ক্যাটেগরিঃ স্যাটায়ার

 

আমন্ত্রণের আতঙ্কে অস্থির থাকি। নিমন্ত্রণ মাত্রই যেন আমাকে সহর্ষে নির্যাতন করতে আসে। দাওয়াতের হাতছানিতে আমার ধামাচাপা সমস্যাগুলি দামামা বাজিয়ে আরেকবার আত্মপ্রকাশ করে। এবং আমার মতো দামাল পরিবারপালকেও নাজেহাল করে ছাড়ে আকসার। প্রথমেই পরার সমস্যা-কারো কি পরার মতো ভালো কিছু আছে? তারপরই যাওয়ার সমস্যা- অমুকদের মতো মোটরগাড়ি না হোক, তমুকদের মতো অটো-স্কুটার-জাতের কিছুও কি আছে? তারপর খাওয়ার সমস্যা-খাবে কী করে, কারো রোগব্যাধি সারানোর চেষ্টাটাও কি হয়েছে কোনো দিন? তারপর মজলিশে মজার সমস্যা-মজ্বে কী, মজা করার রেওয়াজটাও কি আছে এ-বাসায় বহুকাল?

এসবের পরেও তো থাকে পাল্টা দাওয়াতের আস্ত আত্মঘাতী দায়িত্ব। সর্বোপরি রয়েছে উপহারের সমূহ উৎপাত। আগে যেখানে পাঁচ টাকার একখানি নোট ছাড়লে ইঁদুর থেকে বিড়াল পর্যন্ত ডাক পেড়ে আনন্দ দিত, এখন সেখানে দশ টাকার এককাড়ি টাকা ফেললেও কোনোরকম খেলার মতো খেলনাই খেলতে আসে না। এক কালে উপহারের উৎসর্গে লেখা থাকত স্নেহ-প্রীতি-ভালোবাসা ইত্যাদির নিদর্শন স্বরূপ। এখন লেখা না থাকলেও উপহার মাত্রই-যে জ্বালা-যন্ত্রণা আর গোস্বা প্রভৃতির গঞ্জনা স্বরূপ-তাতে অন্তত আমার কোনোরূপ সন্দেহ নেই।

সন্দেহ হয়তো আমার মতো আরো অনেকেরই নেই। নতুবা দাওয়াতে যাবার উপহারের বদলে না-যাবার অজুহাতের অন্বেষণ অত বেড়ে যাবে কেন? গিন্নীর গায়ে ব্যথা থেকে আরম্ভ করে দোহাইটা যখন কর্তার ধোলাই-ছাড়া কোর্তার কথা পর্যন্ত গিয়ে ঠেকল, তখন দাওয়াতদাতাদেরই মাথাব্যথাটা মারাত্মক হয়ে দাঁড়াল-কষ্টায়োজিত পানাহারের জিয়াফতে অপচয়ের বহর দেখে।

এমতাবস্থাতেই হয়তো নিমন্ত্রকসম্প্রদায়ের বিদ্বজ্জন দাওয়াতনামার সংস্কার সাধনে আত্মনিয়োগ করে থাকবেন। এই গোষ্ঠীগত গবেষণা আশু ফলপ্রসূও প্রমাণিত হল। এবং দাওয়াত নামায় একটি বিশেষ দ্রষ্টব্যের ব্যবস্থা গৃহীত হল : কোনো উপহার নয়, শুধু আশীর্বাদ (নো গিফট, বে¬সিং ওনলি)। আমি ভাবলাম অ্যাদ্দিনে তবে একটি আন্তরিক বিষয়ের যথার্থ মূল্যায়ন হল, মানে আশীর্বাদের। কিন্তু স্ত্রী বুঝলেন নিমন্ত্রণপত্রের পবিত্র অঙ্গনে উপহার প্রসঙ্গের প্রবেশমাত্রই বিশেষ অর্থের অনুপ্রবেশ। তাঁর মতে ওটা আসলে সময়মতো উপহার কেনার স্মারকস্বরূপ।

