ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

ইদানীং অনলাইনে বা প্রিন্টিং সংস্করণের পত্রিকাগুলো পড়লে মন খারাপ হয়ে যায়। বেশিরভাগ সংবাদপত্র খারাপ সংবাদে ভর্তি। ইতিবাচক সংবাদ খুব কমই উঠে আসে। এসব মন খারাপের খবরের ফাঁকে মানুষের চিরন্তন এক আকর্ষণের নাম বিনোদন। ছোট বড় সকলেই বিনোদন পাতায় অল্প সময়ের জন্য হলেও ঢুঁ মারেন। কেউবা ছবি দেখে আবার কেউ ফিচার পড়ে আনন্দ পায়। এই বিনোদন বিভাগ দেখলে ইদানিং আমার মন আরও বেশি পরিমাণে খারাপ হয়ে যায়। কারণ, বিনোদন বিভাগে ‘অমুক নায়িকার সেক্স টেপ নিয়ে অনলাইন সরগরম’ টাইপ সংবাদ হয় জাতীয় নিউজ। অর্থাৎ নায়িকা, গায়িকা কিংবা খ্যাত-অখ্যাত মডেলরা কোন সময়, কিভাবে, কোন ছবিতে বা ফটোশ্যুটে নগ্ন হলেন বা নগ্নতা নিয়ে তাদের চিন্তা-ভাবনা যুক্ত নিউজগুলোই প্রাধান্য পায়।

উল্লেখ্যযোগ্য বলা  যায়- হলিউডের পামেলা এন্ডারসন থেকে শুরু করে বর্তমানের সানি লিওন, পুনম পান্ডে, রাধিকা আপ্টে, মাইলি সাইরাস, কিম কার্দাশিয়ান, মডেল জোয়ানা, জাস্টিন বিবার, এলিসিয়া সিলভারস্টোন, থ্যারন, অ্যানজেলিকা ফেনি, অরল্যান্ডো ব্লুম, কেটি পেরি, কান্দিল বালোচ, ইমি, শ্রুতি হাসান, রাখি সাওয়ান্ত, জোহানসন, মৈনাক ভৌমিক, ইরিনা শায়েক, ডেমি মুর, অমৃতা আরোরা, মিরান্ডা কার, গাগাদের নগ্নতা ও নগ্নতার পরিমাণ নিয়ে বিস্তারিত নিউজ কাভারেজ বাংলাদেশের মানুষ দেখেছে। অনেক অনলাইন পোর্টাল তো আরো এগিয়ে। তারা নিউজের পাশাপাশি উত্তেজিত নগ্নতার ছবি ও ভিডিও সহ উপস্থাপন করছে। 

একটু পেছন ফেরা যাক। ভারতীয় একটি চ্যানেলের ‘ক্রাইম পেট্রোল’ নামক অনুষ্ঠানটি খুবই জনপ্রিয়। অনুষ্ঠানগুলো দর্শকদের আনন্দ দিতে গিয়ে অপরাধ কিভাবে ঘটে তা ফুটিয়ে তোলে। বলা যায়- অপরাধ সংগঠিত করার নানা রকম কৌশল দেখানো হয়। ভাল মানুষগুলো ‘ক্রাইম পেট্রোল’ নামক অনুষ্ঠান থেকে হয়তো অপরাধ প্রবণতা বা অপরাধীর বিচার প্রক্রিয়া শিখে নিবে। কিন্তু খারাপ মানুষগুলো কি শিখে? উত্তর একটাই- খারাপ মানুষগুলো অপরাধ সংগঠন করার কৌশল শিখে নেয়। এক্ষেত্রে অনেক অপরাধী বিজ্ঞ আদালতে ‘ক্রাইম পেট্রোল’ থেকে  অপরাধ সংগঠিত করার কৌশল শিখেছেন’ মর্মে স্বীকারোক্তিও দিয়েছে! তাহলে আমরা খুব সহজেই স্বীকার করতে পারি যে, প্রত্যেক বিষয়ের ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া আছে। আর বিজ্ঞানের ছাত্ররা সোজা ভাষায় বলে দেন যে, এই ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া সমান। অর্থাৎ ঠিক যতটুকু ক্রিয়া হবে ততটুকু প্রতিক্রিয়া হবে।

বলছিলাম বিনোদন পাতার সেক্স টেপ ও নগ্নতাকে নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করার কথা। তাহলে এই ক্রাইম পেট্রোলের মত সেক্স টেপ ও নগ্নতাকে নিয়ে পরিবেশিত সংবাদের ক্রিয়া এবং প্রতিক্রিয়া কতটুকু হবে? বিজ্ঞানের ছাত্ররা সহজেই আবার বলবেন, ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া সমান হবে। কিন্তু আমি বলি না। কখনো নয়, কস্মিনকালেও নয়। কারণ, এই ধরনের সংবাদ বা ছবি ছাপা হয় একটা বিশেষ শ্রেণির উদ্দেশ্যে, যারা বয়সে নবীন বা যুবক বা বিনোদনপ্রেমী।

