ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

পুলিশ বাহিনীর ইতিহাস সুদীর্ঘ ও অনেক পুরনো। প্রথম শতাব্দীর মধ্যভাগে রোম শহরে এই পুলিশ ব্যাবস্থা প্রথম চালু হয়। প্রথম দিকে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অপরাধ দমনের দায়ীত্ব পালন করলেও পরবর্তীতে সমাজিক দায়ীত্ব পালনও শুরু করে পুলিশ। মোঘল সম্রাট আকবর দ্যা গ্রেট পুলিশকে সংস্কার করে একটি কার্যকরি পুলিশ ব্যবস্থা চালু করেন। সে সময় আইন শৃঙ্খলা রক্ষার দায়ীত্ব ছিল ফৌজদারীর আর বিচার ব্যবস্থা চলতো ‘আদাল’ বা আদারতের মাধ্যমে। শহরের পুলিশ কর্মকর্তার পদ ছিল কোতওয়াল। সেই সময়েই ঢাকায় একটি কোতওলায় (পুলিশ স্টেশন) চালু করা হয়। প্রত্যেকটি জেলায় একটি করে ফৌজদার ছিল। পেশাদারী পুলিশ ব্যবস্তা বলতে যা বুঝ্য় তা মুলত চালু হয় ব্রিটিশ আমলেই। ১৮২৯ খ্রীষ্টাব্দে রবার্ট পেল ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একটি বিল পাশের মাধ্যমে সিস্টেমেটিক পুলিশ ব্যবস্থার প্রচলন করেন। ১৮৩৩ খ্রীষ্টাব্দে ব্রিটিশদের আদলে আমেরিকানরা নিউয়র্ক শহরে এই পুলিশ ব্যবস্থা চালু করে। ব্রিটিশ সরকার ১৮৫৮ সালে ভারত নিয়ন্ত্রনের জন্য ভারতবর্ষে পুলিশিং ব্যবস্থা প্রতর্বতণ করে। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর বর্তমান বাংলাদেশে পৃথক পুলিশ ব্যবস্থা চালু হয়। যার নাম ছিল ‘ইস্ট বেঙ্গল পুলিশ’। ব্রিটিশ পুলিশ অ্যাক্ট আনুসারেই তা চলতে থাকে। এই ধারাবহিকতায় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশর স্বাধীনতার মাধ্য দিয়ে ‘বাংলাদেশ পুলিশ’ জন্ম নেয়।

কথায় বলে ভারত বর্ষে যা আছে, তা মহা ভারতেও আছে আর ভারত বর্ষে যা নেই তাও মহাভারতে আছে। বা ম্যাকলের ‘প্যানেল কোর্ট’-এ এমন কোন আইন নেই যা বর্তমানের যে কোন অরাধের জন্য উপযুক্ত নয়। তবুও নতুন নতুন আইন তৈরী করা হচ্ছে। কারন বিষয় গুলোকে আরো কার্যকর ও দ্রুত ব্যবস্থাগ্রহণের জন্য। একই ভাবে আমরা বলতে পারি প্রচলিত পুলিশ বাহিনীই দেশের আইন শৃঙ্খলা পালনে সক্ষম। তাহলে কেন এই কমিউনিটি পুলিশিং। তাই আমাদের এই কমিউনিটি পুলিশিং সন্পর্কে জানা দরকার।

কমিউনিটি পুলিশিং কি?
লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট পিলের গণমুখী পুলিশিং এর মূলনীতি হতেই মূলতঃ কমিউনিটি পুলিশিং এর ধারণা আসে। কমিউনিটি পুলিশিং হচ্ছে অপরাধ সমস্যা সমাধানে পুলিশ ও জনগণের যৌথ অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার একটি নতুন পুলিশিং দর্শন। আমাদের দেশে পুলিশী কর্মকাণ্ডে জনগণের অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কার্যকরভাবে অপরাধ প্রতিরোধের জন্য কমিউনিটি পুলিশিং ধারণা গ্রহণ করা হয়েছে। কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা কমিউনিটির সদস্যগণ, সমাজের বিভিন্ন সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং পুলিশের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে অপরাধ প্রতিরোধ ও জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কমিউনিটি পুলিশিং মূলত একটি প্রতিরোধ মূলক পুলিশি ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় অপরাধের কারণগুলো অনুসন্ধান করে সেগুলো দূর করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় । অপরাধের কারণগুলো দূর করা যেহেতু পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয় বা কষ্টকর তাই এই কাজে অন্যান্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়। কমিউনিটি পুলিশিং এর যাবতীয় কর্মকাণ্ড অপরাধ প্রতিরোধ তথা অপরাধ যাতে ঘটতে না পারে সেই লক্ষ্যে পরিচালিত হয়। কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পুলিশ জনগণকে নিজেরাই যাতে নিজ নিজ এলাকার অপরাধগুলো প্রতিরোধ করতে পারে তার জন্য জনগণকে আইনী পরামর্শ দেওয়া, অপরাধ সম্পর্কে সচেতন করা, অপরাধকর্ম সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য বা পরামর্শ দেওয়া ইত্যাদির মাধ্যমে ক্ষমতায়ন করে।

