ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহে জড়িত সন্দেহে আটক ২৪ ব্যাটালিয়নের সিপাহী আল মাসুমকে হেফাজতে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ। মাসুমের মা রাজিয়া বেগম দাবি করেন বিদ্রোহে তার ছেলে জড়িত নয়। নির্যাতনে তার ছেলে সোজা হয়ে হাটতে পারছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। সিপাহী মাসুম বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে এসব তথ্য। এক ইমেইল বার্তায় এ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংস্থাটি।

রাজিয়া বেগম জানান, চট্টগ্রামে ট্রেনিং শেষ করে তাঁর ছেলে পিলখানায় ৭/৮ দিন অবস্থান করেন। সেখান থেকে ৮ই জানুয়ারী ২০০৯ ছুটিতে বাড়ি আসেন। একমাসের ছুটি শেষ করে সিপাহী আল মাসুম আবারও ৮ই ফেব্রয়ারি ২০০৯ তারিখে চাকুরীতে যোগদান করেন। ২৬ শে ফেব্র“য়ারি রাত আনুমানিক ১০টার দিকে তাঁর আরেক ছেলে আলী আকবর জানান যে, পিলখানায় গোলাগুলির কারণে মাসুম পালিয়ে এসে ঢাকার মিরপুরের টোলারবাগে মেসে এসেছেন। পিলখানার গন্ডগোল শেষ হলে মাসুম আবার কাজে যোগ দেবেন বলে জানান। আলী আকবর এর সঙ্গে কথা বলার একটু পরে মাসুমের সঙ্গেও তাঁর কথা হয়। মাসুম তাঁকে জানায় যে, অনেক গন্ডগোল হচ্ছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তিনি আবার পিলখানায় ফিরে যাবেন। তিনি তখন ছেলের সঙ্গে দেখা করার জন্য গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হন। ঢাকায় এসে তাঁর ছেলে মাসুমকে জিজ্ঞেস করেন বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় তাঁর কোন ধরণের সম্পৃক্ততা আছে কিনা? মাসুম তাঁকে জানান যে, তিনি কোনও অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। ২০০৯ সালের পহেলা মার্চ সরকার কর্তৃক সকল বিডিআর সদস্যদের চাকুরীতে যোগদানের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলে তিনি ওই দিন মাসুমকে কাজে যোগদানের নির্দেশ দেন এবং মাসুম তাঁর কথায় রাজি হন। তখন তিনি ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে পিলখানায় উপস্থিত হন। কিন্তু সেদিন মাসুম চাকুরীতে যোগদান করতে পারেননি। পরদিন তিনি ২রা মার্চ আবারও পিলখানায় মাসুমকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হন। কিন্তু মাসুম সেদিনও কাজে যোগদান করতে পারেননি। ৩রা মার্চ তিনি মাসুমের সঙ্গে যেতে পারেননি কিন্তু তাঁর আরেক ছেলে আলী আকবরকে মাসুমের সঙ্গে পাঠান। সেদিন মাসুম চাকুরিতে যোগদান করেন।

৭ই মার্চ ২০০৯ তারিখে সন্ধ্যায় টিভিতে সংবাদ দেখার সময়ে তিনি তাঁর ছেলেকে প্রিজন ভ্যানের মধ্যে বসে থাকতে দেখে বুঝতে পারেন যে, তাঁর ছেলেকে আটক করা হয়েছে। তিনি জানতে পারেন তাঁর ছেলেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মালিবাগ সিআইডি অফিসে নেয়া হয়েছে। ৮ই মার্চ মাসুমকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। মাসুমকে, সিআইডি ও পুলিশ ছাড়াও সেনাবাহিনী ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থার লোকজন জিজ্ঞাসাবাদের সময়ে নির্দয়ভাবে নির্যাতন করে। তাঁর ছেলেকে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা বেশী নির্যাতন করে বলে তিনি জানান।

তিনি জানান মাসুমকে প্রথম দফা রিমান্ড শেষে দ্বিতীয় দফা তিন দিনের জন্য রিমান্ডে নেয়া হয়। তিনি বলেন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি তাঁর ছেলেকে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করে এবং র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরাও নির্যাতন করে। তাঁকে সিলিং এর সঙ্গে ঝুলিয়ে পায়ের পাতা থেকে শরীরের সব জায়গায় পেটানো হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত মাসুম সাদা কাগজে স্বাক্ষর দেয়নি এবং তাঁর কাছ থেকে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করতে পারেনি ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর ওপর অকথ্য নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের কারনে মাসুম অজ্ঞান হয়ে যান। জ্ঞান ফিরে আসার পরে তাঁকে আবারও পেটানো হয়। তাঁকে সকাল বিকাল পর্যায়ক্রমে দুই বেলা নির্যাতন করা হয়।

মাসুমের মা বলেন, কেন্দ্রীয় কারাগারে মাসুমের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে এসব নির্যাতনের কথা জেনেছেন। রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করে পিলখানায় জড়িত থাকার দায় স্বীকারে মাসুমকে বাধ্য করা হয় বলে তিনি জানান।

১৭ই মার্চ ২০০৯ তারিখে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মাসুমকে নিয়ে আসা হলে তিনি দেখতে পান যে, মাসুম হামাগুড়ি দিয়ে পুলিশের গাড়ি থেকে নামছে। সে সময়ে মাসুম দাঁড়াতে কিংবা হাঁটতে সক্ষম হয়নি। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তিনি তাঁর ছেলেকে দেখে চিনতে পারেননি। তাঁর গোটা শরীরেই নির্যাতনের চিহ্ন বেশ স্পষ্ট দেখা যায়। তিনি মাসুমের কাছ থেকে জানেন যে, নির্যাতনের ফলে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে স্যালাইন দিয়ে চিকিৎসা করে আবারও নির্যাতন করা হতো। উপর্যুপরি নির্যাতনে মাসুমের গলার স্বর তাঁর কাছে অস্বাভাবিক লাগে।

তিনি জানান, মাসুমের ট্রাঙ্কে বিডিআর মহাপরিচালকের হাতের লাঠি পাওয়া গেছে বলে তাকে অভিযুক্ত করা হয়। অথচ এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দ লাঠিটি দরবার হলের পাশে পাওয়া গিয়েছে বলে জানিয়েছেন।

মাসুমের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগে মামলা হয় বলে তিনি দাবি করে বলেন, নির্যাতন করে প্রথমে তাঁর ছেলের স্বীকারোক্তি আদায় করা হয় এবং সিপাহী মোঃ ফজলুল হককে দিয়ে মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।

এ ব্যাপারে এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দ জানান, আল মাসুমের বিডিআর আদালতে সাজা হয়েছে এবং অন্য মামলা ফৌজদারী আদালতে বিচারাধীন আছে।
তৎকালীন বিডিআর মহাপরিচালকের লাঠি আল মাসুমের ট্রাঙ্কে উদ্ধার এবং এ সংক্রান্ত মামলার বিষয়ে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।