ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

ধর্মচিন্তা
ধর্মচিন্তা ধর্মদর্শনেরই অংশ। প্রচল কিংবা অপ্রচলার্থে মানুষ ধর্মমুক্ত হতে পারে না (পৈতৃক কিংবা সনির্বাচিত, অথবা ত্যাগে), কিন্তু ধর্মান্ধ মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে কম নয়। খুন-ধর্ষণ থেকে শুরু করে এমন কোনো খারাপ বা ঘৃণ্য কাজ নেই–যা তারা করছে না। বিশ্বব্যাপী বোমা ফাটিয়ে, বাংলাদেশে রগ কেটে, মানুষ হত্যা করে বিশেষ পরিচিতি পেলেও, তারাই আবার চক্রাকারে মানুষকে মানসিকভাবে নানা পর্যায়ে নির্যাতন করছে–বংশপরম্পরায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে উল্লেখ্য, প্রায় সকল প্রচল ধর্মেরই বিস্তার ও বিকাশ ঘটেছে হত্যা, ভোগদখল ও নির্যাতনের পথে। এরাই ফতোয়া দেয়, মানুষে মানুষে বিভক্তি সৃষ্টি করে, আবার রাষ্ট্রক্ষমতাও দখল করতে চায়, করেও দেশে দেশে। অথচ রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্কই নেই। কারণ রাষ্ট্রের পাপ-পুণ্যের হিসেব নেই, প্রথা পালনেরও কোনো সুযোগ নেই। সে প্রেক্ষিতে দেখা যাবে, প্রধানত ধর্মের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্কই বেশি। এটাকে পুঁজি করে প্রচল ধর্ম-ধারণা মানুষে মানুষে বিকাশমান বা বিশ্বাস-অবিশ্বাসে সংরক্ষিত। পশু-পাখি, গাছপালার জন্য তো নিশ্চয়ই মানসসৃষ্ট প্রচল ধর্মের প্রয়োজন নেই। তাদের প্রকৃতিধর্ম সৃষ্টি থেকেই দোদুল্যমান। সেখানে মানুষের প্রবেশ কতটুকুই-বা আর। এইসব ধর্মান্ধ, ধর্মব্যবসায়ী মোল্লা মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ধরেছে তাদের উদরপূর্তিতে–শোষণের বেড়াজাল তৈরি করে। তাদের কুমন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে আসতে মানুষকে জ্ঞান-সচেতনতার সঙ্গে মুক্তির পথ তৈরি করতে হয়। মানুষকে প্রকৃতই মানুষ হয়ে উঠতে গেলে জ্ঞানার্জনের বিকল্প নেই এবং শেষ পর্যন্ত সাংস্কৃতিক বিকাশে বিশ্বাস বা আস্থার জায়গা তৈরি করতে হয়, ফিরে যেতে হয় প্রাণের কাছে, প্রেম ও ভালোবাসার নিবিড়ে। এ জন্য জ্ঞানার্জন অত্যাবশ্যকীয়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পরিপূর্ণ ধারণা ও চর্চায় একজন মানুষ প্রত্যাশিত সিদ্ধি লাভ করে। বই আধুনিক বিশ্বে (কম্পিউটার ও নেট সংযোগসহ হাজারো আবিষ্কারের যুগেও) জ্ঞান বিকাশের ও অর্জনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম বা পন্থা। মানুষ বইবিচ্যুত হলে মরা-মানুষে নতুন রূপ পায়, সে অনায়াসেই ঘুষ খায়, দুর্নীতি করে, অন্যায় করে, নির্যাতন করে, খুন