ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ব্লগ সংকলন: সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড

তথ্য অধিকার আইন নিয়ে দুটো লেখার প্রথম এটি। আজকে থাকছে পুরোনো প্রসঙ্গ। সবাই জানেন। অনেক লেখালেখি হয়েছে। তারপর সবাই চুপ। লেখাটি এর আগেও প্রকাশ হয়েছে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে আবারো একটু ঝালাই করে নিচ্ছি। গণমাধ্যমগুলোতে ‘নানা কারণে’ ফলোআপ স্টোরি করা সবসময় সম্ভব হয় না। আমি আবারো বলছি ‘নানা কারণে!’

তথ্য অধিকার আইন নিয়ে আজকের লেখার বিষয়: তথ্য অধিকার আইন-২০০৯: সুরাহা হয়নি একটি প্রশ্নের!

দ্বিতীয় লেখায় থাকবে … সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কিছু কথা ও তথ্য অধিকার আইন।

লেখাটি একটু বড় হয়ে গেলো। যারা বিরক্ত হবেন, ক্ষমা করে দিয়েন। প্রসঙ্গে আসি এবার..

২০০৫ সালে দি ডেইলি ইনডিপেনডেন্ট ছেড়ে যোগ দেই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এ। ২০০৬ সালের ৩১শে ডিসেম্বর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ছেড়ে চলে যাই প্রাইভেট টেলিভিশন বাংলাভিশন এ। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ছেড়ে যাওয়ার কিছুদিন আগে প্রতিষ্ঠানটিতে নিউজ এডিটর হিসেবে যোগ দেন জনাব খালেদ মুহীউদ্দিন। এখন ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে কাজ করছেন তিনি।

প্রথম আলো থেকে আসা খালেদ মুহীউদ্দীন রিপোর্টার্স মিটিংয়ে বেশ কিছু ভালো রিপোর্ট এর পরিকল্পনার কথা জানান। রিপোর্টাররাও জমা দেন নিজ নিজ রিপোটিং পরিকল্পনা। ভাগ করে দেয়া হয় কে, কোন রিপোর্ট করবেন। আমার ভাগ্যে পড়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক (তখন) জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনীদের (২০০৯ সালের ২৮ জানুয়ারি যাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়) নিয়ে রিপোর্ট করতে হবে।

সে (২০০৬) সময় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফজ্জামান বাবর দোর্দন্ড প্রতাপে মন্ত্রণালয় চালাচ্ছেন। রিপোর্টার্স মিটিং এ খালেদ মুহীউদ্দিন জানান, সেই খুনীরা কারাগার থেকে কর্তৃপক্ষকে ‘ম্যানেজ করে’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে নিয়মিত আসছেন বলে শুনেছেন। আত্মীয় স্বজনদের সাথে গল্পগুজব করে সময় কাটান। তিনি আমাকে রিপোর্টটা করতে বললেন। রাজি হলাম।

পরদিনই হাড়ে হাড়ে টের পেলাম হুটহাট সম্মতি জানানোটা আসলেই ঠিক হয়নি। বাসে ঝুলে সকালে গেলাম তখনকার কারা মহাপরিদর্শক এর অফিসে। আমার কথা শুনেই কর্তৃপক্ষ যেনো আকাশ থেকে পড়লেন। অনেকটা ধমকের সুরেই বললেন, কে বলেছে বঙ্গবন্ধূর খুনীরা নিয়মিত প্রিজন সেলে যাচ্ছেন? এসব তথ্য আপনারা (সাংবাদিকরা) কোথায় পান?

তবে অসুস্থ হলেই তাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাসপাতালের (তখনকার নাম পিজি হাসপাতাল) প্রিজন সেলে পাঠানোর কথা স্বীকার করেন কারা কর্তৃপক্ষ। আমি তখন জানতে চাইলাম, কবে, কোন রোগে এবং কতবার বঙ্গবন্ধুর খুনীরা হাসপাতালের প্রিজন সেলে গেছেন? কোন ডাক্তারের অধীনে চিকিৎসা হয়েছে? আমার প্রশ্নে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন কারা কর্তৃপক্ষ। নানা আইন দেখিয়ে রুম থেকেই বের করে দিলেন আমাকে। রিপোর্ট হবে – কি হবে না, তা ভাবছি।

কিন্তু হাল ছেড়ে দেয়নি।

কারাগারেরই গোপন এক সোর্স এর মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর, সিল সম্বলিত লিখিত তথ্য উদ্ধার করতে সম্মত হই আমি। অ্যাসাইনমেন্ট দেবার দুদিন পরই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এ লিড নিউজ ছাপা হয়: ‘বঙ্গবন্ধুর খুনীরা এক বছরে ১৮ বার পিজি হাসপাতালের প্রিজন সেলে গেছেন। সবাই একই রোগে আক্রান্ত। নাক, কান, গলা।’

কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়মতান্ত্রিক পথে তথ্য চেয়ে এমন বিড়ম্বনায় পড়েছেন অনেক সাংবাদিক। সরকারি তথ্য চাইতে গিয়ে ব্রিটিশ আমলের ‘দি অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩’ নামক খগড় দিয়ে এতোদিন সাংবাদিকদের সাধারণ তথ্য দিতে নানা টালবাহানা করতেন সরকারি কর্মকর্তারা। আর সাধারণ মানুষ তো সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে তথ্য চাইবার বিষয়টি কোনদিন স্বপ্নেও দেখেননি। তবে, ‘দি অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩’ নামক জুজুর ভয় দেখানোর সময় এখন চলে গেছে। তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ http://www.moi.gov.bd/RTI/RTI.pdf) পাস হবার পর তথ্য পাবার ক্ষেত্রে আর কোন বাধাই নেই। বাংলাদেশ ৮৮তম দেশ, যেখানে তথ্য অধিকার আইন কার্যকর হলো।

