে তাঁকে পড়া-শোনা-দেখা, তাঁর শিক্ষা গ্রহণ করা, দীক্ষা অনুসরণ করা- এই সমস্ত ক্রিয়ারই টেন্স বা কাল হল প্রেজেন্ট কন্টিনিউয়াস টেন্স বা ঘটমান বর্তমান কাল। এ কখনোই প্রেজেন্ট পারফেক্ট টেন্স বা ঘটিত বর্তমান কাল হয়ে যাবে না। বলতে চাচ্ছি- তিনি কারও পঠিত হয়ে যাবেন না কখনো, সবার পঠমানই থাকবেন সর্বদা। অন্যকথায়, সত্যদ্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ ততদিনই প্রাসঙ্গিক থাকবেন, সমাজ যতদিন পথভ্রষ্ট থাকবে।

রবীন্দ্রনাথের কাক্সিক্ষত ছিল স্বাধীনতার ভিতর স্বাধীনতা- পড়ে পাওয়া বা কেড়ে নেওয়া স্বাধীনতা নয়। তিনি বলেছিলেন- দেশকে জয় করে নিতে হবে পরের হাত থেকে নয় নিজের নৈষ্কর্ম্য থেকে, ঔদাসীন্য থেকে। তাঁর স্বদেশী সমাজ প্রবন্ধে স্বদেশী আন্দোলনকালে রবীন্দ্রনাথ জাতির আত্মশক্তির জাগরণ এবং আত্মিক স্বাধীনতার ওপর জোর দিয়েই বিতর্কিত হয়েছিলেন। কারণ সেদিন দেশনেতাগণ পাশ্চাত্য অনুপ্রাণিত পেট্রিয়টিক মনোভাবনা কিংবা নেশন চেতনার জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। সেই প্রবল জ্বরের ঘোরে তাঁরা ইউরোপীয় নেশনধর্মটিকে সম্যক রূপে বোঝেননি। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন : মিথ্যার দ্বারাই হউক, ভ্রমের দ্বারাই হউক, নিজেদের কাছে নিজেকে বড়ো বলিয়া প্রমাণ করিতেই হইবে এবং সেই উপলক্ষে অন্য নেশনকে ক্ষুদ্র করিতে হইবে, ইহা নেশনের ধর্ম, ইহা প্যাট্রিয়টিজমের প্রধান অবলম্বন। (সমূহ। বিরোধমূলক আদর্শ)।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ বোধ ছিল গভীরতর স্তরের। ইতিহাসের ধারায় তিনি দেখেছিলেন- এদেশে নেশন নয়, সমাজই প্রবল। তিনি বলেছেন : নেশন অনেক সময় ধর্মকে উপেক্ষা ও উপহাস করা আবশ্যক বলিয়া জ্ঞান করে, বাহুবলকে ন্যায়ধর্মের অপেক্ষা বড় বলিয়া স্পষ্টতই ঘোষণা করে। সমাজ কদাপি তাহা করিতে পারে না- কারণ ধর্মই তাহার একমাত্র অবলম্বন। (প্রাগুক্ত)। তাই উপমহাদেশে চিরকালই উপরতলায় রাজায় রাজায় মারামারি চলেছে অস্ত্র ভাষায়। নিচের তলায় প্রজায় প্রজায় বাঁচাবাঁচি চলেছে সমাজেরই ছত্রছায়ায়।

রবীন্দ্রনাথ সবিস্তারে বলেছিলেন, যে দেশে জন্মেছি কী উপায়ে সেই দেশকে সম্পূর্ণ আপন করে তুলতে হবে। কালান্তর গ্রন্থের সত্যের আহ্বান প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন- বারে বারে আমি কেবল একটি কথা বোঝাবার প্রয়াস পেয়েছি যে মানুষকে অধিকার চেয়ে নিতে হবে না, অধিকার সৃষ্টি করতে হবে। ভারতে ইংরেজ যে আছে এটা বাইরের ঘটনা, দেশ যে আছে এটাই আমাদের ভিতরের কথা। ভারতে ইংরেজের আবির্ভাব-নামক ব্যাপারটি বহুরূপী। আজ সে ইংরেজের মূর্তিতে, কাল সে অন্য বিদেশির মূর্তিতে এবং তার পরদিন সে নিজের দেশি লোকের মূর্তিতে নিদারুণ হয়ে দেখা দেবে। এই পরতন্ত্রতাকে ধনুর্বাণ হাতে বাইরে থেকে তাড়া করলে সে আপনার খোলস বদলাতে বদলাতে আমাদের হয়রান করে তুলবে।

