ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

কোর্ট সংলগ্ন এক চা-দোকানে সেদিন বিষম বিপরীত এক কান্ড দেখলাম। কোমরে রশি-বাঁধা এক আসামীকে অতি আদর করে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে তারই প্রহরী দুই পুলিশ। দেখার মতো এক মানবিক দৃশ্য বটে, অসাধারণ। পনেরো-ষোল বছরের ছেলেটি খেতে চাচ্ছে না, মানে পারছে না; কেবলই ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠছে। আর যে-দুজন সন্তাসির হাতে সে বন্দি, তারা তার গায়ে-পিঠে স্নেহ-সানত্বনার হস্ত বুলিয়ে, সেধে সেধে তাকে মিষ্টির সঙ্গে সিঙাড়াও খাওয়াচ্ছে।
বিপন্ন বালকের বাক্সময় দুঃখ দেখে হঠাৎ মানবিক বোধে আক্রান্ত হওয়া কোর্ট-পুলিশের পক্ষেও একেবারে অসম্ভব হয়তো নয়। তবু দৃশ্যটি ঘোর অবাস্তব, অন্তত আদালতের আওতায়। এখানে খাওয়ার লোকে লোকারণ্য, কিন্তু খাওয়ানোর লোক সামান্য বরং একমাত্র মক্কেলই। এই-যে দোকানটিতে মশামাছির মত প্যানপ্যান করছে পানাহারী, তার মধ্যে সঠিক অর্থে খদ্দের কিন্তু স্বল্পই- যারা খাচ্ছে না, খালি বিল দেয়ার জন্যই বিন্দুবৎ বসে আছে, কোঁচকানো বোঁচকাটির মতো এককোণে। বাকি যারা বারোয়ারী জিয়াফতের মত শোরগোল সহকারে ফরমাশ হাঁকছে আর গপাগপ খাচ্ছে- তারা মোটামুটি মুহুরি-মোখতার, পিওন-পেশকার, টাউট-টাইপিস্ট আর বড়জোর প্রশিক্ষিত পেশাদার সাক্ষী।
মোটকথা, এই মক্কেলমেধ যজ্ঞে দয়াধর্মের অপরূপ ওই দৃশ্যটি আমাকে দারুণ আকৃষ্ট করল। ধর্মীয় নাটিকাটির সংলাপটুকুও শোনার উদ্দেশ্যে আমি তাই সেই ভিড়ের মধ্যেই এক কাপ চা চেয়ে যথাসম্ভব সেঁটে দাঁড়ালাম। চা কেন, ভাতও এখানে প্রায় দাঁড়িয়েই খেতে হয়। একটা সিঙ্গেল সাইজের সিঙ্গাড়া গোটা মুখে পুরেও ছেলেটি উদ্গত কান্না চাপতে পারছে না। কাতরোক্তিগুলি যেন সিঙ্গাড়ায় সিঁধ কেটেই বেরিয়ে আসছে :
ও বাবা গো! আমার কী অইব গো!
বালকটির বাবার বয়েসী কনস্টেবলটি স্নেহসিক্ত সান্তনার সঙ্গে কড়া-মিষ্টি একটি চমচমও এগিয়ে দিল :
নে, খা! কেঁদে কী হবে।
একটা ঢাউস ঢোক গিলে মুখের খাবারটুকু কোনোমতে সাবাড় করেই ছেলেটি আবার ডুকরে উঠলো :
ও মাগো! তোমারে বুঝি আমি আর দেখুম না। তোমার ওষুদ আনব কেডায় গো!
পানির গেলাসটি বাড়িয়ে দিয়ে অগ্রজপ্রতিম অপর পুলিশটিও আনাড়ি আসামীটিকে সহজ হবার উপদেশটিই দিলো, তবে কিঞ্চিৎ ভয়-ধরানো ঢঙে :
আর কাঁদিস না ত- আগে খাইয়া ল। খানা-যে আর কখন পাইবি, তার ঠিক আছে কিছু?
একথা শুনে পানি খাওয়া ছেড়ে দিয়ে বুকফাটা এক চাপা আর্তনাদ করে উঠল ছেলেটি :
ও বাই ও! হাজতে গেলে আমি একদিনও বাঁচুম না ও! কোনোদিন যাই নাই, মায়েরে ছাইরা কোনহানে থাকি নাই-
আহ্! কাঁন্দিস না কইলাম!
