ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

হযরত মুহাম্মদ (স:) যেকোনো শবযাত্রা দেখলে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতেন। মুসলিম এবং বোখারী দুটি হাদিস গ্রন্থে একটি ঘটনার উল্লেখ আছে, তাকে দাঁড়াতে দেখে একজন সাহাবী বললেন, এটি মুসলিমের লাশ নয়, ইহুদির। তিনি কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে বললেন,
"মৃত ব্যক্তিটি কি মুসলিম বা ইহুদি নাকি মানুষ!"

তিনি ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে সর্বপ্রথম ১২ জন সাহাবীর উদ্দেশ্যে এবং জীবনের শেষ বিদায় হজ্জের জনারণ্যে যে ভাষণ দিয়েছেন – দু’টি ভাষণেই তিনি বলেছেন, শান্তির কথা, সাম্যের কথা, সাধারণ মানুষের অনিষ্ট না করার কথা; বিশেষত অমুসলিমদের ক্ষেত্রে তাঁর নির্দেশনা ছিল “তাদের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (স:)।” এমন কি তিনি এটিও বলেছেন,
"কোন মুসলমান যদি কোন নিরপরাধ অমুসলিমের অনিষ্ট করে শেষ বিচারের দিনে তিনি সেই মুসলমানের বিরুদ্ধে এবং সেই নিপীড়িত মুশরিকের পক্ষে দাঁড়াবেন।"

যে মানুষটির জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে শুধুই শান্তি, দয়া, সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা, প্রজ্ঞা, ক্ষমা এবং মহানুভবতার পরিচয় পাওয়া যায়, সেই মুহাম্মদ (স:) কে কটাক্ষ করে কখনো তলোয়ার হাতে কার্টুন তৈরি করা হয় কখনো চলচ্চিত্র তৈরি করা হয়। যে মানুষটি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে গাছপালা, পশু এমনকি ক্ষুদ্র পিপড়ার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন, যিনি প্রতিবেশী যেন ক্ষুধার্ত না থাকে সে নির্দেশ দিয়েছেন – তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিদিন গড়ে তিনটি গ্রন্থ বা প্রকাশনা প্রকাশিত হয়। তিনি বলেছেন সাদা বা কালো, ভৃত্য বা মালিক কেউ কারো চেয়ে বড় নয়, নিজে আরব হয়ে বলেছেন, আরব অনারবের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়। এই মহামানবকে অবমাননা করা হলে তাঁর অসাধারণ গুণাবলী তুলে না ধরার গ্লানি কী আমাদের গ্রাস করে না?

একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর সর্বশ্রেষ্ঠ এই মানুষটিকে হেয় করার, অবমাননা করার যে প্রবণতা লক্ষ করা যায় – এ ক্ষেত্রে মুসলিম হিসেবে আমরা কি কোন দায় বহন করি? আমাদের দায়িত্ব কি তাকে অবমাননা করার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রতি নিন্দা প্রকাশ ও বিক্ষোভ করা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ? আমরা কি পেরেছি তাঁর মহত্ত্ব পৃথিবীর মানুষের কাছে তুলে ধরতে? কোরআনে রাসুল(স:) এর স্বীকৃতি সত্ত্বেও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বের উপাধি দেয়ার জন্য আমাদের কোন উদ্যোগ ছিল না। আমরা রেফারেন্স দেয়া শুরু করি যখন ইহুদি বংশোদ্ভব ইতিহাসবিদ ও গবেষক মাইকেল এইচ হার্ট যীশু বা মুসা (আ:) এর পরিবর্তে হযরত মুহাম্মদ(স:) কে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করে।

মুহাম্মদ (স:) কে বলা হয় “Most historical religious leader of the world” যার সমগ্র জীবন খোলা গ্রন্থের মতো উন্মুক্ত এবং তাঁর প্রচারিত জীবন ব্যবস্থা সবচেয়ে বেশী বিস্তৃত এবং মূলত এক ব্যক্তি কেন্দ্রিক যেখানে অন্যান্য ধর্ম প্রচারকদেরও স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। জর্জ বার্নার্ড শ বলেছেন,

“I have always held the religion of Muhammad in high estimation because of its wonderful vitality."
প্রচলিত “এন্টি-যীশু মনোভাব ধারণা” সম্পর্কে শ বলেছেন,

“I have studied him, the wonderful man – and in my opinion far from being an anti-Christ he must be called the Saviour of humanity."

