ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

Domestic Quarrel
আমাদের দেশে বর্তমানে সাইকোলজির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কম-বেশী খোলামেলা আলোচনা হচ্ছে। এটা অত্যন্ত শুভ লক্ষণ। এর মধ্যে অবশ্য আমি খুব বেশী আলোচনা দেখলাম না দাম্পত্য কলহ সন্তানের উপর কি প্রভাব ফেলে তা নিয়ে। তাই নিজেই নেট ঘেঁটে চেষ্টা করছি কিছু লেখার।

প্রথমেই বলা যাক দাম্পত্য কলহ, ডোমেস্টিক ভাওলেন্স ইত্যাদি কি। ইংল্যান্ডের ‘রয়্যাল কলেজ অফ সাইকাইয়াট্রিস্ট’-এর মতে, “The term `domestic violence’ is used to describe the physical, sexual or emotional (including verbal and financial) abuse inflicted on a man or woman by their partner or ex-partner.” (লিঙ্ক)

ইউনিসেফ-এর একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, “Some of the biggest victims of domestic violence are the smallest”। (লিংক )

ইউনিভার্সিটি অফ নটরদেম-এর একটি রিসার্চ-এ সাইকোলজিস্ট ই. মার্ক কামিংস বলেন, “What we show is that children’s emotional security is affected by the relationship between the parents — not just the child’s relationship to the parent”। ( লিঙ্ক ) অর্থাৎ বাবা-মার সাথে সন্তানের সম্পর্ক যতটা গুরুত্বপূর্ণ, বাবা-মার নিজেদের ভিতরকার সম্পর্কও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ইন্ডিয়ান ওমেন্স হেল্‌থ-এর মতে, “Spouses often disagree on one issue or another, which is quite normal. But when they start fighting to resolve their conflicts in front of the children, it leads to a negative impact on kids. Quarrels between parents can cause detrimental (ক্ষতিকারক) effects on children’s emotional and overall health and their relationships with others later in life.” (লিঙ্ক: )

কার্ডিফ ইউনিভার্সিটি-এর ডক্টর গডর্ন হ্যারল্ড বলেন, “Arguing in front of children can cause them serious damage. ” ( লিঙ্ক )

এতগুলি তথ্যের পরে নিশ্চয়ই পাঠক বুঝতে পারছেন পরিস্কারভাবে দাম্পত্য কলহ সন্তানের ওপর যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং তা অনেকদিন ধরেই সর্বজন স্বীকৃত। এবার দেখা যাক কি কি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে শিশুর উপরে। আমি এরপরে যা যা লিখছি, তা সবই পূর্বে উল্লেখিত লিংকগুলি হতে।

ইউনিসেফ-এর রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে, “শিশু যারা ​​হিংস্রতা বাড়িতে দেখে, তাদের ভবিষ্যতে অসুবিধা হতে পারে শেখার এবং হতে পারে সীমিত সামাজিক দক্ষতা (অন্যের সাথে মেলামেশার); করতে পারে হিংস্র, ঝুঁকিপূর্ণ বা অপরাধী আচরণ। দেখা যেতে পারে বিষণ্নতা বা তীব্র দুশ্চিন্তায় ভোগা। শিশুদের জীবনের প্রথম দিকের বৎসরগুলিতে তারা হয় বিশেষভাবে অরক্ষিত, অসহায়। গবেষণায় দেখা যায় যে, গার্হস্থ্য সহিংসতা হয় ছোট বাচ্চাদের বাড়িতে আরও ​​বেশী, এবং আরেকটু বয়স্ক শিশুদের বাসায় আরও কম।”

ইংল্যান্ডের ‘রয়্যাল কলেজ অফ সাইকাইয়াট্রিস্ট’-এর মতে, “এমন দাম্পত্য সম্পর্ক যেখানে গার্হস্থ্য সহিংসতা হচ্ছে, এই সহিংসতার তিন চতুর্থাংশের সাক্ষী হয় শিশুরা।এই শিশুদের প্রায় অর্ধেকের হয় শারীরিক আঘাত। যৌন ও মানসিক নির্যাতন হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেশী এই পরিবারের মধ্যে।”

তারা আরও বলে, “ছোট শিশুরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে, পেট ব্যাথার অভিযোগ করে অথবা তাদের বিছানা ভিজাতে শুরু করতে পারে। তাদের ঘুম অনিয়মিত হতে পারে, মেজাজ তিরিক্ষি হতে পারে এবং বয়সের তুলনায় আরও ছোট বাচ্চার মত আচরণ শুরু করতে পারে।”

