ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার


রবীন্দ্র-জীবনের সপ্ততিতম বর্ষপূর্তি উৎসব উপলক্ষে কলকাতার টাউন হলে ১৯৩১ সালের ২৭ ডিসেম্বরে পঠিত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত প্রশস্তিপত্রটির দুটি বাক্য আমার বোধে রবীন্দ্র-জন্মদিন উপলক্ষে উচ্চারিত সর্বোত্তম শংসাবচন। একটি বাক্য কবিগুরু, তোমার প্রতি চাহিয়া আমাদের বিস্ময়ের সীমা নাই। আরেকটি বাক্য হাত পাতিয়া জগতের কাছে আমরা নিয়াছি অনেক কিন্তু তোমার হাত দিয়া দিয়াছিও অনেক।
সে-উৎসবটির মতো সমারোহপূর্ণ জন্মোৎসব রবীন্দ্রনাথের জীবনে আর কখনও হয়নি। বাংলার ইতিহাসেও ঘটনাটি চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। উৎসবের আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন দেখে রবীন্দ্রনাথ চরম বিব্রত বোধ করেছেন এবং ইন্দিরা দেবীকে লিখেছেন : সলজ্জে লোকের কাছে কৈফিয়ত দিয়ে বলতে ইচ্ছে করে, দোহাই তোমাদের, আমি এর জন্যে দায়িক নই তবুও আমি মাপ চাই- ভবিষ্যতে আর কখনও সত্তর বছরে পড়বার দুর্গতি ঘটাব না।

রবীন্দ্রনাথের জন্মোৎসব প্রথম পালিত হয় আত্মীয়দের মধ্যে ১৮৮৭ সালে তথা ১২৯৪ সনের পঁচিশে বৈশাখে, যেদিন তিনি ২৬ বছর পূর্ণ করে সাতাশে পড়লেন। অভিনব সে-ঘটনাটি সম্পর্কে কবির ভাগনি, স্বর্ণকুমারী দেবীর কন্যা প্রখ্যাত দেশনেত্রী সরলা দেবী তাঁর জীবনস্মৃতিতে লিখছেন :

রবিমামার প্রথম জন্মদিন উৎসব আমি করাই। তখন মেজমামা (সত্যেন্দ্রনাথ) ও নতুন মামার (জ্যোতিরিন্দ্রনাথ) সঙ্গে তিনি ৪৯নং পার্ক স্ট্রীটে থাকেন। অতি ভোরে উল্টাডিঙ্গির কাশিয়াবাগান বাড়ি থেকে পার্ক স্ট্রীটে নিঃশব্দে তাঁর ঘরে তাঁর বিছানার কাছে গিয়ে বাড়ির বকুল ফুলের নিজের হাতে গাঁথা মালা ও বাজার থেকে আনান বেলফুলের মালার সঙ্গে অন্যান্য ফুল ও একজোড়া ধুতি-চাদর তাঁর পায়ের কাছে রেখে প্রণাম করে তাঁকে জাগিয়ে দিলুম। তখন আর সবাই জেগে উঠলেন- পাশেই নতুন মামার ঘর। রবির জন্মদিন বলে একটি সাড়া পড়ে গেল। সেই বছর থেকে পরিজনদের মধ্যে তাঁর জন্মদিনের উৎসব আরম্ভ হল (জীবনের ঝরাপাতা)।

জন্মদিনে রবীন্দ্রনাথ অনাত্মীয়র কাছ থেকে প্রথম সংবর্ধনা-অভিনন্দন পেয়েছিলেন এর ২৩ বছর পরে ১৯১০ সালে অর্থাৎ ১৩১৭ সনের পঁচিশে বৈশাখ, যেবার কবি ঊনপঞ্চাশ পার হয়ে পঞ্চাশে পড়লেন। জন্মদিনের অনুষ্ঠান সেবারেই প্রথম আয়োজিত হয়েছিল শান্তিনিকেতন আশ্রমের নিরালা শান্ত সমাহিত পরিবেশে। এ দিনকার ভাষণে তাঁর জন্মদিন সম্বন্ধে কবি বলেছেন- একদিন আমি আমার পিতামাতার ঘরে জন্ম নিয়েছিলুম- সেখানকার সুখদুঃখ ও স্নেহপ্রেমের পরিবেষ্টন থেকে আজ জীবনের নূতন ক্ষেত্রে জন্মলাভ করেছি।…আজ আমার জন্মদিনে তোমরা যে উৎসব করছ তার মধ্যে যদি এই কথাটি থাকে, তোমরা যদি আমাকে আপন করে পেয়ে থাক, আজ প্রভাতে সেই পাওয়ার আনন্দকেই যদি তোমাদের প্রকাশ করবার ইচ্ছা হয়ে থাকে, তা হলেই উৎসব সার্থক। (জন্মোৎসব ভাষণ : শান্তিনিকেতন-গ্রন্থ)।

