ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

একটি ফোন কল:

“আইয়ুব ভাই, আমাকে সম্ভবত ছিনতাইকারী বা সন্ত্রাসীরা ধাওয়া করেছে। আমাকে কিডন্যাপ করা হচ্ছে,” ভয়ার্ত কণ্ঠে জানালেন নাজমুল ইসলাম।

“আপনি এখন কোথায়?” জানতে চাইলেন উদ্বিগ্ন তালহা শাহরিয়ার আইয়ুব।

“আমি এই মুহুর্তে মোহাম্মদপুর থানার সামনে,” জানালেন ভীত নাজমুল ইসলাম।

তারপরই ফোন বন্ধ। সময় রাত ১১টা ৫৭ মিনিট। তারিখ ১৫ই ডিসেম্বর, ২০১১।

রাজধানীর মিরপুরের একটি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ধানমণ্ডিতে নিজের বাড়িতে ফিরছিলেন নাজমুল। অপহরণের ঠিক আগ মুহুর্তে এটাই ছিলো কুষ্টিয়ার বাঘাবাড়ি থানা বিএনপির সভাপতি তালহা শাহরিয়ার আইয়ুবের সাথে নাজমুলের শেষ কথা।

পরদিন সকালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে গলায় গামছা প্যাঁচানো অবস্থায় উদ্ধার করা হয় নাজমুল ইসলামের লাশ। তিনি ছিলেন যশোরের ঝিকরগাছা থানা বিএনপির সভাপতি এবং যশোর জেলা বিএনপি নেতা।

২০১১ সালের শেষমাসে গুপ্তহত্যার সবশেষ চাঞ্চল্যকর ঘটনা ছিলো এটি।

শুরুটা বেশ আগে হলেও, ২০১১ সালে গুম আর গুপ্তহত্যার বিষয়টি বেড়ে যায় আশংকজনকহারে। নাজমুলের মতো ২০১১ সালে গুম ও গুপ্তহত্যার শিকার হন কমপক্ষে ৩০ জন। কারো কারো লাশ ধলেশ্বরী নদীতে পাওয়া গেলেও বেশিরভাগের হদিস মেলেনি আজো।

সবশেষ গুম হলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী।

গুপ্তহত্যা-দেশে দেশে :

২০০৪ সালে র‌্যাব গঠনের পর ‘ক্রসফায়ার’, ‘লাইন অব ফায়ার’ ও ‘বন্দুকযুদ্ধ’ শব্দগুচ্ছের সাথে বেশ পরিচয় ঘটে দেশের মানুষের। এর ক’বছর পর যোগ হয় নতুন দুটি শব্দ — — ‘গুপ্তহত্যা’ আর ‘গুম’। বাংলাদেশে নতুন হলেও পৃথিবীতে কিন্তু মোটেও নতুন নয় শব্দটি।

রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে গুম ও গুপ্তহত্যার ঘটনা চলে আসছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনীর গড়া সিক্রেট পুলিশ ফোর্স ‘গেস্টাপো’র হাতে শত শত মানুষের গুম হবার কথা জানা রয়েছে সবার।

তবে, গুম ও গুপ্তহত্যার মতো জঘন্য কাজে সবচেয়ে বেশি নিন্দিত হয়েছেন চিলির সাবেক স্বৈরশাসক অগাস্টা পিনোশে। তার আমলে কমপক্ষে ৩,০০০ বামপন্থী রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী গুপ্তহত্যার শিকার হন।

আলজেরিয়ার বিভিন্ন ইসলামপন্থী দল ও (ইসলামিক আর্মড মুভমেন্ট , ইসলামিক সালভেশন আর্মি, ইসলামিক গ্র“প ইত্যাদি) সেনাবাহিনীর মধ্যকার ১৯৯১ সালে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধের পর শুরু পর শত শত ইসলামপন্থী সদস্য গুপ্তহত্যার শিকার হন। সরকারী হিসেবে এ গৃহযুদ্ধের সময় গুম বা গুপ্তহত্যার শিকার হন ৩০০০ জন। তবে ইসলামপন্থীদের দাবি, এ সংখ্যা ১৭,০০০।

১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্য ন্ত আর্জেন্টিনায় সামরিক শাসনামলে ‘অপারেশন কনডোর’ এ ৩০,০০০ এর মতো মানুষ গুম এবং গুপ্তহত্যার শিকার হয়। সরকারী হিসেবে এ সংখ্যা ৯,০০০।

কলম্বিয়ায় অভ্যন্তরিণ সংঘাতে প্যারামিলিটারি ফোর্স এবং গেরিলা গ্র“প এর হাতে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ২৮,০০০ জনের গুম ও গুপ্তহত্যার পরিসংখ্যান মিলেছে।

পৃথিবীর যেসব দেশে গুপ্তহত্যার মতো নৃশংস কাজ প্রথম শুরু হয়, গুয়েতেমালা সেগুলোর অন্যতম। ১৯৯৬ সালে শেষ হওয়া গৃহযুদ্ধে ৪৫০০০ মানুষ গুম এবং গুপ্তহত্যার শিকার হন।

ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলে ‘অপারেশন আনফাল’ এর সময় হাজার হাজার মানুষকে গুম করার অভিযোগ রয়েছে।

ইরানে ১৯৯৯ সালের ছাত্র দাঙ্গার পর ৭০ জনেরও বেশি ছাত্র গুম হবার অভিযোগ রয়েছে। আর, শ্রীলংকার গৃহযুদ্ধে রেডক্রস এর হিসেব মতে ১১০০০ জন গুম হয়। চেচনিয়ার গৃহযুদ্ধে রাশিয়ার সেনাবাহিনী ও অন্যান্য শৃংখলা বাহিনীর হাতে ৫০০০ জন স্বাধীনতাকামীদের গুপ্তহত্যা বা গুম এর শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ভারত, তুরস্ক, থাইল্যান্ড, সিরিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান ও আয়ারল্য্যান্ডেও গুপ্তহত্যা বা গুম এর ঘটনা ঘটছে ও ঘটেছে।

গুপ্তহত্যা রাষ্ট্রের কৌশল?