তাই করে তুলছে সে- প্রবন্ধটি রচনার প্রায় শত বৎসর পরেও, এবং দেশি লোকের মূর্তিতেই। কারণ আমরা আজও আমাদের দেশকে স্বদেশ রূপে সৃষ্টি করে তুলতে পারিনি, রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন তেমনি করে। তাই আমাদের স্বদেশকে আমরা আজও পাইনি। রবীন্দ্রনাথ আন্তরিক বিশ্বাস থেকেই বলেছিলেন- গ্রামেই আমাদের দেশের প্রাণ প্রতিষ্ঠা ছিল। স্বচ্ছ দৃষ্টিতে বাস্তবিক দেশকে দেখার ও অনুভব করার বিষয়টি চমৎকারভাবে জানিয়েছেন তিনি তাঁর আত্মশক্তি-শীর্ষক গ্রন্থের ছাত্রদের প্রতি সম্ভাষণ-নামক রচনায় :

ভারতমাতা-ভারত লক্ষ্মী প্রভৃতি শব্দ বৃহদায়তন লাভ করে আমাদের কল্পনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। কিন্তু মাতা যে কোথায় প্রত্যক্ষ আছেন তা কখনো স্পষ্ট করে ভেবে দেখিনি। মাতালের পক্ষে মদ্য যেমন খাদ্যের অপেক্ষা বেশি প্রিয় হয় আমাদের পক্ষেও দেশহিতৈষী নেশা স্বয়ং দেশের চেয়েও বড়ো হয়ে উঠেছিল। ভারতমাতা যে হিমালয়ের দুর্গম চূড়ার উপরে শিলাসনে বসে কেবল করুণ সুরে বীণা বাজাচ্ছেন, একথা ধ্যান করা নেশা করা মাত্র। কিন্তু ভারতমাতা যে আমাদের পল্লিতেই পঙ্ক শেষ পানাপুকুরের ধারে ম্যালেরিয়া জীর্ণ প্লীহা রোগীকে কোলে নিয়ে তার পথ্যের জন্য আপন শূন্য ভাণ্ডারের দিকে হতাশ দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন, ইহা দেখাই যথার্থ দেখা।

লক্ষণীয় যে আজও আমাদের কাছে দেশপ্রেম দেশের চেয়ে বড় হয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথের মতে, স্বাধীনতা বাইরের জিনিস নয়, ভিতরের জিনিস। সুতরাং তা কারও কাছ থেকে চেয়ে পাবার জো নেই। যতক্ষণ নিজের স্বাভাবিক শক্তির দ্বারা আমরা সেই স্বাধীনতাকে আমাদের ভিতর থেকে লাভ না করি ততক্ষণই আমরা পরাধীন। তাই বিদেশির নাগপাশমোচনই কবির কাছে স্বাধীনতা ছিল না, তিনি আত্মিক স্বাধীনতার কথা বলেছিলেন- যেটা লাভ করা আমাদের এখনো বাকি।

স্বদেশী সমাজ প্রবন্ধের পরিশিষ্ট রচনা করেছেন কবি একই ভাবনার সম্প্রসারণে। সমাজ ও পল্লীর উন্নয়নকল্পে স্বদেশী সমাজ ও পল্লী সমাজের সংবিধানও প্রণয়ন করেছিলেন তিনি। দেশের শিক্ষা, অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, স্বাস্থ্যরক্ষা, রাস্তাঘাটের উন্নতি, বাণিজ্য বিস্তার প্রভৃতি কর্ম সংঘটনের জন্য প্রয়োজন এক একটি স্বদেশী সংসদ-এর। তিনি বলেছেন :

একটি বৃহৎ স্বদেশী কর্মক্ষেত্র আমাদের আয়ত্ত গত না থাকিলে আমাদিগকে চিরদিনই দুর্বল থাকিতে হইবে, কোনো কৌশলে এই নির্জীব দুর্বলতা হইতে নিষ্কৃতি পাইব না। যে আমাদিগকে কর্ম দিবে, সেই আমাদের প্রতি কর্তৃত্ব করিবে, ইহার অন্যথা হইতেই পারে না।

