ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে কত কথা, কত মত। যুদ্ধাপরাধীর বিচার আমাদের সবারই কাম্য। চাই প্রতিটি যুদ্ধাপরাধীর বিচার হোক। জননীদ্বয় পক্ষে বিপক্ষে সাফাই গাইছে। গাইতে থাকুক। রাজাকার, আল বদর, আল শামস- এরা চিরকালের ভিলেন। ঘৃনিত। নিন্দিত। আমরাও এদের ঘৃণা করি। বর্তমানে পত্রিকার পাতায় কয়েকটা সংবাদ ব্যথিত করছে। যার সারমর্ম হলো- যারা আওয়ামী লীগে আসবে, তারা যুদ্ধাপরাধীর লেবেল থেকে মুক্ত। তাদের (হয়ত) বিচারের সম্মুখীন হতে হবে না। ঠিক গঙ্গা স্নানের মতো। আর যারা এর বাইরে, তাদের কপালে নিশ্চিত দূর্ভোগ।

কয়েক বছর আগে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সাক্ষাৎকারের শেষ পর্যায়ে তিনি জানালেন-১৯৭১ সালে চিহ্নিত কয়েকজন রাজাকার একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার লাশ এনে নিথর দেহটার উপর নির্যাতন চালায়। অবশেষে মুখে প্রসাব করে দেয়। নাম, ঠিকানা, বর্তমান অবস্থান বলতেও তিনি দ্বিধাবোধ করেননি। এটাই সত্য যে, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা সত্য প্রকাশে ভয় পান না। তিনিও ভীত না হয়ে সত্যটা প্রকাশ করেছেন। দেখেছি সেই রাজাকারের সন্তানের হাতে বিজয় দিবসে, ২১ ফেব্রুয়ারিতে, ২৬ মার্চের অনুষ্ঠানে মাইক্রোফোন হাতে দেশের কথা বলতে। দেখেছি চিহ্নিত সেই রাজাকারকে আওয়ামী লীগের মিটিংয়ে। জননী- আমরা সবাই চাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, তেমনি চাই ক্ষমতাশীন দলে যেসব রাজাকাররা আছে তাদের বহিস্কারসহ বিচারের সম্মুখীন করা। নিজের দল থেকে শুরু করুন, তারপর অগ্রসর হতে থাকুন। দেখবেন তখন আর কেউ উদ্ভট প্রশ্ন তোলার সাহস পাবে না। দল বদলের নামে বৈধতা নয়, চাই বিচার।

আমরা কাদের বীর বলবো? যাঁরা আমাদের স্বাধীন একটা দেশ দিতে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন-তাঁদের? উত্তর এটা হতে পারতো। নয় মাসের দেশপ্রেমটা কেন উধাও হলো? কেন একজন মুক্তিযোদ্ধাকে সনদ পাবার জন্য টাকার হিসেব কষতে হয়? কেন একজন মুক্তিযোদ্ধা বিতর্কিত মুক্তিযোদ্ধার জন্ম দিলো? কেন একজন মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীনতার পর দূর্ণীতে জড়িয়ে পড়লো? কেন একজন মুক্তিযোদ্ধা আরেক মুক্তিযোদ্ধার প্রাপ্য টাকা আত্মসাৎ করলো। কেন??? উত্তর জানা নেই।

রাজাকারের খাতায় নাম লিখিয়ে গোপনে নিজের বাড়ীকে মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল বানিয়েছিল, তাঁকে কি রাজাকার বলব? যারা মুক্তিযোদ্ধার খাতায় নাম লিখিয়ে লুটপাটে ব্যস্ত ছিল, তাদের কি মুক্তিযোদ্ধা বলব? একদল মুক্তিযোদ্ধা নির্দিধায় চিহ্নিত রাজাকারদের সাথে হাত মিলিয়ে পথ চলছে, আরেক দল এর বিরোধীতা করছে। আবার মেনেও নিচ্ছে।

এটা আমার কথা নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের কন্ঠে উচ্চারিত কথা। অনেক আক্ষেপ নিয়ে তাঁরা বলেছেন। শুনেছি। আজ পুনরায় লিখছি। থমকে যাওয়া পথে চলার কোন অভিলাষ নেই। স্বাধীনতার এতোটা বছর পরে আমরা কি দেখলাম, কি দেখছি? ৭১ এর রাজাকাররা আজো সংঘবদ্ধ। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা?

কালে কালে মীর জাফররা ছিল এবং থাকবে। আর তাই ভার্চুয়াল জগতে প্রতিবাদী ব্লগারদের ব্যান হতে হয়। ঘৃণিত বাক্যবাণে জর্জরিত হতে হয়। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা এখন নামী ব্যান্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবাই শব্দ দুটিকে ব্যবহার করে ফায়দা লুটতে করতে চায়। এবং সফলও হয়। ক্ষমতা পেতে, ব্যবসায়িক ভাবে লাভবান হতে এই শব্দ দুটির বিকল্প নেই।

গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের উচিত আগামী প্রজন্মকে সঠিক পথ দেখানো, সঠিক পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করা। আর এই কঠিন কাজটির সূচনা আমাদেরই করতে হবে। সবার আন্তরিক ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এটা করা সম্ভব। পুরোনোকে আঁকড়ে ধরে নয়, সনাতন পদ্ধতিতে নয়, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে- কার্যকর পরিকল্পনার মাধ্যমে আমাদের পথ চলতে হবে। নয়ত স্বপ্নের বাংলাদেশ চিরকালের জন্য অধরাই থেকে যাবে।