ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

শূন্য থেকে আসি, শূন্যে মিলিয়ে যাই। ‘জন্মিলে মরিতে হবে’–অর্থে ব্যবহারবিধি পেলেও, গূঢ়ার্থে এর মর্ম উদ্ধার জরুরি। আসা-যাওয়ার এই যে পৃথিবী-রীতি (এর বাইরের কোনো রীতি জানি না অর্থে) তা থেকে আমরা মুক্ত নই। মুক্ত নই চিন্তার স্বাধীনতা থেকেও। সে কারণে জন্ম-মৃত্যুর মধ্যবর্তী অঞ্চল আমাদের অজানা থাকার কথা নয়। এ অঞ্চলের বিস্তৃতি ও বিকাশ, নির্বাণ ও নির্মিতিতে শূন্যের স্থিতি বিরাজমান। বেঁচে থাকার সঙ্গেই শূন্যের সম্পর্ক, আছি অর্থই শূন্য, নাই অর্থই না-শূন্য। তাহলে ছোট-বড় এইসব অসংখ্য অযুত শূন্য সম্পর্কে অল্প করে হলেও জানা থাকা দরকার। জানা দরকার, মস্তিষ্কের ব্যবহার ও প্রয়োগরীতি সম্পর্কেও–যা কোনোভাবেই সীমাবদ্ধতা নয়, বিস্তারের স্বরূপযাত্রায় সবিবেচিত। বিস্তার বিকাশে স্বপ্রাণায়াম। প্রাণের অস্তিত্বের সঙ্গে শূন্যের যেমন সম্পর্ক, প্রাণপাতেও শূন্যের সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় না। তখনই বিশেষভাবে ল করার বিষয় এবং প্রশ্ন ওঠে–শূন্যমুক্ত হওয়া যায় কি? উত্তরও শূন্য, কারণ শূন্যের উত্তরের সমাধান শূন্যতেই। সে-কারণে শূন্যমুক্তির জায়গায় খত, শূন্যযুক্তির জায়গায় সৎ। অর্থাৎ শূন্য থেকে মুক্তি নেই, জন্মেই যেখানে শূন্যের যুক্ততা ও প্রকাশ যুক্ত হয় এবং সৃষ্টির রূপারূপগ্রাহ্যতা তৈরি করে, সেখানে সমগ্র জীবন একটি শূন্যের ওপর দাঁড়িয়ে যায়–যা পৃথিবীকাল বা জগৎধ্বংসকাল পর্যন্ত টেকসই রূপ পায়, অর্থাৎ মজবুত কাঠামোয় দাঁড়িয়ে যায়। মিশরের পিরামিড, সুউচ্চ দালান, প্রকৃতি ও উল্লিখিত প্রশ্নসমগ্র সৃষ্টিজগৎ, বৃহদার্থে সৌরমণ্ডলী কি শূন্যের ওপর দাঁড়িয়ে নয়? উত্তর–হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ। অর্থান্তরে শূন্য দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে বা টিকে থাকছে পুরো পৃথিবী, প্রকৃতি ও মানুষ এবং সৃষ্টিবিস্ময় সমগ্র সৌরজগৎ। ধরা হয়, ভারতবর্ষে শূন্যতত্ত্বের উদ্ভব ও বিকাশ। কিন্তু চর্চার অভাবে আজ তা প্রায় দূর-পরিচিত। অনাত্মীয় হয়ে পড়ছে দিনে দিনে। ভেতর থেকে শূন্যের সেই শক্তিকে জাগিয়ে তোলা তথা আত্মদর্শনই শূন্যদর্শন এবং শূন্যতত্ত্বের মূল কথা। অর্থাৎ পৃথিবীজীবনের মানুষযাত্রাই শূন্যতত্ত্বের প্রকৃত দর্শন, যেখানে সুখ-শান্তি, সুন্দর ও কল্যাণের বিষয়াবলি সম্পর্কিত। ব্যাখ্যা-বিস্তৃতিতে, ছোটখাটো উদাহরণ-রীতিতে, মনে নেয়ার সংস্কৃতিতে হাঁটি হাঁটি পা পা করে যাত্রা হলো শুরু, এবার হাঁটতে থাকুন, কত বছর হেঁটেছেন, আর কত বছর হাঁটবেন, প্রশ্ন করুন নিজেকেই, উত্তর নিশ্চয়ই মিলবে শূন্যদর্শনে।