কমিউনিটি পুলিশিং এর বৈশিষ্ট্য:
১. কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা পুলিশ ও জনগনের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ নিশ্চিত করে।
২. এটি একটি প্রতিরোধমূলক ও সমস্যা সমাধান ভিত্তিক পুলিশী ব্যবস্থা।
৩. পুলিশ ও জনগণের সমন্বয়ে উভয়ের নিকট গ্রহণীয় পুলিশী কার্যক্রমের একটি দর্শন হচ্ছে কমিউনিটি পুলিশিং।
৪. এ ব্যবস্থায় জনগণ এলাকার সমস্যা ও সমস্যার কারণ চিহ্নিত করে তা সমাধানের লক্ষ্যে পুলিশের সাথে অংশীদারিত্বের ভিক্তিতে কাজ করার সুযোগ পায়।
৫. জনগণের নিকট পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।
৬. পুলিশ ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সমঝোতা ও শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পায়।
৭. জনগণ পুলিশী কার্যক্রম ও পুলিশের সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে জানতে পারে।
৮. পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব কমে এবং জনগনের মধ্যে পুলিশ ভীতি ও অপরাধ হ্রাস পায় এবং জনগণ পুলিশকে সহায়তা করার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়।
৯. পুলিশ জনগণকে পরামর্শ ও উত্সাহ দিয়ে তাদের অনেক সমস্যা তাদের দ্বারাই সমাধানের পথ বের করার জন্য অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
১০. কমিউনিটির সম্পদ কমিউনিটির উন্নয়নের জন্য ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

কমিউনিটি পুলিশিং এর সুফল:
১. পুলিশ ও জনগণের মধ্যের পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে অপরাধ দমন ও এলাকার সমস্যা সমাধানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
২. জনগণের সহায়তায় পুলিশ নির্দিষ্ট এলাকার সমস্যা সমাধানের কারণ চিহ্নিত করে তা সমাধানের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে পারে।
৩. জনগণকে পুলিশের কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পাওয়ায় জনগণের প্রত্যাশা ও মতামতের আলোকে পুলিশী সেবা নিশ্চিত করা যায়।
৪. পুলিশ এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পায় এবং জনগণ পুলিশী কাজের প্রক্রিয়া এবং পুলিশের সীমাবদ্ধতা জানতে পারে।
৫. পুলিশ ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সমঝোতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পায়।
৬. পুলিশ ও জনগনের মধ্যে দূরত্ব হ্রাস পায়। জনগণ পুলিশকে আপন ভাবতে শিখে।
৭. জনগণের মধ্যে পুলিশ ভীতি ও অপরাধ ভীতি হ্রাস পায় এবং পুলিশকে সহায়তা করার জন্য জনগণ উদ্ধুদ্ধ হয় ও সাহস পায়। মানুষের মধ্যে পুলিশকে এড়িয়ে চলার প্রবণতাও হ্রাস পায়।
৮. পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ। এ ম্লোগান বাস্তবে রুপ নেয়।
৯. এলাকার অপারাধ দমন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের সহায়ক শক্তি হিসেবে একটি গণফোরম তৈরী হওয়ায় অপরাধীরা নির্বিঘ্নে অপরাধ সংঘটনের সাহস পায় না। সমাজে অপরাধ হ্রাস পায়।
১০. সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিত হয় এবং জনগণের জীবন যাত্রার মান উন্নত হয়।

