ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেদ্র দামোদর মোদী অবশেষে তার বহু কাঙ্ক্ষিত (আমাদের অনেকের কাছে, ভারতের কাছে কিনা জানি না) বাংলাদেশ সফর শুরু করেছেন। তাকে বিমানবন্দরে লাল গালিচা অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে। জৈষ্ঠ মন্ত্রীদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাকে বিমান বন্দরে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। তিন বাহীনির এক চৌকশ দল তাকে বিমানবন্দরেই গার্ড অব অনার দিয়েছে। এই সফরে বহুপ্রতীক্ষিত LBA বাস্তবায়নের ঘোষনা দেওয়া হবে। এছাড়া বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কানেকটিভিটি নিয়ে কিছু চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। ২০০/৩০০ কোটি ডলারের ঋনচুক্তিও হতে পারে। এসবই ভালো খবর। দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। অতীতের নেতিবাচক, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ প্রপাগান্ডা থেকে দুই দেশকেই বেড়িয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে এই দেশে ভারত বিরোধী যে উদ্ধেশ্যমূলক অপরাজনীতি হয়ে থাকে, তার অবসান হওয়া দরকার। আশার কথা যে, যারা ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে অতীতে ফায়দা তুলেছেন, তারা এখন মোদীজি বলে কুর্নীশ করছেন। এসবই রাজনীতির কথা, আমার এতে খুব বেশী একটা কিছু বলার নেই। আমি বলব আমার নিজের কথা, একন্তই আমার নিজের।

আমার স্নাতক পড়ালেখা ভারতের মাদ্রাজে। উচ্চমাধ্যমিক শেষে পড়ালেখার জন্য যে ভারত যাব, তা কল্পনাতেও ছিল না। বিদেশে পড়ালেখার কথা বললে বলতাম যে বিদেশ গেলেভারত ছাড়া অন্য কোন দেশে যাব।ভারত কি আবার বিদেশ নাকি? যাই হউক, উচ্চ মাধ্যমিক শেষে ভারতেই ঠিকানা হল। সাড়ে তিন বছরের ভারত অবস্থান কালে মাথা উঁচু করে চলেছি। ভারতীয়রা আমাদেরকে সমীহের চোখেই দেখত। যেখানেই থাকতাম, স্থানীয়রা সম্মান করত। তারপর আমরা যেমন করে থাকি আরকি। নিজেরা নিজেরা মারামারি করে আর নেশায় বুঁদ হয়ে যাতা করে আমরা নিজেদের সম্মান নিজেরাই লুটিয়েছি।ভারত অবস্থানকালে কিছু ঘটনা এখনও মনে পরে যায়।

১) প্রথমবার ভর্তির সময় সাথে এক দাদা ছিলেন। ওনি নিয়ে গিয়ে ভর্তি করিয়ে দিয়ে আসেন। তারপর যাই একা। কলকাতায় গিয়ে এক বাসায় উঠি। এরা চট্টগ্রামের মানুষ। আমার ভগ্নিপতির সাথে পরিচয়ের সূত্রে বেশ খাতির যত্ন করল। মাদ্রাজ যাবার টিকিট কাটার জন্য এক ছেলেকে দিয়ে পাঠালো। সে আমাকে লোকাল ট্রেনে করে দমদম নিয়ে যায় মাদ্রাজের রেলের টিকেট কাটার জন্য। যাই হউক, টিকেট করে সে আমাকে নিয়ে তার বাবার অফিসে যায়। তার বাবার সাথে পরিচয়ের পর আমরা সবাই বাসায় ফিরব, তখন ঐ ছেলের বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করল যে বাসায় কিসে ফিরব। আমি বললাম ট্যাক্সি করে। একথা বলার সাথে সাথে ওনি ওনার কয়েকজন সহকর্মীকে ডেকে বললেন, দাদা আমরা ট্যাক্সি করে যাচ্ছি, আপনারাও চলেন। শেষে আরো তিন জনকে নিয়ে, সারা কলকাতা ঘুরে ওদেরকে নামিয়ে দিয়ে অনেক রাত করে বাসায় ফিরি। কতটাকা আমার ট্যাক্সি ভাড়া এসেছিল, তা আজ আর মনে নেই। তবে বেশ বেশীই ছিল বলে এতদিনেও ভূলতে পারিনি।পরে যা বুঝলাম যে, এরা ট্যাক্সি করে ফেরা নিয়ে এত উত্তেজিত ছিল যে আমার যে তাতে সারা কলকাতা ঘুরা হয়ে যাচ্ছে, তাতে ওদের মাথা ব্যাথ নেই। ওদের মধ্যে একজন আবার আমাকে অনুরোধ করে বসলেন যে আমি যেন পরেরবার আসার সময় একটা সিকো৫ ঘড়ি নিয়ে আসি ওনার জন্য।

