ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 


পত্রসাহিত্য রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের অন্যতম প্রধান অঙ্গ- কৃতি হিসেবে তাঁর গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, কবিতা, গীতির চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়।
পত্রের একটা অতি বিশিষ্ট ভূমিকা কবি ব্যাখ্যা করেছেন ছিন্নপত্রের ১৪১-সংখ্যক পত্রে, যেটি পুরোপুরিই উদ্ধৃতিযোগ্য :
পৃথিবীতে অনেক মহামূল্য উপহার আছে, তার মধ্যে সামান্য চিঠিখানি কম জিনিস নয়। চিঠির দ্বারা পৃথিবীতে একটা নূতন আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা মানুষকে দেখে যতটা লাভ করি, তার সঙ্গে কথাবার্তা কয়ে যতটা লাভ করি, চিঠিপত্র দ্বারা তার চেয়ে আরো একটা বেশি কিছু পেয়ে থাকি। চিঠিপত্রে যে আমরা কেবল প্রত্যক্ষ আলাপের অভাব দূর করি তা নয়, ওর মধ্যে আরো একটু রস আছে যা প্রত্যক্ষ দেখা-শোনায় নেই। মানুষ মুখের কথায় আপনাকে যতখানি ও যে রকম করে প্রকাশ করে লেখার কথায় ঠিক ততখানি করে না। আবার লেখায় যতখানি করে মুখের কথায় ততখানি করতে পারে না। এই কারণে, চিঠিতে মানুষকে দেখবার এবং পাবার জন্য আরো একটা যেন নতুন ইন্দ্রিয়ের সৃষ্টি হয়েছে। আমার মনে হয়, যারা চিরকাল অবিচ্ছেদে চব্বিশ ঘণ্টা কাছাকাছি আছে, যাদের মধ্যে চিঠি লেখালেখির অবসর ঘটেনি, তারা পরস্পরকে অসম্পূর্ণ করেই জানে। যেমন বাছুর কাছে গেলে গরুর বাঁটে আপনি দুধ জুগিয়ে আসে তেমনি মনের বিশেষ বিশেষ রস কেবল বিশেষ বিশেষ উত্তেজনায় আপনি সঞ্চারিত হয়, অন্য উপায়ে হবার জো নেই। এই চার পৃষ্ঠা চিঠি মনের যে রস দোহন করতে পারে, কথা কিম্বা প্রবন্ধ কখনোই তা পারে না। আমার বোধ হয় ঐ লেফাফার মধ্যে একটি সুন্দর মোহ আছে- লেফাফাটি চিঠি প্রধান অঙ্গ, ওটা একটা মস্ত আবিষ্কার।
কিন্তু মনের বিশেষ রস নিঃসরণের জন্যে বিশেষ পাত্র-পাত্রী চাই, যাকে উপলক্ষ করে রসটি স্বতঃনিসৃত হয়। ১৬ অক্টোবর ১৯৩৩ সালে শ্রীমতী হেমন্তবালা দেবীকে লিখিত পত্রে (পত্র সংখ্যা ১৪২, চিঠিপত্র, নবম খ-) রবীন্দ্রনাথ লিখছেন :
তোমাকে উপলক্ষ্য করে আমি অনেক কথা বলি কিন্তু তোমাকে বলি নে। দেশের অসীম দুর্গতির কথায় মন যখন উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে তখন চুপ করে থাকতে পারি নে।…দেশের জন্যে আমি তোমাকেও ভাবাতে চাই।
বিশ্ব মুসলিম সমাজের সৌভ্রাতৃত্বের তুলনায় হিন্দুজাতের ধর্মে ও নিরর্থক আচারে শতধা বিভক্তির দুর্বলতা এই পত্রের উপজীব্য। এমনি হাজারো বিষয়ে বক্তব্য, মন্তব্য, ভাষা, ব্যাখ্যা উপযোগী কোনো সম্বোধিতকে উপলক্ষ করে কবি হাজারো পত্রে লিখে গিয়েছেন। অবিশ্বাস্য প্রাচুর্যের আধার অজস্র ধারার পত্রাবলীতে রবীন্দ্রনাথ কখনো দেশকে-জাতিকে, কখনো চলমান ক্ষণকে, কখনো সদা সক্রিয় মনকে, কখনো মনের খেয়াল-খুশিকেই বিশ্বস্তরূপে রেকর্ড করে গিয়েছেন।

