ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

স্রেফ নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থেই রাজনৈতিক দলগুলি মতাদর্শে না-মেলা প্রতিদ্বন্দ্বী দলকেও ইস্যুভিত্তিক সমর্থন করে কেন্দ্রে বা রাজ্যে  সরকার গঠন করতে সাহায্য করে থাকে। মানুষ যেহেতু ‘পলিটিক্যাল অ্যানিম্যাল’, সেহেতু তার প্রেম-ভালবাসা-যৌনতা-কাম ‘পলিটিক্যাল’ বা প্রায় ‘পলিটিক্যাল’ হবে—সেটাই স্বাভাবিক।  আসলে প্রেমও একপ্রকার ‘ইস্যুভিত্তিক সমর্থন’। তারাবাজিটা এই হুঁশ করে জ্বলে উঠল, আলোর ফুলকি ছড়াল, এবং শেষে নিভেও গেল। কেউ ভুলে গেল সে-আলো, কেউ-বা বুকে জমিয়ে রাখল আলোর স্মৃতিকথা। কাম প্রেমের অপরিহার্য অংশ। আত্মায়-আত্মায় প্রেম, যা প্লেটনিক ভাবনা, তা সমর্থনযোগ্য নয়। আত্মা তো সেই শরীরেই থাকে, বাইরে কই? তার প্রমাণই-বা কোথায়? আর শরীরেই কামের বসত। কামহীন প্রণয়ও একপ্রকার কামজ প্রেম—উত্তপ্ত লাভা হারিয়ে কিংবা লাভা নিয়েই সুপ্ত কাম ঘুমোচ্ছে শরীরে।

‘প্রেম ইস্যুভিত্তিক’, অর্থাৎ আমি আমার প্রেমিকাকে কোনও কোনও  বিষয়ে সমর্থন করি, পছন্দ করি, সব বিষয়ে নয়। তাঁর সৌন্দর্য, গায়ের রং, শিক্ষাদীক্ষা, ধর্ম-বর্ণ-জাতি-বংশ, আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান, মেধা-রুচি-স্বাধীনচেতা ইত্যাদি সব বিষয়েই চেতন বা অবচেতনে একটা ‘ক্যালকুলেশন’ কাজ করছে এবং তাঁর প্রতি আমার সমর্থন বা প্রত্যাখ্যান এগোচ্ছে। বিপরীত দিক থেকেও এ সমান সত্য। এই সমর্থনে ‘না’-এর সংখ্যা যত বাড়বে, ব্রেক-আপ বা ডিভোর্সের সম্ভাবনাও ততটাই প্রবল। নইলে কোনও মতে টিকিয়ে রাখতে হয় একটা সম্পর্ককে, বিবাহের পরও, সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে কিংবা আর্থিক কারণে। সমাজে বৈবাহিক ধর্ষণ যেমন আছে, আছে তেমনই বিবাহপূর্বে ‘প্রেম-সম্পর্কে’ও ধর্ষণ। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য এখানে অনেক মহিলা-ই ‘চুপ’ থাকেন।

বিবাহপূর্ব সম্পর্কে যদিও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়, কিংবা সরে আসা যায় সম্পর্ক থেকে, বিবাহের পর আর তা যাচ্ছে না, অন্তত বৈবাহিক ধর্ষণকে কেন্দ্র করে, কিছুদিন আগেও সুপ্রিম কোর্টের ইঙ্গিত এমনই। বিবাহ-প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার জন্য ঝুঁকি না-নেওয়া; জোর করে টিকিয়ে রাখা। ‘ইস্যু’ না-থাকলেও সম্পর্ককে ‘সমর্থন’ করতে হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, ‘ঠিক ভাবনা’; অনেকেই, ‘হাস্যকর’। সমীক্ষা বলছে, বিবাহিতা স্ত্রীও স্বামীর দ্বারা ধর্ষিতা হচ্ছেন, আর তাঁকে যে ধর্ষণ করা যায় না, এটাই হক কথা।

আসলে প্রেমের আঠা (পড়ুন ‘সমর্থন’) ক্রমশ কমে এলেই এমন হয়। তাহলে কি প্রেম নেই? আছে। জর্জ বার্নাড শ’ উচ্চাঙ্গের প্রেমে কোনও বিশ্বাস রাখেননি। প্রেম-ভাবনাতে তিনি ছিলেন ‘প্র্যাকটিক্যাল’। আমার মনে হয় উচ্চাঙ্গের প্রেম ওই হুঁশ করে জ্বলে ওঠা তারাবাজি ! আর ‘না-পাওয়া’ প্রেম প্রায় সব সময়ই উচ্চাঙ্গের! ওটা নিয়ে কথা না-বলাই ভাল। ভাট বকছি? আরে দেখুন ‘প্লুরাল’ বৈবাহিক জীবনে ‘সিঙ্গুলার’ কেউ এল, ‘সুচ হয়ে’ ঢুকল আর নিজে ‘ফাল হয়ে’ না-বেরিয়ে আমাকে-আপনাকেই বের করে দিল। অথচ ওই সম্পর্কটা হয়তো ছিল প্রেমেরই ফসল। এমতাবস্থায় আমার বা আপনার ‘থার্ড পার্সান সিঙ্গুলার নাম্বার’  হওয়া ছাড়া গত্যান্তর নেই। এমন জীবনকেও অগত্যা মেনে নেওয়া। শুধু প্রেম নয়, জীবনও যেন এক ‘ইস্যুভিত্তিক সমর্থন’।