ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

“পড়! আর তোমার রব বড়ই অনুগ্রহশীল, যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান শিখিয়েছেন। মানুষকে এমন জ্ঞান দিয়েছেন, যা সে জানতো না।‌‌‌”(আল-কুরআন, সুরা আলাক, আয়াত ৩-৫)। আজকে অমরপুর রেজি: প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মা সমাবেশে মুল প্রবন্ধের পাঠের শুরুতেই আমি মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের তিনটি আয়াত তুলে ধরেছি। শিক্ষার সব দিক এর মধ্যেই নিহিত। মনে রাখতে হবে, আয়াত অর্থ কোন বাক্য নয়। এটা মহান স্রোষ্টার বাণী।

সম্মানিত উপস্থিতি,
এখন আমি মুল আলোচনায় নিয়ে যেতে চাই। সে ক্ষেত্রে শিক্ষা কী, কাদের জন্য এই শিক্ষা, শিক্ষার ইতিবৃত্ত, শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকার ও অন্যদের ভুমিকা ইত্যাদি। যাতে করে এ বিষয়ে আমরা একটা সাম্মক ধারনা পেতে পারি।

শিক্ষা কী?
শাব্দিক অর্থের দিক থেকে শিক্ষা শব্দটির ইংরেজী প্রতিশব্দ EDUCATION। Education শব্দটি e. ex এবং duere. tue শব্দ গুলো থেকে এসেছে। শাব্দিক ভাবে এর অর্থ দাড়ায় pack the information in and draw the talents out’ মূলত: এর অর্থ অবগত বা জ্ঞান প্রদান এবং জ্ঞেয় বিষয়ে সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ। সোজা কথায় এর অর্থ দাড়ায় মানুষকে মানুষের আদলে গড়ে তুলার আয়োজনই হলো শিক্ষা। এই পর্যায়ে আমি কয়েকজন শিক্ষাবিদ ও দার্শনিকদের মতামত তুলে ধরছি। দার্শনিক ও কবি জন মিল্টন বলেছেন,“Education is harmonious development of body, mind and soul” দেহ, মন ও আত্মার সুসামাঞ্জস্যপুর্ণ বিকাশই শিক্ষা। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “মানুষের অন্তরের মানুষটি পরিচর্যা করে খাটি বানানোর প্রচেষ্টায় শিক্ষা।’’ বিখ্যাত দার্শনিক সর্ক্রেটিশ ও তার শিষ্য প্লেটোর মতে, “নিজেকে জানার নামই শিক্ষা। এই মতামত গুলো দিকে নজর দিলে আমরা দেখি, তাদের মুল সুর একই। মোট কথা শিক্ষা হচ্ছে, মানুষকে প্রকৃত ভাবে মানুষ হিসাবে সমাজে উপস্থাপিত করা।’’

