ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

 

উদারতা ও ভালবাসা যে বাঙালির বৈশিষ্ট্য সেখানে সবকিছুর রাজনীতিকরনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে আরও আগে। যেকোন লেখক, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী তাকে যেন দলীয় আবর্তের মধ্যে না আনলেই নয়। দুঃখজনক, অনাকাঙ্খিত এবং দূর্ভাগ্যজনক।

একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে মুহাম্মদ জাফর ইকবাল ও হুমায়ূন আহমেদের ভূমিকা এক রকম হবে তা ভাবার কোন কারণ নেই কারণ ব্যক্তি হুমায়ূন কখনও সাহিত্যিক হুমায়ূনকে ছাড়িয়ে যায়নি।

হুমায়ূন আহমেদের সাম্প্রতিক দেয়াল উপন্যাস নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার সূত্রপাত। কিন্তু তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে আবেগে ভাসছে বাংলাদেশ তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোন ইস্যু বানানোর মানসিকতা হীনতার পরিচায়ক মাত্র।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যখনই হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন তখনই স্বাভাবিকভাবে বঙ্গবন্ধু এসেছে, জয় বাংলা এসেছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার লেখা ১৯৭১ উৎসর্গ করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে (তখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল)। এরশাদের শাসনামলে তার নাটকে তুই রাজাকার শব্দটি নিয়েও নাকি তৎকালীন সরকারী কোন মহল থেকে চাপ এসেছিল। একটি চ্যানেলের টকশোতে তার ঘনিষ্ঠ একজন বলছিল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আবেগ সৃষ্টি করার পরোক্ষ চেষ্টা হয়েছিল “কোথাও কেউ নেই” এর বাকেরের ফাঁসির মাধ্যমে। জনতা যখন ‘বাকেরের ফাঁসি হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’র প্রস্তুতি নিচ্ছিলো তখন আরেকটি দৃশ্যও চিত্রায়িত হয়েছিল রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় বাকেরের ফাঁসি মওকুফ হয়। কিন্তু লেখক মূল রচনা অবিকৃত রেখেছিলেন যার পরোক্ষ বক্তব্যটি ছিল: বাকেরের ফাঁসি হলে সত্যিকারের অপরাধীদের কেন ফাঁসি হবেনা।

দেয়াল উপন্যাস প্রথম আলোতে প্রকাশিত হলে অনেকে সমালোচনা করেন। কিন্তু এখন যে ঘৃণ্য প্রচারণা চালানো হচ্ছে হুমায়ুনের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে তা সত্যি নয়। আদালত তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সংশোধনের সুপারিশ করেছে। হুমায়ূন আহমেদ তার সর্বশেষ সাক্ষাতকারে বলেছেন, তার পক্ষে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সম্পর্কে তথ্য যোগাড় করা সম্ভব ছিলনা তাই প্রাপ্ত সূত্র থেকে তথ্য ব্যবহার করে চরিত্র নির্মাণ করেছেন। তিনি ফিরে এলে সংশোধন করার কথাও বলেছেন। উল্লেখ্য ফারুক মুক্তিযুদ্ধ করেনি এ তথ্য তিনি পেয়েছিলেন দেয়ালের একটি অধ্যায় প্রকাশিত হবার পরে।

পেছন ফিরে তাকালে অনেক কথা বলতে হবে। হুমায়ূন আহমেদও মুরতাদ ঘোষিত হয়েছিলেন। সিলেটের শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তিনি সপরিবারে অনশন করেছেন যখন মৌলবাদীরা তার নুহাশ পল্লী জ্বালিয়ে দিয়েছিল।

হুমায়ূন আহমেদ তার লেখনী দিয়ে নতুন প্রজন্মকে বই পড়া শিখিয়েছেন। জীবনের সব জটিল চক্রকে উপস্থাপন করেছেন সহজভাবে। তিনি মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখে সাহিত্য রচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, কেউ সুপারম্যান নয়। লিখতে লিখতে তিনি নিজে কখন সুপারম্যান হয়ে গেছেন নিজেই জানেন না। এপার বাংলা জয় করে ওপার বাংলা জয় করেছেন। গর্ব অনুভব করি যখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেন – আগে বাংলাদেশে এলে সবাই ইলিশ আনতে বলতো এখন বলে হুমায়ুনের বই আনতে।

বাংলার কীর্তিমান লেখককে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখতে পারলে সেটাই হবে তার প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা নিবেদন।