বাংলা একাডেমী যেখানে তার ব্যবহারিক বাংলা অভিধান গ্রন্থে শূন্য অর্থ–‘০’ এই চিহ্ন, zero, রিক্ততাসূচক চিহ্ন; আকাশ; অস্তিত্বশূন্য, অনস্তিত্ব, অবিদ্যমানতা; অভাব, অনটন; রিক্ত, বিহীন, রহিত; খালি, ফাঁকা, যাতে কিছু নেই–বলে উল্লেখ করছে, সেখানে এ-যাত্রা স্বপ্ন-সম্ভব সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে সম্পন্ন বা হয়ে ওঠাকে চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। যেখানে একমাত্র ইতিবাচকার্থে ‘আকাশ’ শব্দ ও শব্দরূপার্থ ব্যবহার করা হচ্ছে, তার পাশেই অবিদ্যমানতা হাস্যকরই মনে হতে পারে পাঠকের কাছে। ফাঁকার কি কোনো অস্তিত্ব নেই? তাহলে প্রাত্যহিক জীবনের ধূলিকণা, বিভিন্ন জীবাণু ও অণু-পরমাণুর অবস্থান কোথায়? স্পেস বা স্থান অর্থান্তেই অস্তিত্বের রূপচর্চা ও যৌবন সপ্রকাশিত। ফাঁকা হোক, ঢাকা হোক, আর পরিপূর্ণ হোক–সবখানেই প্রাণ ও বস্তুর সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সে-কারণে ব্যাকরণিক ভুল বা অসত্য আলোচনায় এ-যাত্রা পতিত হয়নি, বরং স্বমূর্ত চেহারায় এ-দর্শনযাত্রা সম্পূর্ণ ও বিকশিত হয়েছে। এই পরিপ্রেেিত উল্লিখিত আভিধানিক অর্থ ও ব্যাখ্যা প্রত্যাহার হওয়া যেমন দরকার, তেমনি ইতিবাচকার্থে ভাষাবর্ণের ব্যবহার ও প্রকাশ হওয়া আরো জরুরি। শূন্যার্থ ফাঁকা বা অনস্তিত্ব নয়, যখন আকাশকেই মহাশূন্য বলা হয় এবং প্রতিটি শূন্যের বা শূন্য অবস্থানেরই একটি অস্তিত্ব বা জায়গা আছে–যা আধুনিক বিজ্ঞান বহু আগেই প্রমাণ করেছে। এ ছাড়া সবকিছুর শুরুও শূন্য থেকে, আবার শেষেও শূন্যের বিদ্যমানতা জানান দেয়ার পাশাপাশি মূলে রতি হয়। অঙ্কশাস্ত্রে শূন্যের অবস্থান স্থান-কাল-পাত্রভেদে সুনির্দিষ্ট ও বর্তমান। প্রতিটি কাজের শুরুতে শূন্যের অবস্থানকে স্বীকার করে নিয়েই যাত্রা শুরু করতে হয় এবং শেষ করতে হয়, সেখানেই সৃষ্টির আনন্দ ও সৌন্দর্য সপ্রাণান্ত উপস্থিত। পুরো পৃথিবীটাই শূন্যের ওপর দণ্ডায়মান অথবা ভাসমান–যা সুসম্পাদিত ও সুনিয়ন্ত্রিত। প্রশ্ন উঠতে পারে–সৌরমণ্ডলীরই-বা অবস্থান কোথায়? সেখানেও শূন্যের সম্পর্ক, অবস্থান ও বিস্তৃতি-বিকাশ লণীয়। এ ছাড়া মানুষ ও অন্যসকল জীব ও প্রাণিকুলের সম্পর্কও শূন্য থেকে উৎসারিত ও প্রতিষ্ঠিত। শরীর, মন ও আত্মার যোগাযোগ ও গতিপ্রকৃতি শূন্যে হয়েছে লীন। ভিত্তিপ্রস্তরগতভাবেও বস্তু, প্রাণ ও আধ্যাত্মিকতার স্থিতিস্থাপকতা ও বিকাশ শূন্যে। এর চেয়েও বড় কথা–মানুষ যে অক্সিজেন ব্যতীত একদিনও জীবিত বা বেঁচে থাকতে পারে না, সেই অক্সিজেনের উৎপত্তি, অবস্থান ও নির্মিতি শূন্যে; যদিও তার প্রকরণগত বিশ্লেষণ নানা মানদণ্ডে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, তত্ত্ব ও তথ্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সৃষ্টিরহস্যের যাত্রাও শূন্যপথে এবং শূন্যাবিষ্ট মায়া ও কায়া রূপে বিকাশমান। সে-কারণে দেখা যাবে, জীবনের শুরু এবং শেষ, গ্রন্থের শুরু এবং শেষ, এভাবে প্রতিটি সৃষ্টি এবং ধ্বংসের মাঝেও শূন্যের অবস্থান বর্তমান। শূন্য নেই কোথায়? আগেই উল্লিখিত হয়েছে, যে-কোনো কিছুরই শুরু ও শেষ শূন্যে; মাঝেও শূন্যের বিস্তৃতি-বিকাশকাল লণীয়। শূন্য ব্যতীত অথবা শূন্যাবস্থান বা কাল ছাড়া পুরো-জগতের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রশ্ন করা যায় এবং যার উত্তর থাকে না বা অনুপস্থিতযোগ্য হয়ে পড়ে। উত্তরেরা শূন্য হলে প্রশ্ন যায় হারিয়ে, আবার প্রশ্নেরা শূন্য হলে উত্তর যায় ফুরিয়ে; সেখানে তৃতীয় শূন্যের বিদ্যমানতা সৃষ্টি হয়–সেই শূন্যাস্তিত্ব