ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

সাহিত্যিক ও সাংবাদিক একই পাড়ার বাসিন্দা। দেশে এবং বিদেশে সেকাল থেকে একাল পর্যন্ত তাঁদের অনেকেই দুজনের কাজই করেন। যেমন দেশের সংবাদ প্রভাকর পত্রিকার সম্পাদক কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, বীণা পত্রিকার সম্পাদক নাট্যকার রাজকৃষ্ণ রায়, নবযুগ ধূমকেতু ইত্যাদি পত্রিকার সম্পাদক কবি কাজী নজরুল ইসলাম, প্রবন্ধকার সজনীকান্ত দাস, সমালোচক নীরদচন্দ্র চৌধুরী, গল্পকার সুবোধ ঘোষ, ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ, ঔপন্যাসিক সন্তোষকুমার ঘোষ, কথাসাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, কবি শামসুর রাহমান, ছোটগল্পকার আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, কবি আল মাহমুদ থেকে গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ, কবি জয় গোস্বামী, ঔপন্যাসিক আনিসুল হক প্রমুখ। বিদেশের ড্যানিয়েল ডেফো, রিচার্ড স্টিল, জোসেফ অ্যাডিসন, চার্লস ল্যাম, উইলিয়াম হ্যাজলিট, শার্ল স্যাঁৎ-বভ্, মার্ক টোয়েন, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে থেকে ট্রুম্যান ক্যাপোট, নরম্যান মেইলার, হান্টার এস. টমসন, টম উল্ফ প্রমুখ।

এ ছাড়াও লিটারেটর এবং জার্নালিস্টের মধ্যে মেশামেশি এত বেশি যে হালে এঁদের সংজ্ঞা-বিভ্রান্তিরই সৃষ্টি হয়েছে- বিশেষত জার্নালিস্টের। প্রশ্ন উঠেছে : ইনি কতখানি সাংবাদিক থাকবেন এবং কতখানি সাহিত্যিক সাজবেন। প্রশ্নটা তখন থেকেই ক্রমে ক্রমে রূপ পরিগ্রহ করেছে যখন থেকে ধাপে ধাপে বিভিন্ন অভিধায় পরিবর্তিত হয়ে চলেছে নিউ জার্নালিজম- যেমন লিটারারি জার্নালিজম বা সাহিত্যিক সাংবাদিকতা এবং ক্রিয়েটিভ জার্নালিজম বা সৃজনশীল সাংবাদিকতা ইত্যাদি।

শেষোক্তটা তো সোনার পাথরবাটির মতোই শোনায়। যিনি ঘটনা শোনান, তাঁর ওপর বর্তানো হচ্ছে ঘটনা বানানোর দায়িত্ব। ঘটনার বাহককে কল্পনার কারক হবার প্রত্যাশা এমনি এমনি জাগছে না শ্রোতা-পাঠকের মনে। জাগাচ্ছেন সাংবাদিক নিজেই। অদূরঅতীতে তিনি ভেবে দেখলেন যে বার্তা কেবল বহনীয়ই নয়, বর্ণনীয়ও বটে। এভাবে বার্তা-বহনকারীর সংবাদ-বর্ণনাকারীতে উত্তীর্ণ হওয়ার প্রক্রিয়ায় মঞ্চে আবির্ভূত হলেন একজন আমি, অর্থাৎ একজন বক্তা। সংবাদ হয়ে গেল অনেকটা, অমিয় সেনের পরিভাষায়, বক্তাসাপেক্ষ, অর্থাৎ সাবজেক্টিভ। খবর আর অবিমিশ্র অবজেক্টিভ বা বক্তানিরপেক্ষ রইল না।

তবে এও লক্ষণীয় যে সংবাদে বক্তানিরপেক্ষতার চাহিদাটাও মিডিয়ারই জোগান দেওয়া। বার্তার পরিবেশনে কিংবা বিতরণে মিডিয়ার মাধ্যম হওয়ার পূর্বের কালে বক্তানিরপেক্ষ হওয়া সম্ভবই ছিল না সাংবাদিকের। কারণ শ্রোতাকে বার্তা শুনতে হত বাহকের মুখ থেকে সরাসরি, মানে মুখোমুখি অবস্থানে- যাকে বলে “straight from the horse’s mouth। ধরুন আপনি খ্রিস্টপূর্ব ৪৯০ সালের গ্রিসের এথেন্সের বাসিন্দা। অধীর অপেক্ষায় আপনার উদ্বেগ বেড়ে চলেছে গ্রিসের বিরুদ্ধে পারস্যের আক্রমণাত্মক যুদ্ধের শেষ খবরটি জানার জন্য। একসময় ৩২ কিলোমিটার দূরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র ম্যারাথন থেকে বার্তাবাহক দৌড়ে এসে খবর দিলেন যে যুদ্ধে গ্রিস বিজয়ী হয়েছে পারস্যের বিরুদ্ধে।