ছেলে আর মেয়েদের সব আচরণই ভিন্ন হয় আমরা জানি। এই ক্ষেত্রেও তা দেখা যায়। “ছেলেরা তাদের মর্মপীড়া আরো বাহ্যিকভাবে প্রকাশ করে। তারা আক্রমনাত্মক এবং অবাধ্য হয়ে যেতে পারে। কখনো কখনো, তারা হিংস্রতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা শুরু করে, যদি তারা তাদের পরিবারের প্রাপ্তবয়স্কদের আচরণ থেকে এটা শেখে। আরও বয়স্ক ছেলেরা স্কুল পালানো এবং এলকোহল বা ড্রাগ ব্যবহার শুরু করতে পারে।”

মেয়েদের বেলায় যা হয় তা নিয়ে বলা হচ্ছে, “মেয়েরা চেপে রাখে ভিতরে তাদের অস্থিরতা। তাদের অন্যান্যদের থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয় এবং বিষণ্ণ বা হতোদ্যম হয়ে উঠতে পারে। তারা গুরুতরভাবে নিজেদের নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগে ও অস্পষ্ট শারীরিক উপসর্গের অভিযোগ করতে পারে। They are more likely to have an eating disorder, or to harm themselves by taking overdoses or cutting themselves”।

এই ধরণের শিশুরা (ছেলে ও মেয়ে) যথেষ্ট মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও স্কুলে পড়াশোনায় খারাপ করতে পারে। কারণ তারা নিজেদেরকে নিয়ে অনেক ‘doubt’-এ ভুগতে থাকে এবং পারিবারিক বিবাদ তাদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করে, তাই মনঃসংযোগের ঘাটতি তৈরি হয়।

ইন্ডিয়ান ওমেন্স হেল্‌থ ডট কম বলে, “একটা ছোট বাচ্চার পুরো পৃথিবী যে তার মা-বাবা, যারা বিশ্বজগতের তার জন্য কেন্দ্র, তাদের সম্পর্ক যদি স্থিতিশীল ও যুক্তিযুক্ত না হয়, সন্তানের জন্য কিছুই বিশ্বস্ত এবং স্থিতিশীল থাকে না এবং সন্তানের নিরাপত্তার অনুভূতি মরে যায়।”

ইউনিসেফ-এর রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে তিনটি বিষয়ঃ

১। There is increased risk of these children becoming victims
of abuse themselves. There is a common link between domestic violence and child abuse.

২। There is significant risk of ever-increasing harm তো the child’s physical, emotional and social development. It can harm the development of their brains and impair cognitive (মস্তিষ্কের) and sensory growth. … Later in life, these children are at greater risk for substance abuse (ড্রাগ, অ্যালকোহল), juvenile pregnancy (অকালে গর্ভধারণ) and criminal behavior than those raised in homes without violence.

৩। There is a strong likelihood that this will become a continuing cycle of violence for the next generation. The single best predictor (ভবিষ্যতের ইঙ্গিত) of children becoming either perpetrators (অপরাধী) or victims of domestic violence later in life, is whether or not they grow up in a home where there is domestic violence. Studies from various countries support the findings that rates of abuse are higher among women whose husbands were abused as children or who saw their mothers being abused.

আরও অনেক চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসে গবেষণায়। যেমন শিশুরা কিন্তু বাবা-মার ‘ঠাণ্ডা যুদ্ধ’ খুব সহজেই ধরতে পারে। অর্থাৎ মারামারি না করলেও যেই পরিবারে বাবা-মা সহজ কোন সম্পর্ক নিয়ে চলছে না, সেখানেও শিশুর রিস্ক রয়েছে।

কামিংস-এর গবেষণায় তিনি বলেছেন যে, প্রায় ১ বছর বয়স থেকেই শিশু পরিবারের অশান্তি বুঝতে পারে। আবার টিনএজারদের উপরে এই নেতিবাচক প্রভাব আরও বেশী শিশুদের চেয়ে! এমনকি বাবা-মা শিশুদের ‘বুঝ’ দিয়ে কোন একটা ঝগড়া থামানোর ঘোষণা দিলেও তারা এই মিথ্যা আচরণ সহজেই ধরতে পারে।

