ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

অপরাধ, সহিংসতা কেন ঘটে? পৃথিবীর কোনও দেশে অপরাধের মাত্রা ভয়াবহ আবার কোনও কোনও দেশে একেবারেই কম কেন? এ ব্যাপারে সায়েন্স কি বলে? সেই ধরণের কিছু প্রশ্ন থেকে এই ব্লগ লেখার চেষ্টা। পোস্টটি পড়ে যদি উপকার হয় কারো কোনও, তাহলে তাঁদের কাছে এই ব্লগ শেয়ার করার বা নেট ঘেঁটে নিজেই আরও ব্লগ লেখার অনুরোধ রাখছি। :-B

প্রথমেই সূত্র উল্লেখ করা ভালো। ‘কজেজ অফ ভায়লেন্স’ লিখে গুগল সার্চ করলে অনেক সাইট পেয়ে যাবেন। তবে বলে রাখি, এ ব্যাপারে আমাকে প্রথমেই সাহায্য করেছে ‘জাইটগাইস্টঃ মুভিং ফরওয়ার্ড’ নামে অসাধারণ একটি ডকুমেন্টারি। লিঙ্কঃ পুরো মুভি

বড়ভাবে সংজ্ঞায়িত করতে গেলে বলা যায়, ভাওলেন্স-এর মূল কারণ তিনটিঃ

(১) বায়োলজিক্যাল কারণ, (২) সামাজিক বা sociological কারণ এবং (৩) সাইকোলজিক্যাল কারণ। [লিংক]

(১) বায়োলজিক্যাল কারণঃ এর ভিতরে পড়ে টেস্টসটোরন (testosterone) নামক হরমোন (যা শুধু মাত্র পুরুষদের শরীরে থাকে), ব্রেইনের সেরোটোনিন (serotonin) নামক একটি নিউরোট্রান্সমিটার (যা ঘুম, বিষণ্ণতা এবং মেমরির সাথে যুক্ত) এমনকি হায়পোগ্লসিমিয়া (hypoglycemia) যাতে শরীরের ব্লাড সুগার অত্যন্ত কমে যায়। উল্লেখ না করলেও বুঝবেন, সমগ্র পৃথিবীতেই পুরুষই নারীর চেয়ে বেশী এগ্রেসিভ, বেশী ভায়লেন্ট এবং বেশীরভাগ অপরাধ-ই করছে পুরুষ। তাই বায়োলজির ভূমিকা বোঝাই যাচ্ছে।

তবে শুধু মাত্র বায়োলজি দিয়ে মানুষের অপরাধ-প্রবনতা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। তাছাড়া গবেষণায় বায়োলজিকাল ফ্যাক্টরের চেয়ে অন্যান্য ফ্যাক্টরের প্রতি জোর দেয়া হয়েছে বেশী। (National Academy of Sciences reviewed hundreds of studies on the relationship between biology and violence, and it came to one clear bottom-line conclusion: “No patterns precise enough to be considered reliable biological markers for violent behavior have yet been identified.”) আরও কিছু বিস্তারিত আছে সামনে।

(২) সামাজিক বা sociological কারণঃ এ বিষয়ে কারো সন্দেহ থাকার কথা না যে দরিদ্র জনগোষ্ঠীতে অপরাধের মাত্রা অনেক বেশী হয় সাধারণত। এই কারণগুলি নিয়ে এই পোস্টে বিশদ আলোচনা থাকবে।

(৩) সাইকোলজিক্যাল কারণঃ এই ধরণের কারণের ভিতরে অবশ্যই বলা দরকার, মানসিক রোগ বা বিকৃতি বোঝানো হচ্ছে না। বরং বলা হচ্ছে একটি শিশুর ‘ডেভেলপমেন্ট প্রসেস’ বা তার বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার কথা। এই বিষয়েও বিস্তারিত থাকছে এই পোস্টে।

Epigenetic Effect:

একটা কথা বলে নেই, genetics দিয়ে একসময় মানুষের আচরণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা চলেছিল। কিন্তু এখনকার বিজ্ঞানীদের গবেষণায় প্রমানিত, কারো শরীরে একটা জিন থাকলেই মানুষ সেই জিনের কারণে কোনও আচরণ করবে না। বরং বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক ঘটনার কারণে সেই জিনের প্রকাশ বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে, আবার তা সহায়তাও পেতে পারে। একে বলে ‘এপিজেনেটিক এফেক্ট’।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোলজিকাল সায়েন্সের অধ্যাপক রবার্ট সাপলস্কি (Robert Sapolsky) বলেন, ‘এটি (মানব জীববিজ্ঞান) কার্যত অসম্ভব বোঝা পারিপার্শ্বিকতার প্রেক্ষাপট ছাড়া’।

কানাডার ভ্যানকুভারের প্রখ্যাত চিকিৎসক ডক্টর গাবোর ম্যাটে (Dr Gabor Mate) বলেন, ‘অনেকেই বিশ্বাস করেন বিভিন্ন রোগ জেনেটিকাল। ঘটনা কিন্তু উল্টো। কোনও কিছুই জেনেটিকাল্লি নির্ধারিত নয়।’

রিচার্ড উইল্কিন্সন (Richard Wilkinson) ইউনিভার্সিটি অফ নটিংহ্যাম-এর প্রফেসর। তাঁর মতে, ‘প্রারম্ভিক শৈশব অভিজ্ঞতার কারণে কিছু জিন এক্সপ্রেশন প্রভাবিত হয়।’

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ জেমস গিলিগান-ও (Dr. James Gilligan) একই মত প্রকাশ করেন।

