ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

আমার মত আর কোন ঘরের বউয়ের যেন কপাল পুইর‌্যা না যায়। যৌতুকের ট্যাকা দিতে না পারায় কেরোসিন ঢাইল্যা কোন মাইয়্যারে আর যেন বেডায় (স্বামী) শরীর পুইর‌্যা না দেয়। মরনের আগেই যেন আমি হের বিচার দেইখ্যা যাইতে পারি। পোড়া শরীরের যন্ত্রনা আমি আর সইতে পারিনা। কি দোষ করছি আমি ? এমন অত্যাচারের বিচার যেন আল্যায় করে। নির্যাতিতা নুরজাহান পোড়াক্ষতে মৃত্যুর যন্ত্রনা নিয়ে এখন এমন আকুতি করছে। গতকাল ভোলা সদর হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন স্বামী কর্তৃক অগ্নিদগ্ধ গৃহবধূ নুরজাহান এ সব কথা বলে হাউ মাউ করে কেঁদে এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ভোলা সদরের ১ নং পৌর বাপ্তা এলাকার ভূমিহীন আবুল কালাম মিয়ার কন্যা নুরজাহান অগ্নিদগ্ধ হয়ে গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর ভর্তি হন। সূত্রমতে, একই এলাকার রফিক মিয়ার পুত্র আল-আমিনের কাছে বছর দু’য়েক আগে নুরজাহানকে বিয়ে দেয়া হয়। ওই এলাকার সরকারী খাস জমিতে নির্মিত গুচ্ছ গ্রামের একটি জীর্ণ-শীর্ণ ঘরে বসবাস করে নুরজাহানের পরিবার। মেয়েকে বিয়ে দেয়ার পর থেকেই বদ মেজাজি ও লোভী স্বামী স্ত্রী’র কাছে নানাভাবে যৌতুক দাবী করতো। মেয়ের সুখের জন্য বাবা আবুল কালাম অন্যের বাড়ীতে কামলা খেটে, কখনো ভিক্ষে করে জামাই আল-আমিনকে প্রায় ৪০ হাজার টাকা দিয়েছে। নিজের গতর খেটে মেয়ের জামাইকে আর যৌতুকের টাকা দিতে না পারায়ই ছিল নুরজাহানের কাল।

বাবা আবুল কালাম মিয়া ও মা বিলকিছ বেগম জানান, গতবছরের ১৬ ডিসেম্বর যৌতুকের দাবীতে নুরজাহানের উপর দিনভর শ্বশুর রফিক, স্বামী আল-আমিন ও ভাসুর কবির হোসেন মিলে নির্মম নির্যাতন চালায়। দিনের শেষে তারা নুরজাহানকে যৌতুকের টাকা নিয়ে ফেরার জন্য ঘর থেকে বের করে দেয়। স্ত্রী নুরজাহান দরিদ্র বাবার কাছ থেকে যৌতুকের টাকা এনে দিতে না পারায় ঘাতক স্বামী আল-আমিন নুরজাহানের শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।

গ্রামের লোকজন জানায়, স্বামী ও শ্বশুর বাড়ীর লোকজন নুরজাহানকে হত্যার জন্যই শরীরে আগুন দিয়েছিল। ওই দিন রাতেই গ্রামবাসী অগ্নিদগ্ধ নুরজাহানকে ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেই থেকে গত ৪০ দিন যাবত আগুনে দগ্ধ নুরজাহান হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে ক্ষত-বিক্ষত শরীর নিয়ে মৃত্যু যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছেন।

