ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

নতুন কোচ রিচার্ড পাইবাসের অধীনে প্রথম বিদেশ সফরে খেলতে গিয়ে পুরনো চেহারায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। আনঅফিসিয়াল টি টুয়েণ্টি ট্রাইসিরিজের প্রথম ম্যাচে প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টাইগারদের ১১ রানের পরাজয়ে বিশ্বসেরা অলরাউণ্ডার সাকিবের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা, ব্যাটসম্যানদের সেট হয়ে উইকেট উপহার দেওয়ার প্রবণতা, রান তাড়া করার ক্ষেত্রে মাঝপথে খেই হারানো, বোলারদের অনভিজ্ঞতাসহ বেশ কয়েকটি সমস্যার চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

একটু পিছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, এশিয়া কাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের চমৎকার সাফল্যের পর এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করাটাই ক্রিকেটারদের জন্য আসল পরীক্ষা বলে বিশ্লেষকেরা মেনে নিয়েছেন। তবে তূলনামূলকভাবে সহজ প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২ প্রস্তুতি ম্যাচসহ টানা ৩ টি টি-টুয়েণ্টি খেলায় এমন পরাজয় কারো কাছেই প্রত্যাশিত নয়। দল ঘোষণার পরে সাকিব বিশ্রামজনিত কারণে এ সফর থেকে অব্যাহতি নিয়েছিলেন। সাকিববিহীন বাংলাদেশের শক্তি কমলেও তা জিম্বাবুয়ের চেয়ে কোন অংশে কম নয়।

এ পর্যন্ত খেলা ৩ টি ম্যাচের দিকে তাকালে দলকে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে প্রথমেই আসবে। প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচে ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার জন্য জিম্বাবুয়ে নির্বাচিত একাদশের কাছে বাংলাদেশকে ৩ উইকেটে পরাজিত হতে হয়। অভিজ্ঞ আশরাফুলকে ওপেনিংয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে আমার ধারণা। ১ম প্রস্তুতি ম্যাচে তামিমের সাথে ভালো জুটি গড়েছিলেন। চমৎকার সূচনার পর পরবর্তী ব্যাটসম্যানদের চরম ব্যর্থতায় নিয়মিতভাবে উইকেট হারিয়ে মাত্র ১২৬ রান করতে সমর্থ হয় সফরকারীরা। জুনায়েদকে টিম ম্যানেজমেন্ট ওয়ান ডাউনে পাঠিয়ে যে সুযোগ দিয়েছিলেন তা তিনি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন। তবে মাহমুদউল্লাহর দ্রুতগতির ২৮ রান ছিল হতাশার মাঝে আশার ঝিলিক। বোলিংয়ে মাশরাফি জ্বলে উঠতে না পারলেও নবাগত আবুল হাসান ও ইলিয়াস সানি চমৎকার বোলিং করেন। জয়ের জন্য স্বাগতিক একাদশকে বেশ বেগ পেতে হয়। তবে দুই বর্ষীয়ান মাশরাফি ও রাজ্জাক আরো ভালো খেললে হয়তো টাইগাররা জয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারত।

সেদিনই দ্বিতীয় প্রস্তুতি ম্যাচে মাসাকাদজার দুরন্ত শতকের উপর ভর করে জিম্বাবুয়ে নির্বাচিত একাদশ সফরকারী বাংলাদেশের বিপক্ষে ১৯ রানে জয়লাভ করে। স্বাগতিকরা চমৎকার সূচনার উপর ভর করে ও মাসাকাদজার শতকের সৌজন্যে ১৭৫ রান করে। দুই পেসার নাজমুল ও আবুল বেধড়ক মার খেয়ে প্রচুর রান দেন। সেই সাথে পার্টটাইম আশরাফুল ও পেসার ফরহাদ রেজার ৪ ওভার থেকে ৫১ রান আসে। মূলত অনিয়ণ্ত্রিত বোলিং ও অভিজ্ঞতার অভাবে প্রতিপক্ষরা বড় ধরনের টার্গেট ছুঁড়ে দেয়। যে কোন উইকেটে ১৬০+ ফাইটিং স্কোর। আর ১৭৬ রান তাড়া করতে গিয়ে টপঅর্ডারদের ব্যর্থতায় ও পরিকল্পনাহীন ব্যাটিংয়ের কারণে টাইগারদের ৫২ রানেই চার উইকেটের পতন ঘটে। এরপর মুশফিক ও জহুরুল ৫ উইকেটে চমৎকার ৯১ রানের দ্রুতগতির পার্টনারশীপ গড়েও দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছাতে পারেন নি। ১৮তম ওভারে মুশফিকের বিদায়ের পরপরই দলের পরাজয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়। শেষপর্যন্ত বাংলাদেশ ৭ উইকেটে ১৫৬ রান করে। এ ম্যাচে পার্ট টাইমার নাসির ও রাজ্জাকের মিতব্যয়ী বোলিং ও মুশফিক ও জহুরুলের জুটিই ছিল ব্যর্থতার মাঝে সান্তনা।

