ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

বনবিভাগের মতামত না নিয়েই ভোলার উপকূলীয় অঞ্চলের নদ-নদীতে জলবায়ু তহবিলের টাকায় সংযোগ বাঁধ (ক্রসড্যাম) নির্মানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে সমন্বয় না করে এ পরিবেশঘাতী প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্ধ হয়ে যাবে মেঘনা-তেতুলিয়া আর কালাবাদর নদীর গতিপথ। ক্ষতিগ্রস্থ হবে সাগর মোহনার জনপদ চরফ্যাশনের ৫হাজার একর উপকূলীয় বনভূমি।

সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুকিপুর্ন ভোলার সাগরতীরের চরফ্যাশন উপজেলার ‘চরমানিকা, চরইসলাম ও পটুয়াখালী জেলার গলাচিপার চরমোন্তাজের মধ্যবর্তী খরস্রোতা তেতুলিয়া নদীতে ক্রসড্যাম নির্মাণের মাধ্যমে পরিবেশঘাতী এই কাজ শুরু হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা গেছে, সাড়ে ৭ বর্গকিলোমিটারে দৈর্ঘ্যরে এ প্রকল্পটি তৈরিতে ব্যয় হবে ২৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এটি চরমানিকা, চরইসলাম ও চরমোন্তাজ ক্রসড্যামের মাধ্যমে জমি পুনরুদ্ধার প্রকল্পে জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের আওতায় তৈরি করা হচ্ছে। গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান চরফ্যাশনের স্লুইজঘাট বাজারে, চরমানিকা, চর বেষ্টিন ক্রসড্যাম (নদী সংযোগ বাঁধ) নির্মান কাজের উদ্বোধন করেন। এসময় স্থানীয় সাংসদ আব্দুলাহ আল ইসলাম জ্যাকব এ সংযোগ বাঁধ নির্মানের জন্য সবচেয়ে বেশি দেন-দরবার করেছেন বলে জানা গেছে। প্রকল্পটি উদ্বোধনকালে প্রতিমন্ত্রীর সাথে তিনিও ছিলেন।

অন্যদিকে একই তহবিলের অর্থায়নে পটুয়াখালীতে সাড়ে ৩ কিলোমিটার বনাঞ্চল উজাড় করে বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে। পরিবেশ রক্ষার জন্য গঠিত প্রধানমন্ত্রীর জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিলের অর্থায়নে অনুমোদিত এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে হুমকির মুখে পড়বে প্রায় অর্ধকোটি গাছসহ ৫ হাজার একর বনভূমি। ক্রসড্যাম নির্মানের ফলে শত কিলোমিটার দির্ঘ তেতুলিয়া নদীর গতিধারা বন্ধ হয়ে যাবে। পরিবেশগত ঝুকি আরো বেড়ে যাবে এমন ধারনা করছে এলাকাবাসী।

চরফ্যাশন উপজেলার চরমানিকা বনবিভাগের রেঞ্জ-কর্মকর্তা ফজলুল হক জানান, ক্রসড্যাম নির্মাণের স্থান থেকে গাছ অপসারণের জন্য বেশ কয়েকদিন আগে তারা একটি চিঠি পেয়েছেন। কিন্তু চরইসলাম, চরমানিকার কত গাছ এই ক্রসড্যাম নির্মাণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। ইতিমধ্যেই উপকুলের ক্ষতিগ্রস্ত গাছ শনাক্ত করার জন্য বনগুলোর মাঝে লাল নিশানা টানানো হয়েছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ক্রসড্যাম নির্মানের জন্য ২০ হাজারের বেশী গাছ কর্তন করতে হবে।

অন্যদিকে গলাচিপার চরমোন্তাজ রেঞ্জে বনবিভাগের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পটি বর্তমানে পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বনবিভাগের মধ্যে চিঠি চালাচালির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বনাঞ্চলের মধ্যে গাছ ও মাটি কাটা অব্যাহত রয়েছে। এমনকি বালু উত্তোলনের জন্য সেখানে নেয়া হয়েছে একটি ড্রেজার।

