ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

২০০৯ সালের ২৫ শে ও ২৬ শে ফেব্র“য়ারি বাংলাদেশ রাইফেলস্ (বিডিআর) সদর দপ্তর ঢাকার পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষিতে চট্টগ্রামের ২৮ ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার এর নির্দেশে জুনিয়র অফিসার এসএম শিকদার আব্দুল জলিল হাবিলদার মহিউদ্দিনকে আটক করে র‌্যাব-৭ এর সদস্যদের হাতে তুলে দেন। র‌্যাব সদস্যরা মহিউদ্দিনকে বিদ্রোহের অভিযোগে ঢাকায় আনে এবং ৪৪ দিন গুম রেখে নির্যাতন করে। নির্যাতনের কারণে গত ৫ই মে ২০০৯ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মহিউদ্দিন মারা যাওয়ার পর তাঁর পরিবারকে জানানো হয় বলে তাঁর পরিবারের অভিযোগ।

নিহত মহিউদ্দিনের স্ত্রী মাজেদা আক্তার ডলি (২৮) জানান, মহিউদ্দিন চট্টগ্রামের হালিশহরে অবস্থিত ২৮ রাইফেলস্ ব্যাটালিয়নে ক্যান্টিন ম্যানেজার পদে কর্মরত ছিলেন। ২০০৯ সালের ২২ শে মার্চ রাত আনুমানিক ৯.০০ টায় মহিউদ্দিন মোবাইল ফোনে তাঁকে জানান, এশার নামাজ পড়ে ভাত খাওয়ার জন্য যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ঠিক তখনই ২৮ ব্যাটালিয়নের কমাডিং অফিসার (সিও) এর নির্দেশে জুনিয়র অফিসার এসএম শিকদার আব্দুল জলিল তাঁকে গ্রেপ্তার করে ব্যারাকে আটকে রেখেছে। কথা বলার এক পর্যায়ে মোবাইল ফোনের সংযোগ বিছিন্ন হয়ে যায়। ডলি এরপর আর যোগাযোগ করতে পারেননি। সেদিন রাত আনুমানিক ৯.৪৫টায় র‌্যাব-৭ এর সদস্যরা সেখান থেকে মহিউদ্দিনকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায় বলে তিনি পরে জানতে পারেন।

বিডিআরের হাবিলদার আব্দুল গোফরানের স্ত্রী তাঁকে জানান, মহিউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার সময় রেজিষ্ট্রি বইতে লেখা হয়েছিল যে, ‘২৮ ব্যাটালিয়নের পক্ষ থেকে একটি মোবাইল ফোনসহ হাবিলদার মহিউদ্দিন আহম্মেদকে র‌্যাব-৭ এর সদস্যদের হাতে রাত আনুমানিক ৯.৪৫ টায় হস্তান্তর করা হল’। গোফরানের স্ত্রী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। যখন মহিউদ্দিন কথা বলছিলেন তখনই মোবাইল ফোনটি জব্দ করা হয়েছিল। তিনি এরপর ২৮ ব্যাটালিয়নে যান এবং কর্তব্যরত কর্মকর্তাদের কাছে জানতে পারেন, বিডিআর সদর দপ্তর ঢাকার পিলখানায় বিদ্রোহ হয়েছে এবং এই কারণে তাঁর স্বামী ব্যারাক থেকে পালিয়ে গেছে। তিনি দাবী করেন, তাঁর স্বামীকে র‌্যাব সদস্যদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে মর্মে রেজিস্টার বইতে উল্লেখ আছে এবং তিনি রেজিস্টার বইটি দেখাতে বলেন। কিন্তু ঐ কর্মকর্তা তা দেখাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এরপর তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এবং কাশিমপুর কারাগারে খোঁজ করেও তাঁর স্বামীর কোন সন্ধান পাননি। তিনি নিউ মার্কেট থানায় গিয়ে দিনের পর দিন খুঁজেছেন তাঁর স্বামীকে কিন্তু পাননি। ২০০৯ সালের মে মাসের একদিন তিনি ২৮ ব্যাটালিয়নের সিওর কাছে ফোন করে তাঁর স্বামীর খোঁজ জানতে চাইলে সিও সাহেব তাঁকে বলেছিলেন যে, তাঁর স্বামী তার নিজের কৃতকর্মের ফল ভোগের জন্য ব্যবস্থা আছে, তাঁকে তখন তাঁর স্বামীর জন্য দোয়া করতে বলা হয়।
২০০৯ সালের ৫ ই মে সকাল আনুমানিক ৬.০০ টায় ২৮ ব্যাটালিয়ন থেকে একজন ডেপুটি এ্যাসিসট্যান্ট ডিরেক্টর (ডিএডি) মোবাইল ফোনে জানান, তাঁর স্বামী মারা গেছেন এবং লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে আছে। লাশ গ্রহণের জন্য তিনি তাঁকে হাসপাতালে যেতে বলেন। তিনি হাসপাতালে গিয়ে মর্গ থেকে মহিউদ্দিনের লাশ গ্রহণ করেন। তিনি দেখেন, লাশের সমস্ত শরীরেই নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন ও হাড়-মাংস থেঁতলানো ছিল। ২০০৯ সালের ৬ মে তারিখে লাশ নিজ গ্রামের বাড়ী আইয়ুবপুর নিয়ে দাফন সম্পন্ন করেন।

