ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

বাংলা স্বরলিপি, বাংলা সংস্কৃতি ও বাংলায় বাক-স্বাধীনতাকে অটুট রাখার জন্য ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগানের মাধ্যমে যে গণজাগরণ প্রাতিষ্ঠানিক রুপলাভ করেছিল তার নাম ‘ভাষা আন্দোলন’। ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব, মহত্ত্ব, এর উপকারিতা ও উপযোগিতা আমরা বাংলা ভাষাভাষী মর্মেমর্মে উপলব্ধি করতে পারি। এমনকি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়েও বিস্তর আলোচনা, বিচার বিশ্লেষণ, পুঙ্খানুপুঙ্খ (চুলচেরা) গবেষণা হয়েছে, হচ্ছে ও হবে। সে বিষয়ে নতুন কিছু বলার নাই।

কিন্তু বাংলাভাষার জন্য ৫২’এর আন্দোলনকে আমরা কেন ২১শে ফেব্রুয়ারি বলি? এটা কি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো ২১শে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?” গানের জন্য মনে রেখেছি? আচ্ছা, আমরা হয়তো অনেকেই জানিনা যে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলা কোন সনের, কোন মাসের, কয় তারিখ ছিল? জানি কি??! আমরা কি জানি আজকে ইংরেজি ২০১৪ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলা কোন কোন সনের, কোন মাসের, কয় তারিখ??* সামান্য তারিখ জানাটা হয়তো মুখ্য কিংবা তুচ্ছ কিছুও হবে না। কিন্তু জানাটা কি উচিৎ নয়? সারাজীবন ২১শে ফেব্রুয়ারি বলে-লিখে, গান গেয়ে যাবো কিন্তু যে বাংলার জন্য রক্তপাত হল, বিশ্ব ভাষা দিবস হল (যদিও সেটা ইংরেজি তারিখ অনুযায়ী) সেই বাঙালী চেতনায় বাংলা বছর, মাস, দিনের উল্লেখ থাকবে না??? আমরা দেদারছে ২১শে ফেব্রুয়ারি বলে বুলি আওড়াই, বাংলা ভাষা নিয়ে মাতি, অথচ ২১শে ফেব্রুয়ারির আগে-পিছে কোনপাশেই বাংলা তারিখের খবর নাই!!!

574726_560506870634897_227970327_n

অনেকেই হয়তো বলবেন একটা বাংলা তারিখ নিয়ে এতো কথা বলার কোন মানে নাই। হয়তো ঠিক। আবার কদিন বাদেই আমরা পহেলা বৈশাখে ঢোল, তবলা, ডুগডুগি নিয়ে নেমে পড়বো। পান্তা ইলিশ খেয়ে বাঙালী হবো। এভাবেই বিশেষ দিনগুলোতে চেতনার টিকি ধরে আছি। ‘জিস্ট’ অথবা সারমর্মে বাঙালীর মতো অর্ধেক চেতনা দিয়ে কি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি বাঁচানো যাবে???

এবার আসি চেতনার নামে আরেকটি অপসংস্কৃতির কথায়। শহীদদের পবিত্র রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনা ২১শে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের উদ্দেশ্যে রাস্তার মোড়ে মোড়ে শহীদ মিনার তৈরির নামে বখাটে ছেলেদের অভিনব চাঁদাবাজি। হয়তো এর দ্বারা সৃষ্ট অপ্রীতিকর বড় কোন দুর্ঘটনা জনসম্মুখে আসেনি। বিষয়টা আগেও পাড়ায় মহল্লায় ছোট ছেলেপুলে মিলে কলাগাছ, বাঁশ, ইট ও মাটি দিয়ে শহীদ মিনার বানাত। সেটা ভিন্ন কথা, কিন্তু গত কয় বছর ধরে বিশেষ করে এবার বলা যায় মহামারী আকারে শুরু হয়েছে। যা রীতিমতো ভয়ংকর। আমি নিজেও এর খপ্পরে পরেছি, আমার মতো আরও অনেকেই পড়েছে। ধর্মীয় ও নানা পালাপর্বণ গুলোতে এরকম চাঁদাবাজির জের ধরে বহু অনাকাঙ্খিত ঘটনাও ঘটেছে। যা বরাবরই জনদুর্ভোগ ও অসাধুপূর্ণ হওয়ার কারনে নিগৃহীত হয়েছে বিভিন্ন মহলে। কটূক্তি হয়েছে, প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে সেসকল পালাপর্বণ গুলো নিয়ে। বাংলা ভাষা ও বাংলার চিরায়ত কোন চেতনা লালন করতে গিয়ে মানুষকে কষ্ট দিয়ে কোন অপসংস্কৃতি যেন রীতিনীতিতে পরিণত না হয় সেটাই কাম্য।।

সবকথার শেষ কথা, আমরা অনুষ্ঠান নির্ভর কিংবা বিশেষ দিনগুলোতে চেতনা সর্বস্ব বাঙালী না হই। অর্ধেক কিংবা খণ্ডিত চেতনাধারী না হয়ে শহীদ দিবসের পূর্ণাঙ্গ চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে মনেপ্রাণে পুরোদস্তুর বাংলাভাষী–বাঙালী ও বাংলাদেশী হয়ে উঠি।।

* সবার জ্ঞাতার্থে, ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ ইংরেজি সালে বাংলা তারিখ ছিল ৮ ফাল্গুন ১৩৫৮ সন।

শেরিফ শরীফ

লেখার তারিখঃ বাংলা ৯ ফাল্গুন ১৪২০ সন/২১শে ফেব্রুয়ারি ২০১৪ ইং।।
(বানান সংশোধনের জন্য রওশন খান কে আন্তরিক ধন্যবাদ)