কয়েকটি নগর-রাজ্য সমন্বয়ে গঠিত গ্রিসের মতো ক্ষুদ্র একটি রাষ্ট্রের কাছে পার্সিপোলিসের প্রতিষ্ঠাতা বিশাল পারস্য সাম্ররাজ্যের মহাপরাক্রমশালী সম্ররাট প্রথম দারিয়ুসের শোচনীয় পরাজয়ের রোমাঞ্চকর সংবাদটি উদ্বেগাকুল দেশবাসীদের শোনানোর সময় খবরটির সঙ্গে, ২০ মাইল রুদ্ধশ্বাসে দৌড়ে আসা, সাংবাদিকটির আমি কতখানি যুক্ত হয়েছিল ভেবে দেখুন। বক্তানিরপেক্ষ বা অবজেক্টিভ হওয়া সম্ভবই ছিল না তাঁর পক্ষে। বস্তুত মাধ্যমপূর্ব যুগে, অর্থাৎ সাক্ষাতে খবর বলা ও শোনার কালে তা সম্ভব ছিলই না বলতে গেলে।

তাহলে প্রথমে দেখা যাক কোন স্থানে সাহিত্যিক ও সাংবাদিকের সাক্ষাৎ ঘটে আর কোন স্থানে একে অপর থেকে বিদায় নেন তাঁরা। ধরুন আপনি একটা দুঃসাহসী উদ্ধার-অভিযান বা একটা গুরুত্বপূর্ণ ক্রীড়ানুষ্ঠান দেখলেন। দেখামাত্রই কেউ আপনাকে এই প্রত্যক্ষদর্শনের বর্ণনা দিতে বললেন। এখন আপনি কি আপনার দেখা ঘটনাটার সাংবাদিক বর্ণনা দেবেন? না কি সাহিত্যিক বর্ণনা দেবেন? আপনার স্টোরিটি কি রিপোর্ট হবে? না কি রচনা হবে? উত্তরটা নির্ভর করবে আপনার উপস্থাপন-রীতির ওপর।

আপনি যদি প্রধানত কে-কী-কখন-কোথায়-কেন-কীভাবে-র কথা বলেন, অর্থাৎ যদি জন-স্থান-ঘটনার নিতান্ত তথ্যভিত্তিক সংবাদ দেন- সকলে এটাকে সাংবাদিকতা বলবেন। কারণ জার্নালিজম মূলত সময়মতো সত্যনিষ্ঠ ও কার্যকর তথ্য দানের চেষ্টা করে। শিল্পটি ধ্বনি এবং চিত্র ব্যবহার করে বটে, তবে এর প্রধান বাহন হল ভাষা। অপর পক্ষে আপনার স্টোরিটি যদি হয় ঘটনাটার সঙ্গে বিজড়িত আবেগেরও পুনরুদ্ধারকারী, আপনি যদি ধ্বনির সৃজনশীল এবং ভাষার আলংকারিক ব্যবহার করে থাকেন, আপনার উদ্দেশ্য যদি হয় শ্রোতা-দর্শকদের ভাবাকুল সাড়া পাওয়া, আপনি যদি ঘটিত বিষয়টির অধিকতর প্রভাব সৃষ্টিকারী গভীরতর অর্থ বা তাৎপর্য আবিষ্কার করে থাকেন- এটাকে লোকে বলবে সাহিত্য অথবা রচনা। কারণ সাহিত্য তার শ্রোতা এবং পাঠককে আলোকিত কিংবা আলোড়িত করতে চায়- ঘটনাকে ভাষার প্রসাদগুণ ও কল্পনার রঙে রাঙিয়ে।
মূলে ভিন্ন হলেও এবং উপরে কিছু তারতম্য তুলে ধরা হলেও- জার্নালিজম এবং লিটারেচারের পার্থক্যটা সর্বদা স্পষ্ট নয়। কারণ তাদের সাদৃশ্য অনেক। থাকবে না-ই বা কেন, সাংবাদিক এবং সাহিত্যিক দুজনেই মানবিক অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেন ভাষার মাধ্যমেই। আগের কালে জার্নালিজমকে বলা হতো “Òhistory in hurry” আর একালে নিউ জার্নালিজমকে বলা হয় Òliterature in hurry শব্দবন্ধটির অর্থ হল সংবাদ-প্রতিবেদক যে-ঘটনাগুলোকে প্রত্যক্ষে রেকর্ড করে থাকেন- সেগুলো পরোক্ষে মানুষের জগজ্জীবনের গল্পই বলে।

অনুরূপভাবে সাহিত্যও কেবল কালপর্ববিশেষের ঘটনাবলির কথাই বলে না, যুগটির মানুষগুলির মন-মানসিকতা ও পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার কথাও বলে। এডগার অ্যালান পো যেমন কবিতায় মৌলিকতার মূল্য যোগ করার আবশ্যিকতার কথা বলেন, তাঁর মানের কেউ মৌলিকতার তেমন অপরিহার্য মূল্যযোজনের কথাটা সাংবাদিকতার ব্যাপারেও বলতে পারেন। তেমন মৌলিকতার কারণেই মানুষের কুকুর কামড়ানো সংবাদ হয়, কুকুরের মানুষ কামড়ানো সংবাদ হয় না। পাদটীকাটি হল : অন্তিম বিচারে সাংবাদিক এবং সাহিত্যিক দুজনেই তাঁদের শ্রোতৃম-লীকে আলোড়িত এবং পরিবর্তিত করতে চান।