করে, ধর্ষণ করে; এই মানুষ সর্বপ্রকার মানবিকতাবিচ্যুত, অমানুষ–যাদের সঙ্গে সমাজ-কর্ম চলে না। এমন ধর্ম বা ধর্মমানুষ সমাজের দরকার নেই, রাষ্ট্রেরও না। সে-কারণে আমাদের জানতে হবে, শিখতে হবে, চিনতে হবে, চেনাতে হবে–আপন বৈশিষ্ট্যে ও বিকাশে। এর বিকল্প নেই, গত্যন্তরও নেই। ধর্মান্ধদের যারা প্রশ্রয়-আশ্রয় দেয়, ভাত দেয়, কাপড় দেয়, রান্না করে দেয়, যৌনকাম দেয়–তারাও ধর্মান্ধগোত্রীয় ও পরিত্যাজ্য। এইসব ঘৃণ্যজন থেকে আমাদের সতর্ক হতে হয়, সুন্দর ও কল্যাণের চর্চায়–শুভ কামনায়, সে-যাত্রাও শূন্যধামে চিরন্তনী প্রেমধারা। কোথায় পাবেন এই জ্ঞান? এইসব ঘৃণিত ও পরিত্যাজ্যদের ঘৃণা ও পরিত্যাগ করার জন্য যে শক্ত-কঠিন ও স্বাভাবিক মন দরকার, তার জন্যও সাধনা করতে হয়, জ্ঞানার্জন করতে হয়, সুন্দরের চর্চা করতে হয়–সর্বদা শুভচিন্তা বিকাশে। এর ভিন্নতায় সমাজে অন্যদের মতো আপনিও বিভ্রান্ত হবেন, বিপথ ও বিপদগামী হয়ে পড়বেন। যেখান থেকে ফেরা কঠিন। আর কঠিন বলেই ধর্মান্ধ মোল্লারা সে সুযোগটা নিয়ে আমাদের চোখ-মুখ বেঁধে দেয়। তখন আপনি দেখতে পারেন না, বলতে পারেন না; শুধু শোনেন ভুলকথা–ভুল মানুষের প্রলোভন ও উত্তেজনায় বিভ্রান্ত হয়ে। কারণ আমাদের আশপাশ তো হাজারো ভুল মানুষেই ভরা–মিথ্যা ও শঠতায় ঠাসা, নিন্দুকেরা হয়ে উঠছে আপাত (ভুল দেখানো) খাসা। তার ওপর আপনার বন্ধুও যদি হয় ঐসব ধর্মান্ধ-ঘৃণিত ব্যক্তি বা দলগোষ্ঠী, তবে তো কথাই নেই–একেবারে পোয়াবারো, সে ক্ষেত্রে আপনার পতন অনিবার্য–ধ্বংসরূপের ভয়ঙ্কর রোগে। এই পতন শারীরিক ও আর্থিক নাশ নাও হতে পারে, এই পতন মন ও আত্মার সমূহ ক্ষতি–যা থেকে ফেরা যায় না, ফেরানো হয় না। এই প্রকার মানুষ কোনোভাবেই আর শুভচিন্তা করতে পারে না। মনগড়া সবকিছুই চাপিয়ে দিতে চায় অন্যের ওপর–বিশ্বাস ও ধর্মের মোড়কে। একবার ভেবে দেখুন তো, একজন মানুষ আর কখনোই কোনোভাবে শুভ ও সুন্দরের কল্পনা বা চিন্তা করতে পারছে না, তখন তাকে কী বলবেন? অথচ পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষ সম্পূর্ণতই পৃথক ও আলাদা–কী চরিত্রবৈশিষ্ট্যে, কী অনন্য ভাবনায়–কর্মে ও দক্ষতায়। এই স্বতন্ত্রযাত্রাকে ধর্মান্ধরা ভেঙে দিতে চায়, নষ্ট করতে চায়–খোঁয়াড়ের রূপকথারূপ গল্পে। সফল না-হলে, অধীনস্থ করতে না-পারলে, এরাই আবার ধর্মজিহাদের নামে শারীরিক ও মানসিক আক্রমণে উদ্ধত হয়–নানা পর্যায়ের নির্যাতনে, হত্যায়, ধর্ষণ ও লুণ্ঠনে, ভোগদখলে। সেই ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে শরীর-মন ও আত্মার সংস্রবে সর্বভূমে রুখে দাঁড়ানোই এ-যাত্রার অন্যতম লক্ষ্য ও দিকনির্দেশনা। নানামুখী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ধারায় ধর্মচিন্তার এ-পর্ব বিস্তারের আলোচনা এগিয়েছে। আমরা কি চাই না কলুষতামুক্ত নতুন সমাজ ও পরিণত মানুষযাত্রা–যেখানে সুখ-শান্তি রতি হবে, সুন্দর ও কল্যাণের স্বপ্নবিস্তারে–সততার অন্ন-কামে।

