ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার ” গ্রুপের পক্ষ থেকে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে পথ শিশুদের মাঝে খাবার বিতরণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয় । গ্রুপের সদস্য হিসেবে আমাকে এসএমএস এ জানানো হলে আমি যথা সময়ে উপস্থিত হই । পথ শিশুদের সংগ্রহ করার দায়িত্ব পড়ে আমার উপর ।

ভাই একটু দেন, একটু দেন । সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে লাঞ্চ করার সময় ওরা এভাবেই প্রতিদিন সবার কাছে খাবার চায় । কেউ দেয় আবার কেউ দেয় না । তাই ভাবলাম লাইব্রেরির সামনে গেলেই ওদের পাওয়া যাবে । কিন্তু লাইব্রেরির সামনে গিয়ে একটু আশ্চর্য হলাম। আজ কেউই নেই। তখন কিন্তু লাঞ্চ এর সময়ও হয়ে গেছে। ক্যাম্পাস তো এখন বন্ধ। শীতকালীন ছুটি চলছে । ওরাও হয় তো এটা জানে যে এখানে থাকলে কিছুদিন আর খাবার জুটবে না । তাই খাবারের সন্ধানে অন্য কোথাও ঢুঁ মেরেছে । প্রায় পনের বিশ মিনিট পর নাট্য মণ্ডলের সামনে দু’জনের সাক্ষাত পেলাম ।

আমি ওদের দিকে এগুচ্ছি এটা ওরা বুঝতে পেরে পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে । আমিও ওদের ভাব বুঝতে পেরে দূর থেকেই আশ্বস্ত করলাম । তোদের কিছু বলবো না । একটা কথা আছে । কি কথা কন । ওখান থেকেই কন । ওদের সাথে কেউ ভালো ব্যবহার করে না জন্যই মনে হয় ওদের কাছে গেলে ওরা ভয় পায় । যাই হোক বললাম দুপুরে খাবি ? কি জিনিস ? খিচুরি গোস্ত দিয়ে । খামু । কই খাওয়াইবেন ? একজন প্রশ্ন করলো আমাকে । ভার্সিটির ভিতরে বট তলার পাশে মূর্তি আছে চিনস? ওই যে ভাই বোনের মূর্তি? বললাম, হু । ওখানে যা । তোদের বন্ধু বান্ধব যারা আছে ডেকে নিয়ে যা । একটু পরেই খাবার দেওয়া হবে । খুশির একটা ঝলমলে আভা ফুটে উঠলো ওদের জীর্ণ মুখে । একবেলা খাবারের নিশ্চয়তা পেয়েই খুশি। আজ দুপুরে খাবারের জন্য ওদের হাত বাড়াতে হবে না । বেশ তাড়া হুড়া করেই ওরা হাঁটা শুরু করলো ।

যেখানে চল্লিশ পঞ্চাশ জনের আয়োজন , সেখানে পেলাম মাত্র দু’জন ।

সোহরাওরারদি উদ্যানে ঢুকে বেশ কয়েক জন কে পেলাম । বলার সাথে সাথেই ওরা রাজি হয়ে গেল । কই খাওয়াইবেন ? বললাম ভার্সিটির ভিতরে বট তলার পাশে মূর্তি আছে চিনিস ? ওই যে ভাই বোনের মূর্তি ?বললাম হু । বলল চিনি । বললাম যা ওখানে যা ।

সামনে পা বাড়ালাম আমি । ছেড়া স্যান্ডেল দিয়ে দু’জন ব্যাড মিনটন খেলায় মত্ত । পাশেই একটা ছাউনিতে তখনও গাদাগাদি করে ঘুমাচ্ছে কয়েকজন । ভাবলাম ওদের বাবা মা হবে । ওদের দু জন কে বলতেই ওরাও রাজি হল । শুধু আমগোরে দু’জনেরেই খাওয়াইবেন ? না । তোরা যত জনকে নিয়ে আসতে পারবি সবাইকেই খাওয়াবো। হগলেরেই? নিশ্চিত হওয়ার জন্য মনে আবার প্রশ্ন করলো । বললাম হ । সাথে সাথেই এই দুই জন ওই ঘুমন্ত মানুষগুলোর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল । ওই উঠ উঠ । খাওয়ন দিব । হুড়মুড় করে উঠল অনেক কয় জন । আশ্চর্য হলাম । ওদের বাবা মা কেউ ওখানে নেই ।কোন বড় মানুষও নেই । সবাই ওদের মত। সাত, আট, নয় বছরের।

অপরাজেয় বাংলা যে ওদের কাছে ভাইবোনের মূর্তি হিসেবে পরিচিত জানতাম না । দুই ভাই এক বোনের মূর্তি । ওদের কিছুটা কাছাকাছি যেতে পেরে অনেক ভালো লাগছে । অন্য রকম একটা ভালোলাগার রেলগাড়িতে ঘুরছি আমি । ভাবতে গেলে হারিয়ে ফেলছি নিজেকেই ।

অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে আমরা খাবার বিতরণ করি। এসময় উপস্থিত হন আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর মোবাসসের মোনেম । এমন একটা আয়োজন করার জন্য স্যার আমাদের কে উৎসাহ দেন । খাবার বিতরণের পরেও কিছু প্যাকেট থেকে যায় । পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে ঘুরে আমারা বাকি খাবার বিতরণ করি । এমন একটা কাজে অংশগ্রহন করতে পেরে খুবই ভালো লাগছে । এটা যেন এক নতুন অভিজ্ঞতার প্রতিবিম্ব । বিজয় দিবসের পরের দিন ওই পথ শিশুদের চোখে মুখে কিছুক্ষনের জন্য হাসি দেখেই মনে হয়েছে বাংলাদেশ সত্যি কারের অর্থেই বিজয় অর্জন করেছে ।