বলা হয় সাংবাদিকের কাজ হল to raise hell অর্থাৎ হল্লার সৃষ্টি করা। সত্য। সে অর্থে সেটা তো সাহিত্যিকও করে থাকেন। যেমন হ্যারিয়েট বিচার স্টোর আংকেল টমস কেবিনও তো ঘৃণ্য দাসপ্রথা ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে হল্লারই সৃষ্টি করেছে, মানে“raised hel।“ জোনাথন সুইফটও তো তাঁর “Tale of a Tub”, “Gulliver’s Travels“ ইত্যাদিতে তথাকথিত আলোকিত মানুষের মূঢ়তাকে কার্যকররূপে এঁকে “raised“ ভয়ংকর “hell“ । বলতে চাচ্ছি যে এ ব্যাপারেও সাংবাদিক এবং সাহিত্যিক দুজনেই একই নৌকার যাত্রী।

বস্তুত এজন্যেই আমার মতে জার্নালিজমকে একটা লিটারারি জঁর অর্থাৎ সাংবাদিকতাকে একটা সাহিত্যিক সংরূপ বলে মানতেই হয়। এ কারণেই আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ফ্যাক্ট-রিপোর্টিং থেকে ফিকশন-রাইটিং-এ উত্তরণ ঘটতে পেরেছে এমন স্বাভাবিকভাবে। তেমনি নিউ জার্নালিজমকেও পার্সনাল এসে বা ব্যক্তিগত রচনার একটা নতুন সংরূপ গণ্য করা যায়, যেমনটি রবার্ট অ্যাটওয়ান বলেছেন দি বেস্ট অ্যামেরিক্যান এসেজ (১৯৮৭)-শীর্ষক সংকলনটির সম্পাদকীয়তে। সংকলনটিতে দৃষ্টান্ত সহকারে এটাও দেখানো হয়েছে যে একালের মার্কিন সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ গদ্য সাংবাদিকগণই লিখছেন বেশি।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর দশকটি থেকে হেমিংওয়ের মতো স্বাভাবিকভাবেই ফ্যাক্ট-রিপোর্টার তাঁর চিরাচরিত সাংবাদিক ধরনটি ছেড়ে ননফিকশান সাহিত্যিক হয়ে চলেছিলেন। অবশেষে সত্তরের দশকে এসে নিউ জার্নালিস্ট-নামে পুনর্জন্মই লাভ করেছেন তিনি, অন্য পরিভাষায় যাঁকে বেল-লেট্রিস্ট কিংবা সুকুমার গদ্যকারও ভাবা যায়। তাই বলে এঁকে ক্রিয়েটিভ জার্নালিস্ট কিংবা সৃজনশীল সাংবাদিক নামে অভিহিত করাটা, হাস্যাস্পদ শুধু নয়, পেশাগত বিচারে স্ববিরোধীই শোনাবে। অতএব এঁদের নিউ জার্নালিস্ট কিংবা নবসাংবাদিক বলাটাই সংগত হবে। কিন্তু নিউ কদিনই বা নিউ থাকবে। তাই আমার মতে এঁদের জন্য লিটারারি জার্নালিস্ট কিংবা সাহিত্যিক সাংবাদিক অভিধাটাই সংগততর হবে। দেশে বিদেশে বর্তমানে যা চলছে তা সাহিত্যিক সাংবাদিকতাই- বা তারই সার্থক চেষ্টা।

এখন দেখতে হবে নবসাংবাদিকের সাংবাদিকতা কোথায় শেষ হয় আর সাহিত্যিকতাই বা কোথা থেকে শুরু হয়। ঘটনার সঙ্গে কল্পনা মেশাতে গেলে নৈর্ব্যক্তিকতার সঙ্গে ব্যক্তিকতার সংঘাত কি বাধে না? বাধলে আপস হয় কী ভাবে? আসলে নবসাংবাদিকতা চেনা সহজ হলেও চেনানোটা সহজ নয়। তবু চেনানোর জন্য অন্তত দুটি সূত্রের উল্লেখ করা যায়।

প্রথম সূত্রটি হল- নিউ জার্নালিজম ওল্ড জার্নালিজমের চেয়ে অনেক দিকেই বেশি কিছু দিয়ে থাকে। ঘটনা, বিষয় এবং সংশ্লিষ্ট লোকজনের মধ্যেকার যাবতীয় জটিলতা খতিয়ে দেখে থাকে এ সাংবাদিকতা। তাই পাঠককে নবসাংবাদিক ঘটনাস্থলের দূরসম্পর্কিত এমন এমন স্থানসমূহে নিয়ে যাবে এবং ঘটনাটার এত এত ডালপালার কাহিনি শোনাবে- পাঠক যেসব স্বপ্নেও দেখতেন না এবং শুনতেন না।