তাৎপর্য টুকু ধীমতী আমাকে সেই লোভী মৌলভী সাহেবের দৃষ্টান্ত দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, যিনি দাওয়াত পেলেই মেজবানকে নসিহত করতেন: দেখ বাবা, পুকুর থেকে বড় মাছ-টাছ তোলার ঝামেলায় যেও না। অবশ্য তোমাকে মানা করারও কোনো মানে হয় না। কেননা তোমার মরহুম পিতাও আমার এ-মানা কোনোদিনই মানতেন না। অর্থাৎ পরোক্ষে বলতেন যে, আদর্শ পিতার যোগ্য পুত্রের মতো পুকুর সেঁচে হলেও মাছ ধরার ব্যাপারটা যেন ভুলে থেক না। অবশ্য নব্য নিমন্ত্রণপত্রের বিশেষ দ্রষ্টব্য বোঝার ভুলটুকু যে যথারীতি আমারই, সেটা খোলসা হতেও বেশি সময় লাগেনি। আশীর্বাদ গুলিকে তো আর হাওয়ার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। তাই কখনো দেখি সোনার আংটির ওপর লেখা হয়ে আসছে-বেঁচে থাক। হারের লকেটের ওপর খোদিত হচ্ছে-সুখে থাক। খেলনার গায়ে লেবেল লাগছে-দীর্ঘজীবী হও। প্রাইজবন্ডের বাণ্ডিলে বর্ণিত হচ্ছে-সৌভাগ্য কামনা করি। অতএব আমি আর কী করি-দাওয়াত পেলেই সেই অসুখ বানিয়ে নাজাতের পথ ধরি। এবং আমার আবিষ্কৃত অসুখ সংক্রামক বলেও প্রমাণিত হচ্ছিল বন্ধুমহলে, তাও সেই আগের মতোই।

এর পরবর্তীকালেই সদাশয় নিমন্ত্রণপত্রেও আমন্ত্রণের মহত্তম আদর্শটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নিমন্ত্রণপত্রের গাত্র থেকে উপহার-সম্পর্কিত বিশেষ দ্রষ্টব্যটি তো ঝেড়েই ফেললেন, এমনকি উপলক্ষের উল্লেখ্যটিকেও যথাসম্ভব গায়েব করে দিলেন। এখন আমরা কেবল শর্তহীন নিমন্ত্রণই শুধু পাই না, পাই পুরোপুরি আন্তরিক আমন্ত্রণ-উদ্দেশ্যবিহীন, এমন কি উপলক্ষবিহীন, অন্তত আপাতদৃষ্টিতে। ভেবে বড় আনন্দ লাগল যে চেনা মহলের সঙ্গে সৌহার্দ্যের সম্পর্কটি অবশেষে সম্পূর্ণ নিষ্কণ্টক হতে পারল-এতদিনে তবে নিষ্কলঙ্ক হতে পারল নিমন্ত্রণের মতো সদাচারী একটি অন্তরঙ্গ শিল্প। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে যদি খতিয়ে দেখেন, তবে উপলক্ষের উল্লেখ্য আমন্ত্রণের আন্তরিকতায় ভেজাল ছাড়া আর কী?
তবু যাকে বলে, সাবধানের মার নেই। আজও কেউ দাওয়াত করলে চটপট রাজি হয়ে আমি ভিন্ন কথায় চলে যাই এবং অনেক অযথা প্রসঙ্গের অবতারণা করতেও লজ্জা পাই না। পাছে জান্তে হোক অজান্তে হোক, উপলক্ষটি উক্ত হয়ে না যায়-অর্থাৎ অবহিত হয়ে যাবার সুবাদে কোনো গুরুদায়িত্ব এই লঘু স্কন্ধে যেন না বর্তায়। না-জানা যেখানে আশীর্বাদ-জানা-কি সেখানে বেকুবি নয়? না-হলে শেক্সপিয়ারের মতো মানবমনের অন্তর্যামী এমন কথাটি বলবেন কেন-হয়ার ইগনরেন্স ইজ ব্লিস/ইট ইজ ফুলিশ টু বি ওয়াইজ।

