ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

দেশ এখন একটা অস্থির সময় পাড় করছে । মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই আমাদের জাতীয় জীবনে চরম বীভৎস লোমহর্ষক ও লজ্জাকর কিছু ঘটনা ঘটে গেলো। যা সত্যি আমাদের স্বাধীনতা লাভের দীর্ঘ সময় পরেও বিবেককে নাড়া দেয়। পেছনের সব কিছু বাদ দিয়েও যদি সাভারের অগ্নিকাণ্ড থেকেও ধরি তাহলেও অনেকগুলো অঘটন ঘটেছে। সাভারের তাজরিন ফ্যাশন গার্মেন্টস এ ১১৩ জন জীবন্ত মানুষের লাশ। যেখানে আমরা দেখেছি হর্তাকর্তা দের বড় বড় আস্ফালন! যে যার মতো একে অন্যের ঘারের উপর দোষ চাপানো। এতগুলো মানুষ মরে গেলো সেখানে কেউ বিল্ডিঙয়ের কন্সত্রাকশন নিয়ে ঘাপলার কথা বলছে। বিজীএমইএ যুক্তি দেখাচ্ছে তারা এই করেছে, সেই করেছে। তাঁদের একটিভ পদক্ষেপের কারনেই আজকে মৃত্যুর হার তুলনামুলক ভাবে কমেছে। তুলনা দাড় করতে তারা অনেক পরিসংখ্যানের বই খাতা নিয়ে চ্যানেলে চ্যানেলে টক শো করেছে। আবার হেসে হেসে, হাত উঁচিয়ে তর্ক যুদ্ধও করেছে। তারপর যা হবার তাই…। মৃতের বাড়িতে আহাজারি চলছেই। শ্রমিকের বকেয়া বেতন আনতে গিয়েও পুলিশের গন পিটুনি খেয়ে মরার উপর খাঁড়ার ঘা খেয়েছে! এখন সেই চ্যাপ্টার ক্লোজ!

 

একই সাথে ঘটলো চট্টগ্রামে ফ্লাইওভার এর গার্ডার ভেঙ্গে ১১ জন (মতান্তরে ১৫ কি তার বেশী) সাধারন মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যু। এক শ্রেণীর অসাধু অর্থলিপ্সু মানুষের অবহেলার কারনে কতগুলো সাধারন মানুষের প্রান হারাল। যারা আমাদেরই কারও না কারও আত্মীয়, ভাই, বাবা, স্বামী। কি হল?? কিচ্ছু না। সব ঠাণ্ডা। যে মরে গেছে সে তো মরেই বাঁচছে! কিন্তু আমাদের জন্য মৃত্যু কুপ যে আর বন্ধ হল না…। আমরা যাবো কই???? এখন তো রাস্তায় বের হতেই ভয় লাগে। আমার যাতায়াতের পথেই খিলগাঁও ফ্লাইওভার এর নিচে থেকে যখন যাই, তখন আমি সারাক্ষণ উপরের দিকে তাকিয়ে থাকি আর ভাবি এখনই যদি এই ফ্লাইওভার টা ভেঙ্গে পরে তাহলে নিচের মানুষ গুলো কই যাবে??? তাকিয়ে দেখি চারিধারে যে পরিমান রিক্সা – গাড়ি, সেগুল ডিঙ্গিয়ে যেতেই তো চাপা পড়ব!!!! হায়! কি সুন্দর আমরা ডেভেলপমেন্ট করছি! আমাদের উন্নতি হচ্ছে। ডিজিটাল হচ্ছি। আর চাপা পরে মরছি। আপাতত এই চ্যাপ্টারও ক্লোজ পরিবর্তী ঘটনার আড়ালে!

 

দিন গড়াতে না গড়াতেই জনৈক বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী আদালত (পরবর্তীতে বিজ্ঞ আদালত নামে লেখা) মাদক দ্রব্য সহকারে ধরা পড়লেন। এর পরে কি থেকে কি হইলো আল্লাহ্‌ই জানেন। শুধু শুনলাম যে পুলিশ কেন বিজ্ঞ আদালত কে মিডিয়ার সামনে অপদস্ত করা হল সেই জন্য ঝাড়ি খেতে হল। যাও না পুলিশ একটু বিজ্ঞ আদালত’এর কুকীর্তির জানান দিয়ে বাহবা কুড়াতে গেল, সেখানেও একটা বাঁশ খেল। “শালা খোঁদার উপরে খোদকরি দেখাও, এইবার বুঝো মজা!!” নড়ে গেলো আমাদের অধস্তন বিচার বিভাগের সততা, ন্যায়পরায়ণতা আর নৈতিকতার খুঁটি!