১৩১৮ সনে বা ১৯১১ সালে রবীন্দ্রনাথের বয়স পঞ্চাশ পূর্ণ হল। এবার শুধু শান্তিনিকেতনের আশ্রমিকদের নয়, তা পরিণত হয়েছে সার্বজনিক উৎসবে। কলকাতা থেকে বহু রবীন্দ্রভক্তদের সমাবেশ ঘটে এই উপলক্ষে। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের দুই কন্যা শান্তাদেবী ও সীতাদেবীও ছিলেন সেই দলে। শান্তাদেবী লিখেছেন, সেই প্রচ- রৌদ্রে বোলপুরের ভুবনডাঙার মত জলহীন প্রান্তরে জন্মোৎসবের নামে দলে দলে ছেলেবুড়ো গিয়া হাজির। সীতাদেবীর পুণ্যস্মৃতি-তে সুদীর্ঘ বর্ণনা আছে এই উৎসবের :

২৫শে বৈশাখ ভোর পাঁচটার সময় আম্রকুঞ্জে রবীন্দ্রনাথের জন্মোৎসবের আয়োজন হইয়াছিল। আমরা উৎসাহের আতিশয্যে প্রায় রাত থাকিতেই উঠিয়া পড়িয়াছিলাম।…উৎসবক্ষেত্র আলপনা ও পত্রপুষ্পে অতি সুন্দর করিয়া সাজানো হইয়াছিল। আমরা না বসিয়া এদিক-ওদিক ঘুরিয়া দেখিতে লাগিলাম। অল্পক্ষণ পরেই দেখিলাম, কবি শান্তিনিকেতন হইতে বাহির হইয়া উৎসবক্ষেত্রের দিকে চলিয়াছেন। আমরাও তাঁহাকে অনুসরণ করিয়া আম্রকুঞ্জে ফিরিয়া আসিলাম। আশ্রমবাসী ও অতিথিবর্গে দেখিতে দেখিতে সভাস্থল ভরিয়া উঠিল। দিনেন্দ্রনাথ তাঁহার ছাত্রদের লইয়া গান করিলেন। আচার্যের কাজ করিলেন তিনজন- শ্রীযুক্ত ক্ষিতিমোহন সেন, পণ্ডিত বিধুশেখর ভট্টাচার্য ও শ্রীযুক্ত নেপালচন্দ্র রায়।…রবীন্দ্রনাথকে আশ্রমের পক্ষ হইতে অনেকগুলি সময়োচিত উপহার দেওয়া হইল। বিধুশেখর শাস্ত্রী মহাশয় একটি অভিনন্দন পাঠ করিলেন। রবীন্দ্রনাথ কী বলিয়াছিলেন তাহার কিছু মনে আছে। “আমাকে আপনারা যে উপহার দিলেন সেগুলি পাবার আমি কতখানি যোগ্য তা যদি আমি মনে করতে যাই তাহলে আমাকে লজ্জিত হতে হবে। কিন্তু একটা ক্ষেত্র আছে সেখানে মানুষের কোনো লজ্জা নেই, সেটা প্রীতির ক্ষেত্র। এই-সব উপহার আমাকে আপনারা প্রীতির সহিত দিচ্ছেন, সেইজন্য এ-সব গ্রহণ করতে আমার কোনো বাধা নেই।”…সভার কার্য শেষ হইতেই কবিকে প্রণাম করিবার ধূম পড়িয়া গেল। প্রায় তিনশত ব্যক্তির প্রণাম গ্রহণ করিতে তাঁহাকে আধঘণ্টারও বেশি দাঁড়াইয়া থাকিতে হইয়াছিল। তিনি সমস্তক্ষণই নতমস্তকে হাতজোড় করিয়া দাঁড়াইয়া ছিলেন।

তারপর প্রতি বছরই গুরুদেবের জন্মদিন উদ্যাপিত হয়েছে, নানা অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে। কোনও বছর আড়ম্বরে আবার কোনও বছর অনাড়ম্বরে, কখনও শান্তিনিকেতনে কখনও কলকাতায়- কবি নিজেই যেমন বলেছেন এই দিন বৎসরে বৎসরে/ নানা বেশে ফিরে আসে ধরণীর পরে।