এবারে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ও জনপ্রিয় ছিন্নপত্র প্রসঙ্গ। শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে লেখা আটখানি চিঠিসহ, ১৮৮৭-১৮৯৫ সালে শ্রীমতী ইন্দিরা দেবীকে রবীন্দ্রনাথ যে সমস্ত পত্র লিখেছেন, ১৫৩ টি পত্র-সংকলিত গ্রন্থখানি তা থেকে সংকলন। এ সময়ে লিখিত চিঠিপত্র (সব চিঠি নয়) ইন্দিরা দেবী দুটি খাতায় স্বহস্তে নকল করে কবিকে উপহার দিয়েছিলেন। এই খাতা দুটি অবলম্বনে, অনুলেখিকা অথবা পত্রকার স্বয়ং যতটা সঙ্কলনযোগ্য মনে করেছিলেন তাই নিয়ে ১৩১৯ সালে ছিন্নপত্র প্রকাশিত হয়। বহু চিঠিই রবীন্দ্রনাথ তখন গ্রন্থভুক্ত করেননি; অনেক পত্রের কোনো কোনো অংশ সাধারণের সমাদরযোগ্য নয় মনে করেও বর্জন করেন। মূল খাতা-দুখানি অবলম্বনে ১৯৬০ সালে ছিন্নপত্রাবলী নামে যে গ্রন্থখানি প্রকাশিত হয়, তাতে পাওয়া যাবে বর্জিত অনেকগুলি পত্র এবং পত্রাংশ।
ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরাকে, তাঁর ১৩ থেকে ২১ বছর বয়েসকালে, লেখা চিঠিগুলির একক তাৎপর্য স্বয়ং পত্রকারই সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেছেন ৭ অক্টোবর ১৮৯৪ সালে লেখা চিঠিখানিতে।
ইন্দিরা দেবীকে লেখার বিষয়-বৈশিষ্ট্য কি, সেটা স্বয়ং লেখকের জবানি শোনা যাক :
আমার অনেক সময় ইচ্ছা করে, তোকে যে সমস্ত চিঠি লিখেছি সেই গুলো নিয়ে পড়তে পড়েত আমার অনেক দিনকার সঞ্চিত অনেক সকাল দুপুর সন্ধ্যার ভিতর দিয়ে আমার চিঠির সরু রাস্তা বেয়ে আমার পুরাতন পরিচিত দৃশ্যগুলির মাঝখান দিয়ে চলে যাই। কত দিন কত মুহূর্তকে আমি ধরে রাখবার চেষ্টা করেছে- সে গুলো বোধ হয় তোর চিঠির বাক্যের মধ্যে ধরা আছে…আমাকে একবার তোর চিঠিগুলি দিস- আমি কেবল ওর থেকে আমার সৌন্দর্যসম্ভোগগুলো একটা খাতায় টুকে নেব…আমার গদ্যে-পদ্যে কোথাও আমার সুখ দুঃখের দিনরাত্রিগুলি এ রকম করে গাঁথা নেই (শিলাইদহ। ১১ মার্চ ১৮৯৫, সংযোজন, ছিন্নপত্র)।
ছিন্নপত্রের যে-কোনো একটি চিঠি পড়লেই দেখা যাবে কবির অনুপ্রাণিত মনে বহির্জগতের ক্রিয়াগুলি যে-প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে তাকেই সত্যরূপে পত্রগুলি বিশ্বস্তভাবে ধারণ করে আছে। যেমন প্রকৃতির বক্ষলগ্ন কবির প্রাণিত অনুভব :