ভাই-সেপাইটি অধৈর্য হয়ে উঠেছিল। কিন্তু পরক্ষণেই আবার মাধুর্য মিশিয়ে বলল :
খা, খা, আরেকটা সিঙ্গারা খা। কপালে থাকলে কী না অয়!
চোখের পানিতে ভিজিয়ে আরেকটা সিঙ্গাড়ায় কামড় বসিয়েই বালকটি আবারও বিলাপে ভেঙ্গে পড়লো :
কেডায় আমারে জামিনে ছারাইব? আমার কাছে ত একটা ফুটা-পয়সাও নাই। বাপ নাই, বাই নাই। ব্যারাম্যা মায়ে আর নাবালিকা বইনে আমারে ক্যামনে ছারাইব? অ বাই-
আহা! তুই ও-রকম চেঁচামেচি করলে তো কোনো কাজ হবে না-
পিতা-পুলিশটি মৃদু শাসনটুকু করেই অবশ্য নিজের প্লেট থেকে একটা রসগোল্লা তুলে দিয়ে, সঙ্গে একটু আশ্বাসও দিলো বাচ্চাটিকে :
তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষর্ক। চেষ্টা করলে কী না অয়?
খাওয়া সেরেই ওরা চললো, চা-পান সেরে আমিও। এসব দোকানে ঢোকাটাই কঠিন, খাওয়া কঠিনতর, বেরিয়ে যাওয়া কঠিনতম। পয়সা দিতে এন্তার হাঁক-ডাক, সোয়াল-জোয়াব, হিসেব-নিকেশ হয়। ফলে লম্বা লাইনই লেগে যায়। তার ওপর আবার কাউন্টারে-বসা দোকানি বিশুদ্ধ বাঙালি হিসেবে তাঁর হাতের চেয়ে মুখই চলে বেশি। প্রতিটি খদ্দেরের সঙ্গে খুচরা আলাপ কিছু না কিছু চলছেই পয়সা নেবার সময়। যেমন এই মুহূর্তেই ভাই-পুলিশটির জনা-তিনেক আগের খদ্দেরটির ওপর অমর বাণী বর্ষিত হচ্ছে মুষলধারে :
আপনেরে একখান কতা কই বাইসাব, কিছু মনে কইরেন না! একে তো দিনকাল খারাপ, তার উপ্রে কোর্ট-কাচারি জায়গাটা আরো খারাপ। এই রকম বান্ডিল খুইলা লেনদেন করণ বালা না।
ভিড়ে-অনভ্যস্ত গ্রাম্য মক্কেল রুমালে বাঁধা টাকার পুঁটলিটি খুলে টেবিলে বিছিয়ে নানা রকমের মিল করে নিয়ে বিলটা দিচ্ছিলেন। তবে বাঙালি তো তিনিও, বক্তব্য তাঁরও আছে বইকি :
আর বাই কইয়েন না। সরকারে একশো টাকার নোটটা বাতিল কইরাই এই মুশকিলটা করছে। তবে টাকা-পয়সা আইজ-কাইল আর হাতে থাকেই বা কতক্ষণ। এহনই ব্যাবাকটি যাইবগা চইলা কালা-কোটের কবরে।
তারপর চললো সাধারণ মন্তব্য :
আরে, চুরিটা করবি তোরা সাত-আটজনে, আর নোট বাতিল কইরা চোর ধরণের নামে কষ্টটা পাইব গিয়া কোটি কোটি জনগণে-।
ওরা বেরিয়ে গেল। বেরুলাম আমিও। কনস্টেবল দুজন যেন বিশ্বস্ত রাখাল- রশি হাতে পশু সামলাচ্ছে। এমতাবস্থায় বন্দি বালকটির সুকুমার মুখচ্ছবি দেখে আমার ভারি মায়া হয়। দুরন্ত ছোটাছুটির বয়স, অথচ কটিতে তার কঠিন রজ্জু- বয়স্ক হাতে ধরা। বিষয়টি থেকে কিছুতেই আমি বিচ্ছিন্ন হতে পারছিলাম না।