এরপরে মনে হয় কয়েক দিন না কয়েক ঘণ্টা পরেই রাজনৈতিক দলগুলোর একের পর এক কর্মসূচী শুরু হল। সেখানে তো ঘাত – প্রতিঘাত, সংঘাত নিত্য নইমত্তিক লেগেই আছে। পাল্টাপালতি কর্মসূচী, একেরপর এক হাঙ্গামা! একদল অন্য দলের মানুষ মারছে। কোন দল পুলিশ কেও মেরে মুখ থুবড়ে ফেলে দিচ্ছে রাজপথে। পুলিশ এর পরে একদিন দেখলাম বিজিবি কেও নাকি হোতায়ে ফেলছে! কি অবস্থা, এই নাকি আমার সোনার বাংলা। যেই “সোনার বাংলা” গানের তীব্র মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে একটা দেশ স্বাধীন হয়ে গেলো। আর এখন স্বাধীন দেশেই আমরা নিজেরাই নিজেদের শত্রু হয়ে গেছি! একসময়ে আমরা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী মেরে খেদিয়েছিলাম আর এখন নিজেদের দেশের পুলিশ বাহিনীর উপরে চড়াও হই! যারা আমাদেরই সন্তান, আমাদেরই ভাই। (অবশ্য এখানে কখনও কখনও পুলিশেরও বিতর্কিত চিত্র রয়েছে)।

 

লাস্ট চাঞ্চল্যকর ঘটনার একটা বিশ্বজিৎ নামক এক নিরীহ পথচারীর অনৈতিক, অন্যায় ও চরম অমানবিক নিষ্ঠুর কলুষিত হত্যা। যে নিষ্ঠুরতা বর্ণনার কোন সাবলীল ভাষা নাই। সবার মনে একটাই প্রশ্ন; “মানুষ মানুষকে এইভাবে মারতে পারে??? এই ভাবে কুপিয়ে দিনে দুপুরে হত্যা??? এও কি সম্ভব???” সবাই একবাক্কে ছিঃ ছিঃ ছিঃ করেছে। এটা একটা ‘রাজনৈতিক বলি’ হয়েছে। প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দল, দলের সদস্য, নেতা, কর্মী ও প্রশাসন এর জন্য দায়ী। আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক! লাল-সবুজের পতাকার অহঙ্কার দেখাই! স্বাধীনতা যুদ্ধের ভুরি ভুরি গর্ব কিসের জন্য?? এই হানাহানির জন্যে??? স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরেও এ আমরা কি দেখছি?? দেশ স্বাধীন করে আমরা কি এই পেলাম?? দিনে দুপুরে আমরা মরে যাবো??? আমরা কি মরে যাওয়ার জন্য স্বাধীন হয়েছি??? এমনিতেই তো খেতে পারি না, চলতে পারি না, নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা, সবদিকে হাহাকার, জীবন যাত্রায় নাভির শ্বাস উঠে যাচ্ছে; সব কিছু মেনেও আমরা একটু ধুকে ধুকেও বাঁচতে পারবো না??? একদম গুলি করে, চাপা দিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে, কুপিয়ে মেরে ফেলবে??? এ কোন বাংলাদেশে বাস করছি আমরা??? এখন এটাকেও পুঁজি করে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা কল্পনা। শুরু হয়েছে রাজনীতির নতুন মেরুকরণ। বিশ্বজিৎ মরেই বেঁচেছে, কিন্তু আমরা রাজনীতির চিপায় চ্যাপ্টা হচ্ছি!!! তবে বিশ্বজিৎ হত্যার এই চ্যাপ্টার এখন রাজনীতির মধ্যে ঢুকেছে। এটা সহজে যাবে না বোধ হয়! কারন আমাদের বিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা তো বলেই থাকেন “রাজনীতি হল একটা চলমান প্রক্রিয়া, এর কোন থামাথামি নাই, এ চলবেই অনন্তকাল ধরেই” তাই বিশ্বজিৎ কে নিয়ে রাজনীতির শেষ হবে না সহজে! এক বিশ্বজিৎ মরে গেছে, আরও বিশ্বজিৎ রয়ে গেছে “মরার জন্যে” ওদের (রাজনীতির) খেলার উপকরন হবার জন্যে, পাঁঠার বলি হবার জন্যে, রাজনীতির মাঠ সরগরম করার জন্যে। (অবশ্য রাজনীতি যতক্ষণ সোচ্চার, কিছু ব্যাবসা তো রমরমা হয় কোন কোন শ্রেণীর! এটাও বা কম কি??!)