এ-সাংবাদিকতা নৈমিত্তিক সাংবাদিকতার চেয়ে ঢের বেশি গবেষিত এবং ভালো লিখিত। যেমন একটি মৃত্যুর ঘটনায় প্রাত্যহিক সাংবাদিক লিখবে লাশটি একটি সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আছে, এখনো নামানো হয়নি। বেশি কিছু লিখতে ভয় পাবে, প্রথমত তার সম্পাদককে। ভয়টা বাংলা পত্রিকার নিরেট তথ্য ভাই নিরেট তথ্য আর ইংরেজি পত্রিকার হার্ড ফ্যাক্ট বয়, হার্ড ফ্যাক্ট মার্কা আশঙ্কিত সেন্সারের ভয়।

প্রতিপক্ষে সাহিত্যিক সাংবাদিক প্রথমতই লাশটার সুরতহালসহ পুরো অকুস্থলটির তাৎক্ষণিক একটা ছাপ অংকন করে দেবেন তাঁর পাঠকের মনে। এরপর স্থানটির বাসিন্দাদের ঘটনার অব্যবহিত পরবর্তী দেহভাষাকে সাহিত্যের ভাষায় লিখে নেবেন কাগজে বা ইলেকট্রনিক নোটবুকে। ভেবে বিরত হবেন না যে এসব কাজ থানার বা গোয়েন্দার, বা এসব কাজে অহেতুক হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা আছে। অতএব খাল কেটে কুমীর ডেকে আনার কী দরকার তাঁর?

সাহিত্যিক সাংবাদিক আবেগের অতল গহনে অবতরণে পরান্মুখ হবেন না কখনো, যেদিকে তাকানো এড়ানোতেই ব্যস্ত থাকেন নৈমিত্তিক সাংবাদিক সর্বদা। অথচ এমনি সর্বান্তকরণে জড়িয়ে পড়ার কারণেই কিন্তু সাহিত্যিক সাংবাদিক পাঠকের অন্তরের সঙ্গে গভীরতর সম্পর্ক স্থাপনে সক্ষম হন। এ সাংবাদিকতার একটা ভালো নমুনা একটি ভালো নভেলের মতোই পাঠকের মনে গেঁথে থাকে। এজরা পাউন্ডের রচনাংশের ভাব-বিস্তার করে বলা যায়- “ Literary journalism is news that stays news“

নবসাংবাদিককে বোঝার দ্বিতীয় সূত্রটি বস্তুত বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণের মতোই। তা হল- নবসাংবাদিকতার বেশ কিছু দিকই কণ্টকাকীর্ণ। কাঁটাগুলি ছড়ানো থাকে সংবাদ-লেখক এবং সংবাদ-পাঠক দুজনেরই পথে পথে। সাহিত্যিক সাংবাদিকের সংবাদ পাঠকের একাধিক সমস্যার একটি হল- ফিকশানের মতো করে লেখা নিউজটি পড়ে তিনি কী করে নিশ্চিত হবেন রিপোর্টটি কতখানি সত্য। তেমনি সে সংবাদটি লেখার সময় সাংবাদিকের একটি সমস্যা হল- বাস্তবকে বাস্তবতর করার লোভ সামলানো।

বাস্তবজীবন সুন্দরের পাশাপাশি বিশৃঙ্খল, অপরিচ্ছন্ন, বিষণœ এবং কদর্যও। সে-জীবনটি একাঙ্ক কি তিন অঙ্ক কি পাঁচ অঙ্ক নাটকের কাঠামে ফিট করে না। অথচ সাহিত্যিক সাংবাদিক একদিকে প্রকাশ করতে চাচ্ছেন একজন মানুষের জীবনে কিংবা একটি নগরের জীবনে কিংবা একটি বিতর্কিত বিষয়ের ভিতরে কী কী ঘটে চলেছে। আরেকদিকে এসব দিয়ে তিনি একটি নিউজ স্টোরি তৈরি করতে চাচ্ছেন এমনভাবে যা পাঠককে আকৃষ্ট করবে এবং আকর্ষণটুকু ধরেও রাখবে। আকর্ষণ করার কাজটা রিপোর্টাজ কিংবা তথ্যকাহিনি করতে পারবে। কিন্তু আকর্ষণটুকু ধরে রাখার কাজে সাহিত্যের সহায়তা লাগবে। লিটারারি জার্নালিজমের কাজটা আখেরে তাহলে ঘটনার মূল্যসংযোজিত বর্ণনা। বস্তুত সাংবাদিকতার ভিতরে সন্নিবেশিত সাহিত্যই মূল্যটুকু সংযোজন করে।

তবু জার্নালিজমের সারবস্তুটুকু নিউজ-রিপোর্টিং, জার্নাল-রাইটিং নয়। উচ্চমানের সাংবাদিকতার জন্য চাই নিদর্শন-প্রমাণাদির প্রতি মোহমুক্ত, সশ্রদ্ধ এবং নিষ্পলক দৃষ্টি। কারণ নবসাংবাদিককেও শেষ পর্যন্ত ফ্যাক্টই লিখতে হবে। ফিকশানকে কাজে লাগাতে হলে তা করতে হবে ফ্যাক্টের সঙ্গে তার অস্পষ্ট ভেদরেখাটির অতন্দ্র প্রহরায় ছেদ না দিয়েই। সতর্কবাণীটি উচ্চারণ করেছেন রয় পিটার ক্লার্ক, ২০০২ সালের ২৪ জানুয়ারির পয়েন্টার অনলাইন-এ ।

