ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

রয়েল হংকং পুলিশ ফোর্স এর কাউলুন এর ডেপুটি ডিস্ট্রিক্ট কমিশনার ছিলেন পিটার গডবার। সেখান থেকে ওনছাই পুলিশ স্টেশনে এবং তারপর কাই টাক এয়ারপোর্ট পুলিশ স্টেশনে যোগ দেন আলোচিত এই পুলিশ কর্মকর্তা। এটা ১৯৭৩ সালের কথা। চৌকশ পুলিশ অফিসার হিসেবে বেশ নামডাক ছিলো ডিপার্টমেন্টের ভেতর।

অবসরগ্রহণের পরও হংকং এ এখনো বেশ আলোচিত নাম পিটার গডবার। তবে, নিষ্ঠা, দক্ষতা, দেশপ্রেম বা সততার জন্য নয়। একজন দুর্নীতিপরায়ণ পুলিশ অফিসার হিসেবে পিটার গডবার এর নাম জানে হংকং এর সাধারণ মানুষ। স্কুল পড়ুয়া শিশুরাও জানে ১৯৭৩ সালে কিভাবে ধরা হয়েছিলো গডবারকে। কি হয়েছিলো তার সাজা ইত্যাদি।

৭ই মে হংকং এর ‍ইন্ডিপেন্ডেন্ট কমিশন এগেইনস্ট করাপশন বা আইসিএসি এর প্রধান কার্যালয়ে এক ওয়ার্কশপে যাই। এশিয়ান হিইম্যান রাইটস কমিশন বা এএইচআরসি এবং আইসিএসি এর যৌথ উদ্যোগে দিনব্যাপী এ ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয়। ওয়ার্কশপে আইসিএসি এর কর্মকর্তারা জানান, এটি হংকং এর দুর্নীতিবিরোধী স্বাধীন ও শক্তিশালী একটি প্রতিষ্ঠান। জানালেন, হংকং এর প্রধান নির্বাহী ছাড়া কারো কাছে এই প্রতিষ্ঠান জবাবদিহিতা করে না। এমনকি প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব এনফোর্সমেন্ট উইংও রয়েছে বলে জানান কর্মকর্তারা।

তারা জানান, ৭০ এর দশকেও দুর্নীতির চাদরে মোড়া হংকংকে অনেকটাই দুর্নীতিমুক্ত করায় এই স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের অগ্রনী ভুমিকা রয়েছে। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার দুর্নীতি দমন কমিশনও তাদের পরামর্শে গড়ে তোলা হয়েছে বলে দাবি করেন তারা।

সুরম্য ও সুরক্ষিত এই ভবনের ভেতরেই আইসিএসি গড়ে তুলেছে তাদের জাদুঘর। মধ্যাহ্ন বিরতিতে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো এখানে। চমকে ওঠার মতো এই জাদুঘর। ১৯৭৩ সালের পর দুর্নীতি বিরোধী বড় বড় অভিযানের সচিত্র বর্ননা রয়েছে। রয়েছে দলিলপত্র। রয়েছে বিভিন্ন রায়ের মুল কপিও। এই জাদুঘরেই রাখা হয়েছে পিটার গডবার এর চাঞ্চল্যকর সেই মামলাটির বিস্তারিত দলিলপত্র। ধরা পড়ার ছবি।

১৯৭৩ অবসর গ্রহণের পর ঘুষ নেয়ার মামলায় অভিযুক্ত করা হয় পিটার গডবারকে। বলা হয়, বিভিন্ন সময় তিনি ৪.৩ মিলিয়ন হংকং ডলারেরও বেশি (প্রায় ৬০০০০,০০০ ইউএস ডলার) ঘুষ নেন এবং বিদেশের ব্যাংকে জমা করেন।

অবৈধ এ টাকার উৎস সম্পর্কে জানতে চায় এন্টি করাপশন কমিশন। এরপরই পিটার গডবার আর তার স্ত্রী অস্ট্রেলিয়া পালিয়ে যান।

জনবিক্ষোভের মুখে ১৯৭৫ সালের ৭ই জানুযারি হংকং সরকার তাকে দেশে ফিরিয়ে আনে। একই বছরের ১৭ই ফেব্রুয়ারি বিচার শুরু হয়। চলে টানা সাত বছর। বিচারে তার চার বছরের সাজা হয়। জরিমানা করা হয় ২৫,০০০ হংকং ডলার। আইসিএসি জাদুঘরে পুরো ইতিহাস রাখা হয়েছে।

জাদুঘরে রয়েছে এমন অনেক ঘটনা। বড় বড় রিয়েল এস্টেট কোম্পানীর বহুতল ভবন দুর্নীতির দায়ে ভেঙে ফেলা, জেল জরিমানার অনেক ঘটনা। কর্মকর্তারা জানালেন, ইতিহাস জানুক কিভাবে দুর্নীতি দমন করা হয়েছে তাদের দেশে। কেমন ছিলো দুর্নীতিবাজদের চেহারা।

জাদুঘর ঘুরে দেখার সময় ভাবছিলাম, এমন একটি জাদুঘর যদি করা যেত বাংলাদেশে। দুর্নীতিবাজদের আমলনামা থাকতো। ফলে, দুর্নীতি করে সাজা ভোগের পর বড় গলায় কথা বলার অভ্যাস হয়তো একদমই বন্ধ হয়ে যেত এসব দুর্নীতিবাজদের। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে দেখত কিভাবে বাংলাদেশকে কুরে কুরে খেয়েছিল এসব দুর্নীতিবাজ। কেমন ছিলো তাদের চেহারা।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর কিভাবে দুর্নীতির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে এদেশ। জিয়াউর রহমান বা হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনামলে কিভাবে হয়েছে দুর্নীতি, দুর্নীতিবাজদের চেহারা সব কিছু যদি রাখা তো এমন একটি জাদুঘর বানিয়ে। মন্দ হতো না!

বহুল আলোচিত ১/১১ এর পর বিভিন্ন বড় বড় রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী সহ বিভিন্ন পেশার কয়েকশ ব্যক্তির নামে দুর্নীতির থোকা থোকা মামলা করে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন। এসব মামলাগুলোর বেশিরভাগই আদালতে খারিজ হয়ে গেছে। কিছু মামলা এখনো রয়ে গেছে। সামরিক আমলে করা এসব মামলা নিয়ে সন্দেহ তো থাকতেই পারে। কিন্তু, গণতান্ত্রিক আমলে দুর্নীতির যেসব মামলা হচ্ছে সেগুলোর পরিণতি যদি এমন একটি জাদুঘর করে সংরক্ষণ করা যেত তাহলে মন্দ হতো কি?

তবে, সব কিছুর আগে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। আর তা হলো, বাংলাদেশেও দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতার বিষয়টি। যে সরকারই ক্ষমতায় আসে, সেই সরকারই একে স্বাধীন বলে প্রচার করে। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানটি কতটুকু স্বাধীন তা নিয়ে প্রশ্ন আসবে কয়েক কোটি।