১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথের ৭৬তম জন্মদিন পঁচিশে বৈশাখের বদলে পহেলা বৈশাখ অর্থাৎ ১৩৪৪ সনের নববর্ষের দিনে উদ্যাপিত হয় রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছানুসারে। অনুষ্ঠানটির সপ্তাহখানেক আগে ২৫ চৈত্র রচিত স্মরণ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন : যখন রব না আমি মর্ত কায়ায়/ তখন স্মরিতে যদি হয় মন/ তবে তুমি এসো হেথা নিভৃত ছায়ায়/ যেথা এই চৈত্রের শালবন। শান্তিনিকেতনে নববর্ষের দিন জন্ম-জয়ন্তী উৎসব পালনের পর রবীন্দ্রনাথ আলমোড়া-ভ্রমণে যান। সেখানে পঁচিশে বৈশাখ তাঁর নিরিবিলিতেই কাটে।

১৯৩৮ সালেও আগের বছরের মতো বাংলা নববর্ষের দিন রবীন্দ্র-জন্মোৎসবের আয়োজন হয় শান্তিনিকেতনে। সে-বছর ২৫ বৈশাখ কালিম্পঙে কাটান কবি। ওই দিন কলকাতার আকাশবাণী কর্তৃপক্ষ দেশবাসীকে সরাসরি কালিম্পং থেকে বেতারে কবিকণ্ঠের কবিতা-আবৃত্তি শোনাবার ব্যবস্থা করেন। রবীন্দ্রনাথ টেলিফোনের সামনে বসে জন্মদিন কবিতাটি পড়েন, আকাশবাণী থেকে তা প্রচারিত হয়। এই দিন তিনি উদ্বোধন নামে একটি কবিতাও লেখেন যা নবজাতক কাব্যে স্থান পায়- পরবর্তী কালে কবিতাটি (প্রথম যুগের উদয় দিগঙ্গনে) গীতবিতান-এর ভূমিকা রূপে মুদ্রিত হয়ে আসছে।

৭৮ বছরের জন্মোৎসবও পালিত হয় ১৩৪৬ সনের নববর্ষ-দিবসের অপরাহ্নে। এই উপলক্ষে দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মরণে নির্মিত দিনান্তিকা চা-চক্রের উদ্বোধন করেন রবীন্দ্রনাথ। সন্ধ্যায় উত্তরায়ণে বসে নাচগানের আসর। পঁচিশে বৈশাখ কবি ছিলেন পুরীতে। সেদিন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বনাথ দাসের নেতৃত্বে আয়োজিত হয় নাগরিক সংবর্ধনা। গভর্মেন্ট পার্কে আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে জগন্নাথ মন্দিরের পণ্ডিতেরা কবির সম্মানার্থ শাস্ত্রীয় মন্ত্র পাঠ করে তাঁর উপরে ঐশ্বরিক আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। এই প্রথম স্বদেশবাসী-শাসিত রাজ্য সরকার সংবর্ধনা জানালেন রবীন্দ্রনাথকে। কৃতজ্ঞ কবি তাঁর ভাষণে সে-কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করে ধন্যবাদ দিলেন ওড়িশা সরকারকে। এ-বছরেই প্রথম আকাশবাণী কর্তৃপক্ষ রবীন্দ্র-জন্মোৎসব উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচারের ব্যবস্থা করেন।

৭৯ বছরের জন্মোৎসবের অনুষ্ঠান হয় নববর্ষের সন্ধ্যায় শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জে। বেদমন্ত্র পাঠের পর গুরুদেব পড়ে শোনান অরূপরতন নাটক। রামকিঙ্কর বেইজ তাঁর তৈরি গুরুদেবের আবক্ষমূর্তিটি উপহার দেন এই উপলক্ষে। পঁচিশে বৈশাখের প্রাক্কালে কবি বেড়াতে যান মংপুতে। সেখানে পাহাড়ি অধিবাসীগণ জন্মদিনের অর্ঘ্য দেন রবীন্দ্রনাথকে। মৈত্রেয়ী দেবী মংপুতে রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থে তার বিবরণ দিয়েছেন :