কিছুদিন পর বিডিআরের ডিজির সঙ্গে তিনি মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেন। ডিজি তাঁকে জানান, মহিউদ্দিনের মৃত্যুর ব্যাপারে নিউ মাকের্ট থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। আরো কিছুদিন পর নিউ মাকের্ট থানায় যোগাযোগ করে তিনি জানতে পারেন, ময়না তদন্তে হত্যার কথা বলা হলেও মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, তাঁর স্বামী চট্টগ্রামের হালিশহরে কর্মরত ছিলেন। আর বিদ্রোহ হয়েছিল, ঢাকার পিলখানায়। অথচ তাঁর স্বামীকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। এছাড়া তাঁর স্বামীকে র‌্যাব সদস্যরা গুম করে রেখে দিনের পর দিন নির্যাতন করেছিল। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তিনি তাঁর স্বামীর হত্যাকারীদের বিচার দাবী করেন।

নিউ মার্কেট থানার কনস্টেবল আতাউর রহমান বলেন, ২০০৯ সালের ২রা অক্টোবর নিউ মার্কেট থানার এসআই মতলুবুর রহমান বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেন। যার নম্বর ১৩/২০০৯; তারিখঃ ০৬/০৫/২০০৯। এরপর এজাহারে উল্লেখ করেন যে, বিডিআর এর হাবিলদার মহিউদ্দিন নির্যাতনে মারা গেছেন। তবে মামলার তদন্তকালে উল্লেখিত পেনাল কোডের ৩০২/৩৪ ধারামতে মহিউদ্দিনকে নির্যাতন করে হত্যার ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু দোষী ব্যক্তিদের সনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়া হয় বলে তিনি জানান।

মেজর জিয়াউর রহমান, উপ-অধিনায়ক, র‌্যার-৭, পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম চলতি বছরের ২৫ মে জানান, ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় ২৮ ব্যাটালিয়ন থেকে হাবিলদাল মহিউদ্দিন নামের কোন লোককে র‌্যাব সদস্যরা গ্রেপ্তার করেনি।

ডাঃ আ.খ.ম শফিউজ্জামান, প্রভাষক, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জানান, ২০০৯ সালের ৫ই মে ২০০৯ শাহবাগ থানার পুলিশ সদস্যরা একটি লাশ মর্গে আনেন। লাশের সঙ্গে থাকা পুলিশ সদস্য তাঁকে জানান, লাশটি বিডিআর এর হাবিলদার মহিউদ্দিন আহমেদের। তিনি লাশের ময়না তদন্ত করেন। যার ময়নাতদন্ত নম্বর-৮৮৯/০৯। মহিউদ্দিনকে হত্যা করা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তারিখঃ ২০/০৭/২০০৯। তিনি আরও জানান, ১৩/০৯/০৯ তারিখে এসআই মতলুবুর রহমান নিজে এসে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন সংগ্রহ করে নিয়ে যান।

সূত্র: অধিকার এর প্রতিবেদন