ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

সেনাবাহিনীতে অতীতে গঠিত সব সামরিক আদালতের বিচারের নথি উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির স্বজন ও মানবাধিকার কর্মীরা।
এ দাবির পক্ষে মত দিয়েছেন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক ও একজন বিচারক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. আনোয়ার হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া বিতর্কিত সব কোর্ট মার্শালের দলিল উন্মুক্ত করা উচিত।”
১৯৭৬ সালে সামরিক শাসনামলে সংক্ষিপ্ত সেনা আদালতের বিচারে ফাঁসি হওয়া মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও জাসদ নেতা কর্নেল আবু তাহেরের ভাই আনোয়ার হোসেন বলেন, “আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও সেই প্রহসনের বিচারের নথিপত্র আজো আদালতে জমা দেয়া হয়নি।”
ওই বছরের ২১ জুলাই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় কর্নেল তাহেরের। এর কয়েক বছর আগে তিনি সামরিক বাহিনী থেকে অবসর নেন।
তাহের ছাড়াও ৩৩ জনের বিরুদ্ধে তখন অভিযোগ আনা হয়েছিলো, যার মধ্যে ছিলেন তার ভাই আনোয়ার হোসেনও।
তিনি বলেন, “অন্তত কোর্ট মার্শালে শাস্তি পাওয়া আত্মীয়-স্বজনরা জানুক কি অপরাধে তাদের স্বজনের শাস্তি হয়েছে।”
২০১০ সালে উচ্চ আদালত এক রায়ে কর্নেল তাহেরের মৃত্যুদণ্ডকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন বলে অভিহিত করে।
ট্রান্সপারেন্সি ইনটারন্যাশনাল বাংলাদেশের এর চেয়ারপারসন এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেন, “এসব (কোর্ট মার্শাল) এর দলিল তথ্য অধিকার আইনের আওতায় উন্মুক্ত করা যেতে পারে। দলিল উন্মুক্ত করা না হলে মানুষ কখনোই সত্য জানতে পারবে না।”
‘‘উন্মুক্ত করা হলে মানুষ জানতে পারবে ইতিহাস কোন ধারায় গেছে। অতীতে বাংলাদেশে গণতন্ত্র কিভাবে ব্যাহত হয়েছে,” মন্তব্য করেন তিনি।
একই মত দিয়ে বিচারপতি গোলাম রাব্বানী বলেন, কর্নেল তাহেরের মতো ‘প্রহসনমূলক’ বিচারের গোপন নথি উন্মুক্ত করতে তথ্য অধিকার আইনই যথেষ্ট।
“আমার মনে হয় জাতীয় সংসদে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব আনতে পারেন সংসদ সদস্যরা,” মত দেন তিনি।
সাবেক বিচারক গোলাম রাব্বানী বলেন, “যে আমলেই হোক, কর্নেল তাহেরসহ এ ধরনের কোর্ট মার্শালের সময় যেসব অন্যায় হয়েছে তার দলিলপত্র উন্মুক্ত করা উচিত।”
“এসব গোপন নথি অবমুক্ত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অজুহাত ঠিক না” বলেও মন্তব্য করে তিনি বলেন, এসব অজুহাত জনগণের সঙ্গে ‘ধোঁকাবাজি’ ছাড়া আর কিছুই নয়।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আকবর আলি খান বলেন, “এক পর্যায়ে না এক পর্যায়ে এসব দলিল তো উন্মুক্ত করতেই হবে।”
‘‘তবে কোনো দেশ দীর্ঘ সময়ে করে (উন্মুক্ত), কোনো দেশ কম সময়ে (উন্মুক্ত)”, বলেন সাবেক এই শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, প্রয়োজনে রাষ্ট্র এমন (উন্মুক্ত করার) সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান মনে করেন কিছু কিছু ‘বিচারের’ নথি উন্মুক্ত করা উচিত। যেমন কর্নেল তাহের এর ‘প্রহসনমূলক’ বিচার।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টানেন ওয়ালিউর রহমান। তিনি বলেন, আমেরিকায় ৩০ বছর পর পর গোপন দলিল উন্মুক্ত করে তা লাইব্রেরি অব কংগ্রেসে রাখা হয়। পরে তা জনগণ দেখতে পারে। ব্রিটেনে গোপন নথি উন্মুক্ত করা হত ২৮ বছর পরপর।
জেনারেল জিয়াউর রহমান সরকারের আমলে বিভিন্ন কোর্ট মার্শালের ঘটনার ইতোমধ্যেই ৩০ বছরের বেশি পার হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন,“সে সময়ে অনেককেই বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে। সেগুলো (বিচারের নথি) কি বের করা যাবে না?”
ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস তার বহুল পরিচিত বই ‘বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’-এ লিখেছেন, “জিয়াউর রহমানের সাড়ে পাঁচ বছরের শাসনামলে ২০টি বিদ্রোহ, অভ্যুত্থান চেষ্টা হয়।”
সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর কোর্ট মার্শালে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
(প্রতিবেদনটি বিডিনিউজ২৪ডটকম এ প্রকাশিত হয়েছে। )