বর্তমান কম্পিউটার, ফেইসবুক অনলাইন নির্ভর এই বিনোদনপ্রেমীরা একেবারেই মুক্তমনায় বিশ্বাসী। সব বিনোদনপ্রেমীই যে সুস্থ বিনোদনে আস্থা রাখেন, তাও নয়। যাইহোক, সংবাদ পড়া মাত্র বিনোদনপ্রেমীরা খোঁজ নেবে বিস্তারিত জানার জন্য। ব্যাস, কেল্লা ফতে! একেবারেই ‘খুল্লাম খুল্লা’। অসুস্থ বিনোদনপ্রেমীর মনে তখন অনেক আনন্দ। যারা শেয়ারিং ভালবাসেন না, তারা চুপ করে নিজে আনন্দ নেবে কাউকেই কিছু বলবেনা। অনেকটা কিছুই হয়নি গোছের অবস্থা। কিন্তু যারা শেয়ারিং ভালবাসেন তাদের কি অবস্থা? ফেইসবুক বা অনলাইন পোর্টাল বা নিষিদ্ধ ওয়েবসাইটের লিংকযুক্ত শেয়ারিং চলছে আর চলছেই। কারণ- ইন্টারনেটে সব কিছু উন্মুক্ত। প্রয়োজন শুধু খুঁজে নেওয়া।

সর্বশেষ অবস্থা হয় এই যে, অনলাইন জায়ান্ট গুগল ট্রাফিক এলগরিদম এর সূত্র বলে এই নিষিদ্ধ বিষয়টি ১নং র‍্যাংকিং এ সার্চ রেজাল্ট হিসাবে দেখায়। বেশি খুঁজতে হয় না, প্রতিযোগিতায় ১নং স্থান না পেলেও প্রথম পাতায় পাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত দেখা যায় ঐ সব নগ্নতা নির্ভর সংবাদের কারণে আমাদের সমাজের অনেক অপরাধী বিকৃত মনোভাবের পরিচয় দিচ্ছে। সমাজে বেড়ে যাচ্ছে নগ্নতা ও যৌনতা নির্ভর অপরাধ। ক্রিয়া এবং প্রতিক্রিয়ার হিসাবে এখানে ইতিবাচক শেখার কোন কিছুই নেই, বরঞ্চ ১০০ ভাগ নেতিবাচক শেখার বিষয় আছে।

আরেকটি বিষয় আমার কাছে খুবই মর্মান্তিক মনে হয়। তা হলো, খ্যাত সেলিব্রেটিরা হয়তো একটু নিউজ কাভারেজ পাওয়ার দাবি রাখে, কিন্তু যারা সেলিব্রেটি নয় বা যাদের নাম বাংলাদেশে কেউ শুনেছে বলেও মনে হয় না, তাদের নগ্নতার খবর কিভাবে বিনোদন নিউজে  প্রাধান্য পায়? আমার কাছে মনে হয় যে, এটা অনেকটা বিনোদন প্রেমীদের সাথে নতুন করে কাউকে সেলিব্রেটি হিসাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া কিংবা নগ্নতাকে পুঁজি করে ব্যবসা করা বা নগ্নতার প্রসার ঘটানোর কৌশল। কিন্তু আমাদের সংবাদ মাধ্যমগুলো কেন এই কাজটি করে? এই ধরনের সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে বিনোদনপ্রেমীরা কি পাবে? সমাজের কাছে সংবাদ মাধ্যমগুলো কি বার্তা পৌছাতে চায়? যে সংবাদ গোপনে পড়তে হয় বা বাচ্চা ছেলে-মেয়েদের সামনে পড়া যায় না, সে সংবাদ কেনই বা প্রিন্টিং সংস্করণে জায়গা পায়? আর অনলাইন সংস্করণ তো ছোট-বড় কাউকে সনাক্ত করতে পারে না। অনলাইন সংস্করণ তো জানে না যে ভিজিটর উক্তরুপ বিনোদনের নিউজটি পড়ছে, তার বয়স কত? বরঞ্চ স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্ররা এক্ষেত্রে এগিয়ে।

বিনোদন বিভাগে বিনোদন জগতের অনেক শিক্ষণীয় বিষয় থাকে। গণমাধ্যম চাইলে সুস্থ বিনোদন যুক্ত হাজার হাজার নিউজ করতে পারে। কিন্তু তা না করে কেন বিতর্কিত বিষয় সামনে নিয়ে আসে? আরো উল্লেখ্যযোগ্য বিষয় যে, অনেক খ্যাত বা অখ্যাত মডেল সেলিব্রেটি হওয়ার জন্য বা প্রচারের জন্য অনেক বিতর্কিত ছবি প্রকাশ করে বা এমন কাণ্ড ঘটায় যা দিয়ে লাইমলাইটে আসা যায়। কিন্তু গণমাধ্যমে কেন এই সুযোগটা দিচ্ছে? তাদের বিতর্কিত কর্মগুলো নিউজ হিসাবে প্রাধান্য দেয়া মানেই তো তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডেরই জয় হওয়া। অর্থাৎ লাইমলাইটে সফলভাবে চলে আসা এবং সংবাদ মাধ্যমের নৈতিকতার পরাজয় হওয়া। তাদেরকে নিউজ কাভারেজ না দিলে কি এমন অসুবিধা হয়?