নৈমিত্তিক সাংবাদিকতার সাহিত্যিক সাংবাদিকতায় বিবর্তনের পটভূমিটুকু কিন্তু খুবই মজার। নিউ জার্নালিজমের অগ্রগণ্য একজন বিষয়বস্তু বিশেষজ্ঞ টম উল্ফের কথাই ধরা যাক। তাঁদের দলটিই প্রথম লক্ষ করেছিলেন যে সাহিত্যিকতা ও সাংবাদিকতার মধ্যবর্তী বিভেদরেখাটি নিতান্তই অস্পষ্ট। অর্থাৎ বিভাগ দুটির মধ্যে অলক্ষিত যাতায়াত সম্ভব এবং বেশ লাভজনকও।

সাংবাদিকতায় ঢুকেই উল্ফ দেখলেন যে রিপোর্টারের পেশাটিতে প্রতিযোগিতা প্রবল যা নিজের পত্রিকাটির ঘরের ভেতরে একেবারে গলাকাটা। তিনি লক্ষ করলেন যে সবচেয়ে কম স্বাধীনতা নিউজ-রিপোর্টারের, তাঁর চেয়ে বেশি ফিচার-রাইটারের এবং সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতা কলামিস্টের। রিপোর্টারের এই দমবদ্ধকর সীমাবদ্ধতাই তাঁর দৃষ্টি নিয়ে যায় নভেলিস্টের দিকে। সেই নভেলিস্ট তথা ফিকশানিস্টের মতোই ননফিকশানিস্ট নিউ জার্নালিস্ট নিজেকে তাঁর লেখার ভেতরে ঢুকিয়ে দেন, যাতে তিনি চরিত্র-নির্মাণে অংশী হয়ে বিশেষ মুড সৃষ্টি করে পাঠককে বিশেষভাবে টানতে পারেন।

নিউ জার্নালিস্ট তাই ঘটনাটির বিশেষ পর্বটি শুরুর বহু পূর্বেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান। কেন? ক্যামেরা-বহির্ভূত উপকরণ, মেক-আপ রুমের পার্শ্বনাটকের উপাদান ইত্যাদি সংগ্রহ করার জন্য- যেসব তাঁর চরিত্র-চিত্রণকে জীবন্ত করে তুলবে। এসব আসলে নভেলীয় ডিটেল। উল্ফ বলেন সাংবাদিকতা শুধু তথ্য উপস্থাপন নয়, তথ্যগুলির অন্তর্নিহিত গল্পটি পাঠকের মর্মঙ্গম করানোও বটে। এজন্য তিনি বলেছেন, নিউ জার্নালিজম বস্তুত সাংবাদিকতায় একটি নিউ আর্ট ফর্ম।

কিন্তু আর্টফর্মটিকে নিউ বলতে নারাজ মাইকেল জে. আর্লেন। ফর্মটির সূচনাকালে সুদূর ১৯৭২ সালেই তিনি দি আটলান্টিক মান্থলিতে প্রকাশিত তাঁর নোটস অন দ্য নিউ জার্নালিজম রচনায় বলেছেন যে এই ফর্মে ডেফো-হেমিংওয়েরাও লিখে গেছেন। আর্লেন লিখেছেন, বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আবির্ভূত নিউ জার্নালিস্টের ব্যাচটি বস্তুত নভেলিস্টই হতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রথম পদক্ষেপেই তাঁরা বুঝেছিলেন যে নভেলের বা ফিকশানের দিন শেষ এবং ননফিকশানের দিন শুরু। সুতরাং তাঁরা ফিকশান বা কাল্পনিক ঘটনার লেখক না-হয়ে ননফিকশান বা বাস্তবিক ঘটনার লেখক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। অন্যকথায় ফিকশানের বদলে ননফিকশানকে উপজীব্য করে নভেলিস্টের স্থলে তাঁরা হলেন নিউ জার্নালিস্ট কিংবা লিটারারি জার্নালিস্ট।

টম উল্ফ লিখেছেন, কলেজ থেকে বেরিয়ে তাঁর প্রজন্মের ধারায় তিনি নভেল লেখার যেন একটা দায়েই পড়ে গেলেন। কিন্তু সেদিকে পা বাড়াতেই টের পেলেন যে নভেল অতীতের বস্তুতে পরিণত হয়েছে। বস্তুত বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকের শুরুতে নিউজস্ট্যান্ডের যে কোনো ম্যাগাজিনে চোখ বোলালেই পরিষ্কার হয়ে যেত যে সমসময়ের পাঠাভ্যাস একেবারেই বদলে গেছে। এমনকি কোলিয়ারস, ইভিনিং পোস্ট, দি নিউ ইয়র্কার ইত্যাদির মতো যেসব পত্রিকার সিংহভাগ দখলে থাকতো নভেলের, সে ভাগটি এখন চলে গেছে ননফিকশানের দখলে। (সে ধারাটিই বিশ্বায়িত হয়ে আজো বিদ্যমান আছে, এমনকি বাংলাদেশেও। আমরা আজকাল পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় গল্প-উপন্যাসের আগে পড়ি বিশেষ রচনা বা ইস্যুভিত্তিক লেখাগুলি। বইয়ের বাজারে গেলেও দেখি ক্রেতার বেশি চাহিদা ননফিকশানের, ফিকশানের নয়)।