এই-বয়েসী কচি একটি ছেলের এমন কী অপরাধ হতে পারে? হলেও সে অপরাধের কী এমন গুরুত্ব যে, তাকে এক লাফেই একেবারে জেল-হাজতে পুরে রাখার চেষ্টা করতে হবে? সেখানকার যত পোক্ত পাপীর সংস্রবে তো এর তরল চরিত্রটি বরং তাদেরই ছাঁচে জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে যাবে।
কিন্তু উপায়ই বা কী? প্রচলিত আইনের খপ্পরে পড়েছে যখন, যে-জীবনটি শুরুই হয়নি- অসৎ কানুন তার ক্যারিয়ারটিকেই চূড়ান্ত রূপ দিয়ে ছাড়বে, ক্রিমিন্যাল ক্যারিয়ার। অথচ বালকটির এখন অন্তত নবম-দশম মানের ছাত্র হওয়ার কথা, যা সে হয়ে থাকলেও ফৌজদারি কেসে দন্ড খাটার পরে তা আর থাকবে না- নামটা কাটা যাবে। বড় হতাশ লাগে।
ভালোই হল ঘটনাটি, বলা যায় দৃশ্যকাব্যটি, আমার দৃষ্টির প্রায় আড়ালে চলে গেল। ওরা হাঁটতে হাঁটতে দূরে একটা ফাঁকা জায়গায় গিয়ে বসে পড়লো, যেখানে আড়ি পাতার কোনো ছুঁতা আমার থাকতে পারে না। তবু পাশ দিয়ে যেতে দূর থেকে অঙ্গভঙ্গি দেখে বুঝলাম, সান্ত্রীদ্বয় সিগ্রেট ধরাচ্ছে এবং ক্ষুদে আসামীটিকে সেই প্রবোধ দেয়ার প্রচেষ্টাই চালাচ্ছে নিরিবিলিতে। কেননা কিশোরটিকে রোরুদ্যমানই মনে হচ্ছিল তখনো।
এদিকে, কালো-কোটের পকেটে দক্ষিণা দানের ব্যাপার একটা আমারও ছিলো। অন্যথায় যে মুশকিল-আসান উকিল সাহেবান কেসের খবরই নিতে যান না। ছিন্ন-গাউন মোক্তার প্রবরের সন্ধানে পেরেশান হয়েই অমন নিদারুণ দোকানে চা পান করতে গিয়েছিলাম। সুতরাং আমি সেই উদাসীন অ্যাডভোকেটের সন্ধানেই লিপ্ত হয়ে গেলাম আবার।
কোর্ট-প্রাঙ্গণের গোটা এলাকাটা এখন পুরোদমে সরগরম। বড় বড় কেসের দাগী আসামীর দলগুলি নিয়ে পুলিশ- ভ্যানগুলিও এসে গিয়েছে। কাছারি-পাড়ার এই দুস্থতম শ্রেণীটিও হাঁকে-ডাকে এলাকাটিকে উচ্ছল করে রাখে। রক্ষী-সেপাই সহকারে বিচরণ করে প্রাঙ্গণময়, পান-বিড়ি খায়, ক্ষণেকের স্বাধীনতার জন্যে পেশাব করতে যায়। চলনে-বলনে অশান্তি-আশঙ্কার লেশমাত্র নেই। মানুষ নাকি নিতান্ত বাধ্য হয়েই আদালতে আসে। কিন্তু চতুর্দিকের দৃশ্যাবলীতে আমি এমন একটা মুখর ভাব দেখছি যাতে আর্তির চেয়ে ফুর্তির ছাপই যেন বেশি।
তবে সব কিছু ছাপিয়ে যে-দৃশ্যটি একটি প্রশ্নবোধক হয়ে বড়শির মত গেঁথে থাকে মনে- সে ওই আসামীগুলির হাতকড়া লাগানো হাত, ফাঁস লাগানো কোমর, আর সংলগ্ন কড়াপাকের রশিটি, যেটি ধৃত থাকে রাষ্ট্রীয় রাখালদের বিশ্বস্ত হস্তে (!)। এমন শৃঙ্খলিত অবস্থায়ও আসামীদের মুক্তির দৌড় ওই নিকটবর্তী নর্দমা পর্যন্তই, সে-সীমিত মুক্তি তারা সঘন উদ্যাপন করে প্রাকৃতিক প্রয়োজনের পৌনঃপুনিক দোহাই পেড়ে।