কিন্তু, একটা সমস্যা থেকেই গেছে। বলছি পরে।

মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রে তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার সংরক্ষিত আছে। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক চুক্তিপত্রে (international Covenant on Civil and Political Rights-ICCPR) একে একটি আইনগত অধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০০ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ এই চুক্তিপত্রে সম্মতি জানায়। পরে, বাংলাদেশ ল’ কমিশন তথ্য অধিকার আইন-২০০২ নামের একটি কর্মপত্র প্রণয়ন করে। নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে ২০০৮ সালের ২০ শে অক্টোবর রাষ্ট্রপতি তথ্য অধিকার অধ্যাদেশ-২০০৮ জারি করেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ২৯ মার্চ নবম জাতীয় সংসদে তথ্য অধিকার আইন বিল-২০০৯ পাস হয়। ৫ই এপ্রিল রাষ্ট্রপতি বিলে সম্মতি দেন। পরে ৬ই এপ্রিল আইনটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। পহেলা জুলাই থেকে আইনটি কার্যকর হয়। আর আইন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২রা জুলাই গঠন করা হয় তথ্য কমিশন ।

‘দি ইউনাইটেড নেশনস হিউম্যান রাইটস চার্টার ১৯৪৮’ এর ১৯ নম্বর ধারায় স্পষ্টভাবেই মত প্রকাশের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। এই অধিকারের আওতায় শুধু মত প্রকাশ করা নয়, গণমাধ্যমের মাধ্যমে যেকোনো তথ্য ও ধারণা জানার, গ্রহণ করার এবং ছড়িয়ে দেওয়ার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ এই চার্টারে স্বাক্ষর করেছে ১৯৭২ সালে। একই ঘোষণা লক্ষ্য করা যায়, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তিপত্রে (international Covenant on Civil and Political Rights – ICCPR), মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা সংক্রান্ত ইউরোপীয় চুক্তিপত্রে (European Covenant on Human Rights and Fundamental Freedoms- EHR) এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত মার্কিন চুক্তিপত্রে (European Covenant on Human Rights and Fundamental Freedoms- EHR)। ১৯৬৬ সালের ‘নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক চুক্তিতে ২০০০ সালে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এই চুক্তি অনুসারে সরকার জনগণের কাছে সব ধরণের তথ্য উন্মুক্ত রাখতে বাধ্য।

সংবিধানের ৭ ও ১১ অনুচ্ছেদ জনগণের জানার অধিকারকে স্বীকার করেছে। ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। একইভাবে ১১ অনুচ্ছেদে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে যা ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানুষের মর্যাদা ও জীবনের অধিকারকে সম্মান দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে।

তবে, এর মাঝেই শুভংকরের ফাঁকির মতোই পার পেয়ে গেছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ এর আওতায় সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি এবং বিদেশী সাহায্যপুষ্ট এনজিওকে আনা হলেও বাংলাদেশে ব্যবসা করা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বাইরে রাখা হয়েছে।

জনগন কি সেসব কোম্পানীর তথ্য পাবার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে? যে দেশে তারা ব্যবসা করছে, সেদেশের জনগনের কাছে সেসব বহুজাতিক কোম্পানি কি জবাবদিহিতা করবে না? নাকি এসব বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই? তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ এ বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বাইরে রাখাকে অনেকেই ‘রহস্যজনক’ বলছেন। এ নিয়ে গত তিন বছরে অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু, সুরাহা হয়নি কিছুই।

বহুজাতিক কোম্পানীর তথ্য না দেয়ার একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করছি।

একটি বহুজাতিক মোবাইল ফোন কোম্পানীর ইন্টারনেটের বাজার থেকে iPhone 3g 16gb white মডেলের একটি ফোন কেনেন ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার জিয়া। চার মাস ব্যবহারের পরই ঘটে বিপত্তি। একদিন তার বাসায় হানা দেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের কয়েকজন সদস্য। পুলিশ সদস্যরা জানায়, এটি চোরাই ফোন। জিয়ার কাছে ফোন কেনার ঘটনা শুনে পুলিশও বেশ হতচকিত হয়ে যান। ফোন কোম্পানিটির ইন্টারনেটের বাজারে তাহলে কি চোরাই জিনিসপত্র বিক্রি হচ্ছে? ঘটনাটি জানার পর সেই বহুজাতিক টেলিফোন কোম্পানীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা চালান কয়েকজন সাংবাদিক। কিভাবে এমন চোরাই জিনিসপত্র বিক্রি হচ্ছে তাদের সাইটে। চোরদের ওপর তাদের কি কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। ইত্যাদি নানা প্রশ্ন করা হলেও এর কোনই উত্তর দেয়নি কোম্পানীর কেউ। কারণ তারা বাধ্য নয়। তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ তাদের তথ্য দেয়ার ক্ষেত্রে বাধ্য করেনি। এখন উপায়? তাহলে কি ইন্টারনেটের এই বাজারটি চোরাই বাজারে পরিণত হবে। এটা কি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না? এর সাথে কি মোবাইল ফোন কোম্পানীর কেউ জড়িত থাকতে পারেন? এমন অনেক প্রশ্ন ঝুলে আছে।

যারা কোটি কোটি ডলার মুনাফা নিয়ে যাচ্ছে নিজ দেশে। এসব কোম্পানিগুলোর তথ্য জানার অধিকার কি বাংলাদেশের মানুষের নেই?