ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালী ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়। যাঁদের রক্তে রচিত হয়েছে এই অধ্যায়, তাঁদেরকে আমরা কতটুকু স্মরণ রেখেছি? ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। এই ত্রিশ লক্ষ বাঙালীর মধ্যে আমাদের আবাসভূমি নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলার ছয়জন বীর শহীদদের নাম কি আমরা ভুলতে বসেছি? আমরা কি কেউ কখনও জানতে চেয়েছি কেমন আছেন সেই বীর শহীদদের পরিবার? সেই অবহেলিত ছয় শহীদ ও তাদের পরিবার নিয়ে এই পোস্ট।

শহীদ আশরাফুল ইসলাম ফজলুঃ
মহাদেবপুর উপজেলার বাগাচাড়া গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে ৬মে, ১৯৫৩ইং সালে শহীদ আশরাফুল ইসলাম ফজলু’র জন্ম। পিতা. মৃত আছির উদ্দীন, মাতা. আয়েশা খাতুন। পিতার কর্মস্থলের সুবাদে সৈয়দপুরের জি.আর.পি কলোনীতে তাঁর বেড়ে উঠা। ১৯৬৯ইং সালে সৈয়দপুর কয়ানিজপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি পাশ করেন। চার ভাই ও দুইবোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। ছোটবেলা থেকেই ডানপিঠে ছিলেন। সাহিত্য, সংস্কৃতিতে ছিলো তাঁর অগাধ বিচরণ। নিজে গান, নাটক লিখতেন। মঞ্চ নাটকের সাথেও জড়িত ছিলেন। তৎকালীন কায়দে আজম সরকারী কলেজ সৈয়দপুর, অধ্যয়নরত অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তার মুক্তিযোদ্ধা নম্বরঃ এফ.এফ-১০৭৫ (ভারত)। প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন ইয়্যুথ ক্যাম্প ও মধুপুর শিলিগুড়িতে। ৭নং সেক্টরে তৎকালীন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন লেঃ কর্ণেল নুরুজ্জামান। শহীদ আশরাফুল ইসলাম মধুপুর ক্যাম্পে মুক্তিবাহিনী নিরাপত্তা কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ইংরেজি, উর্দু ও হিন্দী ভাষায় পারদর্শি ছিলেন। সেই সূত্রে ভারতে মুক্তিযোদ্ধাদের তহবিল গঠন করার জন্য সংস্কৃতি কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন। ব্যক্তি জীবনে সৎ ও নির্ভীক ছিলেন। বদলগাছী, রাঙ্গামাটি, সাপাহার ছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় সম্মূখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের মাত্র ৩দিন আগে সাপাহারের আগ্রাদ্বিগুন নামক স্থানে সম্মূখ যুদ্ধে ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ভোরে হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন।

শহীদ আমিনুল হকঃ
শহীদ আমিনুল হকের বৃদ্ধ পিতা হুজুর আলীর শেষ স্বপ্ন ছিল মৃত্যুর আগে শোষণমুক্ত স্বনির্ভর বাংলাদেশ দেখে যাওয়ার। কিন্তু কবে, কিভাবে কোন রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে তা সেটা তার অদেখায় রয়ে গেছে বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন শহীদ আমিনুল হকের একমাত্র ভাই। তিনি বলেন, তার বাবা একজন আদর্শ স্কুল শিক্ষক ছিলেন। দেশ গড়ায় প্রকৃত মানুষ গড়ার লড়াই করেছেন আজীবন। তার বাবা আরও স্বপ্ন দেখতেন তার ছেলে স্মৃতি ধরে রাখার জন্য স্থানীয় প্রশাসন নিশ্চয় কোন উদ্যোগ নিবেন। তাঁর স্বপ্ন পূরণ হয়নি। ভাইয়ের রক্তে স্বাধীন এদেশে স্বাধীনতার পর যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে তাদের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য খুঁজে পাননি তিনি। তাঁর কেন যেন মনে হয়, পাকিস্তানী প্রেতাত্মারাই নতুন রুপে নতুনভাবে আবির্ভূত হয়েছে দেশীয় মানুষের খোলসে। পার্থক্য শুধু তখনকার শাসকগোষ্ঠী ও নির্যাতনকারী শাসকগোষ্ঠী ছিল ভিন্ন ভাষার ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ। আর স্বাধীন বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী এদেশীয় ভাষায় এ বাঙালী সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠা দেশীয় জান্তা। এরকম একটা আপাদমস্তক দূর্ণীতিতে ভরা দেশের জন্যই কি আমার ভাইসহ লক্ষ লক্ষ আমিনুল শহীদ হয়েছিল? মহাদেবপুর উপজেলার হর্ষি গ্রামের স্কুল শিক্ষক হুজুর আলী ও আমেনা বেগমের পুত্র শহীদ আমিনুল হক হাট চকগৌরী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি পাশ করার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। চাকুরীরত অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশ মাতার স্বাধীনতার জন্য চাকুরী ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চূড়ান্ত বিজয়ের ৪২ দিন আগে ৪ নভেম্বর, ১৯৭১ ইং তারিখে মেঘালয় সিমান্তে সম্মূখযুদ্ধে শহীদ হন। শহীদ আমিনুল হকের মৃত্যুর খবরে তাঁর মা আমেনা বেগম অসুস্থ্য হয়ে পড়েন এবং অল্পদিন পরেই তাঁর মৃত্যু হয়। পিতা হুজুর আলী জীবনের সাথে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকলেও চাকুরী থেকে অবসর নেয়ার পরে দারুণ অর্থ সংকটে দিনাতিপাত করলেও শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পিতা হিসাবে কোন রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাননি হুজুর আলী। স্বাধীনতার ৪০ বছর পরও মাঝে মাঝে বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পরিবার হিসেবে ডাকা হয় ওটুকুই শান্তনা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল হকের পরিবারের।