মনুষ্য কর্তৃক মনুষ্য চরানোর এই সব দৃশ্য দেখে, মনের ভিতর আমি নিরন্তর অস্বস্তিকর প্রশ্নধ্বনি শুনি! কে কার হাতে কড়া পরায়? কেন? কোন্ ক্ষমতায়? কার কোমরে কে রশি লাগায়? কেন? কোন্ অধিকারে? এর মধ্যে কি কোনো প্রতিকার আছে? রোগ-নিদান হয়েছে কী? উৎস জানা গিয়েছে তো? নিদেনপক্ষে, কে অপরাধী আর কে নিরপরাধ- সেটুকু তো নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা হয়ে গিয়েছে নিশ্চয়। না কি, সব ঘটনাক্রমেরই ব্যাপার? ব্যাপারটা কিন্তু তাই বলেই আমার ঘোরতর সন্দেহ। নতুবা এই কাছারি-পাড়ার কারবারীদের মধ্যে নিরপরাধ মানুষ পাওয়াই তো দায়। মারাত্মক অপরাধ সর্বদা সবাই করেই চলেছে নানাভাবে, নানা মাত্রায়- যদিও ঘটনাক্রমে অনেকেই অনেকের ভাগ্যবিধাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ। তৃতীয় নয়নে দর্শন মাত্রই ধরা পড়ে যাবে যে আমাদের তাবৎ প্রাতিষ্ঠানিক তৎপরতাই বস্তুত এমনি যত প্রহসনই, অন্য কিছু নয়।
হঠাৎ ওই নর্দমার পুলিনবিহারী জনৈক ছাপ পড়ে যাওয়া পেশাদার আসামীর ওপর নজর পড়তেই, সেই নাক-কাঁদুনে অ্যামেচার আসামীটির কথা আমার আবার মনে পড়ে গেল। আজ থেকে কয়েক বছর পর, সেও এরই মত নরকের কীট হয়ে যাবে এবং এক হাতে কড়া পরে, আরেক হাতে রশি ধরে, হেসে হেসে যেতে থাকবে ওই মূত্রবাহী নর্দমার ধারে- যে-নর্দমা ততদিনে তারও হবে পয়সা দিয়ে কেনা ক্ষণিকের স্বাধীনতার সাধারণ সীমা।
ইতোমধ্যে আদালতের জনবহুল অঙ্গনে আরেক অভিনব পেশাদারের আবির্ভাব হয়েছে। এক শিশু-সাগরেদসহ জনৈক অন্ধ মিসকিন একখানি ব্রেইলি টাইপের কোরানশরীফ নিয়ে, মধ্যমাঠে ফরাস বিছিয়ে বসে পড়েছে। এবং কোরানখানি খুলে উঁচু বুটিদার হরফের ওপর আঙুল বুলিয়ে, শুধু স্পর্শের সাহায্যেই তেলাওয়াত শুরু করে দিয়েছে চড়া গলায়। সুরেলা কণ্ঠের মধুর কিরাতে অল্পক্ষণে বহু লোকও জুটে গেল চোখের সামনে। এবং অনেকে অতি কৌতূহলে, অজুর প্রসঙ্গ ভুলে গিয়ে ঝুঁকে পড়ে কাঁটা-করা মসীবিহীন হরফগুলি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতেও শুরু করে দিলো। অদৃশ্য অক্ষরগুলি ছুঁয়ে দেখা এবং পাঠকের দক্ষতা পরীক্ষা করে মোহিত-বিস্মিত হওয়া- এই ডবল পুলকের ঠেলায় অন্ধ কারীকে ঘিরে রীতিমত ঠেলাঠেলির সৃষ্টি হয়ে গেল দেখতে দেখতে।
হঠাৎ লক্ষ করলাম সেই পুলিশ দুজনও ভিড়ের পেছনে এসে ভিড়ে গেল। হাতে তাদের সেই কোমর-বাঁধা বালকটি এখনো ধরা আছে। চারপাশে ঘুরে ঘুরে যেন কোনো ফাঁক দিয়ে ঠিক যুৎ করে দেখার সুযোগ পাচ্ছে না। অতঃপর তারা আমার পাশ ঘেঁষেই একটুখানি মাথা গলানোর চেষ্টায় লিপ্ত হল। আমার আর দেখার কিছু না থাকায় আমি ভিড় ছেড়ে দূরে এসে একান্তে সরে দাঁড়ালাম।