ঐ-যে মস্ত পৃথিবীটা চুপ করে পরে রয়েছে ওটাকে এমন ভালোবাসি- ওর এই গাছপালা নদী মাঠ কোলাহল নিস্তব্ধতা প্রভাত সন্ধ্যা সমস্তটা-সুদ্ধ দুহাতে আঁকড়ে ধরতে ইচ্ছে করে। মনে হয় পৃথিবীর কাছ থেকে আমরা যে-সব পৃথিবীর ধন পেয়েছি এমন কিকোনো স্বর্গ থেকে পেতুম? স্বর্গ আর কী দিত জানি নে, কিন্তু এমন কোমলতা দুর্বলতা-ময়, এমন সকরুণ আশঙ্কা-ভরা, অপরিণত এই মানুষগুলির মতো এমন আপনার ধন কোথা থেকে দিত!…আমি এই পৃথিবীকে ভারী ভালোবাসি। এর মুখে ভারী একটি সুদূরব্যাপী বিষাদ লেগে আছে- যেন এর মনে আছে, আমি দেবতার মেয়ে, কিন্তু দেবতার ক্ষমতা আমার নেই। আমি ভালোবাসি, কিন্তু রক্ষা করতে পরি নে। আরম্ভ করি, সম্পূর্ণ করতে পরি নে। জন্ম দিই, মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে পরি নে। এই জন্যে স্বর্গের উপর আড়ি করে আমি আমার দরিদ্র মায়ের ঘর আরো বেশি ভালোবাসি- অসহায়, অসমর্থ, অসম্পূর্ণ, ভালোবাসার সহস্র আশঙ্কায় সবর্দা চিন্তাকাতর বলেই (পত্র ১৮, ছিন্নপত্র)।
কাদম্বিনী দত্ত (১২৮৫ ?-১৩৫০) উচ্চশিক্ষিতা বা সুপরিচিতা কোনো ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। কিন্তু তাঁর ঈশ্বর-জিজ্ঞাসা এবং অসামান্য ধীশক্তি রবীন্দ্রনাথকে বিশেষবাবে মুগ্ধ করেছিল। প্রায় ত্রিশ বছর কাল উভয়ের মধ্যে পত্রযোগে নানা বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলেছিল। কবি কি-প্রাঞ্জল ভাষায় এই শোকাতুরা বালবিধবাকে শান্তির আমোঘ বাণী শুনিয়েছেন, এখানে তার কিছু নমুনা দেয়া আলোচনার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হবে।
ঈশ্বর তাঁর পরম দানগুলিকে দুঃখের ভিতর দিয়াই সম্পূর্ণ করেন- তিনি বেদনার মধ্য দিয়া জননীকে সন্তান দেন- সেই বেদনার মূল্যেই সন্তান জননীর এত অত্যন্তই আপন। সেই কথা মনে রাখিয়া, যখন ঈশ্বরের কাছে সত্য চাই, আলোক চাই, অমৃত চাই তখন অনেক বেদনা অনেক ত্যাগের জন্য নিজেকে সবলে প্রস্তুত করিতে হইবে। মা, ঈশ্বর যদি তোমাকে বেদনা দেন তবে নিজরে দোষে সেই বেদনাকে ব্যর্থ করিয়ো না- তাহাকে সফল করিবার জন্য সমস্ত হৃদয় মনকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করিয়া জাগ্রত হও (পত্র ৪, ঐ)।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কাদম্বিনী দত্তের পত্রব্যবহারের মূল বিষয় ছিল- এ সংসারে মানুষের সুখদুঃখের স্বরূপ। হেমন্তবালার সঙ্গে পত্রালাপের মুখ্য বিষয় মানুষের ধর্মমত, এবং ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে কবির আত্মপরিচয়।
তিনি নানা প্রশ্ন করে এমনভাবে চিঠি লিখতেন যে, রবীন্দ্রনাথ সারবান উত্তর লিখতে উদ্বুদ্ধ হতেন। বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণকারিণী এই গরীয়সী রমণীর মুখ্য প্রশ্নটি ছিল আপনি এমন কবি ও ভাবুক হয়েও বৈষ্ণবধর্মকে কেন সমর্থন করেন নি, এবং সাকার-উপাসনার বিরুদ্ধে বলেন কেন?