তিনি আরো বলেছিলেন :

স্বদেশী আন্দোলনের জন্য দেশের মন প্রস্তুত এবং সে কারণে পঞ্চায়েত, গ্রাম্য সম্মিলন, পল্লী সমিতি প্রভৃতি স্থাপনা এখন একান্তই আবশ্যক। পল্লীর অন্ন-বস্ত্র-আশ্রয়-শিক্ষা-রাস্তাঘাট প্রভৃতি সম্পর্কে সমস্ত অভাব মোচনের ভার নিজেরাই গ্রহণ করা, আর কাহাকেও গ্রহণ করিতে না দেওয়া এটি পল্লী সমিতির মূলনীতি। এইভাবে কিছুদিন কাজ করিতে পারিলে পল্লীর দুঃখী দরিদ্রদের সঙ্গে আমাদের হৃদয়ের যোগ সংস্থাপিত হইবে এবং একত্র হওয়ার সার্থকতা আমরা বুঝিতে পারিব। আত্মশক্তি চালনা করিয়া কর্তৃত্বের পৃথক অধিকারী হওয়ার জন্য এইরূপ পল্লী সমিতিতে আমাদের এখন হাতে খড়ি করিতে হইবে।

শুধু উপদেশ নয়, কুষ্টিয়া, শিলাইদহ, কালীগ্রামে এইসব ভাবনা বাস্তবায়িত করতে ব্যক্তিগত কর্ম-উদ্যোগও নিয়েছিলেন কবি। শুধু পরিকল্পনাই নয়, তার বাস্তবায়নও করেছিলেন তিনি তাঁর সীমিত ক্ষমতার আওতায়- শিক্ষাসংস্কার এবং পল্লী সংস্কারের মডেল রূপী শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনে। স্বদেশি যুগের অব্যবহিত পূর্ব থেকেই ভাবের ও কর্মের জগৎকে একই খাতে প্রবাহিত করতে চেয়েছিলেন কবিগুরু। সেই কবি-কর্মীর ভূমিকা স্পষ্ট হয়েছিল স্বদেশি আন্দোলনকালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ-এর সহসভাপতি, ভাণ্ডার পত্রিকার সম্পাদক, জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণেতা এবং বোলপুরের আশ্রম গুরু হিসেবে নানাবিধ গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে। বঙ্গীয় জনগণের কাছে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা তখন চারণকবি। তাঁর ভাবের গানগুলি আত্মবিস্মৃত জাতির মধ্যে আত্মশক্তির আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হয়েছিল এবং বাংলাদেশের মানুষকে একটি জাতি রূপে সংহত করেছিল।

জমিদারি এস্টেটকে রবীন্দ্রনাথ কি রকম ওয়েলফেয়ার এস্টেটে পরিণত করেছিলেন তার এক পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দিয়েছেন রাজশাহী জেলাগেজেটীয়ার-সম্পাদক এল. এস. এস. ও-ম্যালে, আই. সি. এস ১৯১৬ সালে। সংরক্ষিত রেকর্ডটি দেখে নিতে পারেন আগ্রহী পাঠক। জমিদারির বদলে আসমানদারি বলেছেন রবীন্দ্রনাথ এই রূপান্তরণ-কর্মটিকেই।

জনৈক ঔপনিবেশিক ইংরেজ প্রশাসকের এই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা প্রমাণ করে কেমন বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে গিয়েছে এদেশের পল্লীতে রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে, আমাদের বহু পুরুষ আগে। যে-জনপ্রিয়তা চাকরি রক্ষার মাপকাঠি হিসেবে বিশশতকের শুরুতে রবীন্দ্রনাথের জমিদারিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এদেশেরই এক প্রান্তিক অঞ্চলে- সে-জনমুখী মাপকাঠি তো একুশশতকের শুরুতেও বাংলাদেশের সরকারিতে প্রচলিত হবার কোনো নমুনা দেখা যাচ্ছে না।