কাদের জন্য এই শিক্ষা?
আলোচনার এই স্তরে এসে আমরা দেখব শিক্ষার প্রয়োজন কিসের জন্য কাদের জন্য। সৃষ্টি জগতের সকল প্রণীর শিক্ষার প্রয়োজন আছে। কিন্তু একমাত্র মানুষ ছাড়া সকল প্রাণীই প্রকৃতির নিজস্ব আয়োজনে জীবণ-যাপনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান বা শিক্ষা লাভ করে থাকে। এজন্য তাদেরকে কোন কৃত্রিম বা আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার আয়োজন করতে হয় না। অথচ মানুষকে জ্ঞান সমৃদ্ধ হতে হলে বা একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে একটি পরিকল্পিত, সু-নিয়ন্ত্রীত ও কার্যকরী কৃত্রিম শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। প্রকৃত পক্ষে, মানুষ তার হিতাহিত জ্ঞান নিয়ে জন্মায় না। জগতের অন্য সকল শিশুর মতই মানব শিশু অবোধ ও অবুঝ হয়ে জন্ম নেয়। তার মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, সমাজ ও পরিবেশ ইত্যাদি তাকে হিতাহিত জ্ঞানের উম্মেষ ঘটাতে সাহায্য করে, তাকে মানুষ ও পশুর মধ্যেকার পার্থক্য গুলো শেখায়। একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরো ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারি। প্রাণী জগতের সকল শিশুই জন্মের পর অবুঝ থাকে। মানব শিশুও এর বিকল্প কিছু নয়। কিন্তু পার্থকটা দেখি সেখানে, যখন একটি কুকর ছানা মানুষের মলকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে কিন্তু তার নিজে মল সে কখনই খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে না। অপর পক্ষের মানব শিশু অকাতরেই তার নিজের মলকে হালুয়া মনে করে মুখে পুরে দিতে পরে। এই জন্য প্রাণী জগতের মধ্যে এক মাত্র মানুষকেই কৃত্রিম বা অনুষ্ঠানিক শিক্ষা নিতে হয় বা প্রয়োজন পড়ে। যেহেতু একমাত্র এবং কেবল মাত্র মানব শিক্ষার জন্য কৃত্রিম শিক্ষার প্রয়োজন। তাহলে কেমন হবে এই শিক্ষা ব্যবস্থা? শিক্ষা ব্যবস্থা আলোচনার পূর্বে যাদের জন্য এই আয়োজন সেই মানুষের পরিচয় আমাদের জানা দরকার। মানবের সংজ্ঞা গুলো উপস্থাপন করে স্রোতাদের আর বদহজম করাতে চাই না। সরল কথায় বলতে চাই, জগতের সকল প্রাণী ও জড় বস্তুর উপর নিজের জ্ঞান দ্বারা প্রভাব বিস্তার করতে পারে এমন প্রাণী হচ্ছে মানব বা মানুষ।

কেমন হবে শিক্ষা ব্যবস্থা?
