ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

শত্রু সম্পত্তি একটি কালো অধ্যায়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে “রাষ্ট্রের শত্রু” হিসেবে চিহ্নিত করা কোন সভ্য সমাজে কাম্য হতে পারেনা। অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন সংখ্যালঘুদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি আইন হিসেবে একটি সাহসী এবং প্রশংসনীয় উদ্যোগ হলেও বাস্তবায়নে জটিলতা অনেক। ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কতিপয় স্থানীয় প্রভাবশালীরা সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি ক্রমান্বয়ে কুক্ষিগত করেছে, তাদের উচ্ছেদ করেছে। অনেক হিন্দু পরিবার দেশত্যাগ করেছে বা নিরাপত্তার জন্য এলাকা ছেড়েছে। প্রচলিত আইনেই তারা সে সম্পত্তি ফিরে পাচ্ছেনা (বা নিরাপত্তাজনিত কারণে পেতে ইচ্ছুক নয়) সেখানে অর্পিত সম্পত্তি দূর-অস্ত বলেই প্রতীয়মান হয়। কিন্তু অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনকে কেন্দ্র করে লাভবান হয়েছে এবং হতে যাচ্ছে একটি চক্র এবং এ নিয়ে যেভাবে গুজব ছড়ানো হচ্ছে তার ফলাফল সময়ই বলে দিবে।

এটি ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে এক সময় হিন্দুরা ছিল সংখ্যাগুরু এবং তাদের আয়ত্তাধীন সম্পত্তির পরিমাণ ছিল উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে ১৯৪২ সালের হিন্দু-মুসলিম পরিসংখ্যানে ৭৫% হিন্দু গণনা করা হলেও অনুপাত ৫০%-৫০% ছিল এ ব্যাপারে কারও সন্দেহ নেই। সুতরাং ১৯৪৭ এ ভারত ভাগের পর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদের মালিক ছিল হিন্দুরা। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর ভারতে দেশত্যাগ করা মুসলমানদের সম্পদ নিলামে বিক্রয় করে সুরাহা করলেও তৎকালীন পাকিস্তান বিষয়টিকে আইনের মধ্যে নিয়ে আসে যা নিয়ে তখন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত রাজনৈতিক রূপ দেয়ার ও সুবিধা আদায়ের সুযোগ রয়েছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালের ২৩ মার্চ শত্রু সম্পত্তি আইনটি বাতিল করা হয় যার ফলশ্রুতিতে শত্রু সম্পত্তি নামে কোন কিছু বিদ্যমান থাকার কথা নয়। কিন্তু পরবর্তীতেও বিষয়টি অমীমাংসিত থাকে বরং অর্পিত সম্পদের উপর সরকারের ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করা হয়। অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের খ তফসিলের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অবমুক্ত হবার মতো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদ এ তফসীল-ভুক্ত হলেও তথ্যের অভাবে উপরন্তু রাজনীতিকরনের কারণে জনমনে শঙ্কা রয়েছে যার ফলে সরকারের বিরুদ্ধে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।

অর্পিত সম্পত্তি আইনের কিছু জটিলতা
১. হিন্দু মালিকানাধীন হবার কারণে অনেক সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। মাস্টার দা সূর্যসেন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব ও ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার জমিও অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত।
২. দেশত্যাগের আগে অনেকে সম্পদ বিক্রয় করে গেছে। যারা সম্পত্তি বিক্রয় করে গেছে সেটি কিভাবে নির্ণীত হবে?
৩. আদালতের চূড়ান্ত রায়ে কোনো সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তি নয় এমন ডিক্রি থাকলেও সেই সব সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়েছে।
৪. তহসীল অফিসের গাফিলতি বা স্বেচ্ছাচারিতার কারণে অনেক সম্পত্তি এ তালিকায় এসেছে। আবার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর প্রেরিত তালিকা অনুসারে তালিকাভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
৫. অনেকক্ষেত্রে কোন তারিখে কোন কেসের মাধ্যমে অর্পিত সম্পত্তির ঘোষণা হয়েছে তার কোনো কিছুই গেজেটে অন্তর্ভুক্ত নেই।
৬. এ সংশ্লিষ্ট উচ্চ আদালতের অনেক রায়ও রয়েছে যা পরস্পরবিরোধী।

প্রশ্নবিদ্ধ খ তফসিল
এ তফসিলভুক্ত সম্পত্তির অবমুক্ত হবার সুযোগ রয়েছে। খ তফসিলভুক্ত সম্পত্তিতে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সম্ভবত এক কোটির বেশি। সবচেয়ে বিব্রতকর হল ৪০/৫০ বছর পর বর্তমান মালিকরা জেনেছে এ সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত। অবমুক্তির আবেদন পত্রেও লেখা আছে “আমি/আমরা উক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকার/ক্রয় সূত্রে মালিক”। প্রশ্ন হল আইনগত সীমাবদ্ধতা থাকলে এত বছর ধরে ক্রয়/বিক্রয়/হস্তান্তর হল কিভাবে? অনেক বাড়ীর ব্যাংক ঋণও রয়েছে। রাজউক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রেজিস্ট্রি, নামজারি, নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন বৈধতা দিল কিসের ভিত্তিতে?

