ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

হাজারো হাসি-কান্না, সুখ-দু:খ এবং আন্দোলনের নীরব সাক্ষী হয়ে এখনও গৌরবের পতাকা হাতে দাড়িয়ে আছে দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মধুর ক্যান্টিন । নির্বোধ, জড়াজীর্ণ মধুর দেয়াল, চেয়ার, টেবিল সব কিছুতেই রয়েছে অনেক স্মৃতি, ইতিহাসের পরম স্পর্শ । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের ঐতিহাসিক এই মধুর ক্যান্টিন ।

ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে বিক্রমপুরের শ্রীনগরের জমিদারদের সঙ্গে মধুদার পিতামহ নকরীচন্দ্রের ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ব্যবসা প্রসারের উদ্দেশ্যে নকরীচন্দ্র তার দু’পুত্র আদিত্যচন্দ্র ও নিবারণ চন্দ্রসহ ঢাকায় আসেন। তারা জমিদার বাবুর জিন্দাবাজার লেনের বাসায় আশ্রয় নেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর নকরী চন্দ্র পুত্র আদিত্য চন্দ্র’র ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ব্যবসা প্রসারের দায়িত্ব দেন।

নকরীচন্দ্রের মৃত্যুর পর আদিত্য চন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের মাধ্যমে তার ব্যবসা শুরু করেন। ব্রিটিশ পুলিশ এ সময় ক্যাম্পাসের আশপাশের ব্যারাক ও ক্যাম্প প্রত্যাহার করার উদ্যোগ নিলে আদিত্য চন্দ্র বৃটিশ পুলিশের কাছ থেকে ৩০ টাকার বিনিময়ে দু’টি ছনের ঘর ক্রয় করে তার একটিতে বসবাস শুরু করেন।

মধুদা তখন ১৫ বছরের তরুণ। তিনি ১৯৩৪-৩৫ সাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পিতা আদিত্য চন্দ্রের সঙ্গে খাবারের ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৩৯ সালে পক্ষাঘাতে পিতার মৃত্যুর পর মধুদা পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরেন। পাশাপাশি তার বড়ভাই নারায়ণচন্দ্রের পড়াশুনার খরচ জোগাতে থাকেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের দাবির পেক্ষিতে ডাকসু কার্যক্রম শুরু হয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের পাশে মধুদার দায়িত্বে ক্যান্টিন প্রতিষ্ঠিত হয়।

‘মধুর ক্যান্টিন’ নামটি প্রতিষ্ঠিত হবার আগে এর নাম মধুর ষ্টল, মধুর টি-স্টল, মধুর রেস্তোরা ইত্যাদি ছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগেই এর সূচনা। চারদিকে দেয়ালঘেরা এই ভবনটি নবাবদের একটি বিশ্রামাগার হিসাবে ব্যবহার করা হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন ঢাকা মেডিকেল থেকে স্থানান্তর করে বর্তমান ভবনে আনা হলে মধুদাও এখানে চলে আসেন। মধুদার বন্ধুসুলভ আচরণ ও সততার জন্য তিনি ছাত্রদের কাছে বেশ বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন। ফলে ক্যান্টিনটি ক্রমেই ছাত্ররাজনীতির মূল ঘাঁটিতে পরিণত হয়। ’৪৮এর ভাষা আন্দোলন, ’৪৯ এর বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলন, ’৫২-র ভাষা আন্দোলন, ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচন ও সর্বশেষ মুক্তিযুদ্ধের সময় বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আসে এ ক্যান্টিন থেকেই। ’৬৯ থেকে ’৭১ পর্যন্ত বহু বৈঠক মধুদার ক্যান্টিনে হয়েছে। রাতের অন্ধকারে এসব বৈঠক সম্পর্কে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ছাড়া শুধুমাত্র মধুদাই অবহিত থাকতেন। মধুদা সবার খাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। মধুর ক্যান্টিন ছিল প্রগতিবাদী গণতান্ত্রিক ছাত্র আন্দোলনের অলিখিত হেডকোয়ার্টার। এসময় এটি পাক বাহিনীর রোষানলে পড়ে। এর জের ধরে ’৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন সবার প্রিয় মধুদা ,তার স্ত্রী, বড় ছেলে ও তার নববিবাহিত স্ত্রী । এরপর ক্যান্টিনের হাল ধরেন মধুদার বড় মেয়ে। একসময় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলে এটি চলে আসে তার বড় ছেলে অরুণ কুমারেরে কাছে। অরুণদাই মধুর ক্যান্টিন এখনো পর্যন্ত করে রেখেছেন গতিময় ।

ক্যান্টিনে ঢুকতেই দরজার সামনে যে ভাস্কর্যটি দেখা যায় সেটাই মধুদার ভাস্কর্য ।

মধুর ক্যান্টিন শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, পুরো বাংলাদেশের ঐতিহ্য। এটিকে ঘিরে আছে অনেক ইতিহাস । মধুদা নেই কিন্তু তার ক্যান্টিন আজও বাঙালীর অস্তিত্বের অখণ্ড ইতিহাস ।