ঠিক তখ্খুনি আমার চোখের ওপরেই ঘটে গেল বিস্ময়কর ঘটনাটি। ভাই-সেপাইটি চোখের ইশারায় আসামীটির দৃষ্টি আকর্ষণ করলো পাশের লোকটির প্রতি। বেশবাসে মোটামুটি সম্পন্ন-ভাবাপন্ন ভদ্রলোকটি ভিড়ের মধ্যে মাথা গলিয়ে দিয়ে তামাশা দেখায় মশগুল। বালকটিকে প্রথমটায় যেন একটু দ্বিধাগ্রস্ত দেখা গেল। কিন্তু পরক্ষণেই নিপুণ হাতে লোকটির পকেট কেটে নিয়ে, চোখের ভাষায় পিতা-পুলিশটিকে কর্তব্য-সমাপনের বার্তাটিও জানিয়ে দিলো।
সঙ্গে সঙ্গে তারা এমনভাবে খসে পড়লো যেন তামাশায় আর মজাই পাচ্ছে না। অতঃপর ব্যস্তসমস্তভাবে গেট পেরিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট-কোর্টের দিকে চলে গেল। হয়তো ছেলেটির কেসটি এখনি এজলাসে উঠবে। নয়তো এই অভিনব পকেট-শিকারটুকু ছাড়া বাকি সবটুকুই বানোয়াট।
অধিকতর দুঃখের ব্যাপারটি ছিল- কিছুক্ষণ পর কর্তিত পকেটের মালিকটি যখন টের পেল, তখন সে তার হারানো টাকা পয়সা কিংবা রসিদ-পত্রের জন্য ততটা আফসোস করলো না, যতটা আক্ষেপ করলো খোয়া যাওয়া একটা তাবিজের জন্য- যেটা বেচারা তার রুগ্ণ ছেলের জন্য এই আদালতের সব-পেয়েছির-দেশ থেকেই সংগ্রহ করেছিল এবং কিছুক্ষণ আগে একটা রূপোর আধারেও পুরে নিয়েছিল। ভাগ্য-বিড়ম্বিত বেচারিকে এতক্ষণে চিনতে পারলাম- চায়ের দোকানে সেই টাকার বান্ডিল খুলে লেনদেন-করা এবং দোকানদারের ওয়াজ শোনা লোকটাই।
আমি আসলে একেবারেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিলাম। কেননা, জনপ্রিয় ম্যাজিকধর্মী, এই চিরন্তনী চৌর্যবৃত্তিটির অজ্ঞান শিকারও আমি কখনো হইনি, সুতরাং সজ্ঞান দর্শনে তো অভিভূত হবারই কথা। কিন্তু বিমূঢ় ভাবটি কেটে গেলেই মানবিক কর্তব্য পালন না-করার গ্লানি আমার সমগ্র চেতনায় চারিয়ে গেল। অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে-ইত্যাদি আপ্ত বাক্যের আনাগোনায় মনটা আমার ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। শেষে ভিন্নতর বিশ্লে¬ষণের আড়াল নিয়ে বিবেককে এই বলে বুঝিয়ে দিলাম যে- ধৃত আসামীটিকে ধরিয়ে দিতে পারতাম বটে, কিন্তু ধারক-আসামীদের? তাছাড়া ছিল এজাহার-সাক্ষ্যের বখেড়া, ছিলো নয়া মামলার ঝামেলা। অভাবের মতো পাপ নিজের ঘরে পুষে, অপরের অপরাধ ঠেঙানো কোন্ ন্যায়টার প্রতিষ্ঠার জন্য? সংশ্লি¬ষ্ট বাকি সব অন্যায়ের প্রতিকার হয়ে গেছে কী? বিমারের উৎসে কুঠার না হেনে, ঝাড়-ফুঁক থেকে তুকতাক সবই কি সমান বেকার নয়?