আমরা এ বার্তাটি কারো কাছে পৌঁছে দিইনি। বার্নার্ড শ এ মন্তব্য করেছেন মুহাম্মদ (স:) এর যাপিত জীবন সম্পর্কে জানার পর।

সাধারণ মানুষের পক্ষে অন্য ধর্ম সম্পর্কে জানার সুযোগ হয় না তাই কোন ধর্মের অনুসারীদের দেখে সেই ধর্ম সম্পর্কে ধারণা পোষণ করা হয়। বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে অহিংস মতবাদে বিশ্বাসী বলে প্রচলিত যে ধারণা, মায়ানমারে দাঙ্গার পর কী সেই ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়নি? এ কারণেই কোরআনে বহুবার বলা হয়েছে মহানবী (স:) কে অনুসরণ করতে। তিনি বলেছেন তাঁর বাণী অপরকে পৌঁছে দিতে। একজন মুসলমান হিসেবে মুসলমানিত্ব জাহির করতে ৬১ জেলায় বোমাবাজি করতে হয়, রগ কাটতে হয়, সহিংস ও জঙ্গি হতে হয়। কাউকে অভিশাপ দেয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ অথচ আমরা কারো মৃত্যু কামনা করতেও দ্বিধা করি না। গুটি কয়েক ব্যক্তির জন্য এমন একটি চিত্র তৈরি হয়েছে যেন ইসলাম মানেই সহিংসতা ও অমুসলিম-বিদ্বেষ। কোন সন্ত্রাসীর পরিচয় মুসলিম হলেই তাকে ইসলামী মৌলবাদী বা জঙ্গি বলা হচ্ছে। ফিতনা নিষিদ্ধ কিন্তু আমরা বিভিন্ন দল ও মতবাদে বিভক্ত হয়ে হানাহানি করছি। কোরআনে হযরত মুহাম্মদ (স:) এর চরিত্রকে মুসলিমদের জন্য মডেল বলা হয়েছে। আমরা তাঁর কোন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আমাদের মাঝে প্রতিফলন ঘটিয়েছি?

ধর্মকে রাজনৈতিক বা অন্য কোন স্বার্থে ব্যবহার করতে চাইলে তখনই অধর্মের সূচনা হয়। আল্লামা ইকবালকে এখন মূল্যায়ন করা হয় অথচ তার জীবদ্দশায় “ইসলামের ঝাণ্ডা আজ কাঠমোল্লাদের হাতে” – এরকম বহু লেখা লেখার কারণে সকল ফকিহ-মুফতিরা তাকে কাফের ফতোয়া দিয়েছিল। স্যাটানিক ভার্সেস নিয়ে খোমেনি রুশদির মাথার মূল্য ঘোষণার ফতোয়া দেয় তা প্রকাশ হবার এক বছর পর, তার নির্বাচনের আগে। এ ধরণের চর্চা কমবেশি সবসময় হয়েছে যেমন কাজী নজরুলকেও কাফের বলা হয়েছিল। তবে মূলত গত ত্রিশ বছর ধরে ইসলামকে হীন স্বার্থে ব্যবহারের মাত্রা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। সহিংস হতে বিভিন্ন যুদ্ধের উদাহরণ দিয়ে কর্মীদের উৎসাহিত করা হয়। পাকিস্তান আমল থেকে একটি গোষ্ঠী এই শিক্ষা দিচ্ছে যেমন বদরের যুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে। জেহাদ শব্দটির মানে যুদ্ধ নয়। সবচেয়ে বড় জেহাদ বলা হয়েছে নিজের রিপুকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। জেহাদের নামে উগ্রবাদী বানানো হচ্ছে। যে শেষ বিচারের দিনে বিশ্বাস করে তার জানা উচিত তার দায়বদ্ধতা তার আমল-কেন্দ্রিক। তাকে প্রশ্ন করা হবেনা “অমুক” অপরাধী নাকি নিরপরাধী, তাকে অবশ্যই প্রশ্ন করা হবে সে ধর্মের নামে বিভক্তিতে লিপ্ত হয়েছে কি-না, প্রশ্ন করা হবে তার অনিষ্ট থেকে অন্যরা নিরাপদ ছিল কি-না। মুষ্টিমেয় ব্যক্তির স্বার্থ রক্ষায় ইসলামের কিভাবে অপব্যবহার হচ্ছে তা অনুসারীরা জানার সুযোগ হয়তো পায় না। ইসলাম কায়েমের জন্য যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয় তারা হয়তো জানেই না যে হযরত মুহাম্মদ(স:) এর জীবদ্দশায় সংঘটিত প্রত্যেকটি যুদ্ধ ছিল আত্মরক্ষামূলক, তারা হয়তো জানেনা প্রত্যেকটি যুদ্ধ হয়েছে সীমান্ত এলাকায় এবং লোকালয় থেকে দূরে যেন সাধারণ মানুষের ক্ষতি না হয়।