নতুন শূন্যের জন্ম দেয়। এই থাকা না-থাকার শূন্য, দু’য়ে মিলেমিশে সম্পূর্ণ শূন্য–যা দ্বারা জগৎ সৃষ্টি হয়েছে, পরিচালিত এবং যুগের পর যুগ চলবে শুরু থেকে অনাদিকাল। সে-কারণে ‘শূন্য’কে ইতিবাচক অর্থে গ্রহণ করে বা ব্যবহারের মধ্য দিয়ে শূন্যযাত্রা এগিয়ে গেছে। নির্বাণ বা শূন্যতাপ্রাপ্তির পথও শূন্য দ্বারা আকীর্ণ। তাই শূন্য ব্যতীত জীবন যেমন নিষ্প্রাণ, তেমনি শূন্যদর্শন ছাড়া সকল দর্শনও প্রাণহীন। পর্যায়ক্রমে শূন্যদর্শনে সেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, কোথাও-বা নতুন করে তুলে ধরা হয়েছে অদেখা ভবিষ্যৎ-সম্ভাবনার কথা–যা আগামী দিনের নতুন স্বপ্ন-সম্ভারে, চলনে-বলনে-পালনে এবং সৃষ্টিমন্ত্রে প্রকাশমান। এ ধারাবাহিকতায় এসেছে শরীর ও মনের বেড়ে ওঠার স্নায়ুতন্ত্রযাত্রায় যৌবনকথা ও গতিশ্র“ত জীবনের আরো নানা অনুষঙ্গ। যুক্ত হয়েছে সাহিত্য-সংস্কৃতির নতুন ধারা ও বিকশিত পথপরিক্রমা–যেখানে শূন্যের অবস্থান ও স্থিতির আলোকোজ্জ্বল বেড়ে ওঠা ও ‘হয়ে ওঠা’র ধারাক্রম প্রকাশ পেয়েছে। আর সে-কারণেই সুন্দর জীবনের জন্য শূন্যদর্শন অনিবার্য হয়ে ওঠে আবশ্যক পর্যায়েও। ধর্মের বাইরে শূন্যদর্শনের অবস্থান পরমাত্মার জ্ঞানচর্চায়, লালন-এর সহজ-সরল মানুষে–সুবর্ণ সুবচন সুবিবেচনায়। এর কয়েকটি পর্ব বা বিস্তারকাল নিয়ে এই গ্রন্থসমগ্রে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে–যা খুব সহজেই পাঠকের চিত্ত-মনকে সমৃদ্ধ করার মধ্য দিয়ে জীবনের শুভ-সুন্দর যাত্রাপথকে ত্বরান্বিত করবে–ইচ্ছাশক্তি, শ্রমশক্তি এবং চিন্তাশক্তির প্রকরণপ্রিয় সংমিশ্রণে। চিন্তা অর্থ সাধনা, সাধনা ধ্যানে সম্পন্ন, আর ধ্যান-স্বপ্ন-সাধনা উল্লিখিত শক্তিতে রূপান্তরিত হলেই জীবনে-যৌবনে আসে আকাক্সিত সফলতা এবং তৈরি হয় নতুন দিনের স্বপ্ন-সফল সুন্দর সম্ভাবনা। জয়-পরাজয়ের শীর্ষবিন্দুতেও উল্লিখিত শক্তির অবস্থান চিহ্নিত থাকে–মাত্রাগত, সংখ্যাগত এবং চর্চাপ্রীত। সে-কারণে জেনে-বুঝে-শুনে বোধ নির্মাণের ধারাকে শূন্যযাত্রা প্রতিষ্ঠা করে; যার মধ্য দিয়ে মানুষ পরমপ্রাপ্তি বা অর্জনকে স্পর্শ করতে পারে। আর এ-নিমিত্তে শূন্যজ্ঞান প্রতিটি মানুষের আরাধনার বিষয়রূপ হয়ে ওঠে। যিনি তা অর্জন করেন, তিনি সফল হন, সম্মানিত ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষে পরিণত হয়ে ওঠেন। প্রকৃত মানুষ হওয়ার এই পথও আবার শূন্যে বিলীয়মান। সেই শূন্যে সবাই যেতে পারে না। যারা সে পথে অগ্রগামী–তারা নবী-রসুল-পয়গম্বর, সাধক-ধ্যানী, বৈজ্ঞানিক-গবেষক-আবিষ্কারক এবং কবি। প্রচলধারার কবি-সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মী এ আলোচনায় উল্লেখ্য নয় বা পাত্র-পাত্রী হিসেবে যায় না।

এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলায়, বিশেষত ভারত উপমহাদেশে শূন্যধারার দু’জন সফল মানুষ লালন সাঁই ও গৌতম বুদ্ধ-কে বিনম্র চিত্তে স্মরণ করছি এবং তাদের আত্মার প্রতি অন্তরশুদ্ধিযাত্রার বিশেষ-অশেষ শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছার মাধ্যমে স্মরণ করছি।

তারিখ : ২০ ডিসেম্বর ২০১১