শেষবেলা কাছারির কাজ সেরে গেট দিয়ে বেরুবার মুখে দেখি- সেই অপোগন্ড আসামীটি মুক্ত বিহঙ্গের মত শিস বাজিয়ে তার মুক্তি উদযাপন করতে করতে আমার পাশে-পাশেই হেঁটে চলেছে মনের হরষে। ছেলেটির সঙ্গে আলাপ করার কৌতূহল নিবারণ করতে পারলাম না। প্রথমে অবশ্য পকেট দুটোই সামলালাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম :
কী রে জামিন হয়ে গেল তোর?
হ সাব, অইল ত!
তোর তো কেউ নেই। কে হল জামিন?
পয়সা অইলে হক্কলটিই অয়। কেইস-অই যাইব গা।
এখন তো মায়ের ওষুধ নিতে আর অসুবিধা হবে না- তাই না?
ওষুদ? ট্যাহা পামু কই সাব? হালার পুতেরা তো পকেটটারে এক্কেরে খালি কইরাই লইয়া গেছে- একবার জামিন-জামিন কইরা, আরেকবার কিয়ের জানি ফাইন্নাল রিপোর্টের নাম কইরা-
বলতে বলতে হঠাৎ কী-জানি-কী মনে করে অতি-পুলকিত কণ্ঠেই বলে উঠলো বালকটি :
তবে ওষুদ আর কোন্ কামে লাগে সাব, মার লাইগা আইজ এমন এক জিনিস লইয়া যাইতাছি-
আচমকা আবার বিলকুল চুপ মেরে গেল মুখর কিশোর। সারাদিনের শঙ্কা আর পরাধীনতার অন্তে আত্মহারা ছোকরা হেলাফেলা মেজাজে কথা বলতে বলতে হঠাৎ বোধ হয় সংবিৎ ফিরে পেল এবং আমাকেই পাল্টা প্রশ্ন করে বসলো :
আইচ্ছা, আপনে আমার এত কথা ক্যামনে জানেন সাব? আমার মায়ের অসুখের কতা?
সন্দিহান ছেলেটির এই হঠাৎ-গম্ভীর প্রশ্নে থতমত খেয়ে আমি শুধু বললাম :
আমি অনেক কিছুই জানি।
মুহূর্তে ছেলেটির ফুর্তিবাজ পা-দুখানি থেমে গেল, স্থির হয়ে গেল চটুল চাহনি এবং এক জোড়া ভীরু চোখ তুলে সে আমার দিকে বোকার মতই তাকিয়ে রইলো। ইচ্ছে হল, ইঁচড়েপাকা ছেলেটিকে দিই নসিহতের বানে ভাসিয়ে। নষ্ট ছোকরাটি হয়তো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ওয়াজই শোনেনি কোনোদিন। পর মুহূর্তেই আবার নিজের মূঢ়তায় লজ্জা পেলাম। একটা পাপেটকে শিক্ষা দিয়ে কী হবে, পাপেটিয়ারকে বাদ দিয়ে? তা ছাড়া, সৎকথা শুনে এই শয়তানটা যদি হঠাৎ এই মুহূর্তেই সাধু হয়ে যায়, তবে তো পয়লা আমারই মাথার ব্যথা হবে। বলবে- পাঁচ টাকা দিন, ভাত কিনবো; দশ টাকা দিন, চাল কিনবো; পনেরো টাকা দিন, ওষুধ কিনবো- কিংবা চার-শো টাকা দিন, চাকাওয়ালা দোকানই কিনবো।
অতঃপর, একটি অঘোষিত যুদ্ধে পর্যুদস্ত হয়ে, পরাভূত দৃষ্টি নামিয়ে, সন্তানসম শিশুটির সঙ্গে আমি সন্ধি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েই নিবেদন করলাম :
চা-দোকানে সকাল বেলা তুই নিজেই তো সব বলেছিলি কাঁদতে কাঁদতে।
মুহূর্তে নিশ্চিন্ত হয়ে গিয়ে ছেলেটি নিশ্চয় মোটামুটি মিত্রই ধরে নিলো আমাকে। এবং শিশুসুলভ সরলতার সঙ্গে এক আজব প্রশ্নই করে বসলো :
আচ্ছা সাব, একজনের তাবিজ আরেকজনের কামে লাগে না?
