ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

(পূর্ব প্রকাশের পর)

২৪ শে মার্চ, ২০১২ ইং। দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ক্রীড়া সাংবাদিক দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের (দেবুদা) ফেসবুক স্ট্যাটাসটি ছিল
“রিয়েলিটি হচ্ছে দেশে পেসার নাই। মাশরাফির ছুরির আঘাতে জর্জরিত শরীর; তারপরও প্রাণশক্তি দিয়ে দিয়ে যা করার করছে। ‘অপুষ্টিজনিত’ দুই কার্যকর পেসার রুবেল আর সফিউল ইনজুরিতে। নাজমুলের চেষ্টার শেষ নাই। শাহাদতকে নিয়ে কিছু বললে পিটুনিটা কে খাবে? পেসার লাগবে, পেসার। দুর্দান্ত এই টিমটাকে ধারাবাহিকভাবে ধরে রাখার একমাত্র সমাধান দুটো রিয়েল পেসার আর একটা পেস বোলিং অলরাউন্ডার খুজে বের করা। ৬ ফুটের বেশি যাদের উচ্চতা, ১৮-এর কম বয়স, জোরে বল ছুড়তে পারেন; এখনই মাঠে নেমে পড়েন।“
টি টুয়েণ্টির দল নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে টাইগারদের বোলিং এর আসল চিত্র তুলে ধরার প্রয়াসে এ স্ট্যাটাসটিকে টেনে আনা।

গত পর্বে মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানদের কথা বলতে গিয়ে একজন উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যানের কথা বলা হয় নি। সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের সুবাধে এশিয়া কাপের দলে থাকা তরুণ খেলোয়াড় আনামুল হক জহুরুলের চেয়ে ভাল বিকল্প হতে পারেন। এশিয়া কাপে কোন ম্যাচে তিনি সুযোগ পান নি। তবে তার আগে আনামুল হক বিপিএলে ১০ ইনিংসে ২৫.১৪ গড়ে ১৭৬ রান করেন। আর সদ্য সমাপ্ত জাতীয় ক্রিকেট লীগের প্রথম শ্রেণীর ম্যাচগুলোতে ধারাবাহিকভাবে ভাল খেলে ৮১৬ রান করে টূর্ণামেণ্টের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন।

আগেই বলেছি এ ফরম্যাটে অলরাউণ্ডারদের কদর একটু বেশী। ১৪ জনের দলে তাই ৩ জন অলরাউণ্ডার থাকতে পারেন। স্পিন নির্ভর বাংলাদেশ দলে কোন পেস অলরাউণ্ডার নেই বললেই চলে। আর এখানেই দলের সবচেয়ে বড় দূর্বলতা। সাকিব আল হাসান, মাহমুদ উল্লাহ রিয়াদ, অলক কাপালি, নাঈম ইসলাম, ফরহাদ রেজা প্রমুখ দলে অলরাউণ্ডার হিসেবে জায়গা পাওয়ার জন্য লড়বেন। রেজা ছাড়া বাকিরা স্পিনার।

সাকিব আল হাসান টাইগারদের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তারকা। ওয়ানডে ও টেস্টের বিশ্বসেরা অলরাউণ্ডার সাকিব আল হাসান। তবে টি টুয়েণ্টিতে তিনি ব্যাটসম্যানদের তালিকায় ৭৮ নম্বরে, বোলারদের তালিকায় ১৪ নম্বরে ও অলরাউণ্ডারদের তালিকায় সেরা দশের বাইরে আছেন। এশিয়া কাপে ম্যান অব দ্যা সিরিজ হওয়া সাকিব এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক টি টুয়েণ্টিতে ১৬ ইনিংসে ১০৭ স্ট্রাইক রেটে ১৩.৩৭ গড়ে ২১৪ রান করেন যা তার ওয়ানডে ও টেস্টের রেকর্ডের তুলনায় ম্রিয়মাণ। তবে বোলিংয়ে ৬.৬১ ইকোনমতিতে ১৭.৯৫ গড়ে ২১ উইকেট পান। সাম্প্রতিক সময়ে বিপিএলে ১১ ইনিংসে সাকিব ৪০ গড়ে ২৮৬ রান ও ১৫ উইকেট লাভ করেন। চলমান আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে এখন পর্যন্ত মাত্র ৩ টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছেন। এ নিয়ে বাংলাদেশী ক্রিকেটপ্রেমীদের দুঃখ ও ক্ষোভের অন্ত নেই। এ ৩ ম্যাচে ৮ গড়ে ২৪ রান ও ৫.৮১ ইকোনমিতে ১০.৬৬ গড়ে ৬ উইকেট লাভ করেছেন। তবে সাকিবকে ছাড়াই কেকেআর এখন পয়েণ্ট তালিকায় ৯ ম্যাচ খেলে ১১ পয়েণ্ট নিয়ে ২য় স্থানে আছে। সাকিব আইপিলে আরো কয়েকটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবেন বলে সবার আশা। সেটা হোক না হোক তবে এবারের টুয়েণ্টি বিশ্বকাপে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকবে পুরো দেশ। আর তাই তিনি অটোমেটিক চয়েস সবার।

