ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

ফ্ল্যাট নম্বর এ-৪

তিন রুমের ‘এ-৪’ নম্বর ফ্ল্যাটে সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির ক্ষত-বিক্ষত লাশ পড়েছিলো তাদের বেডরুমে। অন্যরুমগুলো ছিলো ঠিকঠাক। রান্নাঘরের জানালার একটি গ্রিল ছিলো কাটা। ফলে জানালায় ১ ফুট ৮ ইঞ্চি সমান ফাঁকা সৃষ্টি হয়। মাপটি নিয়েছিলো পুলিশ।

——– তিনটি কারণ: পুলিশ

তেজগাঁও জোন এর ডিসি ইমাম হাসান প্রথমে (১৪ই ফেব্র“য়ারি) বলেছিলেন, “তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে তদন্ত চলছে।” ১. পেশাগত ২. সম্পত্তি ও ৩. ব্যক্তিগত শত্র“তা।

——– তিনটি কারণ হয়ে গেলো দ্বিগুন, ছয়টি

পরদিনই (১৫ই ফেব্র“য়ারি) তিনটি কারণ হয়ে যায় দ্বিগুন। অর্থাৎ ছয়টি! ডিসি মনিরুল ইসলাম এদিন প্রথমবারের মতো ডাকাতি বা চুরির বিষয়টিকে তদন্তে আনার কথা বলেন। স্মিতহাস্য এই অফিসারের একদিনের মধ্যেই আবিস্কার করা নতুন আরো তিনটি কারণ সৃষ্টি করলো অনেক প্রশ্নের! হঠাৎ দ্বিগুন হলো কেনো?

মনিরুল জানান, খুনের পর সাগর সরওয়ার এর একটি ল্যাপটপ ও তাঁর মোবাইল ফোন সেট, স্বর্ণালংকার ও ১১শ ইউরো ওই বাড়ি থেকে খোয়া গেছে।
প্রশ্ন-১: তাহলে খুনীরা সাংবাদিক মেহেরুণ রুনির মোবাইল ফোন সেট নিলো না কেনো? সেটি তো রুমেই ছিলো!
প্রশ্ন-২: পাশের রুমে আরেকটি ল্যাপটপ ছিলো। সেটা নিলো না কেনো? (যদিও সেই ল্যাপটপটি নষ্ট। কিন্তু, খুনীতের তো জানার কতা নয় যে সেটি নষ্ট!)
প্রশ্ন-৩: সাগরের ল্যাপটপ ও মোবাইলে কী কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিলো?
প্রশ্ন-৪: পুলিশ কি সেটা আমলে নিচ্ছে না? নাকি গোপন করার চেষ্টা করছে?

—– অপেশাদার খুনি:
ময়নাতদন্ত শেষে ফরেনসিক ডাক্তার বলেছিলেন এটা অপেশাদার খুনির কাজ। পেশাদার খুনি হলে এভাবে হত্যা করতো না।

যদি তাই হয়, অপেশাদার খুনি অবশ্যই কোন না কোন আলামত রেখে যাবে! এমকি পেশাদার খুনিও তার অজান্তে রেখে যায় আলামত।
প্রশ্ন-১: তাহলে কি ঘটনা আড়াল করতেই তদন্তের সম্ভাব্য তিনটি ক্ষেত্র হয়ে গেলো ছয়টি? নাকি কোন অদৃশ্য চাপ রয়েছে পুলিশের ওপর?
প্রশ্ন-২: পুলিশ কি যথেষ্ট সক্ষমতা, যোগ্যতার সাথে স্বাধীনভাবে মামলাটির তদন্ত করতে পারছে না?

———- প্রথম ব্যর্থতা—– আঙ্গুলের অস্পস্ট ছাপ

ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের পৌছানোর এক ঘন্টারও বেশ সময় পর সিআইডির কথিত বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে যায়। একজন এএসপি এর নেতৃত্ব দেন। পরে যান সিআইডির বিশেষ সুপার আবদুল কাহার আখন্দ। যাকে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিবেচনা করে বাংলাদেশ পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে তারা খুনে ব্যবহার করা বটি ও অন্যান্য আলামত সংগ্রহ করেন। তারপরও তারা বলছেন ফিঙ্গার প্রিন্ট অস্পষ্ট!
প্রশ্ন-১: এতো বড় ঘটনায়ও কোন স্পষ্ট ফিঙ্গার প্রিন্ট পাওয়া গেলো না? এটা বিশ্বাসযোগ্য?
প্রশ্ন-২: যদি ফিঙ্গার প্রিন্ট অস্পষ্ট হয় তাহলে সিআইডি কি যথেষ্ট দক্ষতার সাথে আলামত সংগ্রহ করতে পারেনি?
প্রশ্ন-৩: খুনী কি কোন আলামতই রেখে যায়নি? এটা বিশ্বাসযোগ্য?
প্রশ্ন-৪: মেহেরুন রুনির ভাই নওশের রোমান এর ভাষ্য মতে, যে ব্যাগে স্বর্ণালংকার ছিলো সেই ব্যাগ নেয়নি খুনীদল। শুধু স্বর্ণালংকার নিয়েছে। স্বর্ণালংকার খোয়া যাবার ঘটনা যদি সত্যি হয় তাহলে সেই ব্যাগ এ নিশ্চয়ই খুনীদের কারো না কারো আঙ্গুলের ছাপ থাকার কথা রয়েছে। তা সনাক্ত করতে ব্যর্থ হলো কেনো সিআইডি? তারা কি সেখান থেকে কোন ছাপ সংগ্রহ করেনি?