জমিদারির কার্যক্ষেত্র গ্রাম। সকল অর্থে শহুরে রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব পেয়ে সেখানে গিয়ে প্রথমেই গ্রামকে যথাযথভাবে চিনে নেন একজন নিরাবেগ সমাজবিজ্ঞানীর পর্যবেক্ষণে। সেই চেনা সার্বিকভাবেই মৌলিক এবং বিস্ময়কররকম সামগ্রিক। ১৯০৭ সালের পাবনা প্রাদেশিক সম্মিলনীতে সভাপতির ভাষণ থেকে তাঁর কিছু উক্তির উদ্ধৃতিই উপলব্ধ সমস্যার স্বরূপ অনুধাবনে যথেষ্ট হবে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন :

গ্রামের মধ্যে চেষ্টার কোনো লক্ষণ নেই। জলাশয় পূর্বে ছিল, আজ তাহা বুজিয়া আসিতেছে; কেননা দেশের স্বাভাবিক কাজ বন্ধ। যে গো-চারণের মাঠ ছিল তাহা রক্ষণের কোনো উপায় নাই, যে দেবালয় ছিল তাহা সংস্কারের কোনো শক্তি নাই; যে-সকল পণ্ডিত সমাজের বন্ধন ছিলেন তাঁহাদের গ-মুর্খ ছেলেরা আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্যের ব্যবসা ধরিয়াছে।…জঙ্গল বাড়িয়া উঠিতেছে, ম্যালেরিয়া নিদারুণ হইতেছে, দুর্ভিক্ষ ফিরিয়া ফিরিয়া আসিতেছে; অকাল পড়িলে পরবর্তী ফসল পর্যন্ত ক্ষুধা মিটাইয়া বাঁচিবে এমন সঞ্চয় নাই।…অন্ন নাই, স্বাস্থ্য নাই, আনন্দ নাই, ভরসা নাই, পরস্পরের সহযোগিতা নাই, আঘাত উপস্থিত হইলে মাথা পাতিয়া লই, মৃত্যু উপস্থিত হইলে নিশ্চেষ্ট হইয়া মরি, অবিচার উপস্থিত হইলে অদৃষ্টকে দোষী করি।

চিত্রটি আজো কি তাই নয়? সমাজ ভেদ প্রবন্ধে তিনি বলেন :

দেশের অন্নে টোলের আর পেট ভরিতেছে না; দুর্ভিক্ষের দায়ে একে একে তাহারা সরকারি অন্নসত্রের শরণাপন্ন হইতেছে; দেশের ধনী মানীরা জন্মস্থানের বাতি নিবাইয়া দিয়া কলিকাতায় মোটর গাড়ি চড়িয়া ফিরিতেছে। তাই দেশের জমিদারদিগকে বলিতেছি, হতভাগ্য রায়তদিগকে পরের হাত ও নিজের হাত হইতে রক্ষা করিবার উপযুক্ত শিক্ষিত সুস্থ ও শক্তিশালী করিয়া না তুলিলে কোনো ভাল আইন বা অনুকূল রাজশক্তির দ্বারা ইহারা কদাচ রক্ষা পাইতে পারিবে না। ইহাদিগকে দেখিবামাত্র সকলেরই জিহ্বা লালায়িত হইবে। এমনি করিয়া দেশের অধিকাংশ লোককেই যদি জমিদার মহাজন পুলিস কানুনগো আদালতের আমলা, যে ইচ্ছা সে অনায়াসেই মারিয়া যায় ও মারিতে পারে, তবে দেশের লোককে মানুষ হইতে না শিখাইয়াই রাজা হইতে শিখাইব কেমন করিয়া?

