ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

গুরুদেব-এর জন্মদিনে বাঙালির একটি সহজাত অভ্যেসে দাঁড়িয়েছে যে…গঁঙ্গা জলেই গঁঙ্গা পুজোই করতে হয়।তার বিরুদ্ধাচারণ করলেই অশ্লীলতার তখমা গায়ে আটকে ফেলে দেওয়া হয় অবজ্ঞার আস্তাকুঁড়ে। কিন্তু যা সত্য তা রবি কিরণের মতোই ধ্রুব সত্য। তেমনি সত্যের মতো এক সত্য রবি-র জীবনে কাদম্বরী-র ছাপ। যারা প্রকৃত রবিকে চেনেন, বুঝতে চান, এই লেখা শুধু তাদের-ই জন্য।

শোনা যায়, ১৮৮৪ সালের ১৯-শে এপ্রিল, অমৃতলোকের পথে যাত্রার জন্য আফিম খান কাদম্বরী দেবী ২৫ বছর বয়সে, মারা যান ঠিক তার দুই-দিন পরে। সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত রবির জীবনে এল প্রথম ও পরম শোক, যে শোকে তিনি বিদ্ধ হয়েছিলেন আজন্মকাল। তাঁর লেখায়, তাঁর জীবন স্মৃতি-র প্রতি পাতায় পাতায়। জোড়াসাঁকোয় একাকী শৈশবে রবির ৭ বছরে এসেছিল ৯ বছরের প্রথম বন্ধু, তার ‘নতুন দাদা’-র বৌ, ‘নতুন বৌঠান’। ঠাকুরবাড়িতে আসার আগে কাদম্বরীর পরিচয় ছিল শুধুই ‘বাজার সরকার শ্যাম গাঙ্গুলীর তিন নম্বর মেয়ে’। তাই তিনি কোনদিন ঠাকুরবাড়িতে সম্মান পেলেন না, যার দাগ রবির জীবনেও পড়েছিল। কৈশরে রবির কবিতার খাতার নাম ছিল ‘মালতি পুঁথি’। তখন রবি বছর ১৫, অনুবাদ করছিলেন শেক্সপিয়ার-এর ম্যাকবেথ। যেখানে উনি দেখা পেয়েছিলেন গ্রিসের আবছা রহস্যলোকের দেবী ‘হেকেটি’। নতুন বৌঠান তখন রবির অনেক কাছের সখী। তাই তিনি সেই অনুভব থেকে, মালতি পুঁথি-র পাতায় বৌঠাকুরণের জায়গায় লিখলেন ‘হেকেটি ঠাকুরুণ’। যা পরে অপভ্রংশ হয়ে ‘ভগ্ন হৃদয়’ কাব্যগ্রন্থে উৎসর্গ হয়, ‘হে-কে’ রুপে। যা সত্য, তাহাই ধ্রুব, তাহাই নিত্য। তাই এই অন্তরঙ্গতা প্রকাশ পায় জোড়াসাঁকোর অন্দর-মহলে। যার ফলস্বরুপ বাবামশাই-এর কঠোর আদেশে ১৮৮৩ সালের ৯-ই ডিসেম্বর বিয়ে হয়ে গেল রবীন্দ্রনাথের। নতুন বন্ধনে রবি আবদ্ধ হলেও, কোনদিন সে ভুলতে পারেনি তার প্রথম ও পরম বন্ধু,সখী কাদম্বরীকে।তাই হয়ত আচম্বিতে তৈলচিত্রে কখনো কবির চোখে ধরা দিলে, কবির মন আনমনে দুলে উঠে প্রকাশ পায়, “তুমি কী কেবলি ছবি!! শুধু পটে আঁকা।” কিম্বা কাদম্বরীর ২৫-তম প্রয়ান দিবসে কবির কলম বলে ওঠে, “রাখো রাখো রে জীবনে জীবনবল্লভে, প্রাণমনে ধরি রাখো নিবিড় আনন্দবন্ধনে॥ আলো জ্বালো হৃদয়দীপে অতিনিভৃত অন্তরমাঝে, আকুলিয়া দাও প্রাণ গন্ধচন্দনে।

তাই আজ ২৫-এ আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি শুধু গুরুদেবকে নয়, তার অন্তরের বেজে ওঠা প্রথম প্রেমকে। যে প্রেম শাশ্বত ছিল কবি জীবনে সব যুগের সব কালের বাঁধা পেড়িয়ে, মনের সব আগল খুলে এক নিস্পাপ প্রেম। তাই হয়ত তার গানেই খুঁজে পাওয়া যায়-
“এসো আমার ঘরে।
বাহির হয়ে এসো তুমি যে আছ অন্তরে॥
স্বপনদুয়ার খুলে এসো অরুণ-আলোকে
মুগ্ধ এ চোখে।
ক্ষণকালের আভাস হতে চিরকালের তরে এসো আমার ঘরে॥”