ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

১৯২১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর। পাবনার চাটমহল গ্রামে জন্ম করেন কাজী আফসার উদ্দিন আহমদ। তাঁর পৈত্রিক নিবাস ছিল মানিকগঞ্জের কতল গ্রামে । পিতা আফাজ উদ্দিন আহমদ ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। শৈশবের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি পা রাখেন স্বপ্নময় কৈশোরে। তখন বাড়িতে সবাই তাঁকে সুরুজ নামেই ডাকতো ।

এরপর তিনি ভর্তি হন চট্টগ্রাম কলিজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণীতে । পাঠ্য পুস্তকের চার দেয়ালে বন্দী না থেকে বইয়ের জগতে তিনি ডানা মেলে মুক্ত পাখির মত আবাধে বিচরণ করতেন। লেখা পড়ার পাশাপাশি তিনি গল্প, কবিতা, উপন্যাসসহ বিভিন্ন ধরনের বই পড়তেন। এছাড়াও তিনি নিয়মিত লেখালেখিও করতেন ।
তখন কলকাতার দেব সাহিত্য কুটির সাহিত্য থেকে নিয়মিত বের হত মজার মজার সব সংকলন । সেবার রংবেরঙের ছবি আর ঝকঝকে প্রচ্ছদের এক অনবদ্য কিশোর সংকলন বের হয়। তাতে স্থান করে নেয় চৌদ্দ বছরের প্রাণবন্ত কিশোর সুরুজের লেখা । সে ‘আলোক দূত’ ছদ্ম নামে ‘মুক্তির সন্ধানে আফ্রিকায়’ শিরোনামে একটা লেখা লেখে। লেখাটি ছাপা হওয়ার পর ছেলেটির সে কি আনান্দ! ভালোলাগার উড়োজাহাজে সে যেন ভেসে বেড়ায় আনন্দের জোস্নালোকে ।তখন থেকেই সে পাঠ্য বইয়ের পড়া বাদ দিয়ে দেব সাহিত্য কুটিরের বিভিন্ন সংকলন, বিভিন্ন বইপত্র আর পত্র পত্রিকা নিয়ে মেতে ওঠে ।এতে করে তাকে বাবার বোকা ঝোঁকাও খেতে হয় নিয়মিত। তারপরেও সে পাঠ্য বইয়ের ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে নিত অন্য সব বই। যাতে বাবার হাতে ধরা না পরতে হয় তাই এম্পন বুদ্ধির প্রয়োগ।

ছোট বেলা থেকেই সে চিন্তাশীল, ভাবুক । তাই সব সময় লেখার ভিতরের রহস্য, যুদ্ধ ও ইতিহাসের আশ্চর্য সব ঘটনা গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন । এই সময় হেমেন্দ্র কুমারের ‘যক্ষের ধন’ বইটি পড়ে ছেলেটি রীতিমত পাগল ই হয়ে যায় । তারও ইচ্ছে জাগে এমপ্ন একটা রহস্য উপন্যাস লেখার । তখন থেকেই ভালো কোন রহস্য উপন্যাসের খোঁজ পেলে সে পড়ে ফেলত এক নিমিষেই।

বাতাসের রেলগাড়িতে পার হয়ে যায় কিছুটা সময় । ছেলেটি একদিন নিজের বাড়ি ছেড়ে পাড়ি জমায় কলকাতায়। সেখানে গিয়ে সে শিশুতোষ লিখতে শুরু করে । কলকাতা থেকে তখন মাসিক মোহাম্মাদি পত্রিকা নিয়মিত বের হত । কুমার নারায়ণ ছদ্মনামে সে মোহাম্মাদি পত্রিকায় একটা গল্প পাঠায় । গল্পটি ছাপাও হয় । আর তখনই সাড়া পড়ে যায় চারপাশে । অবশেষে সবাই যাকে খুঁজে বের করল তিনি হলেন কাজী আফসার উদ্দিন আহমদ। বাড়িতে যিনি ‘সুরুজ’, দেব সাহিত্য কুটিরে ‘আলোক দূত’, এবং মাসিক মোহাম্মাদিতে ‘ হেমেন্দ্র কুমার নারায়ণ’।
মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তার প্রথম উপন্যাস বের হওয়ার সাথে সাথে ই তিনি কলকাতার ‘সন্দেশ’, ‘মৌচাক’, ‘রামধনু’ ও ‘কৃষক’ পত্রিকার ছোটদের পাতা চাঁদের হাটে গল্প, কবিতা,ছড়া, উপন্যাস, ও প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। এর পাশাপাশি তিনি বড়দের জন্য রাজনীতি, ভ্রমণ কাহিনি ও প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন । ফলে তার খ্যাতির আলোকচ্ছটা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে । এদিকে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং ছোটদের জন্য মাসিক খেলাঘর বের করেন। এই সময়ে তিনি অলক, মোহাম্মদি, সওগত, শিশু সওগত, দেশের কথা, গুলিস্তা, ইনসাফ ও দৈনিক জিন্দেগির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রকাশনা বিভাগে কাজ করেন । মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সচিত্র শিশু কিশোর মাসিক নবারুনের সম্পাদক ছিলেন ।

তাঁর লেখা প্রায় ৬০ টি বই প্রকাশিত হয়েছে। যার মধ্যে নয়টি ই ছিল উপন্যাস । গ্রন্থিত হয়নি এমন পাণ্ডুলিপির সংখ্যা ৪০ টি । যার মধ্যে আছে গল্প, উপন্যাস, নাটক, জীবনী ও প্রবন্ধের পাণ্ডুলিপি। ‘চর ভাঙ্গার চর’ উপন্যাস টি তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি ।

বাংলার এই মহান সাধক, কীর্তিমান পুরুষ ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক কাজী আফসার উদ্দিন আহমদ ১৯৭৫ সালের ২৬ শে মার্চ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ।

সময়ের আবর্তনে আমরা অনেক কিছুই ভুলে যাই । ভুলে যাই অনেক গুণী মানুষদের কথাও। বাংলার গুণী এই মানুষটির আজ শুভ জন্মদিন । জন্মদিনে তাঁকে অনেক অনেক শুভেছা । শুভ জন্মদিন কাজী আফসার উদ্দিন আহমদ ।