ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 

স্মরণ করি সেইসব শহীদদের, যারা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজের প্রাণ বাজি রেখে, অসীম সাহস আর বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ছিনিয়ে এনেছেন আমাদের এই স্বাধীনতা। যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমাদের এই সোনার বাংলা, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ, তাদের কথা সোনার হরফে লেখা থাকবে ইতিহাসের পাতায়। মুক্তিযুদ্ধের সেইসব শহীদদের পরিবার এবং সন্তানদের ভরনপোষনের সকল দায়িত্ব যেমন প্রজাতন্ত্রের তেমনি মুক্তিযোদ্ধাদের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করাও প্রজাতন্ত্রের দায়িত্ব এবং কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। তাদেরকে অবহেলা করা যেমন অপরাধ তেমনি চোখের সামনে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে রিক্সা চালাতে দেখাও তাদের সাথে একধরনের বিশ্বাসঘাতকতা।

একে একে চল্লিশটি বছর পার হয়ে গেল। আমরা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, শুধু শুনেছি, বইয়ের পাতায় পড়েছি। সময় যায়, লেখাগুলোতে কিছু ঘষামাজা হয়। কিছু মানুষ মুক্তিযুদ্ধকে পুজি করে কিছু ফায়দা হাসিল করার জন্য। ক্রমশই দেশের রাজনীতি দুটো ধারায় বিভক্ত হল, একটি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের, আর একটি বিপক্ষের(কথিত)। যাই হোক সে কথায় পরে আসছি।

কিছুদিন আগে ৩২তম বিশেষ বিসিএস এর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। অনলাইনে এটি নিয়ে চলছে বিতর্ক। কয়েকটি পত্রিকা এটি নিয়ে প্রতিবেদন ও প্রকাশ করেছে। কোটা থাকার প্রশ্নে যখন আমরা বিভক্ত, যার একটি সিংহভাগ চায় কোটাপ্রথা আস্তে আস্তে উঠিয়ে দেয়া হোক, ঠিক তখন এমন একটি বিসিএস এর আয়োজন সত্যিই হতাশাজনক।

কেন হতাশাজনক? ২৩তম বিশেষ বিসিএস এর পর ২৪ থেকে ২৯তম বিসিএস পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া গেছে ২-১০ ভাগ। সর্বোচ্চ ১০ ভাগ পাওয়া গেছে মাত্র একটি বিসিএস পরীক্ষায়। অর্থাৎ ক্রমশই কমতেছে যোগ্য মুক্তিযোদ্ধার সন্তান।

আচ্ছা পাঠকবলুনতো এই কোটা কিসের জন্য? কোটা থাকার যৌক্তিকতা অবশ্যই আছে। এটি শুধু আমাদের দেশে না, আমাদের মত অন্য দেশেও কোটাপ্রথা আছে। যেসব দেশে স্বাধীনতার জন্য মানুষ প্রাণ বিসর্জন দিছে, সেসব দেশে তাদের সন্তানদের জন্য কোটার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু তা একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। একটা সময় আসলে দেখা যায় যে আর ওরকম প্রার্থী পাওয়া যায়না, তখন আস্তে আস্তে কোটা শিথিল করা হয়।

আমরা সকলেই জানি আমাদের দেশে বিসিএস এ মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের জন্য সর্বোচ্চ ৩০% কোটার বিধান আছে। কিন্তু আমি আগেই উল্লেখ করেছি ২৪ থেকে ২৯তম বিসিএস পর্যন্ত কোন বিসিএস এ ১০% এর বেশি যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায়নি। এটি দিয়ে পরিস্কার ভাবে প্রমাণ পাওয়া যায় যে ক্রমশই কমতেছে যোগ্য মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। আগে যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধাতালিকার ভিত্তিতে নেয়ার বিধান ছিল। কিন্তু ২০১০ সালে নতুন বিধান করা হয় যে, মুক্তিযোদ্ধা কোটা পূরণ না হলে, জাতীয় মেধা থেকে নেয়া যাবেনা। সেটি খালি থাকবে। খালিতো রাখতেই হবে, তা না হলে যে মেধাবীরা চাকরি পেয়ে যাবে।