বোঝা গেল, পকেট-কাটা বিত্তের মধ্যে বালকটির ভাগে ওই তাবিজটিই শুধু পড়ে থাকবে। তাই তার কিশোর কল্পনায় হয়তো ওটাই একটা মহা কিছু হয়ে ফিরে ফিরে আসছে। বুঝিবা বেচারা ভাবতেও চাইছে যে তার মায়ের অসুখ সারানোর জন্যে ওটাই উত্তম ওষুধের চেয়েও মোক্ষম হবে। অসার আশাকে আমি সর্বদাই অঙ্কুরে বিনষ্ট করার পক্ষপাতী, যেহেতু ওটাকে বাঁচতে দেয়ার মানে আশাভঙ্গের কষ্টটাকেই লালন পালন করে বাড়িয়ে তোলা। অতএব, আমি তার কুহকিনী আশাকে হেসেই উড়িয়ে দিতে চাইলাম :
দুঃ পাগল! তাবিজ তো মানুষের নামের ওপরে হয়। এক জনের তাবিজ আরেক জনের বরং ক্ষতিই করে ফেলতে পারে।
উচ্ছল বালকটি মুহূর্তে বৃদ্ধের মত শীতল হয়ে গেল। বেরসিক বাস্তব যেন এই তাবিজের সূত্র ধরেই অতঃপর ছেলেটির মগজে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে। এবং তারপর যতসব কঠিন সমস্যার কণ্টক বেচারির অনেকক্ষণের অর্ধচেতন মনটিকেও বিদ্ধ করতে আরম্ভ করে দিয়েছে। অনন্তর বিভ্রান্ত কিশোর অস্ফুটে শুধু একটি শব্দই উচ্চারণ করতে পারলো, তাও নিরর্থক :
তয়?
জানতে চাইলাম :
কী?
সঙ্গে সঙ্গে ফের সপ্রতিভ হয়ে উঠলো সে এবং বললো :
কিছছুনা সাব। ভাবতাছিলাম তয় তো ওষুদ নেওনই লাগবো, অন্তত তিনটা পুরিয়া। রাইতে-যে মায়ের ব্যথা ওডে!
সহসা বালকটির বুকের গভীর থেকে এবার যেন এক পোড়-খাওয়া পূর্ণবয়স্ক পুরুষই গর্জে উঠলো :
দুশ শালা! খালি কি মায়ের ওষুদ? বইনের ভাত লাগব না?
এরপরই অশ্রুতপূর্ব কণ্ঠে আমার কাছে সময় জানতে চাইলো যে-মানুষটি, তাকে যেন আমি এর আগে আর কখনো দেখিনি কিংবা শুনিনি।
অহন কয়টা বাজে সাব?
সাড়ে পাঁচটা।
সময় শুনে ছেলেটির শিরদাঁড়া যেন শির শির শব্দে চিড় খেয়ে সোজা হয়ে গেল। অতঃপর সিনা টান করে চিতার মতো গা ঝাড়া দিয়ে একটি স্বগতোক্তি করলো, সশব্দ :
হালার খেইলটাঅ ভাইঙ্গা গ্যাছে না ত!
চোখের পলকে সদ্যোজাত চিতাবাঘটি কেশর ফুলিয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে রাজপথ অতিক্রম করে জীবিকার শিকারে যেন ঝাঁপিয়ে পড়লো- বস্তুত হন হন করে হেঁটে রাস্তার ওপারের আজাদ সিনেমার অলিন্দে অনুপ্রবেশ করলো।
এদিকে আমিও একটি সঙ্গী-সমৃদ্ধ আধা দামের রিকশা পাবার আশায় পা পা হাঁটতে হাঁটতে একসময় আবিষ্কার করলাম- তরুণটি বোনের ভাত আর মায়ের ওষুধের প্রয়োজনে সিনেমাহলের গেটে গেরিলার মত ওৎ পেতে আছে। নির্নিমেষ দৃষ্টি তার ঢাকাই ফিলিমের আফিমাচ্ছন্ন সিনেমাহলের ভেতর থেকে উদীয়মান- উদাসীন সমাজটির প্রতি তাক-করা।