কিন্তু আমি একা অজ্ঞানতার পূজারী হলে কী হবে, আমার গৃহিণী এ-বিষয়ে এতই জ্ঞান তাপসী যে অতিশয় সঙ্গিন সময়েই তাঁর জ্ঞানের তৃষ্ণা বেজায় বেড়ে যায় এবং তিনি আমার সর্ব অঙ্গের সকাতর সিগন্যাল সকলি প্রত্যাখ্যান করেন অবলীলায়। ফ্যাচর-ফ্যাচর করতে করতে জানতে-শুনতে তিনি আর কিছুই বাকি রাখেন না যে জন্মদিনটা কার, কিংবা বার্ষিকীটি কীসের-এমনকি আকিকার না খাৎনার, তাও সবিস্তারে বের করে নেন।
তারপর ঘ্যানর-ঘ্যানর করতে করতে আমাকে এলেম দানেও কোনোই ফাঁকি রাখেন না যে ওরা সেই সেবার আমাদের অমুক-আত্মীয়ের তমুক ছেলের প্রাইমারি-পাশ উপলক্ষে কী সুন্দর একটা পাঁচরঙা পেন্সিল দিয়েছিল অথবা আর মাত্র একদিন-কি-আধবেলা বাকি অথচ কোনো ছাই কেনা তো দূরের কথা, বাছাই পর্যন্ত হল না কিছু। কিংবা বেশি পয়সার না-হলেও মোটামুটি রুচিসম্মত তো হতেই হবে, হোক না তা সোনার পাথর বাটি। এবং এমনি-অমনি আরো কত কি।
হায়! এই মূঢ়া মহিলাকে কে বোঝাবে যে রুচির প্রশ্নটি সম্পূর্ণ মুলতবি রেখে দিলেও কম পয়সায় এখন গরুর গলার ঘণ্টাও মেলে না। এই সেদিনই তো বাল্যবন্ধু গনি চৌধুরীর দাওয়াতের উপলক্ষটি জেনে ফেলার জের হিসেবে বাস্তবিকই ওই জিনিসটি কেনার খেয়ালে কাঁসার দোকানে যাওয়াতেই সেটি প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে।

চাকরির অল্পবয়সে জবরদস্তি অবসর প্রাপ্তির ফলে তার কচু ক্ষেতের জমিতে ইমারত নির্মাণ করতে না পেরে, নগরীর বুকে এক পাল গরু-ছাগলের খামার খুলে, গনি চৌধুরী স্বীয় কপালে গনি ঘোষের তিলক এঁটে সপরিবারে সত্যিকারের দুগ্ধপোষ্যের জীবন যাপন করতে করতে অবশেষে নিজেদের গোয়ালঘরটির কামরা খানিক বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। তারই শুভ উদ্বোধন উপলক্ষে উপহার নির্বাচন করেছিলাম : তার প্রচণ্ডতম ষণ্ড-সন্তানটির জন্য গলার একটা ঘণ্টা। কেননা শিঙেলটির নিঃশব্দ আনাগোনার ভয়ে আমার সন্তানদের মনটা ওদিকে টানেই না-যদিও বন্ধুমহলে একমাত্র গনি ঘোষই সবচেয়ে খেটে-খাওয়া নির্দোষ খাঁটি লোক। কিন্তু তাও কি ম্যানেজ করা যায়? খাঁটি পিতলের তৈরি বলে নাতিদীর্ঘ একটি ভূমিকার পর দোকানদার সোজা একশ টাকা দাম হাঁকল। ইচ্ছে হল পাশের বুড়িগঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে…।