কোরআনে বলা হয়েছে একজন নিরপরাধকে হত্যা গোটা মানবজাতিকে হত্যার সমতুল্য, বলা হয়েছে যুদ্ধ অপেক্ষা শান্তি উত্তম। ইসলামের যে যুদ্ধনীতি সেক্ষেত্রেও শান্তির অনন্য দৃষ্টান্ত রয়েছে যা জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ থেকেও অনেক বেশী উদার। বলা হয়েছে আক্রমণের শিকার হলে যুদ্ধ করা যাবে এবং সেই সিদ্ধান্ত নিবে রাষ্ট্র যা আন্তর্জাতিক আইনেও স্বীকৃত। যুদ্ধে নারী ও শিশু হত্যা নিষেধ, বাড়িঘর, গাছপালা, পশুপাখি ধ্বংস করা যাবে না, অমুসলিম ধর্ম প্রচারক ও উপাসনালয়ের কোন ক্ষতি করা যাবে না, কেউ শান্তি চায় এই মর্মে কোন বার্তা পাঠালে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে ইত্যাদি অনেক বাধ্যবাধকতা আছে এবং এর সমকক্ষ মানবিক যুদ্ধনীতি এযাবৎ প্রণীত হয়নি এবং হবে না।

ইসলাম শব্দটির উৎপত্তিগত অর্থই শান্তি। হযরত মুহাম্মদ (স:) তাঁর প্রতিটি কর্মকাণ্ডে যে উদারতার দৃষ্টান্ত রেখেছেন তা আমরা আত্মস্থ করতে পারিনি। মক্কা বিজয়ের পর তিনি বলেছেন, আজ ক্ষমার দিন, আবু সুফিয়ানের গৃহে যে আছে সে’ও নিরাপদ। আমরা নির্বাচনে জয়ের পর সহিংসতা সৃষ্টি করি। আমরা পশ্চিমা বিশ্বে প্রচার করতে পারিনি যে, যীশু খ্রিস্টের জন্ম নিয়ে যেখানে খ্রিস্টানদের অনেকে সন্দেহ পোষণ করে, সেখানে আমরা দ্বিধাগ্রস্ত নই। আমরা সম্ভাষণেও শান্তি বর্ষণের প্রার্থনা করি কিন্তু তার প্রয়োগ ঘটে না। ইহুদি বা খ্রিস্টানরা তাদের নবীদের নাম ও সাধারণ একজনের নামে পার্থক্য করে না। কিন্তু কোন মুসলিম যদি সেই নবীর নামের আগে হযরত ও শেষাংশে আ(:) উল্লেখ না করে তা অসৌজন্য বলে মনে করা হয়। অনেক অমুসলিমই জানেনা যে মহানবী(স:) শ্রেষ্ঠ নারী হিসেবে তাঁর স্ত্রী বা মা’এর নাম বলেন নি, বলেছেন যীশু খ্রিস্টের মা মরিয়ম(আ:) এর নাম। ইসলাম নিয়ে রাজনীতি হয়, ষড়যন্ত্র হয়, ক্ষমতার হাতিয়ার হয় ইসলাম; ফলশ্রুতিতে ইসলামকে বিতর্কিত করার সুযোগ হয়। কোন ধর্মের অনুসারীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা নি:সন্দেহে ঘৃণ্য একটি কাজ যেমনটি ঘটেছে “ইনোসেন্স অফ মুসলিমস” নামক বিতর্কিত চলচ্চিত্রে। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন। কিন্তু একই সাথে মনে রাখতে হবে মুসলিম হিসেবে আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য কী। যতদিন আমরা ইসলামের মূল বাণী শান্তিকে অনুধাবন করে নিজের মাঝে প্রতিফলিত করতে না পারবো, ধর্মকে হাতিয়ার বানাবার অপচেষ্টা থেকে যতদিন আমরা বিরত না থাকবো এবং অপরকে বিরত না করবো হয়তো ততদিন আক্রমণের লক্ষবস্তু হবেন সর্বোত্তম চরিত্রের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হযরত মুহাম্মদ(স:) যিনি ক্ষমা, শান্তি ও উদারতার অনন্য দৃষ্টান্ত। ইসলাম যে শান্তি ও সম্প্রীতির বাণী নিয়ে এসেছে তার প্রতিফলন ঘটানোর দায়িত্ব আমরা এড়াতে পারি না।