আমার ধর্মত্যাগ : চিন্তার বহুরৈখিকতা ও বিকাশ (প্রকাশিতব্য) গ্রন্থসূত্রালোচনার একটি সার-সংক্ষেপ এ পর্বে সন্নিবেশিত হলো–যা ধর্মকে জানতে, বুঝতে ও আত্মস্থ করতে সহায়তা করবে। যে কোনোদিন সমুদ্র দেখেনি তার কাছে নদী, যে কোনোদিন নদী দেখেনি তার কাছে খাল-বিল, যে কোনোদিন খাল-বিল দেখেনি তার কাছে দিঘি বা পুকুর, যে কোনোদিন দিঘি দেখেনি তার কাছে কুয়া অনেক কিছু–বিশালরূপ সমুদ্র, মহাসাগর ইত্যাদি ইত্যাদি। মূর্খ মোল্লা ও যাজকদের কাছ থেকে আমরা ভুলেভালে ভরা ধর্মব্যাখ্যা বা ফতোয়া পাই, তা ঐ কুয়ো দেখার মতোই। কুয়োর ব্যাঙেরা একটু বেশিই লাফায়, একটু বড় হয়ে মানুষ হত্যা করে, রগ কাটে, তারও একটু পরে সমাজ-রাষ্ট্রের মতা দখল করতে চায়। কিন্তু এরা জানে না, মানুষের মৌলিক অধিকারযাত্রায় অধিকার রক্ষা ও অধিকার আদায়ের দীক্ষা–মানুষের জন্মবার্তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা। এরা তাই লঙ্ঘন করছে দেশে দেশে, বাংলাদেশে; মসজিদ-মন্দির-প্যাগোডা-গির্জা দখল করে ধর্মের মর্মবাণী বা মূল সত্য ও মানবতার কথা না-বলে তারা তাদের ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তাদানের প্ররোচনায় উঠেপড়ে লেগেছে। ফলে আপনাকে অবশ্যই সমুদ্র দেখতে হবে এবং সচেতন হতে হবে, সতর্ক হতে হবে, জ্ঞানী হতে হবে। ধর্মের সঙ্গে দর্শনের, কিংবা বিজ্ঞানের সঙ্গে ধর্ম বা দর্শনের পার্থক্য মতাদর্শগত হলেও, ধর্ম-বিজ্ঞান ও দর্শন মূলত আদর্শ প্রচার করে। তবে বিজ্ঞান নিরেট পরীক্ষাগার–সবকিছু জেনে-বুঝে-শিখে শিক্ষা দেয় বা স্বীকার করে; আর ধর্ম ও দর্শন পুরোটাই ভাবাগার বা প্রচারাগার, অনেকাংশে এক একটা স্কুল। বিজ্ঞান ঐ পর্যন্ত স্বীকার করে, যে পর্যন্ত পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত; ধর্ম স্বর্গ-নরকের মতো রূপকথারূপ কাহিনী শোনালেও, সকল ধর্মই সত্য ও ন্যায়ের কথা বলে–মানুষ হত্যা ও নির্যাতনের সম্পূর্ণ বিপরীতে তার অবস্থান; দর্শন নানা মতের নানা আদর্শ প্রচার করে, তবে নিশ্চিতভাবে মানবতাবাদের সঙ্গে সত্য ও সুন্দরের সমন্বয়ে কল্যাণকে পরিস্ফুট করে। এর বাইরে ব্যতিক্রম হিসেবে বিজ্ঞান, ধর্ম ও দর্শনের নামে যদি কিছু থাকে, তবে তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য, দূষণীয় ও ঘৃণিত। মানুষের মৌলিক অধিকার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা এবং বিনোদনের সুষম কাঠামো তৈরি করে সমাজে ও রাষ্ট্রে তার প্রতিষ্ঠারূপ দেখতে চায়–একাধারে ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞান। কিন্তু কালপরিক্রমায় মানুষ ধর্ম দ্বারা বিভ্রান্ত হয়েছে সবচেয়ে বেশি, বিশেষ করে যাজকের পাল্লায় পড়ে–বহুবিচিত্র ফতোয়া ও প্রলোভনের দ্বারা, নিষিদ্ধের একপ্রকার আকর্ষণে, অনিষিদ্ধের অন্যপ্রকার বিকর্ষণে। বিজ্ঞান ব্যবহার বা প্রয়োগরীতির কারণে বহুভাবে আলোচিত-সমালোচিত হলেও, তার সৃষ্টি মানুষ বা সৃষ্টিজগতের উন্নয়ন ও বিকাশে, ধ্বংসে নিশ্চয়ই নয়। পারমাণবিক আবিষ্কার ছিল পরমাণু-সংক্রান্ত নানা শক্তি উৎপাদনে, বিশেষ করে মানুষের সুস্বাস্থ্য রায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎসহ আধুনিক জীবন-চাহিদার অন্য সব শাখার আবিষ্কারে অনুঘটকের ভূমিকায় সঠিক পর্যায়ে সঠিক সময়ে কাজে লাগানোর জন্যে। কে জানতো যে শেষ পর্যন্ত তা ব্যবহৃত হবে বোমায়, তা কি আবিষ্কারকর্তা বিজ্ঞানীও শুরুতে ভেবেছিলেন? নাকি তা বিকৃত মানসিকতার মানুষ-নামীয়দের হাতে পড়ে উদ্দেশ্যছিন্ন হয়েছে? একমাত্র দর্শনই মানুষকে কোনোকালে বিশেষ বা বড় ধরনের তির সম্মুখীন করেনি। দর্শনের প্রধান কাজ আদর্শ প্রচার করা, তা রতি হলো, নাকি হলো না–তা তার দেখার বা বিবেচ্য বিষয় নয়। দার্শনিকও এখানে সরাসরি হাজির হন না কখনো; অথচ ধর্মের নামে যাজকরা অবতার হিসেবে হাজির হয়েছে যুগে যুগে। অবতারদের কথা সুবিবেচনায় এনে মা করে দেয়া গেলেও, যাজকের মুখাবয়বে যারা স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছে, তারাই যত রকমের অঘটন ঘটিয়েছে ও শুভতাকে নষ্ট করেছে। সে-কারণে ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞানের সমন্বয় সাধন করা গেলে অনেক ভালো হতো। যার ফলে উৎকৃষ্ট পর্যায়ের আধুনিক যাত্রাকে অনেকখানি ত্বরান্বিত করা যেত। এর বাইরে দর্শনই শ্রেয় পথ বা আদর্শস্থানীয়, যে কাউকে বিভ্রান্ত না-করে মনের দরজা-জানালা খুলে দেয় জ্ঞানের আকাশে, মাটিতে, ভূতলে। পারলে সে কাঠামোগত ভাবের ঘর ভেঙে দিয়ে মুক্তঘর প্রতিষ্ঠা করে শূন্যকায়া মাঝারে। এখানে এসেই মানুষের সঙ্গে দর্শনের সমিল ও আত্মীয়তা। বিজ্ঞান ও দর্শনযাত্রা তাই মানুষকে মুক্ত করেছে যুগে যুগে, মুক্ত করবে অনন্তকালব্যাপী। এ-যাত্রার সঙ্গে নিশ্চয়ই আপনার পরিচয় ঘটবে…

তারিখ : ৫ জানুয়ারি ২০১২