ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

কোচিং বাণিজ্য বন্ধে যদি ফলাফলের উপর ভিত্তি করে এ বছর মেডিকেলে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করা হয় তবে তা হবে নেগেটিভ সিদ্ধান্ত। শরীরের কোন অংশে সমস্যা হলে তার নিরাময়ের জন্য সব দিক বিবেচনা করে যুগোপযোগী ও সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা অবলম্বন করা যেমন শ্রেয় ঠিক তেমনি মেডিকেলে শিক্ষার্থী ভর্তির মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সবকিছু বিচার বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অনুষ্ঠিত রোববারের বৈঠকে সব সরকারি মেডিকেলসহ ২৪ টি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষরা ফলাফলের উপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থী ভর্তি করার যে প্রস্তাব দিয়েছেন তাতে করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিবে। তাহলে, কোচিং-বাণিজ্য বন্ধ করতে কি ব্যর্থ সরকার? কোথায় গেল প্রণীত কোচিং নীতিমালা কিংবা এর উপযোগিতাই বা কি? হঠাৎ করে মেডিকেল ভর্তিচ্ছুদের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, ৫০-৬০ হাজার পরিক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে! এক্ষেত্রে বুয়েটের উদাহরণ টানা হচ্ছে। হয়তো সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু নীতি নির্ধারকদের মনে রাখতে হবে যে, পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক সুবিন্যস্ত,পরিমার্জিত পদ্ধতির মাধ্যমে বুয়েটসহ বেশ কয়েকটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে সীমিত সংখ্যক আসনের বিপরীতে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

এখন যদি ফলাফলের ভিত্তিতে মেডিকেলে পরিক্ষার্থী ভর্তি করা হয় তাহলে সেটি হবে রাজধানীসহ কয়েকটি শহরের হাতে গোণা কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করাদের জন্য পোয়া বারো। এতে মফস্বলের প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ভাল রেজাল্ট করা শিক্ষার্থীরা ঠিকমত সুযোগ পাবে না বলে অনেকের আশংকা। অন্যদিকে, সারাদেশে অভিন্ন প্রশ্ন পদ্ধতিতে এস.এস.সি. ও এইচ.এস.সি পরীক্ষা হয় নি। ফলাফলে অভিন্ন গ্রেড পদ্ধতি অবলম্বন করা হলেও আসলেই কি সকল পরিক্ষার্থীর উত্তরপত্র মূল্যায়নে সমতা বিধান করা সম্ভব হয়েছে? আবার, কেউ কেউ বলছেন জেলাভিত্তিক কোটা করতে যাতে অনগ্রসররা বঞ্চিত না হয়। তাহলে যে মেধাবীদের বঞ্চিত করা হবে! সব ক্ষেত্রের মত শিক্ষাক্ষেত্রেও যদি কোটার মত এমন সেকেলে পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয় তাহলে আমরা নিজেদেরকে আধুনিক ও যুগোপযোগী ভাববো কি করে? কেউ কেউ বলছেন কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে নম্বর হিসেব করা হবে। এ যেন মগের মুল্লুক। কর্তৃপক্ষের ইচ্ছে হবে আর সিদ্ধান্তে পরিবর্তন এসে যাবে! যারা এত অভিজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী তারা কি একবারও ভাবেন নি যে, শিক্ষার্থীরা সর্বশেষ এইচ.এস.সি. পরীক্ষা দিয়েছেন গ্রেডের কথা ভেবে, ৮০ এর স্থলে ৯০,৯৫… পাওয়ার নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে নয়। এখন নম্বরের উপর ভিত্তি করে কোন বাছাই করা হলে তা হবে চরম অবিবেচনাপ্রসূত কাজ।

যে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে এত চিন্তা ভাবনা সেটির মূল কারণসমূহ চিহ্নিত করে সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি দেয়া জরুরি। শিক্ষার্থীদের দিকগুলো বিবেচন করে এবারই এ পদ্ধতি চালু না করে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ভর্তি দুর্নীতিতে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে সজাগ থেকে প্রচলিত পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। আর ভবিষ্যতে বুয়েটের আদলে নৈব্যক্তিক ও রচনামূলক দুইভাবেই ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করে এবং এস.এস.সি. ও এইচ.এস.সি. পরীক্ষায় অর্জিত রেজাল্টের সমন্বয় করে মেডিকেলে ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তি করানো উচিত। দেশে পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে বিদ্যমান ফলাফল পদ্ধতিতে সমমানের ফলাফল অনেকেই করছে। কিন্তু তাই বলে তারা ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারবে না হঠাৎ করে জারি হওয়া কোন সিদ্ধান্তের কারণে তা কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তাহলে কি ভাল ফলাফল করাটাও এক ধরনের পাপ? নাকি সরকার বুয়েট, জাবিসহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান সমস্যাগুলো ও পদ্মা সেতুর দিক থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে নিতে এ সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করছে?

নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে কোনঠাসা হয়ে পড়া মহাজোট সরকারের শাসনামলের শেষ দিকে এসে সংশ্লিষ্টদের সব ক্ষেত্রে সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে। আর তাই মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি করে কোন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করে ঠাণ্ডা মাথায় যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করে ভর্তি পদ্ধতিকে বিতর্কের উর্দ্ধে রাখতে হবে। আমাদের আরো মনে রাখতে হবে যে, ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরাই (ডাক্তাররাই) আমাদের স্বাস্থ্যখাতের আগামী দিনের কর্ণধার। পারবে কি গুণগত পরিবর্তনের অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় আসা বঙ্গবন্ধুকন্যার এ সরকার প্রশ্নবাণের মুখোমুখি হতে যাওয়া মেডিকেলের ভর্তি বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে? আশংকা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে ঠিক যেমনটি প্রয়াত কবি শামসুর রাহমানের মৃত্যুর পর কবিকে নিয়ে লিখা আমার একটি কবিতায় তৎকালীন বাংলাদেশকে নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ পেয়েছিল ও যা পরবর্তীতে সত্য হয়েছিল। আর যদি সঠিক পথে কর্তৃপক্ষ হাঁটে তাহলে আমরাও বলতে পারব দিন বদলের স্লোগান শুধু কথায় নয় কাজেও প্রতিফলিত হচ্ছে!

রাত ৩: ১৫ মিনিট, ০৬ আগষ্ট, ২০১২ ইং।
মো: মুজিব উল্লাহ: mdmujib_ullah@yahoo.com
ফেসবুকেও ফিডব্যাক দিতে পারবেন।