পঁচিশে বৈশাখের দুতিন দিন আগে একটা রবিবার (২২ বৈশাখ) এখানে উৎসবের বন্দোবস্ত হোলো। সকালবেলা দশটার সময় স্নান করে কালোজামা কালো রং-এর জুতা পরে বাইরে এসে বসলেন (গুরুদেব)। কাঠের বুদ্ধমূর্তির সামনে বসে একজন বৌদ্ধ স্তোত্র পাঠ করল। কবি ঈশোপনিষদ থেকে অনেকটা পড়লেন। সেইদিন দুপুরবেলা জন্মদিন বলে তিনটে কবিতা লিখেছিলেন, তার মধ্যে বৌদ্ধবৃদ্ধের কথা ছিল। বিকেলবেলা দলে দলে সবাই আসতে লাগল- আমাদের পাহাড়ী দরিদ্র প্রতিবেশী, সানাই বাজতে লাগল, গেরুয়া রং-এর জামার উপর মাল্য-চন্দন ভূষিত আশ্চর্য স্বর্গীয় সেই সৌন্দর্য সবাই স্তব্ধ হয়ে দেখতে লাগল। ঠেলা চেয়ারে বসে বাড়ির পথ দিয়ে ধীরে ধীরে ওঁকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, দলে দলে পাহাড়ীরা প্রণত হয়ে ফুল দিচ্ছিল। প্রত্যেকটি লোক শিশু বৃদ্ধ সবাই কিছু না কিছু ফুল এনেছে। ওরা যে এমন করে ফুল দিতে জানে, তা আগে কখনও মনে করিনি।

মংপুতে অনুষ্ঠিত জন্মদিনটির স্মৃতি রয়ে গেছে ওই সময়ে রচিত জন্মদিন কাব্যের ৫, ৬, ৭ সংখ্যক কবিতায়। এই জন্মদিন উপলক্ষেই মার্শাল চিয়াং কাইসেক রবীন্দ্রনাথকে প্রেরিত শুভেচ্ছা-বাণীতে বলেন, ক্ষুদ্র পর্বতমালা যেমন করে তুষারাবৃত সুউচ্চ পর্বতের পবিত্র শৃঙ্গের প্রতি দৃষ্টিপাত করে, নদীসমূহ যেমন ভাবে গভীর সমুদ্রের দিকে ধাবিত হয়, তেমনি করেই, হে সম্মানিত গুরুদেব, সমগ্র জগৎ আপনার প্রতি আকৃষ্ট হয়। আপনার এই শুভ ঊনআশীতম জন্মতিথি উপলক্ষে আমি আপনাকে আমার আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।

কবির মর্ত্য জীবনের শেষ জন্মদিন অশীতিতম উদ্যাপিত হল শান্তিনিকেতনে, ১৩৪৮ সনের নববর্ষের দিনে, ১৪ এপ্রিল ১৯৪১ সালে। ১৫ এপ্রিল প্রকাশিত আনন্দবাজার পত্রিকার নিজস্ব সংবাদদাতা প্রেরিত বর্ণনা থেকে জানা যায় সেদিন ভোরে আশ্রমিকগণ বৈতালিক গান গেয়ে শান্তিনিকেতন পরিক্রমা করেন। সকালে ক্ষিতিমোহন সেনের পরিচালনায় মন্দিরে নববর্ষের উপাসনা অনুষ্ঠিত হয়। গীত হয় এই উৎসব উপলক্ষে বিশেষভাবে রচিত দুখানি গান- হে পুরুষোত্তম এবং ঐ মহামানব আসে। সন্ধ্যায় উত্তরায়ণে নির্মিত একটি ম-পের নিচে আয়োজিত হয় জন্মোৎসব। ক্ষিতিমোহন সেনের কণ্ঠে পঠিত হয় মানব জাতির প্রতি রবীন্দ্রনাথের শেষ বাণী ও মর্মস্পর্শী ভাষণ সভ্যতার সংকট।

গুরুদেবের আশি বছর পূর্তি উপলক্ষে মহাত্মা গান্ধী টেলিগ্রামে অভিনন্দন জানিয়ে লেখেন- আপনার জীবনের আশি বছর পূর্তি যথেষ্ট নয়- শতবর্ষ জীবন প্রার্থনা করি। পরম প্রীতি ও শ্রদ্ধা জানাই। প্রত্যুত্তরে রবীন্দ্রনাথ ধন্যবাদ জানিয়ে মহাত্মাজিকে টেলিগ্রাম পাঠান- আপনার অভিনন্দন-বাণীর জন্য কৃতজ্ঞ। তবে আশি বছর বেঁচে থাকাটাই বেয়াদবি, একশো বছর তো অসহনীয়। মার্শাল চিয়াং কাইসেক তাঁর শুভেচ্ছা বাণীতে বলেন- ১৪ এপ্রিল তারিখে আপনার জন্মোৎসব উপলক্ষে অভিনন্দন জানাই। পূর্ব গোলার্ধ্ব যখন কামান গর্জন ও বোমা বিস্ফোরণে প্রকম্পিত সে সময়ে বিশ্ববাসী আপনার প্রেম, শান্তি, স্বাধীনতা ও ন্যায়পরতার বাণীর মহনীয়তা আরও বেশি অনুভব করবে। চীন পূর্ব এশিয়ার সভ্যতা রক্ষার জন্য লড়াই করে চলেছে। আমি আপনাকে অভিনন্দন জানাতে ও দীর্ঘজীবন কামনা করতে চাই। আপনার উদাত্ত বাণীতে প্রাচ্য সভ্যতার আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্য সমগ্র বিশ্বে ধ্বনিত হবে। আরেকজন চৈনিক নেতা তাই-চি-তাও অভিনন্দন-বাণীতে বলেন- আপনার জন্মোৎসব উপলক্ষে আমি আপনার হিমালয়ের ন্যায় সহনশীল স্বাস্থ্য এবং ভারত মহাসাগরের ন্যায় সীমাহীন শান্তি কামনা করি।

