ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

 

কিছুদিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সমকামিদের বিয়ের আইন পাসের মাধ্যমে ব্যাপক আনন্দ-উদ্দিপনার জন্ম দেয় বাংলাদেশে। যেন নিজ দেশেই ‘সেইম-সেক্স’ আইন পাস হয়ে গেছে! এই অতিউৎসাহি জনতার আবার দুভাগ। এক ভাগ এই আইনের তুমুল বিরুদ্ধে, অন্য ভাগ পক্ষে। আমি ভাই এই কোনো ভাগেই নেই। আমার কাছে মনে হয়েছে, ওই বিদেশে কোন আইন পাস হলো তা দিয়ে আমার আনন্দিতও হওয়ার কি আছে কিংবা ক্ষুব্ধ হওয়ারও বা কি আছে? তার দেশে সমকামি আইনে আমার আগ্রহই ছিল না। কিন্তু বাঙালি বলে কথা!

বন্ধুদের আড্ডায় একদিন বলেই ফেললাম, আমার এসব নিয়ে কোনও আগ্রহ নাই। কিন্তু হ্যা, কেউ যদি ‘সেইম সেক্স’ জীবনে আগ্রহী হয় সেখানে আমার আপত্তিও নাই। একজন মানুষ যদি একই লিঙ্গের সঙ্গে জীবনযাপনে সুখি হয় তাহলে থাকুক। আপত্তি কোথায়? ঠিক তখনই একজন রক্ষণশীল বন্ধু একটা লেখার উদাহরণ দিয়ে বলল, আরে এটা তো দার্শনিক চিন্তার সঙ্গে একদমই সাপোর্ট করে না। বাংলা ট্রিবিউনে জব্বার হোসেনের “সমকামিদের মূর্খতা!” শিরোনামে কলামটা আর কি! ওই কলামে কী আছে? আমি পড়ে দেখি। যার শিরোনামেই তিনি নির্ধারণ করে দিছেন সমকামিরা মূর্খ। তিনি বলতে চাইছেন, সমকামিতা অবৈজ্ঞানিক। আরে ভাই মানুষ কি সেক্স বিজ্ঞান মেনে করে নাকি? আমার মাথায় ঢুকে না। ওই কলামের আবার পাল্টা জবাব দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। “ভিন্ন হলে সমতা চাওয়া মূর্খতা?” শিরোনামে লেখাটা অবশ্য আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। মনে হয়েছে, খুব আয়েশ করে লেখক আরেকজন লেখককে খোঁচাচ্ছেন।

যাই হোক, আমার শিরোনামটা হলো নারীবাদ কিংবা পুরুষবাদ। শুরুতে সমকামি বিষয়ে আলাপ করলাম এজন্য যে আমাদের দেশে এক বিষয়ে বহু মতামতের লোকবল পাওয়া যাবে। যারা একে অন্যের জবাব দিতে প্রস্তুত। যাইহোক ফের আসি নারীবাদে। আমাদের দেশের নারীবাদি আন্দোলন দীর্ঘদিনের। দীর্ঘদিন ধরে নারীরা অধিকার আদায়ের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু কিসের অধিকার? আমি নিশ্চিত বহু নারীও জানে না। যে নারী চাকরি করে, যে নারী বাসে চড়ে অফিসে যায়, ঘরে এসে সংসার সামলায়। সে নারীও বলে, সে অধিকার চায়। আসলে কিসের অধিকার?

কিছুদিন আগে আমি একটা বলিউডের সিনেমা দেখেছি। নাম হলো ‘দিল ধারেকনে দো’। ওখানেও নারীদের অধিকার নিয়ে একটি ছোট্ট বিতর্ক হয়। যেখানে একটি চরিত্র বলে ওঠে, নারীরা তো স্বাধীন। এই যে আমার মা-দাদি কোনওদিন চাকরি করবে, এটা ভাবতেও পারেনি। অথচ দেখো, আমার স্ত্রীকে আমি ব্যবসা করার জন্য এলাউ করেছি।

তখন যাকে খোঁচা দেওয়ার জন্য এই প্রসঙ্গ এসেছিল, তিনি বলেন, ঠিক। আমরা এই জায়গাতেই কাজ করছি। তুমি তোমার স্ত্রীকে ‘এলাউ’ করেছো মানে কি? তোমার কাছ থেকে তার অনুমতি নিতে হয়েছে। তাহলে নারী স্বাধীন হলো কি করে?

আমারও তখন মাথায় আসে। আসলে এটাকেই বলে স্বাধীনতা। যেখানে তাকে কোনও কিছু ‘এলাউ’ করার বিষয় আসবে না। সে তার প্রাপ্য সুযোগ এমনিতেই পেয়ে যাবে। অথচ নারীবাদিরা তার কুলকিনারা পায় না। তারা সিগারেট ফোকা, শার্ট প্যান্ট পরার মধ্যেই নারাবাদি অধিকার খুঁজে বেড়ান। এগুলোর সঙ্গে আমি একমত নই। আমি মনে করি, নারী-পুরুষ সমানভাবে জীবন সংগ্রামে লড়বে। একে অপরকে সম্মান করবে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাবে।

অথচ এই নারীবাদ-পুরুষবাদ করে যারা মাইক বাজান তারা সংগ্রামের কথা না বলে একজন আরেকজনকে খাটো করবেন। নারীবাদিরা বলবেন, পুরুষরা খচ্চর, চরিত্রহীন, লম্পট। পুরুষবাদিরা বলবেন, হে নারী তুমি কিসের তুলসি পাতা?

এই বাংলা ট্রিবিউনেই জব্বার হোসেন একটা কলাম লিখেছেন যার শিরোনাম ‘নারীরা কি ধোয়া তুলসী পাতা?’ এই পুরুষবাদি আর নারীবাদিতার মধ্যে রয়েছে চরম মাত্রার বিদ্বেষ। নারীকে খাটো করার মধ্যেই যেন পুরুষবাদ এবং পুরুষকে খাটো করার মধ্যেই যেন নারীবাদ লুকিয়ে আছে।

এই হিংসাবাদ থেকে দেশ কবে বের হবে জানি না। একে অপরকে সম্মান করে একসঙ্গে মানব অধিকার আদায়ে কবে ঐক্যবদ্ধ হবে কে জানে!