এর কারণস্বরূপ অ্যালেন বলেন, একটি হোটেলের অগ্নিকান্ডে ওল্ড জার্নালিস্টের সংখ্যাগত হিসেবনিকেশে নিউ জার্নালিস্টের উৎসাহ নেই- যেমন কত লোক মারা গেল, কত লোক বেঁচে গেল, হোটেলটিতে কত লোক বসবাসরত ছিল, বিনষ্ট অলংকারাদির মূল্য কত অথবা বিল্ডিংটির ক্ষতির পরিমাণ কত। এসবের চেয়ে নবসাংবাদিকের বেশি চেষ্টা অগ্নিশিখার তাপটিই ধরে দেখার এবং জ্বলন্ত আগুনটিকেই অনুভব করার। তাই এর রোমাঞ্চ অথবা উত্তেজনা সংক্রমিত হয়ে যায় তাঁর পাঠকের মধ্যেও।

পরিশেষে সাংবাদিকদের মধ্যে যাঁর লেখার স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি, এবং সে কারণেই পাঠককে আকৃষ্ট করার ক্ষমতাও সবচেয়ে বেশি, তাঁর সম্পর্কে কিছু বলতেই হবে। তিনি কলামিস্ট বা স্তম্ভকার, যিনি উপসম্পাদকীয় ছাড়াও যে বিষয়ে খুশি সে বিষয়েই লিখতে পারেন এবং সম্পাদকের সম্মতিক্রমে লিখেও থাকেন। পরিস্থিতিদৃষ্টে মনে হয় তিনি তাঁর স্বাধীনতার প্রতি সুবিচার করছেন না। তবে আমাদের সান্ত¦নার বিষয় এটুকু যে কলামিস্টের এ ব্যর্থতা স্থানের বিচারে বৈশ্বিক এবং কালের বিচারে শতবর্ষী।

স্তম্ভকারের ব্যর্থতার স্বরূপটি নিপুণভাবে নিরূপণ করেছেন জনপ্রিয় ইংরেজ কবি, প্রাবন্ধিক ও ঐতিহাসিক ঔপন্যাসিক মরিস হিউলিট (১৮৬১-১৯২৩) তাঁর সম্পাদিত এবং ১৯২২ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত এক্সটেম্পোরেনিয়াস এসেজ-শীর্ষক বিখ্যাত সংকলনটির দি মে-পোল অ্যান্ড দ্য কলাম-নামক বিখ্যাততর ভূমিকায়। দেখা যায় যে কতিপয় ব্যতিক্রমজন ব্যতিরেকে হিউলিটের জ্ঞানগর্ভ কথাগুলিতে তেমন কান দেননি কলামিস্ট কিংবা স্তম্ভকারগণ। অথচ ফিকশানের বদলে ননফিকশানকে সার করা এই সাংবাদিকের অবলম্বিত প্রথাটাই হল ঘটনাকে রচনা বানানো। অন্যকথায় কলামিস্ট রচনাসাহিত্যিকদেরই একজন।
এ ছাড়াও স্তম্ভকার কেবল তথ্যবাহী সাংবাদিক নন, যাঁর দৃষ্টি বিশেষে; অনিত্যে। ইনি একজন লিটারারি জার্নালিস্ট কিংবা সাহিত্যিক সাংবাদিক, যাঁর দৃষ্টি নির্বিশেষে; অনিত্যে। অতএব রচনাসাহিত্য সম্পর্কে সম্যক অবহিত তাঁকে থাকতেই হবে। তা ছাড়া কলামিস্ট তো সাধারণত এক্সটেম্পোরেনিয়াস এসে বা তাৎক্ষণিক রচনাই লিখে থাকেন। বস্তুত উদ্ভূত যে-কোনো পরিস্থিতিতে যে-কোনো বিষয়ের ওপর তাৎক্ষণিক-রচনাকার হিসাবেই তাঁর প্রতিভা মহিমান্বিত। সেজন্যই হিউলিটের এক্সটেম্পোরেনিয়াস এসেজ-এর ভূমিকাটি কলামিস্টের পেশাদারির ক্ষেত্রে খুবই প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয় আমার।

মরিস হিউলিটের উল্লিখিত রচনাটিকেই রচনাসাহিত্যের ওপর আমার-পড়া শ্রেষ্ঠতম ভাষ্য বলে মনে করি আমি। সম্প্রসারিত একটা উপমা দিয়ে ব্যক্তিগত প্রবন্ধশিল্পের খান্দানটিকে তিনি সাক্ষাত পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। উপমিত রচনার উপমান মে-পোল্। উজ্জ্বল গ্রীষ্মের উদ্গমে যুবকযুবতীর দল প্রথমে সবুজ মাঠের বুকে সৃষ্টিমুখর মৌসুমটির একটি প্রতীকী খুঁটি গাড়ে, মৌসুমী পত্রপল্লব ও রঙবেরঙের পুষ্পের আসল-নকল নানান সাজের সরঞ্জাম খুঁটিটির গায়ে সাঁটে- তারপরে সকলে মিলে তারা ওটাকে ঘিরে চতুর্দিকে ঘুরে ঘুরে নাচে।