এ সম্পর্কে কবি বহু পত্রে বহু কথা লিখেছেন। এখানে আমি কেবল দ্বিতীয় পত্রখানি থেকে দীর্ঘ একটি উদ্ধৃতি দিয়ে প্রসঙ্গটি শেষ করবো।
আমি র্নিগুণ নিরঞ্জন নির্ব্বিশেষের সাধক এমন একটা আভাস তোমার চিঠিতে পাওয়া গেল। কোনো একদিক থেকে সেটা হয়তো সত্য হতেও পারে- যেখানে সমস্তই শূন্য সেখানেও সমস্তই পূর্ণ-যিনি তিনি আছেন এটাও উপলব্ধি না করব কেন? আবার এর উল্টো কথাটাও আমারি মনের কথা। যেখানে সব-কিছু আছে সেখানেই সবার অতীত সব হয়ে বিরাজ করেন এটাও যদি না জানি তাহলে সেও বিষম ফাঁকি। আজ এই প্রৌঢ় বসন্তের হাওয়ায় বেলফুলের গন্ধ সিঞ্চিত প্রভাতের আকাশে একটা রামকেলী রাগিণীর গান থাকে ব্যাপ্ত হয়ে- স্তব্ধ হয়ে একা একা বেড়াই যখন, তখন সেই অনাহত বীণার আলাপে মন ওঠে ভরে। এই হোলো গানের অন্তর্লীন গভীরতা। তার পরে হয়তো ঘরে এসে দেখি গান শোনবার লোক বসে আছে- তখন গান ধরি “প্যালা ভর ভর লায়ীরি”। সেই ধ্বনিলোকে দেহমন সুরে সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে, যা কিছুকে সেই সুর স্পর্শ করে তাই হয় অপূর্ব্ব। এও তো ছাড়বার জো নেই। সুরের গান, না-সুরের গান, কাকে ছেড়ে কাকে বাছব? আমি দুইকেই সমান স্বীকার করে নিয়েছি।
এক জাগয়ায় কেবল আমার বাধে। খেলনা নিয়ে নিজেকে ভোলাতে আমি কিছুতেই পারি নে। এটা পারে নিতান্তই শিশু বধূ। সাথী আছেন কাছে বসে তাঁর দিকে পিছন ফিরে খেলনার বাক্স খুলে বা একেবারেই সময় নষ্ট করা। এতে করে সত্য অনুভূতির রস যায় ফিকে হয়ে। ফুল দিতে চাও দাও না, এমন কাউকে দাও যে-মানুষ ফুল হাতে নিয়ে বলবে বাঃ। তার সেই সত্য খুসি আনন্দে গিয়ে পৗঁছায়। শিলাইদহের বোষ্টমী আমার হাতে আম দিয়ে বললে, তাঁকে দিলুম। এই তো সত্যকার দেওয়া- আমারই ভোগের মধ্যে তিনি আমটিকে পান। পূজারী ব্রাহ্মণ সকাল বেলায় গোলকচাঁপার গাছে বাড়ি মেরে ফুল সংগ্রহ করে ঠাকুরঘরে যেত- তার নামে পুলিশে নালিষ করতে ইচ্ছা করত- ঠাকুরকে ফাঁকি দিচ্ছে বলে। সেই ফুল আমার মধ্যে দিয়ে ঠাকুর গ্রহণ করবেন বলেই গাছে ফুল ফুটিয়েছেন আর আমার মধ্যে ফুলে আনন্দ আছে। ঠাকুরঘরে যে মূর্ত্তি প্রতিদিন এই চোরাই মাল গ্রহণ করে সে তো সমস্ত বিশ্বকে ফাঁকি দিলে- মূঢ়তার ঝুলির মধ্যে ঢেকে তার চুরি। কত মানুষকেই বঞ্চিত করে তবে আমরা এই দেবতার খেলা খেলি। ঠাকুরঘরের নৈবেদ্যের মধ্যে আমরা ঠাকুরের সত্যকার প্রাপ্যকে প্রত্যহ নষ্ট করি।
এর থেকেএকটা কথা বুঝতে পারবে, আমার দেবতা মানুষের বাইরে নেই। নির্ব্বিকার নিরঞ্জনের অবমাননা হচ্ছে বলে আমি ঠাকুরঘর থেকে দূরে থাকি এ কথা সত্য নয়- মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে বলেই আমার নালিষ। যে সেবা যে প্রীতি মানুষের মধ্যে সত্য করে তোলবার সাধনাই হচ্ছে ধর্ম্মসাধনা তাকে আমরা খেলার মধ্যে ফাঁকি দিয়ে মোটাবার চেষ্টায় প্রভূত অপব্যয় ঘটাচ্চি। এই জন্যেই আমাদের দেশে ধার্ম্মিকতার দ্বারা মানুষ এত অত্যন্ত অবজ্ঞাত। মানুষের রোগ তাপ উপবাস মিটতে চায় না, কেননা চিরশিশুর দেশে খেলার রাস্তা দিয়ে সেটা মেটাবার ভার নিয়েচি। মাদুরার মন্দিরে যখন লক্ষ লক্ষ টাকার গহনা আমাকে সগৌরবে দেখানো হোলো তখন লজ্জায় দুঃখে আমার মাথা হেঁট হয়ে গেল। কত লক্ষ লক্ষ লোকের দৈন্য অজ্ঞান অস্বাস্থ্য ঐ সব গহনার মধ্যে পুঞ্জীভূত হয়ে আছে। খেলার দেবতা এই সব সোনা জহরৎকে ব্যর্থ করে বসে থাকুন- এদিকে সত্যকার দেবতা সত্যকার মানুষের কঙ্কালশীর্ণ হাতের মুষ্টি প্রসারিত করে ঐ মন্দিরের বাহিরে পথে পথে ফিরচেন। তবু আমাকে বলবে আমি নিরঞ্জনের পূজারি? ঐ ঠাকুরঘরের মধ্যে যে পূজা পড়চে সমস্ত ক্ষুধিতের ক্ষুধাকে অবজ্ঞা করে সে আজ কোন শূন্যে গিয়ে জমা হচ্চে?