বাংলাদেশ দলের অন্যতম খেলোয়াড় মাহমুদউল্লাহ। তবে তার ধীরগতির স্ট্রাইক রেট দুশ্চিন্তার বিষয়। তিনি এমন একটি পজিশনে ব্যাট করেন যেখানে ঝড়ো ইনিংসই খেলতে হয়। রিয়াদ আন্তর্জাতিক টি টুয়েণ্টি ক্যারিয়ারে মাত্র ৬২.৭৯ স্ট্রাইক রেটে, ৬.৭৫ গড়ে ১২ ম্যাচে মাত্র ৮১ রান করেন ও বোলিংয়ে ৭.৩১ ইকোনমিতে ৫৫.৫০ গড়ে ২ উইকেট পান। তবে বিপিএলে তার ভাল পারফরম্যান্স ছিল। সেখানে ৯ ইনিংসে ২৫.৭১ গড়ে ১৮০ রান করা ছাড়াও ৪ উইকেট পান।

অলক কাপালি একসময় বাংলাদেশ দলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ছিলেন। আন্তর্জাতিক আঙ্গিনায় ৬৭.০৫ স্ট্রাইক রেটে ১১.৪০ গড়ে ৭ ইনিংসে ৫৭ রান ও ৭ ইকোনমিতে ১৭.৫০ গড়ে ২ উইকেট লাভ তার প্রতিভার যথার্থ প্রমাণ নয়। এছাড়া বিপিএলে তিনি ৮ ইনিংসে ২০.৬৬ গড়ে ১২৪ রান ও ওভারপ্রতি ১৫ রান দিয়ে মাত্র ৩ উইকেট পান।

নাঈম ইসলাম ঘরোয়া লীগে পিঞ্চহিটিং এর কারণে `ছক্কা নাঈম` নামে খ্যাত। এশিয়া কাপের দলে জায়গা না পাওয়া নাঈম তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ৯ ম্যাচে ১০৭.৬৯ স্ট্রাইক রেটে ১৪ গড়ে ১১২ রান করেন। বোলিংয়ে ৮.১৩ ইকোনমিতে ৪০.৬৬ গড়ে ৩ উইকেট পেয়েছেন। আলোচিত বিপিএলে ৬ ইনিংসে ২৫.২৫ গড়ে ১০১ রানের সাথে মাত্র ১ টি উইকেট পান।

৮ টি আন্তর্জাতিক টি টুয়েণ্টি খেলার অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ ফরহাদ রেজা বিপিএলে ৫ ম্যাচে ৮.১১ ইকোনমিতে মাত্র ৩ উইকেট পান ও ব্যাটিংয়ে লোয়ার অর্ডারে ৩ ইনিংসে ২৫ রান করেন। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ৮৩.৫৮ স্ট্রাইক রেটে ৯.৩৩ গড়ে ৬ ইনিংসে ৫৬ রান ও ১০.৯৩ ইকোনমিতে ৪৩.৭৫ গড়ে ৪ উইকেট লাভ নির্বাচকদের কতটুকু প্রভাব ফেলতে পারে তা নিয়ে সন্দিহান।

ঘরোয়া লীগে ভাল খেলা এমন কোন উদীয়মান অলরাউণ্ডারও নেই যে বিকল্প হিসেবে নাম আসতে পারে। এ সাকিবসহ পাঁচজন অলরাউণ্ডারের রেকর্ড খুব একটা সুখকর নয়। সহজভাবে বলতে গেলে সাকিব বাদে বাকিরা সাধারণ মানের। কোন স্পেশালিষ্ট টি টুয়েণ্টি অলরাউণ্ডার নেই ও পেসার অলরাউণ্ডার নেই, এটিই সবচেয়ে ভাবনার বিষয়। সম্ভাব্য খেলোয়াড়দের স্ট্রাইক রেট খুবই কম যা কোনভাবেই টি টুয়েণ্টির সাথে মানায় না। আর এখানেই দেবুদার সাথে পুরোপুরি একমত। দলে সাকিবের সাথে রিয়াদ ও নাঈমের সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ভালমানের অলরাউণ্ডারের সংকটই অন্য দলগুলোর সাথে শক্তিমত্তা ব্যবধান গড়ার অন্যতম নিয়ামক। নির্বাচক কমিটি অলককে দলে নিয়ে কিংবা নতুন কোন তরুণকে বিশ্বকাপের মত স্টেজে দলে নেওয়ার মত সাহস কি দেখাতে পারবেন?

নোট:
১। দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের ফেসবুক স্ট্যাটাস
২। জাতীয় ক্রিকেট লীগের ফাইনাল ম্যাচসহ আনামুল হকের রেকর্ড
৩। আইপিএলের রেকর্ড ২৯ এপ্রিলের দিল্লী ডেয়ারডেভিলস ও রাজস্থান রয়্যালসের ম্যাচ পর্যন্ত।
৪। আইসিসি খেলোয়াড়দের সারিক্রম সর্বশেষ আপডেট অনুসারে।

(চলবে)

মোঃ মুজিব উল্লাহ: mdmujib_ullah@yahoo.কম

পূর্ববর্তী পর্বগুলোর লিংক:
ক্রিকেট বিশ্বে নতুন পরাশক্তি বাংলাদেশ! (১ম পর্ব)
ক্রিকেট বিশ্বে নতুন পরাশক্তি বাংলাদেশ! (২য় পর্ব)
ক্রিকেট বিশ্বে নতুন পরাশক্তি বাংলাদেশ! (৩য় পর্ব)
ক্রিকেট বিশ্বে নতুন পরাশক্তি বাংলাদেশ! (৪র্থ পর্ব)
ক্রিকেট বিশ্বে নতুন পরাশক্তি বাংলাদেশ! (৫ম পর্ব)