ভারত থেকে হিন্দুরা এসে দেশ নিয়ে যাচ্ছে!!
“আইন করে অর্পিত সম্পত্তি ফেরত দেয়ার অপচেষ্টা”, “ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে পরিকল্পিত পুনর্বাসনে দেশবিরোধী পাঁয়তারা”, “ভারতীয়দের দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে”: এ ধরনের শিরোনাম যখন জাতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় তখন বিভিন্ন ব্লগে বা ওয়েবসাইটের প্রচারণা কি হতে পারে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে গুজবের মাত্রা কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। দেশ দখল করতে ভারত থেকে হিন্দুদের আনা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ভারতকে খুশী করার জন্য এ আইন করছে, প্রতিবাদ করলে ভারতীয় সেনাবাহিনী আক্রমণ করবে এ ধরনের অনেক গুজব ছড়ানো হচ্ছে। বাংলাদেশী নাগরিক ছাড়া আবেদন করা যাবে না এ তথ্যটিও অনেকের অজানা।

নিষ্কৃতির পথ
অর্পিত সম্পত্তির থেকে নিষ্কৃতি পেতে নির্দিষ্ট মহলের পকেট কাটার সুযোগ হয়েছে। অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্তির জন্য গঠিত জেলা কমিটি বরাবর আবেদনের কথা বলা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে জানা যায় সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস আইন মন্ত্রণালয়ের অজুহাতও দেখায়। উদাহরণস্বরূপ ঢাকার একটি এলাকায় প্রায় ৪৫০টি বাড়ি একটি খতিয়ানে অর্পিত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত। সকল বাড়ির মালিকরা সংগঠিত হয়ে ৩/৪ জনকে দায়িত্ব দিয়েছে। অবমুক্তির জন্য বিস্তারিত জানতে এবং মন্ত্রীর সাথে দেখা করা বাবদ ২০০০ টাকা করে ধার্য করা হয়েছে। ধারণা দেয়া হয়েছে বাড়ি প্রতি ১ থেকে ৫ লাখ টাকা খরচ হবে কারণগুলো এরকম: “সরকারী লোকজন নিঃশ্বাস নিতেও টাকা নেয়”, “মন্ত্রী তো গাছে ধরে না, অনেক টাকা খরচ করে মন্ত্রী হয়েছে” ইত্যাদি ইত্যাদি। এরকম সারা দেশেই অবমুক্তির জন্য ভুক্তভোগীরা সংগঠিত হয়ে অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হল প্রচলিত অবমুক্তির প্রক্রিয়ায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কোন ভূমিকা নেই। এ ব্যাপারে বোধ হয় কেউ জনপ্রতিনিধিদের কাছে যাচ্ছে না এবং জনপ্রতিনিধিরাও কোন খোঁজ নিচ্ছে কিনা জানিনা।

অর্পিত সম্পত্তি প্রকৃত হিন্দু মালিকরা পাবে কি-না জানিনা তবে একটি নির্দিষ্ট মহলের পকেট কাটার সুযোগ হয়েছে নিঃসন্দেহে। তালিকাভুক্ত মালিকদের অনেকে দৈনিক সংগ্রাম বা আমার দেশ এর পেপার-কাটিং দিয়ে ভীতির সৃষ্টি করছে। অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন ২০১২ এ তালিকাভুক্ত সম্পদের ব্যাপারে প্রচারের কথা বরা হলেও অনুমান করি সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস পর্যাপ্ত সহায়তা দিচ্ছে না। আমাদের দেশে এ যাবত রাজনৈতিক প্রভাবে জেলা প্রশাসকরা তাদের এখতিয়ারে অনেক সম্পদকে অর্পিত তালিকা থেকে অবমুক্তি দিয়েছে। এক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে। অবমুক্ত হবার মতো তালিকাভুক্ত সম্পদে বসবাসকারী প্রায় ১ কোটির বেশি জনসংখ্যা নিজেদের অজান্তেই ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে এবং আগামী নির্বাচনে ভোটারদের প্রভাবিত করতে এটি একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হতে পারে। সরকার বা আওয়ামী লীগকে কিভাবে তার মূল্য দিতে হবে তা সময়ই বলে দিবে।