হয়তো বলবে এই খেলার পূজাটা সহজ। কিন্তু সাধনাকে সহজ কোরো না। আমরা মানুষ, আমাদের এতে গৌরব নষ্ট হয়। দেবতার পূজা কঠিন দুঃখেরই সাধনা- মানুষের দুঃখভার পর্ব্বত-প্রমাণ হয়ে উঠেছে সেইখানেই দেবতার আহ্বন শোনো- সেই দুঃসাধ্য তপস্যাকে ফাঁকি দেবার জন্যে মোহের গহ্বরের মধ্যে লুকিয়ে থেকো না। আমি মানুষকে ভালোবাসি বলেই এই খেলনা দেবতার সঙ্গে আমার ঝগড়া। দরকার নেই এই খেলার, কেননা প্রেম দাবী করচেন সত্যকার ত্যাগের, সত্যকার পাত্রে।
তোমাকে বোধ হয় কিছু কষ্ট দিলুম। কিন্তু সেও ভালো। যদি তোমাকে অবজ্ঞা করতুম তাহলে এ কষ্টটুকু দিতুম না।

এমনি স্বগত ভাবনা বা ব্যক্তিগত প্রবন্ধে অতুলনীয় সৎসাহিত্য রচিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য পত্রের বেশির ভাগ জুড়ে। তবে এ সাহিত্য পত্র-মাধ্যম ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যমে এ প্রসাদগুণ নিয়ে সৃষ্ট হতে পারতো না কেন, তাও তাঁর কাছেই শোনা ভালো। ছিন্নপত্র, ভানুসিংহের পত্রাবলী, পথে ও পথের প্রান্তে- এই তিনখানি গ্রন্থ ১৩৪৫ সালে পত্রধারা শিরোনামে চিহ্নিত হলে, তার ভূমিকাতে ছিন্নপত্র প্রসঙ্গে কবি যা লিখেছেন তা তাঁর সমগ্র পত্রসাহিত্য সম্পর্কেই প্রযোজ্য :
পত্রধারায় ছিন্নপত্র পর্যায়ে যে-চিঠির টুকরোগুলি ছড়ানো হয়েছে তার অধিকাংশই আমার ভাইঝি ইন্দিরাকে লেখা চিঠির থেকে নেওয়া। তখন আমি ঘুরে বেড়াচ্ছিলুম বাংলার পল্লীতে পল্লীতে, আমার পথ-চলা মনে সেই-সকল গ্রামদৃশ্যের নানা নতুন পরিচয় ক্ষণে ক্ষণে চমক লাগাচ্ছিল; তখনি তখনি তাই প্রতিফলিত হচ্ছিল চিঠিতে। কথা কওয়ার অভ্যাস যাদের মজ্জাগত, কোথাও কৌতুক-কৌতূহলের একটু ধাক্কা পেলেই তাদের মুখ খুলে যায়। যে বকুনি জেগে উঠতে চায় তাকে টেকসই পণ্যের প্যাকেটে সাহিত্যের বড়ো হাটে চালান করবার উদ্যোগ করলে তার স্বাদের বদল হয়। চার দিকের বিশ্বের সঙ্গে নানা-কিছু নিয়ে হাওয়ায় হাওয়ায় আমাদের মোকাবিলা চলছেই, লাউড-স্পীকারে চড়িয়ে তাকে ব্রডকাস্ট করা সয় না। ভিড়ের আড়ালে চেনা লোকের মোকাবিলাতেই তার সহজরূপ রক্ষা হতে পারে।