পটুয়াখালীর চরমোন্তাজ রেঞ্জ কর্মকর্তা দেবদাস মুখার্জি জানান, বনবিভাগের নির্দেশ উপেক্ষা করে বনের মধ্যে মাটি ও গাছ কাটা হয়েছে। ড্রেজার নেয়া হয়েছে মাটি খননের জন্য। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে তিনি জানান।

কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ভোলা জেলা সদরের সঙ্গে সোনারচর পর্যন্ত সরাসরি সড়ক সংযোগ স্থাপন এবং ভূমি পুনরুদ্ধারের জন্য ক্রসড্যাম ও বেড়িবাঁধ নির্মাণের প্রকল্প নেয়া হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওই প্রকল্প ২০১০ সালের ৩০ নভেম্বর জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিলের অর্থায়নে অনুমোদিত হয়।

‘চরমানিকা, চরইসলাম, চরমোন্তাজ ক্রসড্যাম নির্মাণের মাধ্যমে ভূমি পুনরুদ্ধার’ শীর্ষক প্রকল্পটির প্রস্থ ১০০ মিটার এবং দৈর্ঘ্য ৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৩ দশমিক ৪৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ পটুয়াখালী বনবিভাগের চরমোন্তাজ রেঞ্জের আওতাভুক্ত। বাকিটুকু ভোলা জেলার মধ্যে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে চরমোন্তাজ রেঞ্জের চরবেষ্টনী এবং চর বনানীর বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার বনাঞ্চল উজাড় করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হবে। গত বছরের ৭ আগস্ট কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সফিউদ্দিন ওই সাড়ে ৩ কিলোমিটার বনাঞ্চলের গাছ অপসারণের জন্য পটুয়াখালীর উপকূলীয় বনবিভাগে চিঠি দেন। এর কিছুদিন পর একইভাবে বনবিভাগের কাছে বনাঞ্চলের মাটি কাটার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন চরমোন্তাজ চ্যানেলের দরপত্র পাওয়া রূপালী কনস্ট্রাকশন।

বনবিভাগের তথ্যানুযায়ী চরমোন্তাজ রেঞ্জের চরবেষ্টনীতে ১৯৭৮-৭৯ সালের কেওড়া বাগান এবং চর বনানীর ১৯৯৪-৯৫, ১৯৮৬-৮৭, ১৯৮৮-৮৯ সালের কেওড়া বাগান রয়েছে। এ ২টি বাগানের অপসারণযোগ্য গাছের সংখ্যা ১৪ হাজার ১৪০টি। অর্থাৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এই পরিমাণ গাছ কেটে ফেলতে হবে, যা পরিবেশের জন্য হুমকি। প্রকল্পের বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য বনভূমি ব্যতীত আশপাশে বিকল্প কোন স্থান নেই। ওই প্রকল্পের আওতায় বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে বনভূমির গাছ কাটা, মাটি খনন, ছোটবড় খালে বাঁধ দিয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটবে, যা বন বা বনাঞ্চল ধ্বংসের কারণ হতে পারে।

উপকূলীয় বনবিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক আবদুল মজিদ মিয়া জানান, প্রকল্পটি অনুমোদনের আগে পরিবেশ অধিদফতর ওই এলাকাটিকে অজ্ঞাত কারণে ‘বনভূমি’ হিসেবে চিহ্নিত করেনি। তাছাড়া প্রকল্প তৈরিকালীন স্থানীয় বনবিভাগকে কিছুই জানানো হয়নি। বনবিভাগের মতামত না নিয়েই প্রকল্পটি তৈরি করায় গোটা বনাঞ্চলটি এখন হুমকির মুখে। তিনি আরও জানান, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উপকূলের প্রায় অর্ধকোটি গাছ উজার হবে। হুমকির মুখে পড়বে ৫ হাজার একর বনভূমি ।

পরিবেশ রক্ষার জন্য গঠিত তহবিলের টাকায় পরিবেশের ধ্বংসকারী এই ক্রসড্যাম প্রকল্প বন্ধের দাবী জানিয়েছে উপকুলের সাধারন মানুষ।