 

সবশেষে মানুষ গিয়ে দাঁড়ায় আদালতের দরজায়। যার কেউ নাই তার আছেন আল্লাহ্‌ আর আল্লাহ্‌র পরে আছেন ন্যায় বিচারক। একটা কথা আছে “বিচারের বানী নীরবে কাঁদে!” জামানা বদল গ্যায়া! ‘বিচারের বানী’ প্রকাশের আগেই এখন সরবে হাঁকডাক দেয়!!! বহু প্রতীক্ষিত যুদ্ধ অপরাধী মামলার চূড়ান্ত মুহূর্তে এসে গোমর ফাঁস হয়ে গেলো! বিব্রতকর এক পরিস্থিতি!! হায় আমাদের বিচার বিভাগ! মানুষ যাবে কই??? কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই। মানুষের সবকিছুর শেষ আশ্রয় স্থল এই বিচার, বিচারক আর বিচারালয় সেও এখন প্রশ্ন বিদ্ধ??? আমাদের সামনে খুব খারাপ দিন আসছে। এইভাবে একটা দেশ চলতে পারে না। মানুষ বাঁচতে পারে না। যখন চারিদিকে হাহাকার, অন্যায়, অত্যাচার, অনাচার তখন একটা বড় অঘটন ঘটে! আর কতো?? আর না, এইবার একটু থামেন আপনারা…!!! গুটি কয়েক মানুষের পাপের খেসারত আমাদের সবাইক জ্বালিয়ে মারছে। আর কতো পাপের খেসারত দিতে হবে আমাদের??? দেশের প্রত্যেকটা অঙ্গেই দুর্নীতি। প্রত্যেকটা সরকারী, বেসরকারি, ব্যাক্তি পর্যায়ে সব ক্ষেত্রেই কম বেশী দুর্নীতি, অন্যায় চলছে দেধারছে! আমাদের সবাইকেই ব্যাক্তিগত পর্যায়ে ভালো হতে হবে। কোন বিশেষ দল বা গোষ্ঠী কে ভালো হতে বললে হবে না। সবাইকেই যার যার ক্ষেত্র থেকে সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও ভালো হতে হবে। তাছারা আমাদের সুস্থ, সুখী, সুন্দর সোনার বাংলাদেশ কোনদিনই গড়া সম্ভব হবে না।

 

আজকে ১২/১২/২০১২ ইং তারিখ। যা আগামী ১০০ বছর পরে ফিরে আসবে ১২-১২-২১১২ হয়ে আমাদের জীবনে। আমাদের অনেকেই আর থাকবেনা সেই পর্যন্ত। থাকবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। আমরা এখনই ভালো না হলে আগামী প্রজন্ম আমাদের কুকুর, বিড়াল এর চেয়েও খারাপ ভাষায় গালি দেবে! এখন মহান বিজয় দিবসের মাস- সামনেই আসছে ১৬ই ডিসেম্বর। আমাদের মহান বিজয় দিবস। বিজয়ের চতুর্থ দশকে এসে আমরা দাঁড়িয়েছি, অথচ আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তি এখনও শক্ত হয়নি, স্বাধীনতার প্রকৃত চাওয়া এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। আজও আমরা রাজাকার, ঘাতক, দালাল নির্মূল করার এজেন্দা নিয়ে ইলেকশন করি। অথচ আমাদের উচিৎ ছিল অনেক আগেই এই জঞ্জাল নির্মূল করে উন্নয়ের রাজনীতি করার। দেশের উত্তর উত্তর উন্নতির সোপান বেয়ে এগিয়ে যাওয়ার। সে যেভাবেই হোক আমাদের সবাইকে শুদ্ধ হতে হবে। সব অন্যায়, অত্যাচার, দুর্নীতি, জঞ্জাল মুক্ত হয়ে একটা সত্যিকার সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা সোনার বাংলাদেশ, যেখানে দিন দিন আমাদের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা, সুখী ও সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রের মর্যাদা নিয়ে বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। সবার শুদ্ধতা কামনা করছি। সবাই ভালো থাকুক, সুস্থে থাকুক, নিরাপদে বেঁচে থাকুক। সুভেচ্ছা সবাইকে। শেরিফ শরীফ (১২/১২/১২ ইং)