ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

 

ছোট বেলা থেকে বাবা মা শিখিয়েছে হুজুরেরা সন্মানিত মানুষ , তাদের দেখলেই সালাম দিতে হবে , না হলে গুনাহ হবে । আরও কত কি । এছাড়া ও গ্রামের পথে ঘাটে চলতে ফিরতে দেখি ছোট ছোট বাচ্চা পোলাপান একটু দাড়িটুপি নিয়ে চলাফেরা করলেই সবাই সালাম দেয় ইজ্জত করে । এছাড়া ও মক্তবে পড়ার সময় ওস্তাদ ইসলামি কায়দা কানুন যতটুকু না শিখিয়েছেন তার চেয়ে বেশি হুজুর মান্য করার যতকায়দা কানুন আছে সবই আমার মাথায় ডুকিয়ে দিয়েছেন ।

২০০০ সালে আওয়ামী লীগের সোনার ছেলে জয়নাল হাজারীর যন্ত্রনায় অতিষ্ঠ হয়ে কাতার পাড়ি দিলাম জীবিকার তাগিদে । এখানে এসে পরিচয় হয় একখানা বরিশালের হুজুরের সাথে। তিনি এখানে মসজিদে মুয়াযিনের কাজ করেন । তবে নিজেকে ইমাম বলতে বেশি স্বাছন্দ বোধ করেন । হুজুরের সাথে পরিচিত হয়ে নিজেকে ধন্য মনে করিয়া ভাবিতে লাগিলাম এবার বোধ হয় বিশ্বাস যোগ্য কাউকে পাইলাম , যার সাথে চলাফেরার মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের মঙ্গল হয়ে যাবে । কিছুদিন পর আমি একটা দোকান নিয়ে ব্যবসা শুরু করলাম । এরপর আমার হুজুর বন্ধুটি প্রায়ই আমার দোকানে আসা যাওয়া করিত । তখন কাতারে এশিয়ান গেমসের জন্য চারদিকে ধোয়ামুচার কাজ পুরাদমে চলিতেছিল । একদিন পৌরসভার তরফ থেকে আমার দোকানে একটা নোটিশ আসে, নোটিশটা আরবিতে দেখে আমি সেই হুজুরকে বললাম ভাই এইটা একটু পড়ে দেখেন তো কি লিখা আছে ।

তিনি বলিলেন আপনাকে ২৪ দিনের ভিতর ওদের অফিসে গিয়ে দেখা করতে লিখেছে আমি ওনার কথা শুনে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাইতাছি , হাতে তো ২৪ দিন আছে । এর ১ দিনের মাথায় পুলিশ এসে আমার দোকান বন্ধ করে দিয়ে, ৫ হাজার রিয়ালের নোটিশ হাতে ধরিয়ে দেয় এবং বলে জরিমানা দিয়ে রশিদটা নিয়ে এসে তারপর দোকান খুলতে । আমি আর দেরী না করে পৌরসভা অফিসের দিকে দৌড় দিলাম । সেখানে যাওয়ার পর ওরা আমার উপর বেজায় গরম , বলে ২৪ ঘণ্টার নোটিশ পেয়ে এলাম না কেন । আমার মাথায় হাত ২৪ দিন কিভাবে ২৪ ঘণ্টা হয়ে গেল । যাহোক জরিমানা জামাকরে একটা আনুবাদের দোকানে গেলাম তারা ও বলে ২৪ দিন না ২৪ ঘণ্টা । তারপর দোকানে এসে বসে ভাবিতে শুরু করিলাম এত বড় আলেম মানুষ মিথ্যা কি বলবে । আর বললেও কেনই বা বলবে । আমি আরও বেশকিছু আরবি পড়তে জানা মানুষকে পেপার টা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম এবং সবাই একবাক্যে বলল ২৪ ঘণ্টা , আর একজান তো বলেই ফেলল সামন্য আরবি পড়তে জানা লোকেরা ও বলতে পারবে এটা ২৪ ঘণ্টা । তারপর ও আমি হুজুরকে দোষ দিতে পারলাম না যে সে মিথ্যা বলছে । মনে মনে ভাবলাম হুজুর হয়ত অনিচ্ছা কৃত ভুল করেছে ।

এভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর একদিন হুজুর এসে বলল আজকে আপনাকে নিয়ে ঘুরতে যাব , আমি আর না করতে পারলাম না এর মাঝে আমার দোকানের নেপালি ছেলেটা বলল ভাই একটু পরে দোকান ভাড়ার জন্য আসবে । আমি হুজুরকে বললাম আপনি আমার ঘরের মালিককে একটা ফোন করে দেন আমি তো ভাল আরবি বলতে পারি না । আমার মোবাইলে ও টাকা নাই। ঊনি আমার কাছ থেকে নাম্বারটা নিয়ে ঘরের মালিকে ফোন করে জানিয়ে দিল , পরের দিন আসতে ।

এভাবে ৬ মাস পার হওয়ার পর একদিন ঘরের মালিক এসে হাজির , আমি বললাম আমি তো এ মাসের ভাড়া আপনার ড্রাইভার মারফত পাঠিয়েছি । সে বলে আমি অন্য কারণে এসেছি , আমার আর ঘর ভাড়া লাগবে না , আমি নিজে এখানে অফিস দেব , আগামি মাসে তোমার চুক্তির মেয়াদ শেষ আমি আর নবায়ন করতে চাই না ।আমি তো মাথায় হাত এত পুরাতন বিল্ডিংয়ে কাতারিরা অফিস খুলবে এও কি বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে । একমাস পর আমি যথারীতি দোকান ছেড়ে দিলাম ।

এর ২ মাস পর একদিন দেখি সেই হুজুর দোকান খুলে বসেছে । আমার আর কিছু বুজতে দেরী হল না । সেদিন হুজুর আমার দোকানের মালিকের নাম্বার নিয়া শুধু ফোন করেনি , নাম্বারটা ও সেভ করে নিয়েছে । আর তলে তলে দোকান ঘরের মালিক কে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে নিয়েছে ।

আমার মত ,আমাদের ভিতর অনেকে ধারনা করে মাদ্রাসায় পড়লে আর দাড়িটুপি নিয়ে চললে সে খুবভাল মানুষ । আসলে মানুষের চেহারা দেখে কখনও বুজার উপায় নেই যে, সে একজান ভাল মানুষ।