অন্য সকল জীবের সাথে মানুষের যে ব্যবধান নির্দেশ করে তা এই যে, মানুষ নৈতিক জীব, অন্য সকল জীব নৈতিকতার বন্ধন হতে সমপূর্ণ স্বাধীন। ভালো-মন্দ, সত্-অসত্, সত্য ও মিথ্যার বিচার করার ক্ষমতা মানুষ ছাড়া আর কোন জীবের মধ্যে নেই। মিথ্যুক ব্যক্তিও বলে, ‘মিথ্যা বলা অন্যায়। চুরি করা খারাপ-এ কথা স্বীকার করে বলেই চোর গোপনে তা চুরি করতে যায়। তাই চিন্তা শক্তি ও বুদ্ধি মানুষের এক বিরাট অস্ত্র। মানুষ শারীরিক ভাবে ক্ষুদ্র হলেও বুদ্ধি নামের অস্ত্রের মাধ্যমে হাজার গুন বড় সমুদ্রের নীল তিমীকেও ডাঙায় তুলে আনতে সক্ষক হন। কিন্তু নৈতিকতার বিকাশ না হলে এই বুদ্ধি শক্তিকেই সে মানব জাতির অকল্যানে প্রয়োগ করে। তাই নৈতিকতার অভাবে মানুষ আনবিক বোমা ফাটিয়ে হিরোসীমা-নাগাসাকী-ইরাক এর মত জনপদকেও কষাই খানাই পরিনত করতে পারে। বিমান হামলায় ধ্বংশ করতে পারে টু-ইন টাওয়ার বা ২১ শে আগষ্টের মত গ্রেনেট হামলা বা ৭১ এর মত মানবতা বিরোধী ধ্বংসযজ্ঞ্য। তখন মানুষ পরিনত হয় পশুর চেয়েও অধম প্রণীতে। কেননা পশু আণবিক বোমা তৈরী করতে পারে না। তাই সৃষ্টি জগতের সাম্যক নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা যা মানুষ কৃত্রিম আয়োজনে লাভ করে, তা বস্তুগত শক্তির ব্যবহারের উপর নির্ভরশীল। প্রবন্ধের এই অংশে আলোচনায় উপস্থিত সকলকে বুঝে নিতে হবে যে কেমন হওয়া উচিত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। নৈতিকতা পূর্ণ না নৈতিকতা বিবর্জিত?
প্রবন্ধটি কিন্তু শিক্ষার গুনগত মান উন্নয়নে অভিভাবক হিসেবে “মা”-এর ভুমিকা শীর্ষক। মহা মানব মহম্মদ(সা:) বলেছেন, “একজন আদর্শ মা একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয়।” নেপোলীয়ন বলেছেন, ‘আমাকে শিক্ষিত মা দাও আমি শিক্ষিত জাতি দেব।” অন্তত এই দুটি মন্তব্য থেকে আমারা বুঝতে পারি, সন্তানের নৈতিক চরিত্র গঠন ও আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় অভিভাবক হিসেবে মায়ের গুরুত্ব কতখানি। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় এর বিকল্প কিছুই হতে পারে না। বাস্তবতার আলোকে আমরা দেখি সন্ধায় যে বাতিটি নিয়ে ছেলেটি পড়তে বসে গেরস্তালীর অন্য কাজে সেই বাতিটির ব্যবহারি বেশী হয়। এরকম অনেক প্রতিবন্ধকতা মা মোকাবেলা করতে পারে। তাই মাকে যত গুরুত্ব দিয়ে আমারদের শিক্ষার ভীত তৈয়ার করা যায় ততটাই শিক্ষা বাস্তব মুখী ও গুনগত মানের হবে।

