ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

ক্লাস শুরু হতে তখনও বাকি। দাড়িয়ে ছিলাম ডিপার্টমেন্ট এর সামনে। হটাৎ দৌড়াদৌড়ি। ছোটাছুটি । কৌতূহলী হয়ে উঠলাম আমি মিলন আর জুবায়ের । মল চত্বরের দিকে ই অনেকে ছুটছে । বট তলার উৎসুক জনতা তাকিয়ে আছে ওই মল চত্বরের দিকে। ডিপার্টমেন্টের সামনে তখন অনেক ভিড়। সবাই কে পাশ কাটিয়ে ছুটলাম আমরা তিন জন।

ক্রিকেট ষ্ট্যাম্প আর ব্যাট দিয়ে বেধড়ক পেটাচ্ছে একজনকে । দশ বারো জন যে যার মত মারছে । ভিকটিম একজন হুজুর টাইপের । জামাত শিবির কি না তাও জানি না । লম্বা পাঞ্জাবি পায়জামা পরিহিত । মাথায় টুপি । মুখে লম্বা দাড়ি । কাঁধে ব্যাগ । দুই হাত দিয়ে সে প্রতিহত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে । ঠিক পেরে উঠছে না। না পারারই কথা। এতজনকে সে সামলাবেই বা কিভাবে । সবাই দেখছে । কষ্ট পাচ্ছে । তার জন্য মায়া দয়া উপচে পড়ছে । কিন্তু ওই পরিস্থিতিতে আসলে কিছুই করার থাকে না । একজন শুধু বলেছে ভাই ওই ভাবে আর মাইরেন না । এবার সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল ওই ছেলেটির উপর। গণপিটুনি আজই প্রথম দেখলাম । খুব খারাপ লাগলো । দৃশ্যটা চোখের সামনে ভাসছে এখনও ।

আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি । কোন দিকের পানি কোন দিয়ে গড়াবে তা বুঝে উঠার আগেই হয় তো বিপদে পড়ে যাবো । হলের শিক্ষার্থীদের বড় ভাই আছে । তাদের একটা সাইনবোর্ড আছে । বড় রকমের একটা সাপোর্ট আছে তাদের । ক্যাম্পাসে তাদের অনেক পরিচিতি । তারা কোন বিপদে পড়লে কেউ না কেউ বাঁচাতে আগিয়ে আসবে । কিন্তু আমরা যারা হলে থাকি না । হলের ছিট পাই নি এখনও । আমাদের ওই ক্লাসমেট ছাড়া আর তেমন কেউ চিনে না । ক্লাসমেট বৃত্তে বন্দি আমরা । আমাদের নেই বড় ভাই , হলের ভাই , রাজনৈতিক ভাই। সাইনবোর্ড , সাপোর্ট আর ক্যাম্পাসে পরিচিতি কিছুই নেই আমাদের ।

গত সোমবার থেকেই আমাদের এই শান্ত ক্যাম্পাসটা কেমন যেন অশান্ত হয়ে উঠেছে । সোমবার পুরো ক্যাম্পাসে ১৩ টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটেছে । মঙ্গলবারের বিস্ফোরণ স্কোর বোর্ড ১৩ ছাড়িয়ে ২০ এ এসে দাঁড়িয়েছিল । আজ বুধবার ক্যাম্পাসের চারপাশে ছিল বিপুল পরিমাণে পুলিশ । আতংকের ছোপ ছোপ দাগ পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে । বিস্ফোরণ স্কোর বোর্ড ২০ ছাড়িয়ে যে নতুন রেকর্ড গড়বে না এমন নিশ্চয়তা এখন আমাদের নাগালের বাইরে ।

চারপাশে যাই হোক ক্যাম্পাস আমাদের সবচেয়ে বড় নিরাপদ জায়গা । ক্লাসের চার দেয়াল ভেঙ্গে আমরা নিশ্চিন্তে গল্প আড্ডায় মেতে উঠতে পারি হাকিম চত্বর, বটতলা , শ্যাড কিংবা টিএসসি তে । কিন্তু এসব জায়গায় যদি ককটেল বিস্ফোরিত হয় তাহলে আমরা কোথায় যাবো ? ক্যাম্পাসে কেউ দৌড়ালেই আমরা আতঙ্কিত হই । চায়ের কাপ আর চপ সিঙ্গারার প্লেট টা পাশে রেখে চারপাশ টা খুব ভাল করে দেখে নেই । ক্যাম্পাসের এসব খবর আমরা জানার আগেই টিভি চ্যানেলের ডানায় ভর করে পৌঁছে যায় অভিবাবকদের কাছে । কলের পর কল আসতে থাকে । আমরা এখন অনেক টা নিরুপায় ।

হরতালের আগের দিন ভার্সিটির বাসের দোহাই দিয়ে আমরা দেরি করে ক্যাম্পাস থেকে বাসায় ফিরতে পারি । বাবা মাকে আশ্বস্ত করতে পারি । আর যাই হোক ভার্সিটির বাসে দুর্বৃত্তরা আক্রমন করতে পারবে না। করবে না । গত সোমবারে মতিঝিলে ভার্সিটির ফাঁকা বাসে অগ্নি সংযোগ, ভাংচুর করা হয়েছে । ক্ষণিকা, মৈত্রি আর উল্লাস নামের ভার্সিটির বাসে শিবিরের কর্মীরা আক্রমণ করেছে । আজ বুধবার ক্যাম্পাস থেকে বাসায় ফেরার জন্য কার্জন হলে বাসের জন্য গিয়ে দেখি লাল দোতালা বাসে আগুন জ্বলছে । ভরকে গেলাম । কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি । কোন রকমে ভার্সিটির বাসে চড়ে বাসায় ফিরলাম । চিরচেনা এই ক্যাম্পাসের রুপ এখন বদলে যেতে শুরু করেছে ।