ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

মাধ্যমিকে অর্থনীতি পড়বার সময় “কর” এর প্রকারভেদ পড়েছিলাম- প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষ । পরোক্ষ করের সংজ্ঞা পড়ে কিছু বুঝিনাই, উদাহরণ পড়ে বুঝলাম, ভ্যাট নামক জিনিষটা একধরণের পরোক্ষ কর । তারপর আবার সংজ্ঞার সাথে মিলিয়ে দেখলাম, হ্যাঁ, এবার বুঝলাম, যে কর আরোপ করা হয় উৎপাদক বা ব্যাবসায়ীর উপর, কিন্তু মূলত তার দায় বহন করে (অর্থাৎ করটা মূলত পরিশোধ করে ) ভোক্তা!
ব্যাখ্যাটা এরকম যে, ব্যাবসায়ীকে ভ্যাট এর জন্য তার লাভের যে অতিরিক্ত অর্থ রাষ্ট্রকে দিতে হয়, সেটা সে দিতে অনিচ্ছুক থাকে, তাহলে তার লাভ কমে যায় তাই । তখন সে হয় পণ্যের মূল দাম বাড়িয়ে দেয়, নতুবা, ভ্যাট এর অতিরিক্ত অর্থ পণ্যের মূল দামের সাথে যুক্ত করে মোট অর্থটুকু ভোক্তার কাছ থেকেই আদায় করে নেয়। এতে উৎপাদক বা ব্যাবসায়ীর লাভের কিন্তু কোন হেরফের হয়না!
সুতরাং, ভ্যাট নামক বিষয়টা আসলে রাষ্ট্র-ব্যাবসায়ী-ভোক্তার মধ্যে একরকমের লুকোচুরি খেলা । ব্যাবসায়ী রাষ্ট্রর কাছ থেকে লুকাচ্ছে, একইসাথে ভোক্তার কাছ থেকেও চুরি করছে। রাষ্ট্র আবার ভোক্তার কাছ থেকে লুকিয়ে থাকছে! শেষমেষ যা যাওয়ার যায় ভোক্তা বা জনগণের হাত থেকেই!

এখন শিক্ষা বা উচ্চশিক্ষা জিনিষটা রাষ্ট্রের কাছে পণ্য বিশেষ – মৌলিক অধিকার নয়! রাষ্ট্রীয় পণ্যটি রাষ্ট্র নিজেই উৎপাদন-বন্টন করলে তাও বা কিছুটা স্বস্তির হতো ব্যাপারটা, কিন্তু ব্যাবসায়ীগণ যখন সেই ভার নিয়ে নিলো, তখন সেটা শতভাগ বণিক কায়দায় বিক্রি হবে, এটাই স্বাভাবিক।

এই বিশাল পরিমাণ ভ্যাটের বোঝা কাঁধে নিয়েও কি একজন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দক্ষ ও যোগ্যতম হয়ে গড়ে উঠতে পারবে…? অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে কি তার একাডেমিক শিক্ষার মান কিংবা সনদের মান কি বাড়বে???

তাহলে প্রশ্ন হলো, এতসবের পরেও রাষ্ট্র হঠাৎ করে বেসরকারী শিক্ষাখাতে ভ্যাট বসাতে চায় কেন?
তার দু’টো কারণ থাকতে পারে।
(১) বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় গুলো লাগামছাড়াভাবে আয় করে যাচ্ছে (তাও শিক্ষার্থীদেরই পকেট থেকেই!) যখন তখন সেমিস্টার ফী, ভর্তী ফী বাড়িয়ে, অথবা অন্যান্য নানা অজুহাত দেখিয়ে ছাত্রছাত্রীদের পকেট থেকে টাকা খসিয়ে, নিজেদের পকেট ভর্তী করে যাচ্ছে। এখন রাষ্ট্র যদি সেই আয় নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তাহলে সেটা তার ক্ষমতাবলেই করতে পারে, কিন্তু ভ্যাট কেন??!
এই করের জন্য অতিরিক্ত টাকার এক পয়সাও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকেরা নিজের গাঁট থেকে দিবেনা, পুরোটাই যাবে শিক্ষার্থীদের ঘাড়ের উপর দিয়ে- বিষয়টা সরকার জেনেও কেন ভ্যাট বসালো???
তার মানে কি এই নয় যে, রাষ্ট্র আদৌ তার সাধরণ জনগণের কী এল-গেল, তা নিয়ে মোটেও চিন্তিত নয়..?? তাহলে রাষ্ট্র আসলে চায় কী??? এখানেই আসে ২ নম্বর কারণটি – রাষ্ট্র চায় স্রেফ নিজের কোষাগারে টাকা বাড়াতে ।।।
এই ২ নম্বর কারণটাই পরিস্থিতি বিচেনায় একমাত্র সত্যি কারণ । যদি তা না হত, যদি আসলেই রাষ্ট্র তার সাধারণ শিক্ষার্থীদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে ভাবতো, তাহলে, আর যাই হোক, ভ্যাট বসানোর হুকুম দিতো না!

বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর পরিচালনা পদ্ধতি, আয়ের উৎস, এবং একাডেমীক শিক্ষাদান – এইসব বিষয়গুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অবজারভ করার কিংবা নিয়মিত ইনভেস্টিগেট করবার জন্য অনেকদিন থেকেই শিক্ষাবিদগণ বলে আসছেন! সরকারের আদৌ সে নিয়ত নাই। সরকার নিজের কোষাগারে টাকা বাড়ানো নিয়ে ব্যাস্ত! শিক্ষাবিদগণ অবজারভেশনের নানান উপায় নিয়ে বলেছিলেন, কিন্তু ভ্যাট বসানোর কথা কেউ বলেননি।

রাষ্ট্রের উচিত ছিল প্রধানত
*বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার মালিক কতটুকু আয় করছে তা ইনভেস্টিগেট করা। কীভাবে আয় করছে, কী কী উৎস সেসব কৈফিয়ৎ নেওয়া।
*টিউশন ফী, সেমিস্টার ফী, এক্সাম ফী, ভর্তী ফী ইত্যাদি সহ বিশ্ববিদ্যালয় গুলো গুলা যতরকম ফী স্টুডেন্টদের থেকে আয় করে , তার হিসাব নেওয়া।
*বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোন কোন বিষয়ে কী কী কোর্স করায় তার খোঁজ রাখা। বেশীরভাগই “ডিমান্ড” আছে এইজাতীয় বিষয়গুলো যেমন কম্পিউটার প্রকৌশল, তড়িৎপ্রকৌশল, যন্ত্রকৌশল, ব্যাবসায় প্রশাসন, ফার্মাসী, আইন, অর্থনীতি, পুরকৌশল, এইজাতীয় বিষয়ের কোর্স রাখে। কোন লিটারেরী সাবজেক্ট যেমন , সাহিত্য, ভাষাবিজ্ঞান, গণিত, ভূগোল, ইতিহাস, রাষ্ট্রতত্ত্ব, পাদর্থবিদ্যা, পরিবেশ প্রকৌশল, দুর্যোগ ব্যাবস্থাপনা, দর্শনশাস্ত্র, সাইকোলজি এইধরণের বিষয় কখনো পড়ানো হয়না।
*প্রতিটা কোর্স ফী কত করে ধরে? কোন কোর্সে কত ক্রেডিট?
তার মধ্যে কতগুলো থিওরী ক্লাস, কতগুলো প্র্যাকিটকেল ক্লাস???
* এছাড়াও, ল্যাব রিপোর্ট চেক করা, ল্যাব ইনভেস্টিগেট করা, টিচারদের ক্লাস মনিটরিং এর ব্যাবস্থা রাখা, কী ধরণের টিচাররা ক্লাস নেন, তাদের পেমেন্ট কত হয়, ইত্যাদি।
*সর্বপোরি, গত কয়েক বছরে তুলানমূলক কোন বেসকারী বিশ্ববিদ্যালয় কেমন কেমন রেজাল্ট করে, ইত্যাদি বিষয় যদি ইনভেস্টিগেট করারা জন্য রাষ্ট্রের নিয়মিত টীম থাকতো, তাহলে আয় এমনিতেই নিয়ন্ত্রিত হতো।
শুনে হাসি পাচ্ছে??? পাবারই কথা। কারণ এটা অনিয়মের দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশ বাদে বিশ্বের যে কোন দেশেই ব্যাক্তিমালিকানাধীন শিক্ষা বা যেকোন প্রতিষ্ঠানেই রাষ্ট্র তার ক্ষমতাবলে এভাবে জবাবদিহীতা নিয়ে থাকে।
কিন্তু আমাদের সরকার বাহাদুর সেটা করবেন না। কারণ সাপের লেজে কেউ হাত দিতে যায় না। রাষ্ট্রের চাকা চলে ব্যাবসায়ীদের ঠ্যালায়, তাহলে সেই ব্যাসায়ী দেরকেই যাবে রাষ্ট্র ঘাঁটাতে??!! অসম্ভব! তার চেয়ে বাবা তুমি তোমার মত চলো। যা ইচ্ছে তা করো, খালি আমাকে বছর বছর কিছু দিও, আমি তাতেই খুশী…………………..