শহীদ আইয়ুব আলীঃ
খাজুর ইউনিয়নের দক্ষিণ উড়া গ্রামের আইয়ুব আলীর নাম তাঁর নিজ গ্রামের মানুষেরাই ভুলতে বসেছে। আইয়ুব আলী নামে একজন বীর শহীদ ঐ গ্রামে জন্মেছিল এটা নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না। ৭১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সাপাহারে হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মূখ যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।

শহীদ সাইফুর রহমানঃ
শহীদ সাইফুর রহমানের জন্ম খাজুর গ্রামে। ৭১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সাপাহারে সম্মূখযুদ্ধে তিনি শহীদ হন। স্বাধীনতা যুদ্ধের ৪০ বছর পরও শহীদ সাইফুর রহমানের পরিবারের খোঁজ খবর কেউ নেয়নি।

[শহীদ আইয়ুব আলী ও শহীদ সাইফুর রহমান যে সম্মূখযুদ্ধে শহীন হন, সে যুদ্ধের সহযোদ্ধা বীরমুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম জীবনের অন্তীম সময়ে মেসেজ ৭১ এর কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সে যুদ্ধের বর্ণনা দিয়েছিলেন। বিজয়ের এই মাসে তাঁকেও শ্রদ্ধাভরে আমরা স্মরণ করছি।]

শহীদ হারুন-অর-রশিদঃ
জয়পুর ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের সন্তান শহীদ হারুন-অর-রশিদ। ৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর নিজ গ্রামেই হানাদার বাহিনীর ও তাদের দোসরদের হাতে শহীদ হন। তাঁর আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন আজো রাষ্ট্রীয়ভাবে কিংবা সামাজিকভাবে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

শহীদ নুরুল ইসলামঃ
হেলালপুর গ্রামের শহীদ নুরুল ইসলাম চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের মাত্র ৪দিন আগে ১২ ডিসেম্বর মহাদেবপুরে হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন। স্বাধীনতার এতোটা বছর পরও রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন সুযোগ সুবিধা পায়নি শহীদ নুরুল ইসলামের পরিবার।

২৬ মার্চ ২০০০ইং সালে বেসরকারী উদ্যোগে মহাদেবপুর উপজেলার এই ছয় বীর শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে মডেল স্কুলের মোড়ে একটি শহীদ স্মৃতিসৌধ স্থাপন করা হয়। যা মহাদেবুপর উপজেলাবাসীর সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে স্মৃতিসৌধটি স্থাপিত হয়। এটিই মহাদেবপুর উপজেলার ছয় বীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি ধরে রাখার একমাত্র প্রচেষ্টা বলে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

মেসেজ ৭১, টিম এর বিজয় দিবসের একটি ব্যর্থ প্রয়াস।
[সবসময়ের জন্য সক্রিয় আমরা তিনজনঃ আজাদ, আইনুল, আদর ]
কৃতজ্ঞতা স্বীকারেঃ শব্দনীড় ব্লগের শ্রদ্ধেয় ব্লগার (শিবলী ভাই) সাইক্লোন। ভার্চুয়াল জগতে একমাত্র তাঁকেই দেখেছি- এগিয়ে যাবার প্রেরণা দিতে।