এ-তো গেল জনৈকা অযথা-জ্ঞানপিপাসুর কথা-তথা আমার প্রিয়তমাসুর। এছাড়া আছে অনেক গরজের জ্ঞানদান-পিপাসুর গাথা। এই তো গত পরশু একজন এলেন, দাওয়াতনামা দিলেন, আসবেন-কিন্তু বললেন। আমিও তাঁকে বরণ করলাম, নিমন্ত্রণপত্র নিলাম এবং সানন্দে যাব বললাম (যাব না জেনেও)। বলেই অবশ্য এক লম্ফে ক্যাম্বোডিয়ার রণাঙ্গনে চলে গেলাম। তিনি কিন্তু ইনিয়ে বিনিয়ে উপলক্ষটি জানিয়ে যাবার সূত্র খুঁজছেন বলে আমার ঘোর সন্দেহ হল (এই দুর্দিনের বাজারেও দুএকটি দায়িত্ব যে এড়ানো যায় না সে তো ভাই বলাই বাহুল্য)। সর্বনাশ! বজ্রবিদ্যুতের ঝিলিক দেখে আমি নম্পেনের প্যানপ্যানে গ্যাঞ্জামের প্রসঙ্গ ছেড়ে বীরত্বের সঙ্গে ভিয়েতনামের গনগনে যুদ্ধের একেবারে অগ্রবর্তী অবস্থানে ছুটে গেলাম এবং অতি-নাটকীয় বর্ণনার ঘনঘটায় মত্ততালে ভদ্রলোককে সংগ্রামের ঐতিহাসিক পরিণতির দিকে ঠেঙিয়ে নিয়ে যেতে চাইলাম জলদ লয়ে।

তিনি কিন্তু নির্বিকার স্বকীয় স্ত্রীর আঁচলটি ধরে তাঁর আপন গন্তব্যের দিকেই এগিয়ে চলেছেন (একমাত্র ম্যারেজ অ্যানিভার্সারিটি উদ্যাপন করার যে একটিমাত্র শখ বেচারির, তার আয়োজনও আর সম্ভব হয় না ভাই আজকাল)। বলতে ইচ্ছে হল, ম্যারেজমাত্রই তো মেড-ইন-হ্যাভেন। এমন বেহেস্তী বস্তুটির সঠিক দিনক্ষণ কোথায় পাওয়া যাবে যে বার্ষিকী উদ্যাপন করবেন? তবে সংলাপের মতিগতি দেখে তাও বলতে সাহস পেলাম না। কোনোমতে খালি বললাম :
পরশু তো? তাহলে অবশ্যই আসব। তবুও একটু কনফার্ম করে আসি-
ভাবলাম : আপাতত ফাটন্ত বোমার সম্মুখ থেকে তো সরে পড়া যাক। ও খোদা! তিনিও দেখি তড়াক করে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলে উঠলেন :
কনফার্ম কীসের ভাই, আসতে তো আপনাদের হবেই। তাছাড়া আমাকেও-যে এক্ষুনি উঠতে হয়। সত্যি বলতে কি, যার জন্মদিন তার জন্যই তো এখনো নেওয়া হয়নি কিছুই। বড়গুলির কোনোটি হলেও তবু বোঝানো যেত। একেবারে ছোটটি তো-
কোনো রকমে উপলক্ষ্যটি ফাঁস করেই তিনি তাঁর বিদায়ের হস্ত খানি প্রসারিত করে দিলেন সবিনয়ে এবং বেশ স্বস্তির সঙ্গেই। এদিকে, স্নায়ুযুদ্ধ বিজয়ীর হাতখানি হাতে নিয়ে মুচড়েই দিতে ইচ্ছে করল বুদ্ধু এই বিজিতের। তবে একটা কথা কি, আমাদের সকলেরই হাতের চাইতে মুখের ক্ষমতা বেশি। তাই বাক্যবাণ হেনেই জানটা বাঁচাতে চাইলাম :
আরে? ঝন্টুর জন্মদিনটা পরশু বললেন না? কী আশ্চর্য! কেমন বেমালুম ভুলে বসে আছি-

কী ভুলে বসে আছেন?

পরশু তো আমরা পরশুরাম যাচ্ছি।