ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

রহস্য উদঘাটনে সরকারকে সাধুবাদ না দিয়ে অর্থনীতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা দুঃখজনক

হলমার্ক কেলেঙ্কারির ইস্যুটি অবশ্যই নিন্দনীয় এবং এ ধরনের ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। কিন্তু বিষয়টি যতটা জাতীয় তারচেয়ে রাজনৈতিক ইস্যু বানানো হয়েছে বেশী আর মূল ঘটনাটি বলতে গেলে ঢাকা পড়ে গেছে। তবে একে যতই সরকার-বিরোধী রাজনৈতিক ইস্যু বানানো হোক না কেন পক্ষান্তরে সরকারের কৃতিত্বই প্রমাণ হয় কারণ যুগ যুগ ধরে এ ধরণের ঘটনা ঘটেছে কোন সরকার দৃষ্টিপাত করেনি। হলমার্ক কেলেঙ্কারির কিছু বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

• হলমার্কের মালিক তানভীর মাহমুদ ২/৩ বছরে টাকার পাহাড় গড়ে নি; এতে তার একযুগ লেগেছে।
• তানভীর অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে ব্যাংকিং আইনের ফাঁক থেকে ব্যাংকের টাকা গ্রহণের পথ বের করেছে এতে প্রধানত দায়ী ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা।
• একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে ঋণ বলতে যা বোঝায় তার সেই ঋণের পরিমাণ ৫৪ কোটি টাকা। হলমার্কের কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার, তাই এ পরিমাণ ঋণ পাবার যোগ্যতা তার থাকতেই পারে। অনিয়ম হয়েছে অন্যক্ষেত্রে।
• ৪০০০ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে নেয়ার যে বিষয়টি এসেছে তা সে নিয়েছে বিল অব একচেঞ্জ, ঋণপত্র ইত্যাদির মাধ্যমে যা একটি স্বীকৃত প্রথা এবং প্রায় সকল শিল্প প্রতিষ্ঠান ও আমদানি/রপ্তানিকারকরা এ ধরণের সুযোগ নিয়ে থাকে। যেহেতু দুটি পক্ষের দায়বদ্ধতায় এর নগদায়ন হয় তাই এটি তুলনামূলকভাবে ঋণ গ্রহণের চেয়ে সুবিধাজনক পদ্ধতি। তবে ঋণপত্র নগদায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট দুটি পক্ষ যোগ্য কি-না তার যাচাইয়ের দায়িত্ব ব্যাংক কর্মকর্তাদের।
• সাধারণত একজন ব্যাংক ম্যানেজার তার নিজস্ব এখতিয়ারে নির্দিষ্ট পরিমাণ ঋণ মঞ্জুর করতে পারে। পদমর্যাদা অনুসারে ঋণ প্রদানের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
• রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর একেকটির প্রায় ১০০০/১২০০ শাখা আছে। এ ঘটনা ঘটেছে কয়েকটি শাখা থেকে যা কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে পর্যবেক্ষণ করা অসম্ভব। কোন শাখার যেকোনো অনিয়মের দায়ভার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। তানভীর যে পদ্ধতিতে ব্যাংকের টাকা নিয়েছে তা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সর্বোচ্চ ডিএমডি পদমর্যাদার ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট থাকার কথা, আরও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জড়িত থাকলে তা বেশি সহজতর হয়।

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বা রাজনৈতিক কোন ব্যক্তির এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থাকার সম্ভাবনা নেই কারণ ব্যাংক স্বাস্থ্যখাতের অধীনে নয়। তাছাড়া ব্যাংক ঋণ অনুমোদনে সরকারের কেউ সুপারিশ করেছে এমন প্রমাণও মিলেনি। প্রায় সকল রাজনৈতিক ব্যক্তিরাই আমন্ত্রন পাওয়া মাত্র বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে থাকে, এর মাধ্যমে তারা হয়তো “আমি মাঠে আছি” এই বার্তাটি দিতে চায়। পদস্থ ব্যক্তিদের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের অপব্যবহারও কেউ করতে পারে যা সমালোচিতও হতেই পারে। তার সমালোচনা করার মতো অনেক দিক থাকতে পারে কিন্তু শুধুমাত্র হলমার্কের আমন্ত্রণে উপস্থিত হবার জন্য তাকে দোষী সাব্যস্ত করা বোধ হয় যৌক্তিক নয়। অনেক বড় নেতার পাশে এমন কি বিরোধী দলীয় নেত্রীর পাশেও সন্ত্রাসী টোকাই সাগরের ছবি ছাপা হয়েছিল তার মানে এই নয় যে খালেদা জিয়া টোকাই সাগরের চোরাচালানের সাথে জড়িত। তারপরও প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টাকে দুদকের মুখোমুখী হতে হয়েছে এটি একটি মাইলফলক।

ব্যাংকের টাকা এভাবে নেয়ার ঘটনা নতুন নয় এবং কোন সরকারের আমলেই তা প্রকাশ হয় নাই। বাংলাদেশ ব্যাংক অনিয়মের আশংকা ব্যক্ত করলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এ তদন্ত হয় এবং ঘটনা ফাঁস হয়। প্রধানমন্ত্রী বা তার কার্যালয় থেকে প্রভাবশালী কেউ চাইলে বিষয়টি চাপা রাখতে পারতো। কিন্তু এ ঘটনা উদঘাটনের জন্য কেউ সরকারকে সাধুবাদ দেয় নি যা দুঃখজনক।

অফিসিয়াল সিক্রেসি বলতে একটি বিষয় আছে যা জনগণের বৃহত্তর স্বার্থ বিঘ্ন হবার আশংকার কারণে রক্ষা করা হয়। একটি দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হলো ব্যাংক। বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই কমবেশি ব্যাংকিং স্ক্যাম-এর ঘটনা ঘটে। এর তদন্ত ও যথাযথ ব্যবস্থাও গৃহীত হয় জনগণের অজান্তে। কিছুদিন আগে জাপানেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে যা কোন প্রচার বা প্রোপাগান্ডা ছাড়াই উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও অর্থনীতির জন্য ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জনগণের আস্থার স্থান এটি। হলমার্ক স্ক্যান্ডালের মতো ঘটনা জাতীয় ইস্যু এবং এক্ষেত্রে দলমত-নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ থাকা, সরকারকে তদন্তের জন্য মৌন সমর্থন বা সহযোগিতা দেয়া অন্তত প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় কথা সরকারই এ অনিয়মের তদন্ত শুরু করেছে। অথচ একে রাজনৈতিক রূপ দেয়ার চেষ্টা অদূরদর্শী, অজ্ঞতাপ্রসূত অথবা হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
৪০০০ কোটি টাকা দেশের অর্থনীতিতে বড় কোন অংক নয় কিন্তু এ নিয়ে ইস্যু তৈরি করে ব্যাংকিং খাত তথা গোটা অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করার যে চেষ্টা তার আর্থিক অদৃশ্যমান ক্ষতি হাজার হাজার কোটি টাকা।

এ ধরণের ঘটনা তুলে ধরার জন্য সরকার তথা বাংলাদেশ ব্যাংক সাধুবাদ পাবার যোগ্য। জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা হতে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না হয় তার জন্য সুষ্ঠু তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। যে-ই জড়িত থাক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। ঋণ মঞ্জুরের ক্ষেত্রে আরও সচেতন হতে হবে। কিন্তু আমরা যদি সবক্ষেত্রে রাজনীতি খুঁজি তাহলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিবন্ধক হবো আমরা নিজেরাই।