——– জামিন পাওয়া ডাকাত দিয়ে মহড়া

বাস্তবে অনেকটাই অসম্ভব হলেও ১ ফুট ৮ ইঞ্চি ফাঁক গলিয়ে খুনী পালানোর মহড়া দিয়েছে পুলিশ। একটি ডাকাতি মামলার জামিন পাওয়া এক অভিযুক্ত ডাকাতকে ভাঙা গ্রিল দিয়ে পাইপ পেয়ে নিচে নামিয়েছে তারা। জামিন পাওয়া অভিযুক্ত ডাকাত নাকি অনায়াসেই এই মহড়ায় সফল হয়েছে। এমন দাবি পুলিশের!

তবে, প্রথম দিন তেজগাঁও জোন এর উপপুলিশ কমিশনার ইমাম হাসান ও শেরে বাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেছিলেন, এই ফাঁক গলে শুধুমাত্র হাল্কা পাতলা গড়নের শিশুই ঢুকতে বা বের হতে পারে! ঘটনার আট দিন পর শিশুর বদলে সন্দেহভাজন ডাকাত ঢোকার মহড়া দিয়ে কি প্রমাণ করতে চাইছে পুলিশ?

—— ১ ফুট ৮ ইঞ্চি সমান গ্রীল কাটা

চলুন দেখা যাক ১ ফুট ৮ ইঞ্চি গ্রিল দিয়ে কারো ঢোকা বা বের হওয়া সম্ভব কিনা।

রান্নাঘরের জানালার একটি মাত্র রড এর এক দিক কাটা ছিলো। পুলিশ এর মাপেই এর দৈঘ্য ছিলো ১ ফুট ৮ ইঞ্চি। ভাঙা রডটি রান্নাঘরের ভেতরের দিকে কয়েক ইঞ্চি বাঁকা হয়ে ছিলো।
প্রশ্ন-১: নীচতলা থেকে পাঁচতলা পর্যন্ত পাইপ বেয়ে ১ ফুট ৮ ইঞ্চি গলে প্রাপ্তবয়স্ক কোন মানুষের ভেতরে ঢোকা কী সম্ভব?
প্রশ্ন-২: যদি কেউ ‘দৈবক্রমে’ (খেয়াল করুণ আমি বলছি, ‘দৈবক্রমে’) ঢোকেও কাটা রডটি ভেতরে মাত্র কয়েক ইঞ্চি বেঁকে থাকবে কেনো? বেঁকে তো থাকার কথা ১৮০ ডিগ্রি বা তার বেশি। কারণ খুনীরা তা বাইরে থেকে ধাক্কা দিয়ে যথেষ্ট জায়গা তৈরী করার চেষ্টা করবে। অথচ রডটি ভেতরের দিকে বাঁকা অবস্থায় ছিলো মাত্র কয়েক ইঞ্চি।
প্রশ্ন-৩: বাইরে থেকে রডটি ভেতরের দিকে ধাক্কা দিলে তা কমপক্ষে পূর্ণ বয়স্ক মানুষের হাতের সমান অর্থাৎ দুই থেকে আড়াই ফুট (ভেতরের দিকে) থাকার কথা। অথচ তা ছিলো মাত্র কয়েক ইঞ্চি।

খুন করার পর কাটা গ্রিল দিয়ে বাইরে যাবার ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য! ১ ফুট ৮ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যরে ফাঁক গলে একজন পূর্ণ বয়স্ক ব্যক্তির পক্ষে বেরিয়ে য্ওায়া সম্ভব কী?

তাহলে? গ্রিলটা কি প্লাস্টিকের যে ১৮০ ডিগ্রি বা তার চেয়ে বেশি বাঁকা করার পর তা আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে? প্রায় একদম সোজা থাকার কথা নয়!