দেশ চালাতে রাজার কোষাগারে টাকা চাই। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকদের কাছেও ঐটা দোকান, ওখানে “ডিগ্রী” কিনতে পাওয়া যায়। রাষ্ট্রের কাছেও ওটা দোকানই, বিদ্যায়তন নয়! সুনীলের প্রথম আলো উপন্যাসে আমরা দেখি, মণিপুর রাজের বিশাল রাজপ্রাসাদ ভূমিকম্পে ধ্বসে পড়বার পর, পুনরায় আবার ঐরকম বিশাল প্রাসাদ বানানোর জন্য প্রজাদের থেকে খাজনা আদায়ের হুকুম হলো। নব্বই এর পরে জন্ম বলে ই হয়তো, আমার অবাক লেগেছিল, কোষাগার খালি বলে প্রজাদের ঘর খালি করে হলেও টাকা আনা চাই কারণ রাজা বাস করবার মত প্রাসাদ নেই…!!!!
সরকারের কোষাগার ভর্তী করতেই তাই তার বাজেটের সবখানে ভ্যাট ভ্যাট রব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সাবেক গভর্নর এবারের বাজেটে খুশী হয়ে বললেন, “এবারের বাজেটের মূল দিক হচ্ছে বড়লোকদের কাছ থেকে অধিক পরিমাণে কর আদায় করা। এটা একটা ভালো দিক। অর্থনীতি-ফীতি,বাণিজ্য, ব্যাংকিং এসব আমার একেবারে মাথার উপর দিয়ে চলে যায়, ভদ্রলোকের পুরো কথার অর্থ আমি বুঝিনাই ঠিকমত। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরা জানি বড়লোক হয়, কিন্তু ওখা নসব শিক্ষার্থীদেরও কি সরকার বাহাদুর বড়লোক ঠাউরে বসে আছেন নাকি……???! মুসিবত!

আমার দেশের কোষাগার ভরলে তো খুশী আমারই বেশী হবার কথা।। কিন্তু ভাই, রাজকোষের টাকা তো আর প্রজাতন্ত্রের মালিকের জন্যে ব্যাবহৃত হবেনা, হবে রাজতন্ত্রের মালিকের জন্যে!

কে দেবে জবাব,
রাজকোষের টাকায় কি দেশে আরো ১০-১২টা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, স্থাপন হবে, যাতে প্রজারা পড়তে পায়???
কিংবা যেগুলোআছে, সেগুলোর কি ব্যাস্থাপনায়, প্রশাসনে কি কোন চেঞ্জ আনা হবে???
ঐ টাকায় কি দেশের মরা নদী গুলোরক বাচানোর চেষ্টা হবে???
দেশের বড় বড় মহানগরীর নামের আগে যে “জলাবদ্ধতার নগরী”, “যানজটের নগরী” ট্যাগগুলো আছে, সে ট্যাগ রিমুভ করার কাজ করা হবে???
ব্যাবসাই যে দেশের চালিকা শক্তি যেখানে, সেখানে বৈদেশিক বাণিজ্যের কী-রুট চট্টগ্রামবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলতে বলতে সবার বদনখানি মলিন হয়ে গেল, করা হবে সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত শক্তি বৃদ্ধি???
ঢাকা, চট্টগ্রাম সহ গোটা দেশের পাবলিক মেডিকেল কলেজ হসপিটাল গুলোর যে করুণ দশা, তার উন্নতি করা হবে???
পুলিশ বাহিনীর মত একটা জিনিষ যে সেই মান্ধাতার আমলের থ্রিনটথ্রি রাইফেল আর ওয়ারলেস নিয়ে ঘুরে ,সেগুলো চেঞ্জ করে কি তাদেরকে অথর্ব অবস্থা কাটানো হবে??? তাদের শারিরীক প্রশিক্ষণ কি উন্নত করা হবে যাতে রাস্তায় খুন হচ্ছে দেখলে দৌড়ে খুনীকে ধরতেপারে, বা কাপড় খূলে ফেলছে দেলে শ্যুট করতে পারে??? তাদের ট্রেনিং এ নৈতিকতা শিক্ষার জন্য কি আলাদা কাউন্সলিং এর ব্যাবস্থা রাখবে, যাতে বিচার চাইতে কেউ রাস্তায় নামলে তাকে চুল ধরে মাটিতে ফেলে লাথি না মারে???