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের তৃতীয় বছরে ‘ক্রসফায়ার’ এর নামে হত্যাকাণ্ড কমলেও গুপ্তহত্যার ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টিকে রাষ্ট্রের ‘কৌশল’ হিসেবে মন্তব্য করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন।

২০০৯ সালে ২টি গুমের ঘটনার কথা জানা গেলেও ২০১০ সালে হয় ১৮টি। আর ২০১১ সালে গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছেন অন্তত ৩০ জন।

ব্যাপক সমালোচনার মুখে ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ে র‌্যাব ও পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কথিত ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে হতাহতের ঘটনা কমে আসলেও বিভিন্ন স্থানে অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের লাশ উদ্ধারের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় ওই সময় থেকেই ‘গুম’ শব্দটি আলোচনায় আসে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে সাদা পোশাকের লোকজন বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর কখনো ডোবা, কখনো নদীতে এসব ব্যক্তিদের লাশ পাওয়া যায়। নিহতদের মধ্যে যাদের পরিচয় মিলেছে, তাদের অনেকেই বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নানা স্তরের নেতা-কর্মী।

অবশ্য র‌্যাব ও পুলিশ এ ধরনের ঘটনায় জড়িত থাকার কথা বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।

তবে, জাতীয় সংসদে দেয়া ভাষণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন বলেন, ‘গুম’ বলতে কোন শব্দ নেই। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুপ্তহত্যার অভিযোগ ওঠার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমকে জানান, পত্রিকা পড়ে তিনি গুপ্তহত্যার খবর জেনেছেন।

পুলিশের গোয়েন্দা শাখার ‘গোপন প্রতিবেদন’ ও গুপ্তহত্যার ‘খসড়া’ হিসেব:

পুলিশের একটি গোয়েন্দা শাখার গোপন প্রতিবেদনেও এ পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সারাদেশে চলছে অপহরণ, নিখোঁজ, গুপ্তহত্যা ও গুম আতংক। পরিস্থিতি এখন উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। এ নিয়ে জনমনে আতংক, উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। অপহরণ, গুপ্তহত্যা ও গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে এসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। কিন্তু আইন শৃংখলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত সংস্থা সমূহ এর দায় দায়িত্ব নিচ্ছে না। আবার এসব ঘটনার কোনো কিনারাও হচ্ছে না। ধারণা করা হচ্ছে যে, ২০১১ সালের প্রথম থেকেই এ ধরনের অপরাধ শুরু হয়েছে।

‘অপহরণ, গুম ও গুপ্তহত্যার বিষয়ে ভুক্তভোগী অধিকাংশ পরিবার র‌্যাবকে দায়ী করেছে,’ গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অপরাধীরা ঘটনাস্থলে কোনরূপ অপরাধ সংঘটিত না করে সুবিধাজনক জায়গায় অপরাধ সংঘটন করে মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, নারায়নগঞ্জ ও ঢাকার আশপাশের কোন নির্জন জায়গায় লাশ ফেলে দেয়,’।

সংবিধানের ভাষ্য:

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আর্টিকেল -৩১ এ আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া আর্টিকেল-৩২ এ ব্যক্তি ও ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার এবং আর্টিকেল-৩৩ এ গ্রেপ্তার ও আটক সম্পকে রক্ষাকবচ এর কথা বলা হয়েছে। আর আর্টিকেল-৩৫ এ বিচার ও দন্ড সম্পর্কে বলা হয়েছে। তবে এসব কতটুকু মানা হচ্ছে তা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যায়।

আর্টিকেল ৩১: আইনের আশ্রয়লাভের অধিকার: আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভ যে কোন স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষত আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোন ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।

আর্টিকেল ৩২: জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার অধিকার রক্ষণ : আইনানুযায়ী ব্যতিত জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।

আর্টিকেল ৩৩: গ্রেপ্তার ও আটক সম্পর্কে রক্ষাকবচ:

গ্রেপ্তারকৃত কোন ব্যক্তিকে যথাসম্ভব শীঘ্র গ্রেপ্তারের কারণ জ্ঞাপন না করিয়া প্রহরায় আটক রাখা যাইবে না এবং উক্ত ব্যক্তিকে তাঁহার মনোনীত আইনজীবীর সহিত পরামর্শ ও আত্মপক্ষের অধিকার হইতে বঞ্চিত করা যাইবে না।

গ্রেপ্তারকৃত ও প্রহরায় আটক প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে গ্রেপ্তারের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে (গ্রেপ্তারের স্থান হইতে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আনয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ব্যতিরেকে) হাজির করা হইবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ব্যতীত তাঁহাকে তদতিরিক্ত প্রহরায় আটক রাখা যাইবে না।

সবশেষ কথা:

বিভিন্ন দেশে গুম এর উদাহরণ এ বোঝা যায় সেসব দেশে কি অবস্থায় এমন ঘটনা ঘটেছিলো। বাংলাদেশ কি তেমন অকার্যকর রাষ্ট্রর দিকেই এগুচ্ছে? ইলিয়াস আলীর গুম তার অশনি সংকেত কী?