পড়ালেখা হারাম ঃ অগ্নিদগ্ধ ১৮ বছর বয়সী নুরজাহান জানান, বাবা-মা দরিদ্র হলেও পড়ালেখা করে বড় হওয়ার খুব স্বপ্ন ছিল তার। ভোলার টাউন কমিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেনীর ছাত্রী নুরজাহান। সেখানে তার রোল নম্বর ১৫। ২০১০ সালে তার বিয়ে হওয়ার পর থেকে তার পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। স্কুলে যেতে চাইলে শশুর বাড়ির লোকজন তাকে বাধা দিত। নুরজাহানের বাবা আবুল কালাম মিয়া জানান, স্কুলে যেতে চাওয়ার অপরাধেই প্রথম মেয়ের উপর নির্যাতন শুরু করে স্বামী আল-আমিন। এর পর থেকেই শুরু হয় যৌতুকের বায়না। নুরজাহান জানায়, পড়া-লেখা করা হারাম এমন অজুহাত তুলে শাশুরী তাহেরা বেগম ও ননদ হাসনুর বেগম প্রায় সময়ই তার উপর নির্যাতন চালাতো। এক পর্যায়ে নুর জাহানের বড় হওয়ার সেই স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। মানুষ হওয়ার ইচ্ছে পোষন করায় শশুর বাড়ির অমানুষরা নুরজাহানের শরিরে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে দেয়। হাসপাতালের বেডে মৃত্যুশয্যায়ী নুরজাহান তার স্কুল জীবনের স্মৃতি আর বড় হওয়ার স্বপ্নের কথাগুলো বার বার সামনে এনে চোখের নোনা পানিতে পুড়ে যাওয়া শরির ভিজিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠছে। তার এই করুন গগন বিদারি আর্তনাদ দেখে হাসপাতালে গিয়ে চোখের পানি পড়েনা এমন মানুষ খুব কমই দেখা যায়।

হুমকি ঃ এদিকে নুরজাহানকে হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই ঘাতক স্বামীর লেলিয়ে দেয়া ক্যাডাররা তাদেরকে হুমকি দিয়ে আসছে। হাসপাতালে গিয়ে নুরজাহানের ভর্তি তালিকা থেকে নাম কাটাতে তারা মরিয়া হয়ে উঠেছে। নুরজাহানের বাবা কালাম মিয়া জানান, একারনে হাসপাতালেও তারা নিরাপদ নয়। তারা সব সময় আতংকিত।

তার মা বিলকিস বেগম জানান, ঘটনার পর স্থানীয় কমিশনার মঞ্জুরুল আলমসহ সমাজপতিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোন প্রকার বিচার পাইনি। ভিক্ষে করে মেয়ের চিকিৎসা চালাই। থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ করলেও ওসি সাহেব মামলা নেয়নি। আমরা মেয়েকে বাঁচাতে অনেকের কাছেই সাহায্য চেয়েছি। অবশেষে হাসপাতালের সামনে দাড়িয়েই বিভিন্ন মানুষের কাছে হাত পাতছি।

হাসপাতাল এলাকার ঔষধ ব্যবসায়ী এরশাদুল ইসলাম আজাদ ও মনছুর আলম জানান, অসহায় নুরজাহানের চিকিৎসার জন্য তারা গত দেড় মাস ধরে বিভিন্ন লোকদের কাছ থেকে টাকা তুলে দিচ্ছেন। কিন্তু এতে করে অগ্নিদগ্ধ গৃহবধূর ভালো কোন চিকিৎসা হচ্ছে না। ডাক্তার তাদেরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যাওয়ার পরামর্শ দিলেও নুরজাহান পরিবারের সেই সামর্থ নেই।

ভোলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডাঃ শরীফ আহমেদ জানান, অগ্নিদগ্ধ নুরজাহানের অবস্থা আশংকাজনক। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে রেফার করা হয়েছিল কিন্তু সামর্থ না থাকায় তারা যেতে পারেনি। ফলে যে কোন মূহুর্তে নুরজাহানের জীবন হানির আশঙ্কা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

এ ব্যাপারে ভোলা পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মঞ্জুরুল আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এ ঘটনাটি সমাধানের চেষ্টা করেছিলাম। যদি মিট-মাট করতে না পারি তাহলে দোষীদের বিরুদ্ধে অবশ্যই মামলা দেয়া হবে।

ভোলা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোবাশ্বের আলী জানিয়েছেন, এ ধরনের কোন ঘটনা আমি জানিনা। লিখিত কোন অভিযোগও পাইনি। কেউ অভিযোগ করলে মামলা নেব।

এঘটনায় অভিযুক্ত স্বামী আল-আমিনের সাথে যোগাযোগ করতে তার বাড়িতে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। বাড়িতে কোন লোকজনও ছিলনা। ঘরের দরজা তালাবদ্ধ থাকতে দেখা যায়। এলাকাবাসী জানান, নুরজাহানের অবস্থা খারাপ শুনে তারা বাড়ি ছেড়েছে।

***
লেখাটি প্রকাশিত: http://www.newshoursbd.com, ৩০ জানুয়ারি ২০১২