এরকম শত শত প্রশ্ন আমি, আপনি করতে পারি- রাজকোষের টাকা নিয়ে। কিন্তু প্রশ্ন করলেই আপনাকে জবাব দিতে কেউ বাধ্য নয় এখানে!!! এবং আমি লিখে দিতে পারি, রাজকোষের রাজকীয় অর্থ ব্যায় করে কখনো এজাতীয় কাজ করা হবেনা। কেউ কখনো করেনা,….!

যা করা হবে তা হল,
আরো কয়েকটা র‌্যাডিসন ব্লু খুব জরুরী।
আরো কয়েক হালি সাবমেরিন কিনতে যাচ্ছে,
আরো অস্ত্র ও যুদ্ধবিমান কিনার ডেট পড়ে গেছে অররেডী!
ও, পদ্মা সেতু তো বানাতেই হবে!!! নইলে উন্নয়নের জোয়ারে ভাসবো কি করে….
অযৌক্তিক ভাবে শহরের এখানে সেখানে ফ্লাইওভার বানাতে হবে, সামনে মেট্রোরেলও আসছে!!!!
আরব্বাস, ভুলেই গেলাম!!! পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র…? আরে ওটা তো আগে বানাতে হবে!!!!

দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী প্রতিবছর উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে পাবলিক বিশ্ববি. মেডিকেল কলেজ , প্রকৌশল বিশ্ববি. গুলোতে হত্যে দিয়ে বেড়ায় । সেখানে “চান্স” নামক বস্তুটি না পেয়ে মানে, মূলত আসন অনুযায়ী পড়ুয়ার সংখ্যা প্রায় দশগুণ বলে তারা গিয়ে হত্যে দেয় বেসরকারী বি. গুলোতে।
এখন সেই গুড়েও বালি ছিটিয়ে দিয়ে রাষ্ট্র ও ব্যাবসায়ীরা যৌথভাবে শিক্ষার্থী সমাজকে পিষে ফেলতে চাইছে।
একে তো এখনকার বাজারী সিস্টেমের মধ্যে থেকে থেকে শিক্ষার্থী রা বাজারী বিষয়গুলো বাদে কোন বিষয় নিয়ে পড়েনা! তারপর লাখলাখ টাকা খরচ করে করা মূল্যহীন স্নাতক কোর্সের সনদটি নিয়ে চাকরীর বাজার গিয়ে দেখে সেটা পনির বিনিময়েও বিকোয় না!!! সেরকম পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থী দের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎকে আরো ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়ে রাষ্ট্র এখন মধ্য আয়ের দেশ হবার সুখে বগল বাজাচ্ছে………!!!

দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক যখন তরুণ হয়, সেটা একটা দেশের জন্য বড় সুসময়। ঐসব তরুণদেরকেই দেশ গড়ার হাতিয়ার বানানো উচিত চিল, অথচ দেশ বাচানোর হাতিয়ার হল পারমাণবিক বিদ্যুত, পদ্মাসেতু, সাবমেরিন কংবা যুদ্ধজাহাজ!!!!

শোন রে ভাই সেলুকাস, এটা হল বাংলাদেশ।
সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশ।।।