আমাদের শিক্ষার ইতিবৃত্ত:
আমাদের জাতীয় জীবণ যে রকম সংঘাত ও সংগ্রাম মুখর, শিক্ষার ইতিহাসও একই ধাচের। মানসম্মত শিক্ষা বলতে যা বুঝায় অর্থাত একটি নিদৃষ্ট জনপদ বা জনগোষ্ঠীর জন্য যতটুকু বা যে ধরণের শিক্ষা দরকার তাকেই সেই জনপদ বা জনগোষ্ঠীর মানসম্মত শিক্ষা বলতে পারি। কিন্তু এই মানসম্মত শিক্ষা আমরা কোন দিন হাতের নাগালে আনতে পারি নাই। কারণ বিভিন্ন সময় যারা এদেশ শাসন-শোষণ করেছে, এই শোষকরা তাদের সার্থেই এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। উপনিবেশিক শাসন কালে এদেশের কিছু লোককে তাদের অফিসের কেরাণী পদে প্রয়োজন ছিল। তাই তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল কেরাণী নির্ভর। যা চলতি সংসদ অধিবেশনেই আজকের প্রধান অতিথীর সীদ্ধান্ত প্রস্তাবের আলোকে মহান সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কেরাণী নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য পরবর্তীতে বিভিন্ন শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছে। যেমন ১৮২৩ সালে ‘পাবলিক ইনস্ট্রাকশন কমিটি’ ১৮৩৫ সালে ‘মেকলে কমিশন’। ঔপনিবেশিক শাসন পরবর্তী ১৯৫৮ সালে এসএম শরীফের নেতৃত্বে একটি জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠিত হয় এবং ১৯৫৯ সালে তা প্রকাশিত হয়। এবং ১৯৬২ সালে এই কমিশনের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনের ফলে তা বন্ধ হয়ে যায় এবং ১৯৬৪ সালে জাস্টিস হামিদুর রহমানের নেতৃত্বে আরো একটি শিক্ষ কমিশন গঠিত হয়। উক্ত কমিশন ১৯৬৬ সালে ‘Report of the commission on the students problem and welfare’ নামে প্রকাশিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশেও ১৯৭২ সালের ৩০ জুলাই ড: কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বাধীন জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। ১৯৭৪ সালের ৩০ মে জাতির জনকের হাতে এই রিপোর্ট পেশ করা হয়। ১৯৭৫ সালে আমাদের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আবার নতুন শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। ১৯৮৩ সালে তত্কালীন শিক্ষা মন্ত্রী ড: আব্দুল মজিদ খানের নেতৃত্বে একটি শিক্ষা নীতি প্রনয়ণ কমিটি গঠিত হলেও সে কমিটির কোন সুপারিশ জাতির চোখে পড়ে নাই।
আমরা এই সব শিক্ষা নীতিতে পাঠ্য ক্রমের অনেক পরিবর্তণ দেখলেও শিশু শিক্ষায় মাকে কোন ভাবেই সম্পৃক্ত করতে দেখি নাই। যদিও ৯৬ এর আয়ামীলীগ সরকার সার্টিফিকেটে পিতার নামের সাথে মায়ের নাম লিখার প্রচলন করে মাকে শিশু শিক্ষায় অনেকটা উত্সাহিতেও সম্পৃক্ত করেছে।
শিক্ষায় আমাদের ভুমিকা:
একটি মান সম্মত শিক্ষা ছাড়া কোন জাতিরর উন্নয়ণ সম্ভব নয়। মাসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সকল ব্যক্তি-গোষ্ঠি-মহলের কার্যকরি ভুমিকা পালন করতে হবে। ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকদের এগিয়ে আসতে হবে নিজ নিজ প্রচেষ্টায়। আমাদের শিক্ষার্থীদের নোট বই এর প্রবণতা থেকে বের করে আনতে হবে। এর জন্য সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি একটি ভালো পদক্ষেপ। কিন্তু এর জন্য শিক্ষকদেরকেও হতে হবে সৃজনশীল। শিক্ষকদের বাস্ততমুখী হয়ে কঠোর শ্রম ও গবেষনার মাধ্যমে নতুন নতুন তথ্য উপাত্ত শিক্ষার্থীদের মাঝে তুলে ধরতে হবে। শিক্ষকদের দায়ীত্ব পালনে সততা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিতে হবে। প্রত্যেক শিক্ষককে সব জান্তার ভাব ছেড়ে দিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পুন: পুন: দক্ষতা অর্জণ করতে হবে। চেয়ার বেঞ্চের দুরুত্ব ভুলে গিয়ে হতে হবে রিফ্রেসার টিচার।সর্বপরি শিক্ষার্থীদের মানসিকতা শিক্ষা গ্রহণের জন্য সদা প্রস্তুত রাখতে হবে। আমাদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ২৪ ঘন্টায় মাত্র ৬ ঘণ্টা শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের আই ভিশনে থাকে আর বাকী ১৮ ঘন্টা থাকে অভিভাবদের কাছে। সেক্ষেত্রে সফলতার অনেটাই অভিভাবকের উপর নির্ভরশীল।

আলোচনার শেষ প্রন্তে একজন চীনা দার্শনিক ও শিক্ষবিদেরু কথা বলে শেষ করছি। তিনি বলেন, ‘তুমি যদি কম সময়ের মধ্য ফল পেতে চাও তবে মৌসুমী ফসলের চাষ কর, যদি দীর্ঘ মেয়াদী ফল পেতে চাও তবে ফলবান বৃক্ষ রোপণ কর এবং যদি সারা জীবণের জন্য ফল পেতে চাও তবে মানুষের চাষ কর।”

________________
মা সমাবেশ ও শিক্ষা সেমিনার, তারিখ: ১৮ মার্চ ২০১২, স্থান: অমরপুর রেজি: প্রাথমিক বিদ্যালয়, ধামইহাট, নওগা এ প্রবন্ধটি পাঠ করেন আ.ন.ম. আফজাল হোসেন, প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, পাগল দেওয়ান ফজিল মাদ্রাসা, ধামইরহাট, নওগা।