১৭ ই জুন ত্রিদেশীয় সিরিজের ১ম ম্যাচে জিম্বাবুয়ে টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নামে। ইনফর্ম মাসাকাদজা সিবান্দাকে সাথে নিয়ে মাশরাফি ও রাজ্জাকের বল দেখেশুনে খেললেও ৬ষ্ঠ ওভরে আবুল হাসানের উপর চড়াও হয়ে ১৬ রান তুলে নেয়। ইলিয়াস সানি পরের ওভারে সিবান্দাকে আউট করলেও মাসাকাদজা অধিনায়ক টেইলরকে সাথে নিয়ে রিয়াদ ও জিয়াউরের বলে চার-ছয় মেরে রানের চাকা সচল রাখেন। দলীয় ৯১ রানের মাথায় মাসাকাদজা অধিনায়কের ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে রান আউট হন। টাইগারদের স্বস্তির মুহূর্ত আসার আগেই তিনি ব্যক্তিগত ৬২ রান করেন। জিম্বাবুয়ে ২০ ওভার শেষে ৬ উইকেটে ১৫৪ রান করে। এ ম্যাচেও মাশরাফি ও আবুল হাসান ব্যয়বহুল বোলারের তালিকায় ছিলেন।
১৫৫ রানের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে তামিম ও আশরাফুল দলকে ৬১ রানের চমৎকার সূচনা এনে দেন। আস্কিং রানরেট খুব বেশী না হলেও আশরাফুল ডাউন দ্যা উইকেট খেলতে গিয়ে উতসেয়ার বলে স্টাম্পড হয়ে নিজের উইকেট বিলিয়ে দেন। এরপর ব্যাটিং অর্ডারে প্রমোশন পেয়ে জিয়াউর রহমান তামিমের সাথে যোগ দেন। আগে চিগুম্বুরার বলে লাইফ পাওয়া তামিম নিজের ৩৮ রানের সময় অফ স্ট্যাম্পের বাইরের বল খেলতে গিয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনেন। এরপর মুশফিক চমৎকার একটি ইয়র্কারে ও জিয়াউর আরভিনের অসাধারণ ক্যাচের শিকার হলে চাপে পড়ে যায় বাংলাদেশ। শেষদিকে নাসির ২৯ রানের ঝড়োগতির ইনিংস খেললেও রিয়াদের স্লো ব্যাটিংয়ের কারণে ৫ উইকেট হারিয়ে ১৪৩ রানে শেষ হয় টাইগারদের। বাংলাদেশ সফরের টানা ৩ ম্যাচেই হারে।

ওপেনিংয়ে আশরাফুল ও তামিমের সেট হয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীন শর্ট খেলতে গিয়ে আউট হয়ে যাওয়া থিংক ট্যাংকের জন্য চিন্তার বিষয়। আশরাফুল নিজেকে ফিরে পেতে শুরু করলেও দলের অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান হিসেবে তাকে বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হবে। মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানদের ধারাবাহিক ব্যর্থতা ও হঠাৎ করে কয়েকটি উইকেট পড়ে যাওয়াও অন্যতম একটি সমস্যা। ব্যাটিংয়ে ৩ ও ৪ নম্বর নিয়ে সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। সাকিব, নাসির, রিয়াদ ৫,৬,৭ এ যদি খেলেন তাহলে ব্যাটিং গভীরতা বাড়বে। কিন্তু ওপেনিং জুটির বিদায়ের পরে ৩ ও ৪ নম্বর স্থান ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড। আশরাফুল যদি তামিমের সাথে ওপেনিং করেন তাহলে মুশফিক, জহিরুল, জুনায়েদদের এ দুটি পজিশনে ভাল করতে হবে। বিকল্প হিসেবে নাসির ও সাকিবকে আরো উপরে ব্যাটিং করানো যেতে পারে। রান চেজের সময় সঠিক কৌশলে খেলা দরকার। সেট হওয়া ব্যাটসম্যানদের বড় ইনিংস খেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বোলিংয়ে মাশরাফি, নাজমুল, রাজ্জাককে আরো ভাল করতে হবে। সম্ভাবনাময় আবুল হাসান দ্রুত ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে শুধরে নিলে আরো ভাল করতে পারবেন। তরুণদেরকে এগিয়ে নিতে অধিনায়ক, সিনিয়র খেলোয়াড়দের ও কোচকে এগিয়ে আসতে হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার এ সফর ও ইউরোপ সফর শেষে সেরা কম্বিনেশন বের করতে হবে। সঠিক প্রস্তুতি নেওয়ার এখনই সময়। বাংলাদেশ পারবে কি মঙ্গলবার শক্তিশালী দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ভুলের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে চমৎকার পারফরম্যান্স উপহার দিতে?

১৭ জুন, ২০১২ইং।
মো: মুজিব উল্লাহ: mdmujib_ullah@yahoo.com
এই ঠিকানায় ক্লিক করেও ফিডব্যাক দিতে পারবেন।