এই আলোচনার সারমর্ম একটাই, জিনের কারণে কারো আচরণ পূর্বনির্ধারিত নয়। :-B

***প্রসঙ্গঃঅ্যাডিকশন বা নেশাগ্রস্ততা***
অ্যাডিকশন বললেই সবাই ড্রাগের কথা ভাবেন। কিন্তু অ্যাডিকশনের আরও অনেক অনেক প্রকার আছে। সিগারেট খেলেও কিন্তু সবাই সিগারেটের নেশায় ভোগেন না। পাশ্চাত্য দুনিয়ায় অ্যালকোহল পান করেন সবাই। কিন্তু সবাই-ই কি অ্যালকোহলিক? আরও অনেক ধরণের অ্যাডিকশন আছে। যেমন ফুড, ইন্টারনেট, গেমিং, শপিং এমনকি টাকা বা ক্ষমতার অ্যাডিকশন (মনোবিদরা গবেষণায় দেখেছেন কোনও টাকার খেলায় মানুষের ব্রেইনের সেই পার্ট সাড়া দেয় যা একই সাথে কোকেন-এর কারণেও সাড়া দেয়)।

তাহলে প্রশ্ন আসে কেন কেউ ‘অ্যাডিক্ট’ হয় আবার কেউ হয় না। এখানেই চলে আসে আমাদের ‘এনভায়রনমেন্ট’ বা পারিপার্শ্বিকতার প্রসঙ্গ।

***পারিপার্শ্বিক অবস্থা***

তাহলে কেন কেউ অ্যাডিক্ট হবে আর কেউ হবে না তা বুঝতে হলে আমাদের তার ‘লাইফ এক্সপেরিএন্স’ দেখতে হবে। আর লাইফ এক্সপেরিএন্স শুরুই হয় মায়ের গর্ভে।

গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভে সন্তান থাকাকালীন মাকে পীড়ন, দমন ইত্যাদির ভিতর দিয়ে নিয়ে গেলে তাদের সন্তানদের ভবিষ্যতে অ্যাডিক্ট হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায় (predisposition)। এমনকি ল্যাবে পশুদের ওপরও এই ধরণের এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে দেখা গেছে, তাদের সন্তানরাও ভবিষ্যতে অ্যাডিক্টিভ দ্রব্যাদির উপর আসক্তি দেখায় অনেক গুনে বেশী। :-/

এবার আসা যাক মায়ের গর্ভ থেকে জন্মের পরে কি হয় তাতে। মানুষ জন্ম হয় খুবই অপরিণত মস্তিষ্ক নিয়ে। ঘোড়ার সাথে যদি তুলনা করা যায়, তবে দেখা যায় একটি ঘোড়ার বাচ্চা জন্মের অল্প কয়েক ঘণ্টার ভেতরেই দৌড়াতে পারে। কিন্তু মানুষের হাঁটা শিখতেই বহুদিন লেগে যায়। এর কারণ মানব মস্তিষ্ক এত জটিল, তার পূর্ণ গঠন সম্ভব নয় মায়ের গর্ভে মাত্র ৯ মাসে।

এই মস্তিষ্ক গঠনের সময়ও অনেক ঘটনা আমাদের আচরণে ছাপ রেখে যায় সারা জীবনের জন্য। এই ব্যাপারে ২ ধরণের মেমরি উল্লেখযোগ্যঃ Explicit বা সুব্যাক্ত এবং Implicit বা অব্যাক্ত মেমরি।

প্রথমটা বলতে বোঝায়, আমরা যেসব মেমরি ‘মনে করতে পারি’। কিন্তু দ্বিতীয় ধরণের মেমরি বা স্মৃতি হচ্ছে যেসব স্মৃতি আমরা ‘মনে করতে পারি না’। এটা হচ্ছে শিশুর জীবনের প্রথম বা দ্বিতীয় বছরের স্মৃতি, যা তার ব্রেইনে থেকে যায় নার্ভ সেলের মধ্যে যা তাকে ভবিষ্যতে কোনও একটা আচরণ করাবে, কিন্তু সে বুঝতে পারবে না কেন সে এরকম করছে। 😐

তবে মূল কারণ সকল মনোবিদরাই একমত যে ব্যাপারে, তা হচ্ছে মাদকাসক্তরা প্রায় সবাই-ই শৈশবে বড় ধরণের অ্যাবিউজ বা নির্যাতন অথবা বড় ধরণের ‘ইমোশনাল লস’-এর শিকার (severe childhood trauma)। তবে দুঃখের বিষয়, এর অনেক কিছুই তারা ‘মনে করতে’ বা recall করতে পারে না। তাই তাদের আচরণও অনেক সময় তাদের নিজেদের কাছেও দুর্বোধ্য থেকে যায়। /:)

তবে আমার লেখার মূল উদ্দেশ্য মাদকাসক্তি নিয়ে কথা বলা নয়। আমি এর উদাহরণ টানলাম শুধুমাত্র বুঝানোর জন্য যে মানুষের কোনও একটি অপরাধ-প্রবনতা কেন শুধুমাত্র আইন, ধর্ম, নৈতিকতা ইত্যাদির আলোকে ব্যাখ্যা করলে চলে না।

পোস্ট বেশী বড় হয়ে যাচ্ছে। পরবর্তী পর্বে আরও বিস্তারিত আলোচনা করবো বাকি পয়েন্টগুলো। আপাতত ডঃ গাবোর ম্যাটের একটি ইন্টারভিউ দেখুনঃ

ধন্যবাদ পড়ার জন্য। 🙂