আজো কি তাদের আমরা মানুষ হতে শিখিয়েছি?
এবারে আরেকটি প্রসঙ্গ, সম্পূর্ণ ভিন্ন কিন্তু জাতিক ও সামাজিক উন্নয়নে অচ্ছেদ্য। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদিন বাইশে শ্রাবণকে তাঁর আশ্রম শান্তিনিকেতনে বৃক্ষরোপণের দিন হিসেবে ধার্য করা হয়েছে- এ অর্থে যে বৃক্ষরোপণ হল নবজীবন উদ্বোধন। অনুষ্ঠানটির তাৎপর্যের স্মারকস্বরূপ স্মর্তব্য যে ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের জীবনাবসানের দিনটির সঙ্গে নবজীবন সৃজনের এই দিকটি যোজিত হয়ে চলে আসছে তাঁর জন্মবার্ষিকীতে ১৯৪২ সাল থেকে এই পর্যন্ত ৬৯ বৎসর ধরে। ১৯২৫ সালের পঁচিশে বৈশাখ কবির জন্মোৎসব পালিত হয় শান্তিনিকেতনে। সে-জন্মোত্সবের অঙ্গ হিসেবে উত্তরায়ণের উত্তর-পশ্চিম সীমানায় পঞ্চবটী (অর্থাৎ অশ্বত্থ, বিল্ব, বট, আমলকী ও অশোক) প্রতিষ্ঠা করা হয়। শান্তিনিকেতনে আনুষ্ঠানিক এবং ধারাবাহিক বৃক্ষরোপণ শুরু হয় আরো তিন বছর পরে ১৯২৮ সাল থেকে। কেন এই বৃক্ষরোপণ উৎসব সে বিষয়ে কবি তাঁর মনোভাব স্পষ্ট করে জানিয়েছেন ১৯৩৯ সালে। তিনি বলেন :

পৃথিবীর দান গ্রহণ করবার সময় মানুষের লোভ বেড়ে উঠল। অরণ্যের হাত থেকে কৃষিক্ষেত্রকে সে জয় করে নিলে, অবশেষে কৃষিক্ষেত্রের একাধিপত্য অরণ্যকে হটিয়ে দিতে লাগল। নানা প্রয়োজনে গাছ কেটে কেটে পৃথিবীর ছায়া বস্ত্র হরণ করে তাকে নগ্ন করে দিতে লাগল। তার বাতাস হল উত্তপ্ত, মাটির উর্বরতার ভাণ্ডার নিঃস্ব হল। এই কথা মনে রেখে কিছুদিন পূর্বে আমরা যে অনুষ্ঠান করেছিলুম সে হচ্ছে বৃক্ষরোপণ, অপব্যয়ী সন্তান কর্তৃক মাতৃভান্ডার পূরণ করবার কল্যাণ-উৎসব।

১৯২৮ সালের বৃক্ষরোপণ অনুষ্ঠানটির মন্ত্র পাঠে এ কথাই বলা হল যে বৃক্ষদের জন্ম শ্রেষ্ঠ। সকল জীব এদের অবলম্বন করে জীবিত থাকে। যাজকেরা এর নিকট থেকে নিরাশ হয়ে ফিরে যায় না। পত্র, পুষ্প, ফল, ছায়া, ফুল, বল্কল, কাষ্ঠ, গন্ধ, রস, ক্ষার, সার, অঙ্কুর- এই সকলের দ্বারা এরা লোকের কাম্য বস্তু দান করে। সংসারে সকল সম্পদের হেতু, ভূমি লক্ষ্মীর কেতু স্বরূপ ও জীবগণের জীবনৌষধাস্বরূপ এই তরুগণ অক্ষত হয়ে বেঁচে থাকুক।

অথচ সেই তরুদের আজো কি আমরা নির্বিচারে নিধন করে চলছি না দেশময়? এর পরের বছর বর্ষামঙ্গল, হলকর্ষণ ও বৃক্ষরোপণ উৎসব অনুষ্ঠিত হয় শ্রীনিকেতনে। এই উৎসবে কবি তাঁর ভাষণে বলেন :

মানুষ গৃধ্নুভাবে প্রকৃতির দানকে গ্রহণ করেছে, প্রকৃতির সহজ দানে কুলোয় নি, তাই সে নির্মমভাবে বনকে নির্মূল করেছে। তার ফলে আবার মরুভূমিকে ফিরিয়ে আনবার উদ্যোগ হয়েছে।…এই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে হলে আবার আমাদের আহ্বান করতে হবে সেই বরদাত্রী বন লক্ষ্মীকে- আবার তিনি রক্ষা করুন এই ভূমিকে, দিন তাঁর ফল, দিন তাঁর ছায়া।