অতঃপর জীবনের শেষ পঁচিশে বৈশাখে উপনীত হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। সারা দেশে জয়ন্তী উৎসব পালিত হয়েছে মহাসমারোহে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় রবীন্দ্র-সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। আনন্দবাজার পত্রিকার রবীন্দ্রসংখ্যায় রবীন্দ্র-জীবনের নানা দিক নিয়ে লিখেছেন প্রমথ চৌধুরী, গোপাল হালদার, নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, নীহাররঞ্জন রায়, মণীন্দ্রভূষণ গুপ্ত, উমা দত্ত প্রমুখ। পূরবী কাব্যের পঁচিশে বৈশাখ কবিতাটিকে রবীন্দ্রনাথ হে নূতন, দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ গানে রূপান্তরিত করেছিলেন তেইশে বৈশাখ। গানটি আনন্দবাজারে মুদ্রিত হয়েছে শান্তিদেব ঘোষ-কৃত স্বরলিপিসহ। শান্তিনিকেতনে চলছে গ্রীষ্মের ছুটি। তবু আশ্রমবাসীগণ একান্ত ঘরোয়াভাবে গুরুদেবের জন্মদিন পালনে উদ্যোগী হয়েছেন। যথারীতি বৈতালিক ও মন্দিরে উপাসনা অনুষ্ঠিত হয়েছে সকালে আর সন্ধ্যায় সকলে সমবেত হয়েছেন উত্তরায়ণে কবিকে প্রণাম জানাতে। গান ও নাচের পর অভিনীত হয়েছে বশীকরণ নাটক। রোগপীড়িত রবীন্দ্রনাথ শেষ পর্যন্ত দেখেছেন সেই অনুষ্ঠান। আশ্রমবাসীদের বলেছেন, সংসারে বড়ো জিনিস হচ্ছে প্রীতি- খ্যাতি নয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন উদ্যাপনের শুরু-শেষ এই ধারাভাষ্যটিতে তিনটি বিষয় লক্ষণীয়। এক- উৎসবটি তাঁরই নির্দেশক্রমে কবি-জীবনের শেষ পাঁচটি বছর পঁচিশে বৈশাখের বদলে হয়েছে পহেলা বৈশাখে। দুই- আজকের বিশ্বময় পালিত বাঙালির সার্বজনিক উৎসব রবীন্দ্র-জয়ন্তীর উল্লেখযোগ্য অস্তিত্ব রবীন্দ্র-জীবনের প্রথম ৫০ বছরে বলতে গেলে ছিলই না। তিন- জয়ন্তীর এই ঐতিহ্যটির সৃষ্টিতে বিশেষ অবদান কবি-জীবনের কেবল ৬৫তম, ৬৭তম ও ৭০তম- এই তিনটি বছরেরই।

অথচ এ-লেখাটির উপাত্ত সংগ্রহের পূর্ব পর্যন্ত কী মূর্খই-না ছিলাম আমি ! আমার ধারণা ছিল, শৈশব থেকে কবি এবং কৈশোর থেকে কথাশিল্পী- বিশেষত মাত্র ১৬ বছর বয়েসে ভিখারিনীর মতো গল্পের এবং করুণার মতো উপন্যাসের রচয়িতা- রবীন্দ্রনাথের জয়ন্তী-পালন নিশ্চয় সেই বয়ঃসন্ধিক্ষণ থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। হতে পারে, আমাদের অনেক ছোটখাটো কবি-লেখকের যখন তখন অকাল-জয়ন্তী পালনই আমার এহেন মূর্খতার কারণ।