রচনাকারও তাঁর নির্বাচিত বিষয়বস্তুটি মে-মাস্তুলরূপে প্রথমে শূন্য মাঠে পুঁতবেন, তারপর ওটিকে বারবার ঘোরাতে থাকবেন- ডুগডুগি বাজানোর কাজে নয়, খুঁটিটির অঙ্গসৌষ্ঠব এবং সুষম সাজাই সুদক্ষ আলোকসম্পাতে সকল দিক থেকে দেখাবার গরজে। এমনকি নৈর্ব্যক্তিক রচনাকার ফ্র্যান্সিস বেকনও পুঁতেছেন তাঁর বিষয়ের খুঁটিটি, সাজানোর বদলে ছুলে-ছুলে তরুমজ্জা পর্যন্ত দেখানোর জন্যে হলেও। হিউলিটের মতে এই মে-পোল গাড়া এবং ওটাকে নজর-কাড়া করাই ছিল রচনাকারের মোট কাজ।

মে-মাস্তুলটি হতে পারত রচনাকারের মুডবিশেষও। উদাহরণ : চাল্র্স ল্যাম, যিনি রচনার মুডটিতে নিজের মেজাজ চারিয়ে দিতে গিয়ে জানাজায়ও জোক করতে পিছপা হন না। তাঁর সে-মশকরাকেও বস্তুত মনুষ্যের চিরবিদায় উপলক্ষে মরজগতের প্রতি অবিক্ষুব্ধ একটি সমাপনী স্তুতি জ্ঞান করা যায়- রাব্লে যেমন বলেছেন : টু লাফ অ্যাট ফেইট থ্রু লাইফ্স শর্ট স্প্যান/ ইজ দ্য প্রেরগেটিভ অফ ম্যান।
কিন্তু রচনাকার আজ মে-পোল-নামক প্রাকৃতিক মাস্তুলটি ছেড়ে কলাম-নামক সাংবাদিক স্তম্ভটি ধরেছেন। তিনি তাঁর নির্বাচিত মাস্তুলটিকে আর মন দিয়ে সাজিয়ে তোলেন না, বদলে তাঁর নির্ধারিত কলামটিকে তাড়াহুড়ো করে ভরিয়ে ফেলেন – হাবিজাবি রাবিশ দিয়ে হলেও। এভাবে সাহিত্যিক সাংবাদিকের রচনা তথ্যবাহী সাংবাদিকের রচনায় অবনমিত হয়েও বাজার পাচ্ছে- নেহাত হালের তথ্য-সমাজের পাঠকগণ পেটুক তথ্যভোজী বলেই। অথচ সাংবাদিক হলেই তিনি খারাপ সাহিত্যিক হবেন তেমন কোনো কথা নেই।

সাহিত্যিকতার সঙ্গে সাংবাদিকতার মৌলিক প্রভেদ হল : সাহিত্যিকের দূরবীনে খুব কাছের জিনিসের স্বরূপ ধরা পড়ে না। প্রতিপক্ষে সাংবাদিকের গোচরে কাছের জিনিসের মোটা রূপ ছাড়া বেশি কিছু আসে না। তার মানে সাংবাদিক রচনাকারের যেটা আসে সেটা কেবল মোটা দাগের ম্যাটার, তাৎক্ষণিক ইফেক্ট সৃষ্টির অমোঘ অস্ত্র- যা দিয়ে আক্রমণ করে পাঠক-মনকে তাঁর তদ্দণ্ডে জয় করতে হয়। কেননা বশীকরণ করার সময় তাঁর থাকে না। কারণ তিনি নিত্যপরিবর্তমাণ বস্তুপরম্পরার একজন শশব্যস্ত অনুধাবক।

প্রতিপক্ষে, সাহিত্যিক রচনাকারের জাদুর কাঠিটি বশীকরণেরই, যেহেতু তাঁকে অনিত্য থেকেও নিত্যকে ছেঁকে তুলতে হয়। হিউলিট বলেন, সাহিত্যিক হলেই কেউ খারাপ সাংবাদিক হবেন তেমন কোনো কথা নেই। ল্যাম্ প্রথমত সাহিত্যিক, অবশিষ্টটুকুই সাংবাদিক। স্যাঁৎ-ব্যভ্ প্রতি সোমবারের পত্রিকায় তাঁর তিন হাজার শব্দের মান্ডে চ্যাট লিখেছেন ১৮৪৯ থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত বিশটি বছর ধরে এবং বলেছেন সোমবার দুপুরে আমি মাথাটা তুলে ঘণ্টাখানেক শ্বাস নিয়ে আবার সাতদিনের জন্য আমার কারাকক্ষে অন্তরীণ হয়ে যাই। এর উপর মন্তব্য করেছেন ম্যাথু আর্নল্ড : এই মূল্যেই আমরা পেয়েছি তাঁর কোজ্রি।
প্রকৃতই সাহিত্য ও সংবাদ- এই দুই প্রভুর সেবা করার মতো কঠিন কাজে এমন মূল্য দিতেই হয়। এম. জে. আকবর অনিত্যের কারবারি একজন সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত। কিন্তু তিনি যখন গুজরাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতো সাময়িক দুর্ঘটনার ওপরও লেখেন, তখনও ওতে নিত্যের মূল্যই বর্তায় এবং তাতে সাংবাদিক হিসেবে তাঁর দাম কিছুমাত্র কমে না।

