ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

যারা আওয়ামী লীগ বিট করেন তাদের অনেকেরই কম- বেশি পরিচিত ছিলেন ইব্রাহীম। ক্রাইম বিট এ কাজ করার কারণে ইব্রাহীমকে ভালো করে চিনতাম না। তাকে আমি কাছে থেকে দেখি ১/১১ এর পর সংসদ ভবনে স্থাপন করা বিশেষ আদালতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সেনা সমর্থিত সরকারের দায়ের করা বিভিন্ন দূর্নীতি মামলার বিচারকালে। শেখ হাসিনা, বেগম খালেদা জিয়াসহ অন্যদের বিরুদ্ধে দায়ের করা যেসব মামলা বিশেষ আদালতে সে সময় চলেছে, তার সবগুলোই আদালতের ভেতর বসে প্রত্যক্ষ করেছি আমি।

যেদিন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার শুনানী থাকতো, সেদিন সকাল থেকেই বিশেষ আদালতের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন ইব্রাহীম। দীর্ঘদেহী, সুঠাম দেহ। লম্বা দাড়ি। শান্ত স্বভাবের।

শেখ হাসিনার মামলার শুনানীর পর আদালত থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করতেন বর্তমান আইনমন্ত্রী ব্যারিষ্টার শফিক আহমেদ। সাথে থাকতেন বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মণি, আইনপ্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর জন্য বেশ ধাক্কাধাক্কি করতেন এরা সবাই।

ব্রিফ শুরু হলে, পেছনে দাড়িয়ে থাকতেন ইব্রাহীম। অনেক লম্বা। পেছনে দাঁড়ালে কোন সমস্যা নেই। ক্যামেরায় থাকবেনই! অনেকে রাগ করতেন ইব্রাহীমের উপর! তাতে কিছু যায় আসে না। চুপ করে সহ্য করতেন সব রাগ।

১/১১ এর সময় সব আন্দোলন সংগ্রামে দেখেছি তাকে। তার সম্পর্কে খুব বেশি জানি না। যারা আওয়ামী লীগ বিট করেন, তারাই বলতে পারবেন ভালো।

সেই ইব্রাহীমই খুন হলেন, দলীয় এমপির পিস্তলের গুলিতে। সেটা ২০১০ সালের ১৩ই আগস্টের কথা।

পেছন ফিরে দেখা:

আগস্ট ১৩: তোপখানায় ইব্রাহিম খুন

সেগুনবাগিচায় খুন হন ইব্রাহিম(৩৬)। রাত সাড়ে ৮টার দিকে মাসুম নামে এক যুবক একটি মাইক্রোবাসে করে এক ব্যক্তিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নেয়। মাসুম হাসপাতালে জানায় যে, সেগুনবাগিচায় অজ্ঞাত সন্ত্রাসীরা ইব্রাহিমকে গুলি করে পালিয়ে গেছে। পরে চিকিৎসকরা ঐ ব্যক্তিকে পরীক্ষা করে দেখেন তার আগেই মৃতু্য হয়। তার পিতা মৃত সালেহ আহমেদ। ২৬, তোপখানা রোডে তার বাড়ি।

আগস্ট ১৪: এমপির পিস্তল জব্দ

শেরেবাংলানগর থানার ওসি রিয়াজ হোসেন সেসময় জানান, মামলার বাদি ভোলার সংসদ সদস্য নূরুন্নবী চৌধুরী শাওনের গাড়িচালক কামাল হোসেন কালা থানায় দায়েরকৃত অভিযোগে বলেছেন, ইব্রাহীম তার পূর্ব পরিচিত। ঘটনার রাতে তিনি সংসদ সদস্য শাওন ও যুবলীগ নেতা ইব্রাহীমকে নিয়ে পাজেরো জিপ চালিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের ৬ নম্বর বস্নকের সামনে যান। তিনি সংসদ সদস্যকে সংসদ ভবনের ১৩৫ নম্বর কক্ষের কাছে নামিয়ে দেন। ইব্রাহীম তখন জিপেই ছিলেন। জিপ গাড়িটি পার্কিং এলাকায় রাখেন। পরে তিনি পানি দিয়ে গাড়ি ধোয়ার কাজ করছিলেন। হঠাৎ তিনি গাড়ির ভিতর থেকে শব্দ শুনতে পান। তিনি দেখেন গাড়ির ভিতর ইব্রাহীম চিৎকার করছেন। তার বাম চোয়াল থেকে রক্ত ঝরছিল। এ সময় ইব্রাহীমের ডানহাতে পিস্তল ধরা ছিল। পরে তাকে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করান। ওসি জানান, সংসদ সদস্যের পিস্তলটি জব্দ করা হয়েছে।

আগস্ট ১৫: এমপি শাওনের পিস্তল, গুলির খোসা, পরীক্ষার জন্য সিআইডিতে

এদিন, এমপি শাওনের লাইসেন্স করা পিস্তল, গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধারকৃত গুলির খোসা ও ইব্রাহীমের শরীর থেকে উদ্ধারকৃত গুলি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সিআইডিতে পাঠানো হয়। এছাড়া শাওনের পাজেরো গাড়ি, গুলিবিদ্ধ ইব্রাহীমকে বহনকারী মাইক্রোবাস এবং ইব্রাহীমের শরীরের রক্ত আলাদাভাবে ডিএনএ টেষ্ট করানোর আবেদন করে পুলিশ। জানা যায়, মাইক্রোবাসটির মালিক এমপি শাওনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিঠু নামে যুবলীগের এক কমর্ী। তার গাড়ি চালক মিজানসহ তিনজন জাতীয় সংসদ ভবন থেকে ইব্রাহীমকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। মিজানের সঙ্গে থাকা অপর দুই জন শাওনের দেহরক্ষী বলেও জানা গেছে। ইব্রাহীমের স্ত্রী রীনা ইসলাম তার স্বামীর হত্যার সঠিক তদন্ত দাবি করেন।

