ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

“তিন ব্যক্তি পথের ধারে নামাজ পড়ছে। সামনে দিয়ে একটি শেয়াল যেতে দেখে যিনি নামাজ পড়াচ্ছেন তার বাম পাশের জন্য নামাজরত অবস্থায় বলল- আরে শেয়াল গেল। ডানের জন শুনে বলল- তোর নামাজ ভেঙ্গে গেল। নামাজরত অবস্থায় দুজনের কথা শুনে মাঝের জন বলল- তোদের দু’জনের নামাজই ভেঙ্গে গেল। আসলে কিন্তু তিনজনের নামাজ ভেঙ্গে গেল। নিয়ম জানা থাকলেও কেউ আর নিয়মের তোয়াক্কা করেনি।”

বাস্তবচিত্র ঠিক এমনই। আমরা জেনে শুনিই ভুল করি। ইচ্ছাকৃত – অনিচ্ছাকৃত, আমরা ইচ্ছাকৃত ভুল করি। এখানে আমরা বললে ভুল হবে না। “আমরা” শব্দটি ব্যবহার করছি এ কারণে যে, আমাদের সমর্থিত কোন না কোন দল থাকেই। সমর্থিত দলের গুণগান করি, তর্কে লিপ্ত হই, আলোচনা-সমালোচনায় নিজেদের জড়ায়। ব্যতিক্রম শব্দটি আছে বলেই, এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয়। বিরোধীদলের তকমা যখন গায়ে লেপ্টে থাকে, তখন ক্ষমতাশীনদের ভুল ধরে প্রকাশ করি। এটা করা উচিত ছিল, এটা করা উচিত নয়, এটা করলে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়ে যাবে, এটা করা যাবে না। এমন সব কথা দম্ভের সাথে উচ্চারণ করি। প্রয়োজনে আন্দোলনের হুমকি দেই। ক্ষমতাশীনদের প্রতিটি কর্মেই আমরা রহস্যের গন্ধ খুঁজে পাই। প্রকাশ্যে বলি- আমরা ক্ষমতায় গেলে এমনটি করবো না, বাতিল করবো, সুন্দর করে জুড়ে দেই-জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে, জনগণের মধ্যে ক্ষোভ জমা হচ্ছে। যাই হোক, সত্যি সত্যিই যখন ক্ষমতার পালা বদলে ক্ষমতায় আসি- তখন কি পূর্ব ঘোষিত কথাগুলো আমাদের মনে থাকে? আর একটা কৌতুক মনে পড়ে গেল-

ছাগলের উৎপাতে প্রতিবেশীরা ক্ষিপ্ত। কেউ কিছু বলতে পারে না কারণ- ছাগলটির মালিক একজন ধার্মিক ব্যক্তি। সবাই তাঁকে সম্মান করেন। তাই প্রতিবেশীরা সবাই মিলে ভদ্রচিত ভাবে তাদের অভিযোগ জানালো, তিনি শুনলেন এবং সবাই চলে যাবার পর ছাগলকে কাছে এনে বুঝাতে শুরু করলেন; – দ্যাখ বাবা, তোকে আমি কত ভালবাসি, তোকে অন্য ঘরে রাখিনা, নিজের ঘরেই রাখি, তোকে মারিনা, গ্রামের সবাই আমাকে সম্মান করে বলে কেউ তোকে খোয়ারে দেয় না। ছাগল কথাগুলো শোনে আর মাথা নাড়ে। আরো কিছু উপদেশমূলক কথা বলে, ছাগল মাথা নাড়ে। অবশেষে ধার্মিক লোকটি ছাগলকে ছেড়ে দিয়ে বলল- আমার সম্মান রাখিস বাবা। কয়েক কদম হেঁটে ব্যা ব্যা শব্দ করে ছাগল পাশের ক্ষেতে ঢুকে ফসল নষ্ট করতে শুরু করলো। এ দৃশ্য দেখে লোকটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল- হায়রে আমার শিক্ষিত ছাগল, ভাল কথাও কানে ঢোকে না। অবশেষে প্রতিবেশীদের ঢেকে বললেন- ছাগলটা তোমাদের ফসলের ক্ষতি করা মাত্রই খোয়ারে দিয়ে এসো।

এদেশের প্রতিটি মানুষ কেউ না কেউ কোন না কোন দলের সমর্থক। প্রতিটি দলেরই সমর্থক আছে, থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। আছে ভোট ব্যাংক। তারপরও ক্ষমতার পালা বদল হয়। কেন হয়? সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেও পরবর্তী নির্বাচনে পরাজয় বরণ করতে হয়। কেন এই পরাজয়? ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশে এমন হয়, কর্মের জন্য এমন হয়। আমরা এমনই দেখে আসছি। এবং ভবিষ্যতেও দেখবো। শুধরে নেবার কোন ইচ্ছে নেই বলেই- এমন দৃশ্য বারবার ঘুরে ফিরে আসে। এদেশের জনগনের একটা অংশ আছে, যাঁরা কোন দলের সমর্থক নন কিন্তু ভোটাধিকার প্রয়োগে কোন কার্পণ্য করেন না। ইনারা সবদিক ভেবে চিন্তে নিজের ভোট প্রদান করেন। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, তাঁদের চিন্তাগুলো অনেকাংশেই মিথ্যে প্রমাণিত হয়। কিন্তু এদেশের জনগণের এই অংশটার জন্য বিশাল রদবদল হয়, ক্ষমতার হাত বদল হয়। এই সত্যটা কখনই অস্বীকার করা যাবে না। এঁরা শান্তি চায়, নিরাপত্তা চায়, উন্নয়ন চায়, বিশ্বের দরবার মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে। হায়রে আমাদের রাজনীতি, আমাদের দেশপ্রেম- এদেশে উন্নয়নের কথা মুখে বললেও বাস্তবায়নের কোন চিহ্নই দেখা যায় না। প্রতিহিংসার রাজনীতিতে, নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে, রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এদেশের শান্তিপ্রিয় জনগণকে পিষ্ট করতে মহাব্যস্ত। আর কতদিন এভাবে চলবে? যাদের জ্বলে উঠার কথা, তাদের বুকে ঈর্ষার আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। অন্ধ করে দিয়েছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার শক্তি চতুরতার মাধ্যমে হরণ করা হয়েছে। আর তাই- যতই অনিয়ম, দূর্নীতি, ধ্বংসযজ্ঞ কর্মকান্ডে দেশটা ছেয়ে যাক না কেন;- ওরা জেগে উঠবে না, প্রতিবাদ করবে না, মিছিলে মিছিলে রাজপথ কাঁপাবে না, কোটি জনতার দাবী নিয়ে রক্তলাল চোখে এক পতাকাতলে দাঁড়াবে না। আর লাখো শহীদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার পথ আরো আরো আরো দীর্ঘায়িত হবে। সুখী, সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। স্বাধীনতার এতটা বছর পর আমরা কি পেলাম, কি হারালাম, কি পাবার ছিল সে হিসেব করতে যেয়ে আগামী প্রজন্মের জন্য কোন বাংলাদেশ রেখে যাওয়া উচিত সে হিসেবটাও করতে হবে। আমাদের পূর্বসূরিরা আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, আর আমরা …???