কমিউনিটি পুলিশিং এর সাংগঠনিক কাঠামো:
কমিউনিটি পুলিশিং এর অঞ্চল ভিত্তিক সাংগঠনিক কমিটির দুটো কাঠামো থাকে: (১) উপদেষ্টা পরিষদ এবং (২) নির্বাহী কমিটি বা কার্যকরী পরিষদ।
উপদেষ্টা পরিষদ
উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সংখ্যা ৮-১০ জন হয়। তবে যদি কার্যকরী কমিটি মনে করে এলাকার বিশেষ কোন ব্যক্তি কমিউনিটি পুলিশিং সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সেক্ষেত্রে এর সংখ্যা বৃদ্ধি করার সুযোগ আছে।
নির্বাহী কমিটি/কার্যকরী পরিষদ:
নির্বাহী কমিটির সদস্য সংখ্যা ১৫-২০ এর মধ্যে হয়ে থাকে। তবে এলাকার উদ্যোগী, আগ্রহী এবং খ্যাতি সম্পন্ন কোন বিশেষ ব্যক্তিকে অন্তর্ভূক্ত করতে সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করে সর্বোচ্চ ২৫ জন করা যায়।
কমিউনিটি পুলিশিং এর আইনগত ভিত্তি:
কোন অধ্যাদেশ বা আইনের মাধ্যমে এদেশে কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়নি। তবে ফৌজদারী কার্যবিধির ৪২, ৪৩, ৪৪, ও ৪৫ ধারা অনুসারে কিছু ক্ষেত্রে জনসাধারণ, পুলিশ এবং ম্যাজিস্ট্রেটকে সহায়তা করতে বাধ্য। জনপ্রতিনিধি যেমন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারগণ পুলিশি কাজে সহায়তা চাইতে পারেন। পুলিশ রেগুলেশনের ৩২ প্রবিধিতে এর উল্লেখ আছে। ফৌজদারী কার্যবিধি এবং পুলিশ রেগুলেশনের এই ধারা অনুসারে পুলিশী সহায়তা ও নেয়া যায়। কমিউনিটি পুলিশিং হলো পুলিশকে সহায়তা করার জনগণের একটি সংগঠিত শক্তি। কাজেই প্রচলিত আইনেই কমিউনিটি পুলিশিং-এর সমর্থন আছে।

কমিউনিটি পুলিশিং এর তহবিল:
সদস্যদের চাঁদা এবং ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনুদানের মাধ্যমে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম চালানো হয়। বিজ্ঞাপন বা বাণিজ্যিক আয়ের উত্স সৃষ্টি করেও অর্থ সংগ্রহ করা যায়। বিধান অনুসারে প্রতি অর্থ বছর শেষে কার্যনির্বাহী কমিটি ৩ সদস্য বিশিষ্ট অডিট টিম গঠন করে আডিটের ব্যবস্থা করে।

ধামইরহাটে কমিউনিটি পুলিশিং–এর ক্ষেত্র:
নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলা একটি সীমান্তবর্তী জনপদ। তাই এখানে নতুন ধরনের ও কৌশলের অপরাধ সংগঠনের সম্ভাবনা অনেক বেশী এবং সীমান্তবর্তী হওয়ায় সীমান্ত অপরাধ বিশেষত: মাদক চোরাচালানের সম্ভাবনাও বেশী।বলা হয়ে সকল অপরাধের মুলসুত্র হলো এই নেশা। আমাদের ধামআরহাট উপজেলায় মাদকাশক্তদের সংখ্যা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্য সকল অপরাধও। এই সকল অপরাধ শুধু মাত্র থানা পুলিশের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বা কষ্টকর। কেননা আমাদের সম্পদের সীমাব্ধতা ও বৈষয়ীক কারনে জনসংখ্যার অনুপাতে পুলিশের সংখ্যা অপ্রতুল। ধামইরহাটও এর বাহিরে নয়। তাই ধামইরহাটে কমিউনিটি পুলিশিং তার কার্যকরি ভুমিকা পালনের মাধ্যমে এই এলাকার শান্তি শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে পারবে বলে আমরা আশা করি।

সম্পাদনায়: আ.ন.ম. আফজাল হোসেন, প্রভাষক পাগল দেওয়ান ফাজিল মাদ্রাসা, ধামইরহাট, নওগাঁ।

***
(আজ শনিবার(২৫.০২.১২ ইং তারিখ) নওগাঁ জেলার ধামইরহাট থানায় কমিউনিটি পুলিশিং সেমিনারের মুল প্রবন্ধ।