আগেই বলেছি আমদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে পুঁজি করে একধরনের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করা হচ্ছে, যার ফলশ্রুতিতে আমরা আরও কিছু উদ্ভট সিদ্ধান্ত দেখতে পাই পরবর্তীতে। ৩২তম বিসিএস সেরকম একটি প্রয়াস ছাড়া আর কিছুই না। মিথ্যা বললাম? আচ্ছা ভেবে দেখুন, আগের কোন বিসিএস এ তো ১০% এর বেশি যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায়নি, তাহলে এত প্রার্থী পাবে কোথায় পিএসসি? ছোট একটা হিসাব দেই। প্রতিবছর মেডিকেলে ৫০-৬০ জন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে কোটায় নির্বাচিত করা হয়, মোট ছাত্রের ২-৩%, আর ডাক্তার মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য বিসিএস এ কোটা ৩০%, একটু হিসাব করুনতো ব্যাপারটা কি দাড়ায়। ধরলাম, আরও প্রার্থী আছে, কিন্তু তারা কি ক্যাডার সার্ভিসে চাকরি করার যোগ্য? অর্থাৎ অযোগ্য প্রার্থীদেরকে আপনারা যোগ্য বানিয়ে চাকরি দিবেন ৩২তম বিসিএস এর মাধ্যমে?

আমি আগেই বলেছি, কোনভাবেই মুক্তিযুদ্ধের মহান বীরদেরকে অবহেলা করা যাবেনা। তাদের যোগ্য সম্মান না দিতে পারলে কোনদিনই আমরা মাথা উঁচু করে দাড়াতে পারবনা। এটি যেহেতু একটা স্পর্শকাতর বিষয়, তাই এই কোটার ব্যাপারটাকে সংস্কার করার সাহস কেউ করেনা। কেন করেনা? তাহলে সে যে হয়ে যাবে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি, এই সাহস কার আছে?

মুক্তিযোদ্ধার সন্তান না পাওয়া গেলে তার ছেলের সন্তান বা মেয়ের সন্তান। আচ্ছ বলুন তো বাবার ভরনপোষন কে করে? সন্তানরা নাকি নাতিরা? সব সন্তানরা কি বাবাকে খেতে দেয়? তাহলে মুক্তিযোদ্ধারা আজ রিক্সা চালাত না, খেতে খামারে কাজ করত না, ছোট্ট মুদি দোকানে বসে চালডালের ব্যাবসা করত না। দুবেলা দুমুঠো ভাত পেত। অনেক মুক্তিযোদ্ধা তাও পায়না। আপনারা মুক্তিযোদ্ধার নাতিদেরকে চাকরি দিবেন, মনে করেন ওরা ওদের বউ সন্তান কে না খাইয়ে দাদা অথবা নানার সেবা করবে? তাদের ভরনপোষনের দায়িত্ত্ব নিবে? এরকম আজগুবি চিন্তা কিভাবে আসে আপনাসের মাথায়?

কত টাকা ভাতা পান মুক্তিযোদ্ধারা? তাতে কি তাদের পরিবার চলে? কেউ কি সে খবর রাখে? তাদের নাতিদের চাকরি দিলে তারা কি খেতে পাবে? সে খবর কেউ রাখেনা, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল আর নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি প্রমান ছাড়া এসব আর কিছুই না। নাতিদের চাকরি না দিয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধার ভাতা ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তার সমান করুন, তাতে তারা ভাল থাকবে, তাদেরকে সম্মান দেখান হবে। আর যদি তাদের যোগ্য সন্তান থাকে তাদের অবশ্যই তাদের যোগ্য পদ দেয়া হোক। যোগ্য না হলে কেন জোরকরে যোগ্য বানাবেন? যে ২য় শ্রেনীতে পাওয়ার যোগ্য কেন তাকে জোর করে ক্যাডার সার্ভিসে চাকরি দিবেন? তাতে কি জাতি মেধাশুন্য হয়ে যাবেনা?