খুনীরা ডাকাতি বা চুরির জন্য আসলে অবশ্যই তাদের কাছে চুরি বা ডাকাতির সরঞ্জাম থাকার কথা। তার মধ্যে গ্রিল কাটার সরঞ্জাম এবং ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্রও থাকার সম্ভাবনা বেশি।
আর গ্রিল কাটার সরঞ্জাম তাদের কাছে থাকলে মাত্র একটা রড কাটবে কেনো তারা? অন্তত একাধিক রড কেটে আরামে ভেতরে ঢোকা বা বের হবার চিন্তাই তো করবে যে কোন খুনী/ডাকাত/দুর্বৃত্ত।

————- একজোড়া স্যান্ডেল ও অস্পষ্ট পায়ের ছাপ:

ঘটনার দুই দিন পর দুই ভবনের মাঝখানের গলি থেকে একজোড়া নতুন স্যান্ডেল খুঁজে পাওয়ার কথা বলেছে পুলিশ সূত্র। গলিতে পাওয়া গেছে পায়ের ছাপ। সব সংগ্রহ করেছে সিআইডি!
প্রশ্ন-১: খুনীরা কি স্যান্ডেল ফেলে যাবে? এটা বিশ্বাসযোগ্য?
প্রশ্ন-২: গলিটা কি ‘নো ম্যান্ডস ল্যান্ড’ যে, কেউ যেতে পারে না বা যাবার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আছে? যে কেউ তো যেতে পারে গলিতে! একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিও!

—— গোঙানির শব্দ
ঘটনার দিন পুলিশের হাতে আটক (পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে) নিরাপত্তা কর্মী পলাশ রুদ্র পাল সাংবাদিকদের জানান, ফজরের নামাজের আগে ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সভাপতি নুরুন্নবি তাকে টেলিফোনে (ইন্টারকমে?) জানান যে, উপরে চিৎকার ও কান্নাকাটির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। নুরুন্নবী তাকে ভবনটির দরজা ভালোমতো বন্ধ করার নির্দেশ দেন বলেও জানান পলাশ। নুরুন্নবীও পরে সাংবাদিকদের জানান, তিনি গোঙানির শব্দ শুনেছিলেন। নুরুন্নবী বাস করেন তিন তলায়।

প্রশ্ন-১: নুরুন্নবী যদি তার নিরাপত্তা প্রহরীকে সতর্ক করেন তাহলে খুনীরা পালালো কিভাবে?
প্রশ্ন-২: নুরুন্নবী তিন তলা থেকে গোঙানির শব্দ পেলে পাশের ফ্ল্যাট এর (এ-৩) (সাংবাদিক দম্পত্তি থাকতো এ-৪) মানুষরা কোন শব্দ পায়নি? এটা বিশ্বাসযোগ্য? যদি শব্দ পায় তারা কি করেছিলো?
প্রশ্ন-৩: মুল ফটক থেকে কাউকে সে সময় বের হতে দেখেনি নিরাপত্তা কর্মী! তাহলে খুনীরা কি ভবনটির কোন ফ্ল্যাটেই অবস্থান করেছিলো? পরে কি শত শত মানুষের ভিড়ে পালিয়ে যায় খুনীরা?

—– তৈরী হয়নি সম্ভাব্য খুনীর স্কেচ

ঘটনার দিনই অন্তত দুটি টেলিভিশন চ্যানেলে সাংবাদিক দম্পত্তির পাঁচ বছরের ছেলে মেঘ জানিয়েছিলো যে সে দুইজনকে দেখেছে। মেহেরুন রুনির ভাই নওশের রোমান জানান, গত ১৬ই ফেব্র“য়ারি র‌্যাব এর একটি টিম গিয়েছিলো তাদের বাসায়। মেঘ র‌্যাব এর একজন লম্বা সদস্যকে দেখিয়ে বলেছে খুনিদের একজন তার (র‌্যাব এর লম্বা সদস্যটির) মতোই ছিলো লম্বা। নওশের রোমান জানান, মেঘ তাদের বলেছে খুনিরা মেঘ এর গলাও চেপে ধরেছিলো। মেঘ জানায়, খুনিদের একজনের নখ ছিলো অনেক বড়। পুলিশ জানায়, মেঘ যতটুকু বলতে পেরেছে তাতে খুনির গড়ন সম্পর্কে একটা সম্ভাব্য ধারণা পাওয়া গেছে।

প্রশ্ন-১: পুলিশ যদি সম্ভাব্য খুনির গড়ন সম্পর্কে জানতেই পারে তাহলে পেশাদার আঁকিয়ে এনে খুনি/খুনিদের মুখায়ব আঁকা হচ্ছে না কেনো? পুলিশ কি এসব জানে না? নাকি সম্ভাব্য মুখায়ব আঁকার পর অন্য কোন আসামি (সাজানো) হাজির করা হলে চেহারার অমিলে ফাঁস হয়ে যাবে জারিজুরি?

***
ফিচার ছবি: http://www.bijoynews24.com থেকে সংগৃহিত