বিজ্ঞানী-সাহিত্যিকা রাচেল কারসন প্রণীত এবং ১৯৬২ সালে প্রকাশিত সাহিত্য-শ্রেণীর বই দি সাইলেন্ট স্প্রিং দিকে দিকে সাড়া ফেলে দেয় এবং বিশ্বময় শুরু হয়ে যায় পরিবেশ আন্দোলন। পুস্তকটি এই নৈতিক সত্যটির প্রতি মুনাফা মুখী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো যে সৃজন-ছন্দ ও বিমল আনন্দের বসন্ত- নিরানন্দ ও নীরব হয়ে গেছে মানুষের অবিমৃশ্যকারিতায়। পৃথিবীর বাস্তুভূমিতে প্রাণী-অপ্রাণী সকলের সমান অধিকার। বইটি বললো : বনে বনে মত্ত হাওয়ার ছন্দে, নানা ফুলের নানা গন্ধে, পাখিদের কলরবে- বসন্ত সংগীতে যেন আবার সরব হয়ে ওঠে নীরব বসন্ত।

অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরিবেশ-সংকটকে এমনি প্রকট করে তুলবার বহু পূর্বে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই রবীন্দ্রনাথ বোঝাতে চেয়েছিলেন যে প্রাণের প্রাচুর্য এবং প্রকৃতির মাধুর্য নিয়ে আমাদের পৃথিবীটি যেন একটি বড়ো সমাজ- যার পরিবেশকে সুন্দর এবং স্বাস্থ্যকর রাখতে হবে। প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এই ভূমিশ্রীকে মর্যাদা দিতে হবে।

সেই মর্যাদা এখনো কি দিচ্ছি আমরা আমাদের পরিবেশকে সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর রেখে? পুনরুৎপাদন ধর্মী ইন্ধন হিসেবে বৃক্ষ মানুষের অশেষ শক্তির জোগানদার এবং অফুরান অক্সিজেন-চেম্বার হিসেবে মানুষের স্বাস্থ্যের অতন্দ্র প্রহরী। তাই বৃক্ষরোপণ-উৎসব ও বর্ষা ঋতু-উৎসবের ধারাটি রবীন্দ্রনাথ প্রবর্তন করেছিলেন দেশের মানুষের ভবিষ্যৎ ক্ষয় ক্ষতিজনিত ক্ষতিপূরণের সংস্থান স্বরূপ। অথচ ক্ষতিপূরণের স্থলে ক্ষতি বর্ধনই কি করছি না আমরা আজও?

সারকথাটি আবার বলি। রবীন্দ্রনাথের সংগীত-কাব্য-নাট্য-চিত্র নিয়ে লেখা প্রভূত পরিমাণ হয়েছে, কিন্তু তাঁর চিন্তা-ভাবনা নিয়ে লেখা সে তুলনায় খুব কমই চোখে পড়ে। তাই সাম্প্রতিক তরুণদের মনে যেন রবীন্দ্রনাথের ওপর একটা অনাস্থার ভাব জেগে উঠতে চাইছে। এজন্যে তাদের দায়ীও করা যায় না। আমরাই ভাষণে-কথনে-লিখনে রবীন্দ্রনাথকে এমনভাবে উপস্থাপিত করে এসেছি যাতে কবিকে তারা প্রাচীন ধাতের সনাতন ধারার লেখক ও প্রতিক্রিয়াশীল মানুষ বলেই চিনতে শিখেছে। মনে করেছে রবীন্দ্রনাথ শুধু সীমা আর অসীমের তত্ত্বই কপচেছেন, চলমান বাস্তব জীবনের প্রকৃতি নিয়ে তেমন কিছু বলেননি। তাই তিনি তাদের কাছে মহান, কিন্তু অচল; শেলফের সর্বোচ্চ তাকে রেখে নমস্কার করে সম্মান জানানোর যোগ্যই শুধু।

অথচ তারুণ্য এবং প্রগতিকে রবীন্দ্রনাথের মত এদেশের আর কোনো মহাজন এত প্রবলভাবে অভিনন্দন জানাননি। বস্তুত রবীন্দ্রনাথ সকল যুগের নবীন-প্রবীণের প্রাসঙ্গিক থাকবেন তাঁর চিরস্থায়ী গান, গল্প, কবিতা, উপন্যাস, রূপক ও সাংকেতিক নাটকের, বিশেষত নটরাজ ঋতু রঙ্গশালা পরবর্তী নৃত্যনাট্যের জন্যে তো বটেই- থাকবেন উপনিষদীয় দার্শনিক, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতিক এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী সমাজতান্ত্রিক বিপুল রচনাসম্ভারের জন্যেও।