আরেকটি লক্ষণীয় ব্যাপার, অনেক শিশুই বাবা-মার ঝগড়া থামাতে নিজেই উদ্যোগী হয়, এটা শুধু তারা করে আতংকিত হয়ে, আর কিছু নয়।

তাহলে বাবা-মা থেকে শুরু করে পরিবারের সবার কি কি করা উচিত? নিচে গবেষকদের সেরকম কিছু প্রস্তাব তুলে ধরা হলঃ

১। শিশুদের সামনে কখনই ভয়াবহ রকমের ঝগড়া-ঝাঁটি করা যাবে না। সেরকম কোন কনফ্লিক্টের আশংকা থাকলে, তাদেরকে নানাবাড়ি, দাদাবাড়ি এ ধরণের কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া যায়। তবে এরকম ঘন ঘন হলেও ওই বাড়িগুলো তাদের জন্য নেতিবাচক স্মৃতি হিসাবে জমা থাকবে।

২। গবেষকরা বলেন, কত বেশী ঝগড়া হচ্ছে সেটাও নিয়ামক নয়। বরং দেখা যায়, যেসব বাবা-মা ঝগড়া করে আবার ভালভাবে তা মিটিয়ে ফেলে, সেইসব পরিবারের শিশুদের জন্য এটা আরও পজিটিভ হয়। কারণ তারা বাস্তব জীবন সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা পায়। তারা বুঝতে শিখে যে, যে কোনও দ্বন্দ্ব শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধান করা যায়। আবার শিশুদের সব ধরণের দ্বন্দ্ব থেকে আগলে রাখলেও তারা ভবিষ্যতে একটি অবাস্তব পৃথিবীর চিন্তা করে বড় হয়, যেখানে কোনও দ্বন্দ্ব নেই। এটাও কিন্তু নেগেটিভ।

৩। যে কোনও ঝগড়ার সময় শিশু আশেপাশে থাকলে অনেক সময় তারা ভাবে, তাদের কোনও আচরণেই বাবা-মা এরকম করছে। তাই যেকোনো ঝগড়া মিটে গেলে তাদেরকে অবশ্যই বোঝাতে হবে যে, তাদের কোনও দোষ ছিল না। আর বাবা-মার এরকম ঝগড়া হয়ই, কিন্তু এটা সাময়িক মাত্র। এতে শিশুর ভিতরে একটা ‘সেন্স অফ সিকিউরিটি’ গড়ে ওঠে।

৪। আমার আপনার সবার দায়িত্ব আছে এইসব ঘটনা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবগত করার। এ জন্য এই লিংকগুলি শেয়ার করুন। যারা মিডিয়ায় আছেন, তারা চেষ্টা করুন এগুলো ছড়িয়ে দিতে। এমনকি বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়দের সাথে এ নিয়ে আলোচনা করুন রেগুলার। কোনও শিশুরই একটি পরিবারে বড় হওয়া উচিত নয়, যেখানে ভয়াবহ দাম্পত্য কলহ তাকে প্রতি মুহূর্তে আতংকিত করে রাখে।

৫। যারা এই লেখা পড়ছেন, আপনিও এই ধরণের পরোক্ষ ‘অ্যাবিউজ’-এর শিকার হয়ে থাকতে পারেন। তাই আপনি এমন অনেক আচরণ করতে পারেন, যা আপনার ‘সাব-কন্শাস’-এ রয়ে গেছে। কাউন্সেলিং-এ যা করা হয়, তা হল, কাউকে এই আচরণের ব্যাপারে ‘কনশাস’ করা, তাহলেই একমাত্র এইসব নেতিবাচক আচরণ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এছাড়া মেডিটেশন, ভালো সঙ্গীত, এমনকি শুধুমাত্র কোনও নিকট বন্ধুর সাথে এই বিষয়ে কথা বলাও অনেক কাজে দেবে। তবে কোনও প্রোফেসনালের সাহায্য নেয়াই শ্রেয়। আর তা সম্ভব না হলে ইন্টারনেট তো আছেই।

আমরা সবাই জন্মেছি একটি ‘ফাঁকা স্লেট’ নিয়ে যা হচ্ছে আমাদের মস্তিষ্ক। আমাদের সবারই জীবনের বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে নিজস্ব সাইকোলজি, চিন্তাভাবনা, আচার-আচরণ গড়ে ওঠে। ভবিষ্যতে সবাই আমরা যেন একটি শিশুর জন্য আনন্দময় শৈশব উপহার দিতে পারি, সে চেষ্টা আমাদের সবারই করা উচিত।