পরিবার অভিযোগ করে, এই হত্যাকাণ্ডের সাথে ভোলা-৩ আসনের এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, তার দেহরক্ষী দেলোয়ার ও কামাল হোসেন কালা জড়িত থাকতে পারে। এমপি শাওনের সাথে ইব্রাহীমের ঘনিষ্ঠতা দীর্ঘদিনের। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনে বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজে ইব্রাহীম শাওনের পাশে থাকতেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তারা কালো রংয়ের একটি নোয়া মাইক্রোবাস এবং সংসদ ভবনের স্টিকার লাগানো একটি জলপাই রংয়ের পাজেরো জিপকে জরুরি বিভাগের সামনে পার্কিং করতে দেখেন। জিপ থেকে নামেন এমপি শাওন। বার্ন ইউনিটের সামনে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তিনি মোবাইল ফোনে কথা বলেন কারো সঙ্গে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের যুবলীগ কর্মী জীবন, রিটন, আওয়ামী লীগ কর্মী আলমসহ ১০/১৫ জন দলীয় কর্মী সমবেত হয় জরুরি বিভাগের সামনে। তাদেরকে এমপি শাওন প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেয়ার পরই কালো রংয়ের নোয়া মাইক্রোবাস থেকে গুলিবিদ্ধ ইব্রাহীমের রক্তাক্ত দেহ ধরাধরি করে ট্রলিতে নামানো হয়। জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ইব্রাহীমকে পরীক্ষার পর মৃত ঘোষণা করার পরই সবাই দ্রুত হাসপাতাল চত্বর ত্যাগ করেন।

আগস্ট ১৬: শাওনের নাম মামলায় নেয়নি পুলিশ

এদিন, এমপি শাওনকে আসামি করে শেরেবাংলা থানায় মামলা করার উদ্যোগ নেন, ইব্রাহিমের স্ত্রী রিনা আক্তার। কিন্তু, পুলিশ তাকে জানায়, সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা নিতে সরকারের অনুমতি লাগবে তাই আদালতে মামলা করা উচিত। ইব্রাহিমের স্ত্রী রিনা আক্তার বলেন, সংসদ সদস্য শাওনের সঙ্গে তার স্বামী ঠিকাদারি কাজ করতেন। ১০ লক্ষাধিক টাকার একটি কাজ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছিল। এর পর তার মৃতু্য হয়। এসব কারণে বিষয়টি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডও হতে পারে।

আগস্ট ১৭: এমপি শাওনের গাড়ি চালক ও দেহরক্ষী গ্রেফতার: মামলা ডিবিতে

এদিন, মামলাটি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে(ডিবি) হস্তান্তর করা হয়। নূরুন্নবী চৌধুরী শাওন এমপির গাড়ি চালক কামাল হোসেন ও দেহরক্ষী যুবলীগ কর্মী মিঠুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে পুলিশ।

আগস্ট ১৮: শাওনের বিরুদ্ধে খুনের মামলা

পুলিশ মামলা না নেয়ায় ঢাকা মহানগর মুখ্য হাকিম আদালতে নূরুন্নবী চৌধুরী শাওনের বিরুদ্ধে মামলা করে ইব্রাহীমের ছোট ভাই মাসুম আহমেদ। মামলায় শাওন ছাড়াও আরো ৭ জনের নাম উলেস্নখ করে এবং অজ্ঞাত ৮/১০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

আগস্ট ১৯: ময়নাতদন্ত রিপোর্ট: ইব্রাহিমকে খুন করা হয়েছে গুলিতে

ইব্রাহিমকে গুলি করে খুন করা হয়েছে বলে ময়না তদন্তের রিপোর্টে চিকিৎসক উল্লেখ করেন ডাক্তাররা। ময়না তদন্তকালে চিকিৎসক তার মাথার পেছনের দিকে ঘাড় থেকে একটি বুলেট উদ্ধার করেন। বুলেটটি ইব্রাহীমের থুতনির নিচে দিয়ে ঢুকে ঘাড়ে গিয়ে আটকে যায়। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্য হয়। তার দেহের ভিতর গুলির চিহ্নের এই আলামত দেখে ময়না তদন্তকারী চিকিৎসক নিশ্চিত হন যে, ইব্রাহিমের মৃতু্য হত্যাজনিত।

এখন?

ইব্রাহীম এর খুন নিয়ে বেশ কিছুদিন টালমাটাল ছিলো সবগুলো মিডিয়া। তারপর হঠাৎই সব বন্ধ! হয়তো, ভুলেই গেছেন অনেকে! যাদের মনে আছে, তারা জানতে চান মামলার সর্বশেষ অবস্থা।

***
ফিচার ছবি: [], [] এবং [] লিংক থেকে নেয়া স্ক্রিনশট