কথাটা আমি বাড়ালাম দুই কারণে। এক, সাহিত্যিক আর সাংবাদিক একই পাড়ার বাসিন্দা। দুই, বর্তমানে লেখালেখির জমি-জমা- দৈনিক, অর্ধসাপ্তাহিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ইত্যাদি পত্রিকা বলতে গেলে সাংবাদিকেরই দখলে। তিনি সুপ্রচুর ফসল ঘরে না তুলতে পারলে রচনাসাহিত্যের সফল চাষটা আর হবে কোথায়? মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষান্মাষিক, বাৎসরিক ইত্যাদি প্রবন্ধপ্রধান সাহিত্যপত্রে তো ব্যক্তিগত রচনা চাষের সুযোগ সীমাবদ্ধ। সুতরাং সাহিত্যিক সাংবাদিক যেন জিনিয়াসটা নিজের জীবনকে দিয়ে এবং ট্যালেন্টটা তাঁর পেশাকে গছিয়ে অস্কার ওয়াইল্ডের আক্ষেপটা আর না বাড়ান- বরং কিছু পেটুক কলাম উপড়ে ফেলে, কিছু রঙিন মে-পোল্ পোঁতেন।

বর্গাচাষী হয়েও সাহিত্যিকগণ কিছু চমৎকার রচনা মাঝেমধ্যে এখনো লিখে যাচ্ছেন নকাল্পনিক কিংবা কল্পনাগৌণ গদ্যের ভুবনে। সেজন্যেই অক্সফোর্ড বুক অফ এসেজের নির্বাচক ও সম্পাদক জন্ গ্রস্ তাঁর ভূমিকায় বলতে পারেন সার্টেনলি দেয়ার ইজ নাথিং টু সাজেস্ট দ্যাট দ্য এসে ইজ ডায়িং বরং আরেক ধাপ আগে বেড়ে বলতে পারেন আ ফর্ম দ্যাট হ্যাজ অলরেডি লেড সো মেনি লাইভস ইজ ভার্চুয়েলি আনকিলেব্ল। সাহিত্যিক-সাংবাদিক, বিশেষত কলামিস্ট, তাঁর ব্যক্তিগত রচনার সযতœ চাষে অবিচল হলে রচনাসাহিত্য অমরই থাকবে।

এই অবধ্য রচনাসাহিত্যকে বাংলা ভাষায় আজ বধ্য বলেই মনে হচ্ছে এজন্যে যে এ আসরে সেরা গদ্যকার আর আসতে চাচ্ছেন না, যেন শুধু ড্রেস নির্বাচনের ভয়েই- পাঠকসমীপে তিনি কী পরে আসবেন? লাউঞ্জস্যুট পরে নামবেন, না কি ড্রেসিংগাউনেই চলে আসবেন? আমাদের লেখকের সকারণ সন্দেহ যে তাঁর পাঠক হয়তো উদ্ভট কম্বিনেশনই আশা করেন- লুঙ্গির ওপর কোট।

ওদিকে পেঙ্গুইনের আ বুক অফ ইংলিশ এসেজের নির্বাচক সার এম্রিস উইলিয়ামস তাঁর রচনা-সংকলনটির ভূমিকায় জানিয়েছেন যে রচনা-পাঠকের কাছে অলিভার গোল্ডস্মিথ ড্রেসিংগাউন পরেও চলে আসতেন, তবে ইংরেজি রচনাসাহিত্যের প্রকৃত পিতা যোসেফ অ্যাডিসন পাঠককে অভ্যর্থনা জানাতেন না- আন্টিল হি ইজ ড্রেস্ড অ্যান্ড পাউডার্ড্। তবু অষ্টাদশ শতকের ইংরেজি সাহিত্যের মহামান্য অভিভাবক স্যামুয়েল জনসন

অ্যাডিসনকেই বলেছেন আ কুল কারেন্ট অফ ডিলাইট। প্রকারান্তরে, জনসন ব্যক্তিগত প্রবন্ধসাহিত্যের মর্মকথাটিই বলে দিয়েছেন এই একটিমাত্র ফ্রেজে- স্নিগ্ধশীতল আনন্দধারা।
সাহিত্যিক-সাংবাদিক কলামিস্ট পরিস্থিতিবিশেষে এই আনন্দধারার বদলে নিরানন্দধারারও সৃষ্টি করতে পারেন, কিন্তু কান্তিধারার বদলে ক্লান্তিধারা যেন কখনো বইয়ে না দেন তাঁর পাঠকদের ওপর।