যেকোন নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরন্তন। তাই প্রশ্ন, নগ্নতা কেন্দ্রিক সংবাদ পরিবেশনের সুযোগে নিষিদ্ধ বিষয়কে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আমাদের গণমাধ্যম কি সঠিক জায়গায় আছে?

আমি পেশাদারিত্বের প্রয়োজনে যখন বাংলাদেশের কোন বিষয় নিয়ে সার্চ অপটিমাইজেশন নিয়ে কাজ করি তখনই দেখি গুগল, ইউটিউব ও ফেইসবুকে নগ্নতার ছড়াছড়ি। অবস্থা এমন যে, ভাল বিষয়ের কোন জায়গা নেই। (নগ্নতার বিস্তার নিয়ে ইনশাল্লাহ আরেকটি পোস্ট দেব)।

গণমাধ্যমে দেখি, নগ্ন ছবি নিয়ে নিরীহ সরলমনা মেয়েদের সাথে প্রতারণা করছে, সরলমনা মেয়েদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে সেক্স টেপ তৈরী করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষ তো এসব প্রতারণার পদ্ধতি জানত না। কিভাবে শিখল? কোথায় যাচ্ছি আমরা? বাংলাদেশে নগ্ন মানসিকতার বিকাশের জন্য কারা দায়ি? গণমাধ্যম কি এক্ষেত্রে দায় এড়াতে পারে? সংবাদ মাধ্যম যদি নগ্নতা নিয়ে কোন ধরনের সংবাদ পরিবেশন না করত, তাহলে  উক্ত বিষয়ে পাঠক বা ভিজিটরের কি ঐ বিষয় দেখার বা পড়ার কি কোন প্রকার উৎসাহ তৈরি হতো? উত্তর একটাই- না, কোন মতেই উক্তরূপ উৎসাহ তৈরি হতো না। গণমাধ্যম কি সেলিব্রেটিদের জীবন থেকে ইতিবাচকভাবে মানুষের শিক্ষণীয় বিষয় নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করতে পারে না? যদি নাই পারে তাহলে ‘শুধুমাত্র প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য’ লেবেল দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা কি উচিৎ নয়?

তাই প্রশ্ন- গণমাধ্যম কি করছে? যৌনতা নির্ভর সংবাদ পরিবেশনা বা যৌনতা ছড়ানোর মধ্যে পার্থক্য কি গণমাধ্যম করতে পারে না? (আমি সব গণমাধ্যমকে ঢালাওভাবে দোষারোপ করছি না।)

সাংবাদিকদের বলা হয় জাতির বিবেক, আর সংবাদপত্রকে বলা হয় জীবনের প্রতিচ্ছবি। অন্যদিকে বিবেক থাকার কারণেই মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। কতেক সংবাদপত্র বা পোর্টালের জন্য আজকে সকল সংবাদপত্রকে মানুষের মনে বিরূপ ধারণা জন্ম নিচ্ছে। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে সংবাদপত্র পড়াও এখন দায় হয়ে পড়ছে। অনেক অনেক অভিভাবককে দেখি, নগ্নতা নির্ভর ছবি বা সংবাদের কারণে পত্রিকা বাসায় নিয়ে যান না। ছেলে-মেয়েদের সাথে নিয়ে পত্রিকা পড়েন না।

মুক্ত ইন্টারনেট এর এই যুগে আমাদের এই বিষয়ে ভাবতে হবে। সন্দেহ নেই যে, নগ্নতা বা যৌনতা নির্ভর বিনোদন প্রেমীদের সংখ্যা বেড়ে গেলে আমাদের দেশে অপরাধ বাড়বে। ইন্টারনেটে যেভাবে যৌনতা নির্ভর সংবাদ বা অপরাধ বাড়ছে, তা বর্তমানেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ভবিষ্যতে কি হবে জানি না। তবে বলতে পারি  যে, সংবাদপত্রের বিবেকবোধ মৃত হয়ে গেলে সমাজে মহামারির মত বিকৃত রুচিসম্পন্ন বা যৌনতা নির্ভর বিনোদনপ্রেমীদের সংখ্যা বেড়ে যাবে এবং প্রকাশ্য দিবালোকে যৌনতা বা নগ্নতার চর্চা হবে।

উল্লেখ্য, কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের ইমেজ ক্ষুণ্ন করা এই্ লেখার উদ্দেশ্য নয়। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও দায়বদ্ধতা তৈরির জন্যই আমার এই লেখা।