২) একবার ট্রেনে করে শিয়ালদাহ থেকে বনগাঁ ফিরছি আমরা কয়েকজন (সবাই বাংলাদেশি)। তখন ট্রেনে সিগারেট খাওয়া চলত। আমি খেতাম ৫৫৫ আর আমার অন্য বন্ধুরা বেনসন খাচ্ছিল। হঠাৎ করে পাশে বসা একজন আমার বন্ধুর কাছ থেকে বেনসনের প্যাকট চেয়ে নিয়ে তার বন্ধুদের দেখিয়ে বলছে যে এটা বিদেশি সিগারেট, অনেক দামী।আমাদের কাছ থেকে আগ্রহ করে দাম-টাম জিজ্ঞেস করছে। ওরা যে জীবনেও এমন এক প্যাকেট সিগারেট কেনার কথা ভাবতেও পারেনা, তা ওদের চোখ-মুখ দেখে বুঝা যাচ্ছিল। আমাদের প্রতি সমীহটা ওদের চোখে স্পষ্ট দেখেছি।

৩) মাদ্রাজে গিয়ে হুজুগ ওঠল NIIT আর  APTECH এ ভর্তি হবার। আমার অনেক বন্ধু ভর্তি হয়েছে দেখে আমিও ভর্তি হলাম NIIT তে। সেখানে এক তামিল ছেলের সাথে বন্ধুত্ত্ব হয়। ক্লাস শেষে বাইরে বেরিয়ে সিগেরেট ধরিয়েছি, অমনি সে এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে বলছে, “Can I have a cigarette, please? “এরপর নিয়ম করে ক্লাস শেষে সিগারেট দিতে হত তাকে। একদিন দু’টা সিগারেটই ছিল। ওকে একটা দিলাম আর আমি একটা ধরিয়ে খালি প্যাকেটটা ফেলে দিচ্ছি। অমন সময় ওই ছেলে (এতদিনে তার নাম মনে নেই) বলছে, যদি কিছু মনে না কর তাহলে আমি খালি প্যাকেটটা নিতে চাই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন? ও বলছে যে, ও তার ছোটবোনকে প্যাকেটটা দেখাবে। তার বোন বিশ্বাস করতে পারছেনা যে সে ৫৫৫ সিগারেট খায়। তাই বোনকে বিশ্বাস করানোর জন্য তার প্যাকেটটা দরকার।

এমনি আরো অনেক ছোটবড় হাজারো ঘটনা আছে যা লিখে শেষ করা যাবে না।ট্রেনে করে মাদ্রাজ যাওয়ার পথে বিশাখাপত্তম পোছলে দেখতাম যে ট্রেন লাইনের পাশে নারী/পুরুষ সমেত সবাই গোল হয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে আর প্রাকৃতিক কাজ সারছে। ট্রেন প্লাটফর্মে ঢুকলে লোটা নিয়ে দাঁড়িয়ে যেত আর আমরা নাক চাপা দিয়ে কোনরকম জায়গাটা পার হতাম। একই ঘটনা দেখা যেত ফেরার পথে খরগপুর স্টেশনে ঢোকার মুখে।

এত কিছু বলার একটাই কারণ, আমরা সাধারন মানুষ ভারতকে যথাযথভাবে মূলায়ন করি। আমরা সবসময় মাথা উঁচু করে চলি ভারতীয়দের সাথে। আজকাল যখন মোদীকে বরণ করে নেওয়ার প্রতিযোগীতা চলে, মোদীর সাক্ষাৎ পাওয়ার জন্য রীতিমত লবিং করা হয়; তখন লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায়। আমাদের মত যারা এখন ভারতে পড়ালেখা করছে বা চিকিৎসার জন্য যাচ্ছে, তারা কি এখন আমাদের মত মাথা উঁচু করে চলতে পারছে? আমি কি এখন সেই সময়কার মত এত আত্মবিশ্বাস নিয়ে চলতে পারব ভারতে? আমাদের রাজনীতিবিদরা কবে বুঝবেন যে ওনাদের শিরদাঁড়া শক্ত না হলে আমাদের মাথা নিচু হয়ে যায়? পাখির মত গুলি করে আমাদেরকে মেরে ফেলে রাখা হচ্ছে, আমরা চুপ করে থাকছি। একেক সময় একেক ভারতীয় নেতা/মন্ত্রী যা খুশি বলে যাচ্ছে, আমরা চুপ করে থাকছি। এভাবে চুপ করে থাকতে দেখে এখন মায়ানমারও আমাদের সমীহ করে না। সুযোগ পেলেই নাসাকা বাহিনী আমাদের সীমান্তে ঢুকে পড়ে, আমাদের জলসীমায় মাছ স্বীকার করতে নৌযান পাঠায়, রোহিঙ্গাদের আমাদের দেশের ভিতন ঠেলে দেয়। জনাব, শিরদাড়াটা শক্ত করে একবার চোখে চোখ রেখে না বলুন। দেখবেন বুকের উপর থেকে চাপা কষ্টটা দূর হয়ে যাবে। আমরা মানুষ, তোমরা মানুষ। তফাত শুধু শিরদাঁড়ায়।